অণুগল্প – গাছতলার লোক

অণুগল্প // গাছতলার লোক // সুব্রত সরকার

“বাবু, আমি গাছতলার লোক। শুনে যান দুটো কথা।” কানে ভেসে এলো এরপর,” বাবু, দেখলে টাইম পাস হবে। ট্রেন আসলে চলে যাবেন।” ট্রেন আসতে একটু দেরীই আছে। মন খারাপ মন নিয়ে একা একা দাঁড়িয়েছিলাম। তাই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম গাছতলার দিকে। কি বলে শুনি, কি দেখায় একটু নয় দেখি!…

“বাবু, আমি পন্ডিত নই। আমার ভাষার বুলিতে যদি ভুল হয়, ক্ষমা করে দেবেন।” ব্যাগ থেকে মালপত্তর বের করতে করতে সে বলে যায় কথাগুলো। আমার সাথে সাথে আরও কিছু লোক জড়ো হয়ে গেছে।

“বাবু, যতবার মিথ্যে বলেছি, ওষুধ বেশি বিক্রি হয়েছে। সত্যি বললে হয় না।” কথাটা বেশ ভারী। ধাক্কা দিল সপাটে। কৌতূহল আমার আরও বেড়ে গেল। গাছতলায় এবার বেশ ভিড় জমে গেছে।

“বাবু, এ হল ঢপের যুগ। মা মেয়েকে, ছেলে বাবাকে, স্বামী বউকে, আমি আপনাকে, নেতা জনতাকে চারদিকে দেদার ঢপ!..” লোকটার কথাগুলো বেশ সরেস আর স্পষ্ট। বলার ভঙ্গিটাও আকর্ষণ করে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলাম।

“বাবু, আমার দেশটা হল গণতান্ত্রিক। কিন্তু এই ওষুধ হল নিয়মতান্ত্রিক। নিয়ম করে দিতে হবে।” এবার সে ওষুধের ছোট ছোট ডিব্বাগুলোকে এক টুকরো কাপড়ের ওপর সাজিয়ে দিল। সবই ব্যথার মলম। যত রকম ব্যথা আছে, সব ব্যথারই ওষুধ আছে ওই ডিব্বাগুলোতে।

“বাবু, আমার ওষুধ দোকানের শোকেসে সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়। কারণ এর মধ্যে মেমসাহেবের ছবি নেই। একদম ন্যাংটো ডিব্বেতে আমার ওষুধ দিচ্ছি।”

মনে মনে হাসছি। ভাষার বুলিতে বেশ রঙ্গ – রসিকতা আছে। তির্যক ব্যঙ্গ আছে। আমার মত অনেকেই মন দিয়ে শুনছে।

“বাবু, সব ব্যথা সারবে। গ্যারান্টি দিয়ে বলছি। শুধু… ” একটু থামল। তারপর চারপাশের জনতাকে চোখের কোণ দিয়ে একবার দেখে নিয়ে বলল,”শুধু একটা ব্যথা সারবে না। দাগা খাওয়া, ধোঁকা খাওয়া ব্যথা সারবে না। বাবু, বিশ্বাস করে নিয়ে যান। ঠকবেন না। ছোট ডিব্বা কুড়ি, বড় ডিব্বা…”

” ডাউন ক্যানিং লোকাল এক নাম্বার প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে।” রেলের ঘ্যাসঘ্যাসে মাইকে ভেসে এল এই ঘোষণা।

আমি এই ট্রেনেই উঠব। ভেবেছিলাম একটা ন্যাংটো ডিব্বা নয় কিনে নিয়ে যাব। কিন্তু আর কিনতে ইচ্ছে করল না!…

।। সমাপ্ত।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top