অঞ্জনার দায়িত্ব – (সত্যিকার ঘটনা অবলম্বনে) – সবিতা কুইরী

পরিবারে একাধিক ভাইবোনের মাঝে বেড়ে ওঠা অঞ্জুর আদরের কোন কমতি ছিল না।সে যে ছোট। আদরের ছোট বোন।অন্যান্য ভাইবোনদের সঙ্গে  তাঁর বয়সের পার্থক্য টা খুব বেশি হওয়ার কারণেই বোধহয় তার আদরের পাল্লাটা ভারী হয়ে উঠেছিল একটু বেশি।

অতি দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা অঞ্জুর স্কুলের মুখ দেখা হয়ে ওঠেনি।ভাইবোনদের মধ্যে বড়দি সবচেয়ে বড় পরের তিনজন দাদার মধ্যে ছোটদা শুধুমাত্র হাইস্কুলের মুখ দেখেছিল কিন্তু বেশি দূরে এগোতে পারেনি।
অঞ্জনা ইচ্ছা করলে প্রাইমারি পাশ দিতেই পারত কিন্তু হতদরিদ্র পরিবারে কন্যাশিশুর লেখাপড়া নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামাইনি।
আদুরে মেয়ে অঞ্জু বাড়ির কাজকর্মে মতি গতি কম ছিল অনেক  বড় প্রায় বছর আট বয়স পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ ছাড়েনি সে।
বেশির ভাগ সময় রাস্তার ধুলো ঘেটে খেলাধূলা করতে পছন্দ করতো।

ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা অঞ্জুকে পাড়াপড়শির বাক্যবানে  ছাড়তে  হয় কিছু আদুরে অভ্যেস নিতে হয় কাজের কিছু দায়িত্ব।কিন্তু বাড়িমুখো গৃহস্থালির কাজে লাগু করা যায়নি তাকে।অগত্যা বাড়ির দুটো গরুকে মাঠে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব উঠল তার ওপর।
ফ্রকের নীচের দিকটা থলের মতো করে তাতে মুড়ি ভরতি করে খেতে খেতে মনের আনন্দে গরু চরাতে যায় প্রতিদিন।মাঠের মধ্যে হ্যালানো শ্যাওড়া আম আরো কত রকম নাম না জানা গেছে দোল খেয়ে অন্যান্য রাখাল বালকদের সঙ্গে খেলা ধুলা করে ভীষণ আনন্দের মাঝে তার কর্মটি পালন করে। বাড়ি ফেরার কথা মনেও আসত না তার।ফিরলেও বাড়ি তে দু ঘন্টা কাটানো মুশকিল হতো কখনো ।কারণ সুদীর্ঘ দু তিন ঘন্টা পার হবে তবে তো বিকেলে আবার মাঠে যেতে পারবে সে।

এইভাবে মাঠে দোল খেতে খেতে কখন বড় হয়ে উঠেছে অঞ্জনা নিজেও জানে না।
পাড়াপড়শিরা ধাঁড়ি মেয়ের ন্যাকামোপনা দেখে গালমন্দ করতে ছাড়ে নি।কিন্তু বাবার কানে এরকম কথা  এলে রক্ষে থাকতো না মুখ উঁচিয়ে লাঠি হাতে ঝগড়া করতেন তিনি।

অঞ্জনা বাড়ির আশকারা পেয়ে  পাড়াপড়শির কথায় কান না দিয়ে একই ভাবে মাঠে যেতে থাকে । বয়সের দোষে তাদেরই সঙ্গী এক রাখাল যুবকের সঙ্গে চোখাচোখি তে প্রেমের টান অনুভব করে সে।রাখাল ও তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
এবার অঞ্জনার স্বভাবে কিছুটা পরিবর্তন ঘটে।বেড়ে যায় সাজগোজ।কিছুটা ধীর স্থির।বন্ধ গাছের দোল খাওয়া ।শুরু হয় রাতে ঘুমের বদলে জেগে স্বপ্ন দেখা।দুষ্টুমির ছেলেমানুষি কেটে যেন এক নতুন অস্থিরতা ।

ব্যাপারটা ধামাচাপা থাকল না পাড়াপড়শির কাছে।শুরু হল গুঞ্জন, কানাকানি ।খবরটা পৌছে গেল তার বাড়ি অবধি ।গরীব গোড়া পরিবারের অঞ্জনার বাড়ির কেউ মেনে নিতে পারেনি এই অসবর্ণের প্রেম।
হ্যাঁ অসবর্ণ ।রাখাল যুবকের জাতি গোত্র অঞ্জনার থেকে আলাদা ছিল তাঁদের ভাষায় ওর থেকে নীচু জাতের ঘরের।
ব্যাস এখান থেকেই অঞ্জনার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হল।পালিয়ে বিয়ে করল তারা।
যুবকের বাড়ি খুব একটা দূরে ছিল না।চোখের জ্যোতি ভালো থাকলে এ বাড়ি ও বাড়ি কিছুটা আন্দাজ করা যায় ।
যাইহোক বিয়ে হল। পাড়াপড়শির কানাকানি, পরিবারের কান্নাকাটি সবটাই স্বাভাবিক ছিল কিন্তু যেটা অস্বাভাবিক ছিল সেটা হল অঞ্জনার বাড়িতে বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই একটা প্যান্ডেল দেখা গেল।
কি ভাবছেন আপনারা তবে কি সবকিছু মিটমাট হয়ে গেল? মেনে নিল এ বাড়ি ও বাড়ি??
ভুল, ভুল সবকিছু ভুল ধারণা আপনাদের।আসলে প্যান্ডেল টা ছিল এক শ্রাদ্ধের আয়োজোন , শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের।জ্যান্ত শ্রাদ্ধ হল অঞ্জনা র।
এটাই নাকি তার জাতের লোকেদের এই অনাচারের কুল রক্ষার একমাত্র শুদ্ধাচার ।

পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ি হওয়ার সুবাদে গোটা ঘটনার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল অঞ্জনা।আর করারই বা কি ছিল তার।
যাইহোক সবকিছুই মেনে অল্প বয়সের কাঁচা প্রেমের মহিমা তিন চার মাস বেশ রমরমা ভাবেই চলল।তারপর ধীরে ধীরে সংসারের জটিলতায় প্রবেশ ঘটল তার।অবশ্য এই অবস্থায় পৌঁছাতে তাকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না।
শুরু হল অত্যাচার ।শারীরিক মানসিক আরো যত রকম অত্যাচার থাকে কোনটাই যেন বাদ গেল না।চলতি একটা কথা আছে পেটে ভাত না থাকলে ভালোবাসা জানলা দিয়ে পালাই।ঠিক এটাই প্রমাণিত হল অঞ্জনার জীবনে।
এই ভাবেই চলতে চলতে তিন সন্তানের জননী হল সে।
কিন্তু তবুও ফিরে এল না শান্তি ।দুঃখের কথা বাবার বাড়ি গিয়ে বলার অধিকার- এটুকুও নেই তার।সেখানে তো তার কোন অস্তিত্বই নেই।
একটা বড় লোকের বাড়িতে কাজ নিয়েছে অঞ্জনা।এখন দেখা যায় সাদা বিধবার ড্রেসে সেই বাড়ি তে যাতায়াত করতে।
স্বামী যে সুইসাইড করেছে রেলে মাথা দিয়ে।
অঞ্জনা কে মরলে চলবে না তিন সন্তানের দায়িত্ব এখন যে তার ওপর বর্তায় ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top