অন্য ভুবন – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

[post-views]                                     [printfriendly]
===================================

আজ নবীন বাবু  বড় ব্যস্ত. একমাত্র ছেলে সুনীল লন্ডন থেকে সপরিবারে  ফিরছে, সঙ্গে নাতি অভিমন্যু. না বিদেশী স্ত্রী নয়. রানাঘাটের মেয়ে দোলন. দোলনচাঁপা. ইংরাজীর পোস্ট গ্রাজুয়েট. আর সুনীল পেশায় ডাক্তার. হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ.

নবীন বাবুর বাড়ী হুগলীর রবীন্দ্র নগরে.

নবীন বাবু ডাক বিভাগে চাকরি করতেন. পোস্ট মাস্টার ছিলেন. সংসারে স্ত্রী অনুভাই সব দিকে নজর রাখেন. সুনীল ছাড়াও নবীন বাবুর এক মেয়েও আছে. বিবাহিতা. নাম সরমা. জামাই রেলে কাজ করে. টিকিট পরীক্ষক.

ওদের মেয়ের নাম কাজল. নবীন বাবু নামটাকে বাড়িয়ে কাজললতা  করে দিয়েছেন . সাবেকী নাম হলে কী হবে, নাতনির খুব পছন্দ. ওদেরও আসার কথা.

কয়েক ঘন্টার মধ্যে বাড়ী জমজমাট হয়ে যাবে.

নবীন বাবু চেয়ে ছিলেন সুনীল এখানেই প্র্যাকটিস করুক. গরীব দুঃখী দের বিনা পয়সায় পরিষেবা দিক. কিন্তু ক্যারিয়ারিস্ট ছেলে কথা রাখে নি. দেশের জনগণের টাকায় ডাক্তার হয়ে শুধু মাত্র টাকা রোজগারের লোভে বিভিন্ন পরীক্ষা দিয়ে লন্ডনের একটি হাসপাতালে পোস্টিং পেয়ে গেলো. ওখানে গাড়ী, ফ্ল্যাট সবই কিনেছে.

অথচ সুনীল বাবাকে কথা দিয়েছিলো কলকাতার কোন সরকারি হাসপাতালে কাজ নেবে. ছুটির দিন বাড়িতেই বসবে. অন্তত নিকট প্রতিবেশী, দু’একজন গরীব দুঃখী দের কাছে ভিজিট নেবে না. কিন্তু সুনীল কথা রাখে নি. ব্যক্তিগত স্বার্থে এই বিদেশে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে নবীন বাবুর অভিমান আছে.

নবীন বাবু বাড়ীর সামনে তাই  দাঁড়িয়ে. প্রতিবেশীরা জানে বছরের শেষ দিনে সুনীল প্রায় প্রতি বছরই বাড়ী আসে.

একসময় সুনীল সপরিবারে এসে গেলো.

নবীন বাবু আগে নাতিকে কোলে নিতে গেলেন. পুত্রবধূ আপত্তি করে বললে,

‘না বাবা,  একটু পরে নেবেন -আগে আপনার হাত স্যানিটাইজ করতে হবে. ‘

মুহূর্তে নবীন বাবুর পৃথিবীটা বদলে গেলো. তাঁর নিজের নাতিকে কোলে নিতে গেলেও হাত স্যানিটাইজ করতে হবে. সুনীল ব্যাপারটাকে সহজ করার জন্য বললো, ‘বাবা, এখনও তো করোনা যায় নি. তাই সকলেরই সাবধানে থাকা উচিত’. সুনীল স্যুটএর পকেট থেকে বিলিতি স্যানিটাইজার বার করে কয়েক ফোঁটা নবীন বাবুর হাতে দিল. নবীন বাবু হাত দুটিতে সেটা রগড়ে নিলেন তেল মাখার মতো. পাড়ার দু, চার জন এই দৃশ্য দেখে যে যার ধারণা নিয়ে বাড়ী চলে গেলো.

নবীন বাবু ব্যাপারটা ভালো ভাবে নিলেন না.

একটা  হঠাৎ  হোঁচট খাওয়ার মতো ব্যথা বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো.

স্বাস্থ্যের কারণ দেখিয়ে ছেলে -বৌমা এই বৃদ্ধ বয়েসে তাঁকে উচিত শিক্ষাই  দিল.

নবীন বাবু বাড়িতে  ঢুকে আরও জানতে পারলেন,  দোলন সবাইকেই হাত স্যানিটাইজ করার ফরমান জারি করেছে. পাড়ার ওষুধের দোকানের নয় –বিলিতি স্যানিটাইজারের একটা বোতল বার করে দিয়ে বলেছে, ‘এ কদিন ঐ স্যানিটাইজারই সকলকে ব্যবহার করতে হবে. ‘

নবীন বাবু এতো দিনে বুঝতে পারলেন পৃথিবীটা সত্যিই বদলে গেছে. তাঁর একমাত্র প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার ছেলে এখন অন্য ভুবনের বাসিন্দা. রাতে শোবার সময়ে স্ত্রী অনুভা’কে সকালের তিক্ত অভিজ্ঞতার ঘটনাটা বললেন. অনুভা সব শুনে সখেদে বললেন, ‘হ্যাঁ, ওদের আচার -আচরণ আর আগের মতো নেই. ‘

সুনীল আর দোলন তাদের সন্তান অভিমন্যুকে কাছ ছাড়া করতে চাইছে না, কাউকে আদর করতেও দিচ্ছে না.

পরদিন সকালে আর একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলো. নবীন বাবু দুই প্রিয় বন্ধুকে গত সপ্তাহে বড় মুখ করে বলেছিলেন, আমার ছেলে আসছে তো. তোমাদের হৃদ রোগের ব্যাপারে সুনীলের সঙ্গে একটু আলোচনা করে নিও. সঙ্গে ডাক্তারবাবু -দের প্রেসক্রিপশনগুলো নিয়ে আসবে.

অশোক বাবু আর অমর বাবু তাই  সকালবেলায় হাজির. হাজার হোক পাড়ার ছেলে. জন্ম থেকেই দেখে আসছে. বিলেতের ডাক্তার বলে কথা. চা পর্ব শেষ হলে নবীন বাবু সুনীলকে একবার নীচে নামতে বললেন . জানালেন, আমার দুই নিত্য সঙ্গী বন্ধু এসেছে. ওদের কিছু পরামর্শ দিয়ে দে. হার্ট -এর অসুখে ভুগছে.

সুনীল বাবার সম্মান রাখতে নেমে এলো. ওঁরা পাড়ারই লোক. একজন আবার ওর  বন্ধুর বাবা.

সুনীল বি পি চেক করে  ই সি জি রিপোর্ট, স্থানীয় ডাক্তারদের ওষুধএর তালিকা দেখে একটু বিব্রত হয়ে বললো, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডএ কত ভালো ভালো মেডিসিন এসে গেছে কিন্তু এখানে এখনও সেই পুরোনো মেডিসিন গুলোই চলছে. আমি লিখে দিলেও তো আপনারা কিনতে পারবেন না.

অমর বাবু ওষুধগুলি লিখে দিতে বললেন. সুনীল নিমরাজি হয়েও দুটি সাদা কাগজে নির্ধারিত ওষুধ গুলি লিখে দিল. অশোক বাবু বলে বসলেন,’ তোমার লেটার হেডে না লিখে দিলে ওষুধগুলি পাওয়া যাবে না. এখন অন লাইনে মেডিসিন আসে. দাম কম লাগে.’

সুনীল বললো ‘সে লেটার হেড আনে নি. ‘

অমর বাবু, অশোক বাবু ভালো থেকো বলে নবীন বাবুর বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলেন.

নবীন বাবুরও খটকা লাগলো. একজন ডাক্তার দেশে এসেছে লেটার হেড ছাড়াই.

নাকি ওঁদের কাছে ভিজিট নেওয়া যাবে না বলে পাশ কাটিয়ে গেলো.

নবীনবাবুর মাথায়  নানা প্রশ্ন  ঘুর পাক খেতে লাগলো. একটা অতি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে  বিলেতে গিয়ে এতটা বদলে গেলো,  ভাবা যায় না!

বিকেলে যথারীতি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হলো. নবীনবাবুকে  চুপচাপ বসে থাকতে দেখে অশোক বাবু বললেন, রাস্তার ধারে সবথেকে বড় ওষুধের দোকান ‘বেঙ্গল মেডিকেল স্টোর্স ‘এ সুনীলের হাতের লেখা প্রেসক্রিপশনটা ওষুধগুলি কেনার জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম বুঝলে নবীন. ফার্মাসিস্ট বললো ‘এসব ওষুধ এখানে চলে না. তাছাড়া সাদা কাগজে লেখা প্রেসক্রিপশন ভ্যালিড নয়. বিল পাবেন না. ডাক্তার বাবুর রেজিস্ট্রেশন ও মোবাইল নাম্বার লাগবে.  অন লাইনেও আপনি এই কারণেই ওষুধ গুলি  পাবেন না’.

তাই কাজের কাজ কিছুই হলো না. যাকগে আমাদের মতো মানুষের পাড়ার ডাক্তাররাই ভালো.

বিমর্ষ ও হতাশ নবীন বাবুর বুকে অশোক বাবুর কথা গুলি তীরের মতো বিঁধলো. সমবয়সী অমর বাবু বললেন আমরা সব বুঝেছি. নবীন আর কী করবে? অত বড় ডাক্তার জানে না তা নয়. বিলেতে এসব চলে নাকি? এ সব  দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল- বুঝলে না.

নবীন বাবু কাজের অছিলায় বাড়ী ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালেন.

এক সঙ্গে সকলেই বলে উঠলো, কী ভায়া এতো তাড়াতাড়ি? অন্য দিন তো বাড়ী যেতেই চাও না. আজ ——

নবীন বাবু নতমস্তকে বন্ধুদের জানালেন, ‘সুনীল আর আমার জগৎটা সত্যিই আলাদা হয়ে গেছে. এই বদলে যাওয়া মানসিকতার জন্য আমি লজ্জিত. ‘

নবীন বাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন —

‘আমি আমার সন্তানকে সত্যিই  মানুষ করতে পারিনি.’

 [printfriendly]

আপনার মতামত এর জন্য

[everest_form id=”3372″]

amitab mukhapadya

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top