অচেনা – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

ঘ‍্যাঁচ করে ব্রেক কষল ঋষি, মেয়েটা একেবারে সামনে,ক্রসিং-এর লাল লাইটে গান বাজছে “যদি তারে নাই চিনি গো”- শশব‍্যস্ত ঋষি গাড়ির দরজা খুলতে যাবে, লক-টা যেন আঁট হয়ে বসে আছে; আশেপাশের লোকজন গেল গেল করে ছুটে এল, ঋষির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, “সত‍্যিই কিছু হয়ে যায় নি তো”- মনে মনে ভাবল সে; জনতা জনার্দন তাহলে পেড়ে ফেলবে তাকে, শরীরের একটা হাড়গোড়ও আস্ত রাখবে না। ভিড়টা বেশ জমে উঠল, একজন বলল-” মরে যায় নি তো,” ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে একজন নাড়ি দেখতে বসে গেল।

খোলা চুলে মুখ ঢেকে আছে মেয়েটির, ঋষির প্রাণপাখি যেন ওর উঠে বসার ওপর নির্ভর করছে; অলরেডি দুটো খিস্তি কানে এল-” শালা গাড়ি চালালে রাস্তার মানুষকে মানুষ বলে মনে করে না,”- আর একজন বলে উঠল-“দে ঠুসে শালাকে,”- উত্তেজনার মাঝে নড়ে উঠল মেয়েটি। উপস্থিত জনতা একটু নরম হল, যে লোকটা নাড়ি দেখছিল সে বোতলের জলের ছিটে দিল মেয়েটার মুখে, ঋষি পকেট হাতড়াচ্ছে কার্ডের জন‍্য, কে জানে কত টাকা গুনাগার দিতে হয়; সবাইকে অবাক করে অস্ফুটে উচ্চারিত হল-“না, ওনার কোন দোষ নেই, আমিই এসে পড়েছিলাম সামনে।” সবার মনোযোগ ঋষিকে ছেড়ে মেয়েটির দিকে গেল,ঋষি সহৃদয়তা দেখিয়ে বলল-” চলুন, আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দি, যদি লাগে রাস্তায় ডাক্তারও দেখিয়ে নিতে পারেন।”

একটা ষন্ডা গোছের লোক বলল-” যদি লাগে মানে- আপনাকে অবশ‍্যই এটা করতে হবে আর ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।” মেয়েটা ক্ষীণস্বরে প্রতিবাদ করে উঠল- “না না, ওসব লাগবে না।” এতক্ষণে ঋষির বড় মায়া হল মেয়েটার ওপর, ভাবল-“বেশ ভাল মনের তো, মওকা বুঝে নিতেই তো পারত টাকা।” ঋষি হাতটা বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে, যাতে সে উঠে দাঁড়াতে পারে, একটু ইতস্তত করে ও ধরল হাতখানা, একি!

এই হাতের স্পর্শে ঋষির মনে অস্থিরতা এল কেন? ভাবনাটাকে পাত্তা না দিয়ে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল মেয়েটাকে, ওর মুখের একদিকটা চুলে ঢাকা,জায়গাটাও অন্ধকার, তবুও ঋষির মনে হল, দূরের কোন স্বপ্নের দেশ থেকে হাজির হল, তারই চেনা কোন স্বপ্নমালা।

মুখে না-না বললেও মেয়েটার কনুই-এর কাছটা অনেকখানি কেটে গ‍েছে, গাড়ির ফাস্টএড বক্স থেকে তুলো, গজ, ব‍্যান্ডেজ, ডেটল এনে দ্রুত হাতে রক্ত বন্ধের ব‍্যবস্থা করল ঋষি। আশেপাশের ভিড় ক্রমশ পাতলা হচ্ছে, দু-চারজন এখনো দাঁড়িয়ে মজা দেখছে, ওপাশের ফুটপাত থেকে ভেসে এল, “চুরালিয়া হ‍্যায় তুমনে যো দিলকো”ঋষি দেখল এভাবে বেশীক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হবে না, প্রায় জোর করেই মেয়েটাকে গাড়িতে উঠতে বলে গাড়ি স্টার্ট দিল।

গাড়ির ফ্রন্ট গ্লাসে এক মায়াবী প্রতিফলন খেলা করছিল, কেউ-ই মুখ খুলছিল না, দুজনেই চুপচাপ, নিস্তব্ধতার প্রাচীরে আড়াল হওয়া যেন দুটো মানুষ, দৈবাৎ রাস্তার অঘটন, যাদের এক চলমান শকটে বসিয়ে দিয়েছে।ঋষি খেয়াল করল গাড়ির তেল জিরো লেভেলে নেমে এসেছে, সামনে একটা পেট্রল পাম্প দেখে দাঁড় করালো গাড়িটাকে, আলগোছে হাজার টাকার নোট আর গাড়ির চাবিটা এগিয়ে দিল পাম্পকর্মীর দিকে। চাবিটা ফেরত নিতে গিয়ে খেয়াল হল মেয়েটা ঘুমে ঢুলে যাচ্ছে, কিন্তু ওকে তো জাগাতে হবে, বাড়ির ঠিকানা জানা চাই, নাহলে তো উদ্দেশ‍্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে হয়। গলা খাঁকারি দিয়ে ঋষি বলল-” ম‍্যাডাম, আপনার বাড়িটা কোন্ দিকে একটু বলবেন, তাহলে নামাতে সুবিধে হয়।”

মেয়েটা একটা হস্টেলের ঠিকানা বলল,শিয়ালদার কাছাকাছি, ঋষির গাড়ি এখন পার্কস্ট্রীটে, মানে যেতে আরো খানিকটা সময় লাগবে, মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল,- ” শরীর দুর্বল লাগছে? কিছু খাবেন? একটু চা বা কফি।” মেয়েটা উত্তর দিল,-“না,” ঋষির বেশ খিদে পেয়েছে, বার বার অনুরোধ করতে, রাস্তার ধারের একটা আধো অন্ধকারে থাকা রোলের ঠ‍্যালা দোকান দেখাল, বলল-” এখানে দাঁড়ান।”

এমনিতে ঋষি এ ধরণের দোকানে খায় না, তবুও রাজী হল মেয়েটার কথায়, গলির মধ্যে গাড়িটাকে পার্ক করে দুজনে দাঁড়াল গিয়ে রোলের দোকানের সামনে। রোলের অর্ডার দিয়ে বসল পাশে রাখা বেঞ্চিটাতে, সামান‍্য ইতস্তত করে মেয়েটাও বসল, হাল্কা স্বরে দোকানিকে বলল,-” আমার রোলের ভেতর স‍্যালাড আর সস দেবেন না।

ঋষি সামান্য আনমনা হল, এরকম কথা সে কোথায় শুনেছে, কার কাছে শুনেছে, স্মৃতির গোড়ায় জল ঢেলেও কিছুতেই মনে করতে পারল না; গরম রোলটা হাতে নিয়ে ঋষির খিদেটা আবারও চাগাড় দিল, রোলে কামড় দিয়ে জিভে ছ‍্যাঁকা খেয়ে বলে উঠল- “উরি-বাস্, জিভ তো পোড়বার জোগাড়,” ওর ধরণ দেখে মেয়েটা হাসতে গিয়েও থমকে গেল, মাথা নীচু করে হাতে ধরা রোলটা খেতে থাকল।

রোলওয়ালার মোবাইলে বেজে চলেছে- “সেই ভাল সেই ভাল, আমারে না হয় না জানো,”ঋষি মনে মনে ফুটপাতের দোকানির তারিফ করল ওর রাবীন্দ্রিক ভাল লাগার জন‍্য। খাওয়া শেষ করে জগের জলে হাত ধুয়ে ঋষি জগটা মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল, অন্ধকারের প্রগাঢ়তাতেও অপরিচিতার আড়ষ্টভাব ঋষির দৃষ্টি এড়ালো না। দাম চুকিয়ে গাড়ির দিকে এগোল, পেছন পেছন মেয়েটা এসে গাড়ির পেছনের সীটে আগের মতোই বসল, ট্রাফিকের লাইনে থেমে থেমে অবশেষে এক ঘিঞ্জি গলির তস‍্য ম‍্যাড়ম‍্যাড়ে এক হস্টেলের সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াল।

বাক‍্য বিনিময়ের সুযোগ না দিয়ে মেয়েটা তড়িঘড়ি হস্টেলে ঢুকে গেল।ঋষি খানিকক্ষণ কিংকর্তব‍্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কারুর উপকার করে পাল্টা কৃতজ্ঞতার সাড়া পাবে তা অবশ‍্য কোনদিনই সে আশা করে না, তবে মেয়েটার অকারণ হুড়োহুড়ির কারণও বুঝতে পারছে না, গাড়ি ঘোরালো নিজের সাবেকি আস্তানা ভবানীপুরের দিকে।

হস্টেলে নিজের ঘরে ঢুকে সুরঞ্জনা চুলের আবরণ সরালো, দগ্ধ গালে ঋষির ছোঁয়া আঙুলের স্পর্শ নিল; পাঁচ বছরের অদেখায় ঋষি কি তাকে ভুলে গেল? এতদিনের চেনা মানুষটাকে তো অনুভবের মণিকোঠায় কোথাও তুলে রাখে নি। একদিকে ডাগর আর অন‍্যদিকে বীভৎস, কোঁচকানো চোখে অশ্রুর ধারা গড়িয়ে পড়ল, এতদিন সন্তর্পণে আগলে রাখা আগল ভাঙা বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে চাইছে।

একদিন সে নিজেই চায় নি অন‍্যের অনুকম্পায় বাঁচতে, দুর্ঘটনার কুফল সে নিজেই ভোগ করে চলেছে গত পাঁচ বছর ধরে; এমন কি দায় বাড়ায় নি , নিজের পরিবারের, চিকিৎসাতেই তো লেগে গ‍েছে দু- বছর, বাকী তিনবছর ধরে চলেছে নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই; যে লড়াই দাঁতে দাঁত চেপে সে একাই লড়েছে, দুর্যোগের আঁচ লাগতে দেয় নি ঋষির গায়েও। নিজেকে আড়াল করেছে সময়কে সাক্ষী রেখে, মুক্ত করেছে ঋষিকে তার ভার থেকে, নির্ভার জীবনের খোঁজে রেখে এসেছে ঋষিকে।

“আঃ”- আওয়াজ করল সুরু, ঋষির বড় আদরের সুরু, দুলটা খুলতে গিয়ে অন‍্যমনস্কতার খোঁচায় রক্তের নাচন তার আঙুল বেয়ে নীচে নামছে, ঠিক তার ক্ষতবিক্ষত জীবনের মতো; অথচ একদিন এই জীবনেও দোলা ছিল, ছন্দ ছিল,ঋষির সঙ্গে কাটানো মুহূর্তরা ছিল। সব যেন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে,ফেলে আসা যে জীবনকে এতদিন সন্তর্পণে ঢেকে রেখেছে, তা যেন দমকা হাওয়ায় তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে।

কি কুক্ষণে ও আজ নিউমার্কেটের পথে পা বাড়িয়েছিল,পড়বি তো পড় একেবারে ঋষির গাড়ির সামনে, ভাগ‍্যিস তার অদম‍্য প্রচেষ্টা আর বদলে যাওয়া চেহারার জন‍্য ঋষি তাকে চিনতে পারে নি। একেবারেই কি ঋষি তাকে চিনতে পারে নি, মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশ্নটা, কোন্ উত্তরটায় খুশি সে, তা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। প্রশ্নের ঘোর কাটতে পার্সটা ব‍্যাগ থেকে বার করতে গেল, “একি কোথায় ওটা, রাস্তাতেই পড়ে রইল নাকি?”-নিশ্চিত হতে না পেরে চারদিকে আবার চোখ বোলালো, না কোথাও নেই, তন্ন তন্ন করে খুঁজছে এইসময় মোবাইলটা বেজে উঠল, ধরে কানে দিতেই স্থির হল সুরঞ্জনা, ও প্রান্তে কে?

এতো পরিস্কার ঋষির গলা, ঘামতে থাকে সে, তবুও অতিকষ্টে বলে-” হ‍্যা- -হ‍্যালো।” ও প্রান্ত থেকে উত্তর আসে,-” ম‍্যাডাম, আপনি আপনার পার্সটা আমার গাড়িতে ফেলে গ‍েছেন, খুব জরুরী হলে আজই দিয়ে আসতে পারি, নাহলে আপনি যে দিন বলবেন।” সুরঞ্জনা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে-” না আজ লাগবে না, কোন একদিন নিলেই হবে,”- বলেই ফোনটা কেটে দিল, নিশ্চয়ই ঋষি পার্স থেকে কল লিস্টটা পেয়েছে, যেটা সুরঞ্জনা সবসময় পার্সে রাখে, ফোন নম্বর মনে রাখার ঝক্কি নেয় না, ফোনের চার্জ অফ হলেও বুথ থেকে ফোন করতে পারে, এনজিও-র কাজে তাকে এদিক ওদিক ফোন করতে হয়।

বড্ড ক্লান্ত লাগছে সুরঞ্জনার, চা পেলে ভাল হোত, চাঁপাদি মানে হস্টেলের হাউসকিপারকে ডেকে চা দিতে বলল, যা সে সচরাচর করে না, হয় ডাইনিং- এ গিয়ে খায় বা নিজে করেও নেয়; তার দগদগে জীবন ইতিহাসের ব‍্যাপারে সামান্য হলেও হস্টেলের সকলেই প্রায় জেনে গ‍েছে।

এ নিয়ে কারুর মনে ওর প্রতি করুণা, কেউ বা আড়ালে ফিসফিস করে, যার কোনটাই সে চায় না, তবুও তাকে ভোগ করতে হয়; যেমন ভোগ করতে হয়েছিল তার আদরের দিদিভাই-এর মামাতো দেওরের এঁকে দেওয়া অ‍্যাসিডের ক্ষতচিহ্ন, যে ইতিহাসটা ঋষিকে জানতে দেয় নি সুরঞ্জনা, অথচ যার জানাটা সবচেয়ে জরুরী ছিল। নিঃশব্দে ঋষির দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছিল, নিজেকে নিজেই জনারণ‍্যে মিশিয়ে দিয়েছিল যাতে তাকে চেষ্টা করেও খুঁজে না পায়; ঋষি জানত তাকে ছেড়ে তার সুরু উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে চলে গ‍েছে।

কিন্তু,- কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা হল কোথায়? যাকে ফাঁকি দেওয়ার জন‍্য সুরঞ্জনা ওর চিকিৎসার ব‍্যবস্থা করেছিল দিল্লিতে, কাকু-কাকিমার বাড়িতে থেকে, ফেরেও নি এই শহরে, এনজিওর কাজে তিন মাস হল ওর এখানে বদলি হয়েছে। বদলিটা আটকানোর জন‍্য অসম্ভব খেটেছিল সুরঞ্জনা, লন্ডনে- ওদের হেড অফিসে প্রচুর মেল ও চিঠি চালাচালি করেছে; ঋষির সঙ্গে দ‍েখা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা মনের মধ্যে ছিল, কিন্তু এত বড় শহরে তা সত‍্যিই ঘটবে একথা সে ভাবে নি।

আজ সে আবার তার রক্তাক্ত ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে, যে ইতিহাসের দুঃস্বপ্ন এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে, যে ইতিহাস তাকে তার ঋষির থেকে আলাদা করে দিয়েছে; দিদিভাই-এর মামাতো দেওর রোহিত প্রায়ই ওকে বিরক্ত করত, বিশেষ পাত্তা না দিয়ে, ওকে এড়িয়ে চলত সুরঞ্জনা। কিন্তু ওকে না পাওয়ার জিঘাংসা মেটাতে রোহিত যে অতদূর যেতে পারে তা কল্পনাতেও ছিল না।

সেদিন- সেদিন কলেজ গেট থেকে বেরিয়ে ওই পরিচিত অথচ বিরক্তিকর মুখটা দেখে হন হন করে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল সুরঞ্জনা। হঠাৎ তীরের ফলার মতো ছুটে এল অ‍্যাসিডের শত- সহস্র কণা, ও! সে জ্বালা কোনদিন ভুলবে না সুরঞ্জনা, হাজারো ভীমরুল যেন তার মুখ, গলা, হাত কামড়ে ধরেছিল, সবাই ছুটে আসার আগেই রোহিত পালিয়ে ছিল।

হাসপাতালে পৌঁছেছিল প্রায় অজ্ঞান হয়ে, জ্ঞান ফিরতে নার্স দিদিদের কথা শুনতে পাচ্ছিল, ওরা বলাবলি করছিল-“এমন ক্ষতি মানুষ মানুষের করতে পারে।”কেউ একজন বলল- “মেয়েটার চেহারাটা দেখেছেন, মুখের মাংস যেন গলে পড়ছে।” সেপটিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল, ডাক্তারদের চেষ্টায় ওর বিপদ কেটেছিল, কিন্তু মুখের বীভৎসতা এড়াতে পারে নি, প্লাস্টিক সার্জারি করা সত্বেও সুরঞ্জনার শ্রীময়ী মুখ এখন অসংখ্য খানাখন্দের আল্পনা। একটু সুস্থ হতে দেখেছিল ঋষির মেসেজ আর মিসড্ কলে ওর ফোন ভরে গ‍েছে, এই ফোনটা ছাড়া তো সুরঞ্জনার আর কিছুই ঋষি জানত না, সিমটা পাল্টে ফেলেছিল সুরঞ্জনা।

সুস্থ হওয়ার পর বিস্তর খেটেছিল যাতে রোহিতের শাস্তি হয়,রোহিতের প্রভাবশালী বাবাও চেষ্টা করেছিল খুব, রোহিতকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য। সুরঞ্জনা সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিল দিদিভাইয়ের আচরণে, শশুরবাড়ির ব‍্যাপার বলে বোনকেই মিটমাট করে নিতে বলেছিল, আরো অদ্ভুত ব‍্যাপার মায়েরও তাতে পরোক্ষে সায় ছিল। মাও চেয়েছিল ঘটনা যখন ঘটেই গ‍েছে, বড় মেয়ের সংসারটা বাঁচুক, সে অভিমানে সুরঞ্জনার মন এখনো কাঁদে।

সাথ দিয়েছিল দিল্লির কাকা, নিজেরা নিঃসন্তান হওয়ায় সুরঞ্জনাকে ওরা সবসময় আগলে রাখে; মামলার পুরো খরচটাই ওনারা করেছিলেন। তবে বাহবা দিতে হয় কলেজের গেট ম‍্যানকে, পুরো ঘটনাটাই ওর সামনে ঘটায়, ওই ছিল প্রধান সাক্ষী, মিথ‍্যে সাক্ষ‍্য দেওয়ার জন‍্য রোহিতের বাবা ওকে অনেক টাকা দেবে বলেছিল,ও রাজী হয় নি। প্রধান সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে শাস্তি পেয়েছে শয়তানটা, দশবছরের জেল হয়েছে, সুরঞ্জনার ক্ষতির কাছে সে কতটুকু আর। বান্ধবীদের কাছে শুনেছিল ঋষি পাগলের মতো ওর খোঁজ করেছে কিন্তু ততদিনে তো সে দিল্লির রাজেন্দ্রনগরে ওর কাকার বাড়িতে।

কারুর করুণার পাত্রী সে হতে চায় নি, সময় ঋষিকে ঠিক উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে, এই ভেবেই নিশ্চিন্ত ছিল, আর আজ তো নিজের চোখেই দেখতে পেল ঋষি তো উঠে দাঁড়িয়েছে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; তার ভালবাসা কি এত ছোট যে প্রেমাস্পদের ভারবহ হয়ে তা বেঁচে থাকবে,তার চেয়ে এই ভাল, যেখানেই থাকুক ঋষি ভাল আছে। আজ ঋষির মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস দেখেছে সে, তার ছিটেফোঁটাও তো সুরঞ্জনার নিজের মধ্যে অবশিষ্ট নেই,জীবনযুদ্ধে লড়তে লড়তে সে আজ ক্ষয়ে যাওয়া একটা মলাটের মতো।যার ভেতরটায়ে কি আছে, দ‍েখার আগ্রহ কারুর হবে না।

বাড়ির গ‍্যারেজে গাড়ি ঢুকিয়ে নামতে যাবে ঋষি দেখল,সীটের তলায় কি যেন একটা পড়ে আছে, ঝুঁকে দেখল একটা লেডিস পার্স। নিশ্চয়ই মেয়েটা ফেলে গ‍েছে, আহা কতই না অসুবিধেতে পড়বে, মনে মনে ভাবল সে।পার্সটা হাতে নিয়েই ঘরে ঢুকল। ঢুকেই দ‍েখে মা আর তৃপ্তি মাসি ড্রয়িং রুমে, সঙ্গে আরো কিছু অপরিচিত লোক বসে আছে; নিজের রুমে ঢুকতে যাবে, অমনি তৃপ্তি মাসি ডাকল-” বুবাই- একবার এদিকে এসো, এনারা তোমার জন‍্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন, তোমার দেরী হল তো আজ অফিস থেকে ফিরতে।”- মা বলল-” হ‍্যাঁ বুবাই, একটা সম্বন্ধের ব‍্যাপারে ওনারা এখানে এসেছেন,”- ঋষি মনে মনে ভাবল, এত লোক দেখে তার আগেই ভাবা উচিৎ ছিল, মা আর তৃপ্তি মাসি মিলে নতুন কোন বিপদের ঘুঁটি সাজিয়েছে।

আগে আগে ওরা ওকে বলে রাখত, না ফিরে সব ভেস্তে দিত, ইদানিং তাকে না বলেই করে সব, অগত‍্যা কাষ্ঠহাসি হেসে খানিক ভদ্রতা করতে হল।যদিও মনে মনে জানে শেষ অব্দি কোন না কোন চক্করে সে ঠিক বিপদ কেটে বেরিয়ে আসবে। বাধ‍্য ছেলের মতো ব‍্যবহার করল, যেমন প্রতিবারেই করে থাকে; মা আর তৃপ্তিমাসির কাছে এ এক রহস‍্য তাদের এমন রূপবান, উচ্চশিক্ষিত ছেলেকে শেষ অব্দি সবাই প্রত‍্যাখ‍্যান করে কেন। নিজেই নিজের চরিত্রহীনতার সার্টিফিকেট চালান করে ঋষি, সে খবর তো আর পায় না।

অল্পেতেই রক্ষা পেয়ে নিজের ঘরে যাওয়ার অনুমতি পেয়ে গেল ঋষি। ঘরে ঢুকে স্নান সেরে ও পার্সটা আবার হাতে তুলে নিল, একটা চেনা গন্ধ জড়িয়ে আছে বলে মনে হল, খাটে শুয়ে- হাত,পা ছড়িয়ে গন্ধটা চেনার চেষ্টা করল, ঋষির মরে যাওয়া মন আজ হঠাৎ উদাস হল কেন? সে তো বরাবরই দায়িত্ব সচেতন, তাই প্রথমেই পার্সটা ফেরত দেওয়ার চিন্তাটা মাথায় এল; ফেরত দিতে গেলেও তো যোগাযোগ করতে হবে, কি ভেবে পার্সটা খুলে ফেলল, খুলতেই কললিস্টের কাগজটা বেরিয়ে এল।

লিস্টে একটা জায়গায় সেল্ফ লেখা, মনে হয় নম্বরটা ওনার হবে- ডায়াল করল ঋষি, উল্টো দিকে যে গলাটা শুনল সেই গলাটা সে কি আজই শুনেছে? নাকি এই আওয়াজ ওর অনেকদিনের চেনা, মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আর অবধারিতভাবেই যে নামটা তার শয়নে, স্বপনে এসে পড়ে সেই নামটাই মনে এল, অস্ফুটে উচ্চারণ করল-” সুরঞ্জনা, সুরু,”- দূরে কোন একটা বাড়ি থেকে ভেসে এল বেহাগের করুণ সুর, ঋষির মনটা বড় ছটফট করছে; অনেক না পাওয়া প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে মন।

সুরঞ্জনা ফোন পেয়ে অস্থির হল, রোজ রোজ কিভাবে ঋষির থেকে নিজেকে লুকোবে? নিশ্চয়ই আন্দাজ করেছে কিছু, তাই তড়িঘড়ি ফোন করেছে, শুধু পার্সের ব‍্যাপার নিশ্চয়ই নয়। আবার অজ্ঞাতবাসে যেতে হবে তাকে, তবে এবারে জীবনের সব কথা লিখে রেখে যাবে; যাতে ঋষি আরো এগোতে পারে নিজের জীবনে, কেন ও দূরে সরে গেছিল বুঝতে পেরে, ওকে ভুলে নতুন করে সংসারী হতে পারে। অবশ‍্য সুরঞ্জনা নিশ্চিত নয় যে ঋষির নতুন কোন সম্পর্ক হয়েছে কিনা, এতোটা আশা করা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না।

তবুও ভালবাসাটা যখন তার দিক থেকে বেঁচে আছে, এটুকু দায় তো তাকে নিতেই হবে। লিখতে বসল সেইসব ভয়ঙ্কর দিনের কথা, লিখতে গিয়ে এতদিন পরেও দুচোখ জলে ভরে যাচ্ছে, কাগজ ভিজে যাচ্ছে, কোন দিকে হুঁশ নেই, মনে পড়ছে কলেজের সেই সব দিনের কথা, কলেজ বাঙ্ক করে ঋষির সঙ্গে সিনেমা দ‍েখার কথা, বইমেলায় ঘোরা, নন্দনে চলচ্চিত্র উৎসব; আরো আরো রঙিন দিনের কথা,মনের মধ্যে বাজছে চির বিরহের করুণ রাগিণী। চিঠিটা খামে ভরে, অনলাইনে টিকিট কেটে, নিজের জিনিসপত্র গুছোতে গিয়ে ঋষির একটা ছবি বেরিয়ে পড়ে। আবেগকে দূরে ঠেলে যতটা সম্ভব জিনিস গুছিয়ে নেয়, কিছু জিনিস বাইরে ছড়িয়ে আছে, থাকলে থাক, নিজের জীবনটাকেই গোছাতে পারল না, জিনিস দিয়ে হবে কি?

কি জানি কখন এসে পড়ে ঋষি, ভালবাসা নিভে গিয়ে করুণা ঝরে পড়ে যদি, সুরঞ্জনা তা একেবারেই সহ‍্য করতে পারবে না। চাঁপাদিকে ডেকে চিঠিটা ধরিয়ে কাকে দিতে হবে বুঝিয়ে দেয়; ব‍্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়ে সামনে একটা ট‍্যাক্সি পেয়ে উঠে যায়, আপাতত গন্তব‍্য স্টেশন- রাজধানী ধরবে, তারপরে কি, সে নিজেও জানে না।

ছটফটানি মন নিয়ে ঋষি ঘরে টিকতে পারে না, পাঁচ বছর আগের, সেই সব হারানোর যন্ত্রণাটা মনের মধ্যেটাকে তোলপাড় করে দিচ্ছে, পর্দা সরিয়ে কালো রাতগুলো ফিরে আসছে যেন, ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিটা মনের মধ্যে জেগে উঠছে; যাকে এতদিন সে বহুকষ্টে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল। একবার ভাবল পার্সটা নিয়ে কাল যাবে, পরক্ষণেই মন যেন হু হু করে বলে উঠল- “আজ, আজ।”

লেডিস পার্সটা নিয়ে মা-কে বলে বেরিয়ে আসে, মা পেছন থেকে বলতে থাকে-” এই তো এলি অফিস থেকে খাটাখাটনি করে, আবার কোথায় চললি?”-মায়ের গলার আওয়াজ পৌঁছোয় না অন‍্যমনস্ক ঋষির কানে। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যায় নিশির ডাকের মতো ডাক শুনে; চলে শিয়ালদার সেই হস্টেলে, যেখানে ছেড়ে এসেছিল পথের অপরিচিতাকে।

অজানা আশঙ্কায় ভরে আছে মন, পথ যেন আর শেষ হচ্ছে না, সে নিজেও বুঝতে পারছে না, সামান‍্য একজন অপরিচিতার জন্য তার এরকম হচ্ছে কেন, তার মন তো এখনো “সুরু” ময়। গন্তব‍্যে পৌঁছে হস্টেলের রিসেপশনে গিয়ে খোঁজ নেয়, যার জিনিস তার হাতে না দিয়ে যাবে না ও, হাঁকডাক করার পর চাঁপাদি এগিয়ে আসে। ঋষির চেহারা জরিপ করে সন্তুষ্ট হয়ে বলে-” আপনি তো ঋষিবাবু?”ঋষি অবাক হয়, এই সামান্য সময়ের মধ্যে ওকে এরা চিনল কি করে? উত্তরে বলে-” হ‍্যাঁ” চাঁপাদি পূর্ব নির্দেশ মতো ঋষিকে চিনে ফেলেছে তাই বলে-” আপনি তো সুরঞ্জনাদির কথা বলছেন?”

নামটা শুনে ঋষি যেন একশো চাবুকের ঘা খায়, মুখে কোনরকমে বলে-“হ‍্যাঁ।” চাঁপা সুরঞ্জনার চিঠিটা এগিয়ে দেয়, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় ঋষি, মুখে বলে-” উনি নেই?” চাঁপাদি বলে-” সুরঞ্জনাদি তো একটু আগেই জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন; হস্টেলের বাকী বকেয়াও সব চুকিয়ে দিয়ে গেলেন আর ফিরবেন বলে তো মনে হয় না, যাবার সময় এই চিঠিটা রেখে গেলেন আপনার জন‍্য।

এর থেকে বেশী কিছু জানতে হলে আপনাকে অফিসে খোঁজ করতে হবে; ঋষি বুঝতে পারে না, এতদিন পরেও সুরঞ্জনার আবার ওকে এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কি, সুরু যে আবার তাকে ফাঁকি দিল সেটুকু বুঝতে পারে। রিসেপশন রুমের এককোণায় বসে চিঠিটা পড়তে থাকে, চিঠির ছত্রে ছত্রে এ কি লিখেছে সুরু; পাঁচবছর আগে তার সুরুর জীবনে এতকিছু ঘটে গ‍েছে, আর আজ সে তা জানছে।

পাষন্ড রোহিতের কথা জেনে ঋষির চোয়াল শক্ত হয়, সুরু তার ঋষিকে এত কাপুরুষ ভাবতে পারল কি করে,ভারী অভিমান হয়, এত কিছু ঘটে গ‍েছে, তাকে কিছুই জানতে দেয় নি, লড়াই-এর এতটুকু অংশীদার করে নি তাকে। সুরঞ্জনা পাঁচবছর আগে হঠাৎ করে দূরে সরে যাওয়াতেও ঋষি এত দুঃখ পায় নি, যা আজ সে পাচ্ছে।এ ঘটনা যদি ঋষির সঙ্গে ঘটত তাহলে কি এমনিভাবেই সুরু দূরে সরে যেতো, নিজের অফুরান ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখত না ঋষিকে; তাহলে ঋষিকে সে সুযোগ দিল না কেন?

এই কেন-র উত্তর ঋষিকে পেতেই হবে। বহিরাঙ্গ কি অন্তরের বাধা হতে পারে? চাঁপাদিকে পাগলের মতো জিজ্ঞেস করল-” উনি কোথায় গ‍্যাছেন, বলতে পারেন আপনি? চাঁপাদি ঠোঁট উল্টে বলল-” কত লোক আসে যায়, সবাই কি আর বলে যায় কোথায় যাচ্ছে। ঋষি দেখল এখানে সময় নষ্ট করা বৃথা, সুরঞ্জনার পুরোন বান্ধবীদের সঙ্গেও তার আর যোগাযোগ নেই; স্টেশন না এয়ারপোর্ট কোনদিকে যাবে সে, পাঁচবছর আগে যে কপাল তাকে সাথ দেয় নি, আজ নতুন করে দেবে সাথ।

কি হবে সে জানে না, শুধু এটুকু জানে শেষ চেষ্টা তাকে করতেই হবে; অন্ধের নুড়ি খোঁজার মতো সে হাতড়াবে জনারণ‍্যে, পথে-প্রান্তরে। সে যখন বুঝে গ‍েছে সুরু তারই আছে, শুধু একটা ভুল ধারণা নিয়ে দূরে সরে আছে তখন সে ছাড়া আর কে খুঁজবে? সুরুকে আর ফিরে পাবে কিনা ঋষি জানে না, তবুও গাড়ি নিয়ে স্টেশনের দিকেই চলল, ওখানে না পেলে এয়ারপোর্টের দিকে যাবে। ঋষির হাতে যেন কোন গাড়ি নেই, আছে একটা পক্ষীরাজ ঘোড়া, যা নিয়ে রাজপুত্র যাচ্ছে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া এক রাজকন‍্যের খোঁজে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top