অপেক্ষা ( অণুগল্প)

# অণুগল্প — অপেক্ষা
# গল্পকার — অভিষেক সাহা

মেনকা সিনেমা হলের সামনে থেকে গোলপার্ক পর্যন্ত রোজ বিকেলে হাঁটে ঝিমলি। লেকের ভিতর দিয়ে।বছর কুড়ি বয়েস। কিন্তু এখনি চেহারা একটু ভারী হয়ে গেছে। তাই বেশ কিছু দিন ধরে এই ইভিনিং ওয়াক শুরু করেছে। এমনিতেই ছোটবেলা থেকে ঝিমলির বন্ধু খুব কম। যেকটা বন্ধু ছিল সব কলেজের। করোনা, লকডাউন সব মিলিয়ে কলেজ বন্ধ প্রায় এক বছরের উপর। সব কিছু এখন অনলাইনে। বন্ধুদের সঙ্গে যে একেবারেই দেখা হয় না তা নয়। তবে খুব অনিয়মিতভাবে। ক্লাস হোক বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, সবই অনলাইনে। পাড়ায় তেমন বন্ধু নেই, তাই এই একবছরের বেশি সময় বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে। খুশিতে নয়, বাধ্য হয়ে। আর এই শুয়ে বসে সময় কাটানোর ফলে শরীরে মেদ জমতে শুরু করেছে। জিম বা যোগা ক্লাস এই করোনাকালে জয়েন করা কতখানি নিরাপদ তা নিয়ে বড়দের থেকে একশো পাতার লেকচার শোনার পর একাএকা হাঁটা টাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায় মনে হয়েছে ওর ।
রোজই মেনকা থেকে গোলপার্ক হয়ে আবার মেনকার সামনে ফিরে এসে লেকের পাড়ে বাঁধানো বেঞ্চে কিছুক্ষণ বসে ও। অস্তমিত সূর্যের শেষ আলোয় পাখিদের দলবদ্ধভাবে বাসায় ফিরে যাওয়ার দৃশ্য মন ভালো করে দেয় ওর। তবে ক’দিন ধরে ওর ঠিক পাশের বেঞ্চের এক মধ্য তিরিশের মহিলাকে লক্ষ্য করছে ও। ভদ্রমহিলাও ওর মতই একাই আসেন, হাঁটাহাঁটি করেন না, শুধু বেঞ্চে বসে থাকেন। চা-ওয়ালা, বাদাম ওয়ালা প্রায় কাউকেই ফেরান না। সারাক্ষণ মুখ নড়ছে।
আজ হাঁটা শেষ করে ওই মহিলার পাশে গিয়ে বসল ঝিমলি। উনি ভ্রক্ষেপও করলেন না । ঝিমলিই কথা শুরু করল।
” আন্টি, আমি আপনাকে রোজ দেখি , একাএকা জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকেন। আপনি কী কারুর অপেক্ষা করেন?” সাহস করে জিজ্ঞেস করল ঝিমলি।
ভদ্রমহিলা রাগ করলেন না, মুখে কিছু বললেনও না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।
” কার !” প্রশ্ন করল ঝিমলি।
” আমার প্রেমিকের ! ” বাদাম চিবোতে চিবোতে শান্তভাবে উনি উত্তর দিলেন।
ঝিমলি দেখল ভদ্রমহিলার হাতে শাঁখা-পলা রয়েছে, সিঁথিতে সিদূর। তবু প্রেমিকের অপেক্ষা!
” উনি কী আপনাকে ছেড়ে চলে গেছেন, নাকি…” কথা শেষ করল না ঝিমলি। ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল।
ভদ্রমহিলা ওর দিকে ঘুরে তাকালেন। মুখের বাদাম শেষ করে বললেন ” উনি আমাকে ছেড়ে চলেও যাননি, আর মরেও যাননি। সুস্থ সবলভাবেই আছেন আমার সঙ্গে। আমার স্বামী হয়ে। শুধু বিয়ের আগে যে প্রেমিককে আমি স্বামীরূপে বরণ করেছিলাম , ওনার মধ্যে থেকে সেই প্রেমিকটাই হারিয়ে গেছে। আমাদের প্রেমের অনেকটা সময় এখানে কেটেছে, তাই রোজ আমি এখানে এসে আমার সেই প্রেমিকের ফিরে আসার অপেক্ষা করি !”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top