অবনী কাকু – শম্পা সাহা

[post-views]

আজকাল মানুষের মন বড় সংকীর্ণ ,বড় ছোট ,বড় লোভী ,তবে পুরোপুরি বোধহয় নয় !আমি এ বাড়িতে বিয়ে হয়ে এসেছি প্রায় বছর আঠারো।আমাদের বাড়ির পিছনে একটা বাড়ি,  আজ থেকে প্রায় আঠারো বছর আগেও সেটা ছিল এক কামরা পাকা ঘর ,মাথায় টালি আর সামনে ছোট্ট একটা মাটির রান্নাঘর ,তার মাথায় খড় আর কিছুটা টালি দেওয়া। মাঝে মাঝে শুনতাম, “রঞ্জু ,রঞ্জু”। অপূর্ব সুন্দরী এক মহিলা ধবধবে গায়ের রং ,চোখা  নাক, টানা টানা চোখ ,একেবারে চোখ ধাঁধানো রূপ ডাকছেন। শাশুড়িকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ওই বাড়ির  ছেলে বছর-দশেকের নাম রঞ্জু।
    রান্নাঘর থেকে কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভদ্রমহিলার টুকটাক গৃহস্থালি চোখে পড়তো ,কখনো বড়ি’ দিচ্ছেন, উঠোনের কলপাড়ে জামা কাপড় কাঁচছেন বা উঠোন ঝাড় দিচ্ছেন।  যেহেতু রান্না ঘরের জানালার একেবারে সোজাসুজি ,চোখ চলেই যেত।বাড়ির কর্তা অবনী রায় ওষুধের দোকানে কাজ করেন ,খুব সামান্য মাইনে,তাই কাকিমা, লোকের বড়ি দিয়ে,ধানসেদ্ধ,কাঁথা সেলাই করে কিছু কিছু সাহায্য করতেন।রঞ্জু তখন সবে ক্লাস ফাইভ।
   এরপর ধীরে ধীরে আমারও বয়স বেড়েছে অনেক, রঞ্জু পড়াশোনায় ভালো ছিল না কোনো কালেই ,বড় হয়ে ও  ওর বাবার মত একটা কাপড়ের দোকানে কাজে লাগলো,  যদিও ওর মা মানে বাতাসী কাকিমার চেহারা  কয়েকটা পাকা চুল আর কয়েকটা বলিরেখা বাদ দিলে মোটের উপর এক রকমই আছে ,খুব একটা বদল নেই! কি করে পারেন?
   ওদের বাড়ির হাল যে ফেরাতে  পারত সে তো নিজেরই হাল ফেরাতে পারল না। ফলে এখনো রান্নাঘর সেই মাটির,আর বাড়ি একটা মাত্র ঘর, টালির চালের। আমাদের রান্নাঘর থেকে কাকীমার নিত্যদিনের ঘটনা দেখি আমার ঘরকন্যা করতে করতে, খালি রঞ্জু রঞ্জু ডাকটা আর শুনতে পাই না ,রঞ্জু যে বড় হয়ে গেছে।
   গত পরশু আমার কর্তা বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেল স্টার্ট  দিয়ে ,চেপে বসে স্ট্যান্ড তুলতে গিয়ে ঘটালেন এক রক্তারক্তি কান্ড !বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা একেবারে পা ছাড়া! অত রক্ত !আমি তো প্রায় মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলাম !কোনরকমে ব্যান্ডেজ বাঁধা হলো। ওই আর কি, একটুও ওষুধ যা সাধারণ কাটাছড়ার জন্য বাড়িতে থাকে, তাই একটু ন্যাকড়া দিয়ে বেঁধে দিলাম । হাসপাতালে গেলে গোটা তিন-চারটে  সেলাই পড়তো, দুটো তো বটেই তা হলফ করে বলা যায় ,কিন্তু কে শোনে কার কথা! তবে টিটেনাস  তো দিতেই হবে ।
   কর্তাবাবু ওষুধ নিয়ে আসার সময় রঞ্জুর বাবা মানে অবনী কাকুকে বলে এলেন ইঞ্জেকশনটা দিয়ে যেতে।অবনী কাকুর ইঞ্জেকশনের হাত খুব ভালো! আমার মেয়ে হওয়ার সময় সব কটা টিটেনাস  ওনার কাছেই নিয়েছি । প্রথমে একবার হাসপাতালে নার্সের কাছে নিতে গিয়ে উনি যেভাবে সু্ঁচ বাগিয়ে ধরেছিলেন আমি আক্ষরিক অর্থেই পালিয়ে আসি তাই অবনী কাকুই ভরসা!
  এত সুন্দর ইঞ্জেকশন দিলেন যে কিছুই টের পেলাম না পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন দশটা টাকা ,সে তো প্রায় চোদ্দ পনেরো বছর আগেকার কথা। কাকু এত সুন্দর হাসি মুখে কথা বলতে বলতে ইঞ্জেকশন দিতেন কিচ্ছু মনে হত না । তাই এবারও কাকুকেই ডাকা হলো। কাকু একইরকম হাসিমুখে ইনজেকশনটা দিয়েও দিলেন, যথারীতি  গল্প করতে করতে । কর্তা বাবু টেরই পেলেন না যে কখন বিরাট কাজটা হয়ে গেছে,  ওনার আবার ইঞ্জেকশন দেখলেই জ্বর আসে!এবার টাকা তো দিতে হবে, আমি নিজেই  ওকে ডেকে বললাম ,”পঞ্চাশ টাকা দাও।”  ও টাকাটা বের করেও তবু একবার জিজ্ঞাসা করার দরকার বোধ করলেন কারণ আড়ালে আমরা যাই বলি পারিশ্রমিকটা ওনার তাই মূল্য ঠিক করার অধিকারও ওনার।
জিজ্ঞাসা করলেন, ” ইয়ে মানে কাকু কত দেব? “কাকু  একগাল হেসে বললেন, “কুড়িটা টাকা দাও”,আমি অবাক! আমি কেন  ওনার কথা শুনে আমার বর, শাশুড়ি সবাই অবাক !আমরা  ঠিক জানি ,যতই আমরা ঘরের ভেতর থেকে কথা বলিনা কেন  পঞ্চাশ টাকা দেওয়ার কথা, বারান্দায় বসে উনি নিশ্চয়ই শুনেছেন !কিন্তু অবলীলায় বললেন ,”কুড়ি টাকা”! ও পঞ্চাশ টাকা  বের করে দিতে পকেট থেকে তিরিশ টাকা ফেরত দিলেন হাসিমুখে ।
   কাকুর বাড়িও এক আছে, কাকুর হাসিমুখও একই আছে আর চাহিদাও! বুঝলাম কি ভাবে কাকু সব সময় এত হাসি মুখে থাকেন! যার চাহিদা কম, যার লোভ নেই,যে টালির চালে,ডাল ভাত খেয়েও খুশি, সুখী সেই এভাবে হাসতে পারে! আর আমরা কিসের পেছনে ছুটছি? আর কেনই  ছুটছি! আমরা কি সবাই অবনী কাকু হতে পারি না ?তাহলে অন্তত রাতের ঘুমটা ভালো হবে, তাহলে হয়তো আর ঘুমের ওষুধ খেতে হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *