অদ্ভুতুড়ে

 4 total views

অদ্ভুতুড়ে // জয়নারায়ণ সরকার

তখন সবে সূর্যটা পশ্চিমে হেলেছে। সারাদিন একঘেয়েমি পড়া আর ভাল লাগছিল না সাম‍্যর। একটু মুক্ত বাতাসে ঘুরে আসার জন‍্য বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল সে। এখন অবশ‍্য রাস্তাগুলো বেশ ভাল। মাঝে বর্ষার জল জমে পুরো রাস্তা এবড়োখেবড়ো হয়ে গিয়েছিল। তখন রিকশাওয়ালারা ডবল ভাড়া চাইত। এখন হাঁটতে একেবারেই কষ্ট হয় না। পেছন থেকে কেউ ডাকছে মনে হওয়ায় ঘুরে তাকিয়ে দেখে মোড়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে টিঙ্কা। পড়ার চাপ থাকায় সেভাবে আড্ডা জমেনি বেশ কয়েকদিন। অগত‍্যা আবার ঘুরে এসে সাম‍্য বলে, কী খবর রে।
টিঙ্কা বলে, তোর তো দেখাই পাওয়া যায় না। সাম‍্য কিছু বলার আগেই সে আবার বলে, অঙ্কিত এক্ষুণি আসবে, চল কোথাও একটু ঘুরে আসি।
সাম‍্য মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। তারপর দুজনে অপেক্ষা করতে থাকে অঙ্কিতের জন‍্য। নানা বিষয়ে কথা হতে থাকে দুজনের। এরইমধ‍্যে অঙ্কিত এসে যোগ দেয়। এসেই বলে, চল আজকে ওই রেললাইনের ধারে যাই, ওখানে বসে আড্ডা মারব।
এ কথা শুনে সাম‍্য একটু ইতস্তত করে বলল, অন‍্য দিকে চল না।
অঙ্কিত সাথে সাথে হেসে বলে, কেন, তোর ভয় করছে নাকি!
সাম‍্য এবার বুঝতে পারে ওকে ঠাট্টা করছে অঙ্কিত। তখন সে গলায় জোর এনে বলে, ঠিক আছে, চল ওদিকেই যাই।
পাড়ায় অনেক বন্ধু আছে সাম‍্যর। তবে টিঙ্কা আর অঙ্কিতের সঙ্গে একটু বেশি সখ্যতা। ওরা তিনজন প্রায় সমবয়সি। টিঙ্কা আর অঙ্কিত একই কলেজে পড়ে।
সাম‍্য বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ওর ওপরে বেশ ভরসা করে তারা। তাই সাম‍্যকে এখন থেকেই অনেক বুঝে চলতে হয়। বন্ধুদের অনেক কাজই সে এড়িয়ে চলে। সে পড়াশোনাতেও খারাপ নয়। রেজাল্ট ভালই করে। বিসিএ পড়ছে। এখন থার্ড ইয়ার। তবে ছোটবেলা থেকে কো-এড স্কুলে পড়ার ফলে মেয়েদের সামনে সপ্রতিভই থাকে। বন্ধুরা কোনও মেয়ের সাথে সম্পর্কের কথা বলে খ‍্যাপানোর চেষ্টা করলে ও সুনিপুণভাবে এড়িয়ে যায়। তবে এরমধ‍্যে যে কাউকে ভাল লাগেনি তা নয়। অবশ‍্য সেটা গোপনে। কোনোদিনই প্রকাশ করতে পারেনি। নিজেকে নিজেই বোকা মনে করে। মনে মনে সান্ত্বনা দেয় এ রকম বোকা থাকাও ভাল। এখন শুধু একটাই লক্ষ‍্য বিসিএ কমপ্লিট করে একটা চাকরি জোটানো।
অনেকটা যাওয়ার পর টিঙ্কা বলে, কী রে সাম‍্য, এতটা পথ এলাম কোনও কথা বলছিস না তো!
সাম‍্য অন‍্যমনস্কভাবে বলে, তোরা এত কথা বলছিস যে, আমাকে আর বলতে দিচ্ছিস কোথায়।
এরইমধ‍্যে ওরা এসে গেছে রেললাইনের পাশের রাস্তায়। তখন সূর্য ডুবেছে। চারিদিকে অন্ধকারও গাঢ় হচ্ছে। রেললাইনের ধারে একটা বড়ো পাথরের ওপর বসে পড়ে ওরা। তারপর খেলা থেকে রাজনীতির নানা খবর উঠে আসে আড্ডায়। এই এলাকাটা একটু বেশি নির্জন।অফিস টাইমে বেশ লোক চলাচল করলেও রাতে কোনও মানুষের দেখা পাওয়া যায় না। সাম‍্যের এরকম জায়গা একেবারেই পছন্দ নয়। সেদিন ওখানে পৌঁছনোর পর থেকেই মনে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করতে থাকে। কিছুটা দূরে চায়ের দোকানটা দেখিয়ে অঙ্কিত বলে, চল, একটু চা খেয়ে আসি।
ওরা উঠে দোকানের বেঞ্চিতে বসে চায়ের অর্ডার দেয়। সাম‍্য বলে, কাকু, তিনটে প্রজাপতি বিস্কুটও দিও। এরই মধ‍্যে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে। সাথে সাথে লোডশেডিং হয়ে যায়। কেমন একটা গা ছমছমে পরিবেশ। দোকানে কয়েকটা মোমবাতি জ্বালে কাকু। শুধুমাত্র রেললাইনের ধারের সিগন‍্যাল পোস্টের ছিটকে আসা লাল আলো জায়গাটাকে আরও রহস‍্যময় করে তোলে। এই মুহূর্তে দোকানে ওরা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই। দোকানদার কাকুর মুখটা একটু ব‍্যাঁকা ধরনের, সেটা সাম‍্য খেয়ালও করেছে, কথা বলতে গেলে কেমন যেন মাথাটা নড়েই চলে এবং গলার স্বরটা কেমন ফ‍্যাকাশে ধরনের।
চা দিতে দিতে কাকু বলে, তোমরা কোথায় থাকো।
অঙ্কিত চটপট বলে, ওই তো নন্দগড়ে।
কাকু এবার বিস্ময়ে বলে, অতদূর থেকে পায়ে হেঁটে এসেছো। রাতের বেলায় এখানে না আসাই ভাল। দেখছো না কেউ নেই এখানে। আমিও একটু পরেই দোকান বন্ধ করে চলে যাব।
ওরা তিনজনেই তিনজনের দিকে তাকায়। সাম‍্যের মুখটা আরো ফ‍্যাকাশে লাগে। সেটা দেখে অঙ্কিত চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, কেন আমাদের শুধু শুধু ভয় দেখাচ্ছো কাকু। দেখছো নাও ভয় পাচ্ছে। বলেই সাম‍্যের দিকে আঙুল দেখায়।
টিঙ্কা বলে, কাকু আমাদের এমনি এমনি বলছে।
চায়ের দোকানের কাকু তখন জোরে জোরে মাথা নাড়তে থাকে। তারপর গলা খাদে নামিয়ে বলে, কত রকম ঘটনা জড়িয়ে আছে এই রেললাইনে। তবে যে ঘটনাটির পর রাতে এই অঞ্চলে লোক চলাচল কমে গেছে, সেদিনের ঘটনাটা তোমাদের বলব।
এ কথা বলেই কাকু একটু থামে। হাতে ধরা চায়ের কেটলিটা নামিয়ে রেখে বলতে শুরু করে, এই এলাকায় কয়েকটা পোড়ো বাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। বহু বছর আগে কিছু পরিবার এখানে বাস করতো। প্রতিদিনই কোনো না কোনো অঘটন ঘটতো। রাতে তেনাদের দেখাও পেয়েছে কেউ কেউ। সেই ভয়েই এই বাড়ি ছেড়ে অন‍্য কোথাও চলে গেছে। এখন ওই বাড়িগুলোতে রাতে বিভিন্ন রকমের আওয়াজও শুনতে পাওয়া যায়।
একথা শোনার পর সাম‍্যের মুখে অস্থিরতার ছাপ ফুটে ওঠে।
অঙ্কিত আবার বলে ওঠে, কাকু, ওই রেললাইন নিয়ে ঘটনাটা বলো।
কাকু তখন কেমন বিশ্রীভাবে হাসে। সেইসঙ্গে মুখটা কেমন বিভৎস‍্য লাগে সাম‍্যর। অঙ্কিত আর টিঙ্কা উদগ্রীব হয় সেই ঘটনা শোনার জন‍্য।
দোকানদার কাকু মাথা নাড়িয়ে বলে, সেদিন সবে সন্ধে নেমেছে। আমি দোকান থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম রেললাইনের ওপর দিয়ে দুটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই দুজনেই লাইনেরওপর বসে পড়ে। মনে হচ্ছিল কেউ জোর করে ওদের বসিয়ে দিল। তখনই একটা এক্সপ্রেস ট্রেন আসে। দুজনেই তাতে…
আলো-আঁধারিতে কাকুর মুখটাও কেমন অদ্ভুত লাগে অঙ্কিতের। বাঁ-পাশে তাকিয়ে দেখে সাম‍্য নেই। সাথে সাথে টিঙ্কাও চিৎকার করে বলে, এই অঙ্কিত, সাম‍্য তো পাশেই বসেছিল!
ওরা দুজনেই দোকান থেকে এক দৌড়ে রেললাইনের ধারে আসে। দেখে সাম‍্য রেললাইনের ওপরে দাঁড়িয়ে। এক ছুটে তার কাছে আসে ওরা। ততক্ষণে সাম‍্যকে কে যেন রেললাইনে উপুড় করে ফেলেছে। অঙ্কিত হাত ধরতে যায়। কিন্তু ও ছিটকে পড়ে। তখন ওর গায়ে অসম্ভব শক্তি। টিঙ্কা ওই দেখে আবার দৌড়ে আসে দোকানের দিকে কাকুকে ডেকে নিয়ে আসার জন‍্য। কিন্তু দেখে ওখানে একটা বহুদিনের পোড়ো বাড়ি। তার গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে ওঠে‌। সে দৌড়োনোর চেষ্টা করে কিন্তু পা চলতে চায় না। সে ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে ওঠে, অঙ্কিত— তারপর নিজেকে কোনওরকমে টেনে নিয়ে দাঁড়ায় রেললাইনের কাছে। দেখে অঙ্কিত দুমাদুম চড় মারছে সাম‍্যের গালে। কিছুক্ষণ পরে সাম‍্যের জ্ঞান ফেরে। অঙ্কিত সাম‍্যর এক হাত ধরে হ‍্যাচকা টানে লাইনের এপাড়ে ফেলে দেয়। তখন সাম‍্যের গায়ে কোনও শক্তিই নেই, সে হুমড়ি খেয়ে টিঙ্কার গায়ের ওপরে পড়ে। টিঙ্কাও টাল সামলাতে না পারায় দুজনেই মাটিতে পড়ে যায়। অঙ্কিত দৌড়ে এসে দুজনকেই টেনে তোলে। মুহূর্তের মধ‍্যে একটা ট্রেন হর্ন দিতে দিতে চোখের নিমেষে চলে যায়। সাম‍্য তখন পুরো গা এলিয়ে দিয়েছে অঙ্কিতের ওপর। অঙ্কিত খুব সন্তপর্ণে সাম‍্যকে কোলপাঁজা করে নিয়ে এসে পাথরটার ওপর শুইয়ে দেয়। টিঙ্কাও ধীরে ধীরে এসে সাম‍্যের পাশে এসে গা এলিয়ে দেয়।
***
হঠাৎ মায়ের ডাক কানে আসতেই ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে সাম‍্য। মা দরজার বাইরে থেকে বেশ উঁচু স্বরেই বলছেন, তোরা আর কত ঘুমোবি। অনেক বেলা হল। এবার উঠে পড়।
সৌম‍্য দু’হাতে চোখ কচলে দেখে বিছানায় তখনও টিঙ্কা আর অঙ্কিত অঘোরে ঘুমোচ্ছে। টিভির দিকে চোখ পড়তেই দেখে সেটা তখনও চলছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তিনজনে একসঙ্গে রাতে থাকবে বলে মায়ের কাছে আবদার করেছিল সাম‍্য। মা সম্মতি দেওয়ায় টিঙ্কা আর অঙ্কিত সেদিন সন্ধের মধ‍্যেই ওদের বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *