অসুখের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যেন এক আরোগ্য-দিগন্তে যাত্রা – পুলক মন্ডল

[post-views]                                     [printfriendly]

সভ‍্যতার হৃদয় থেকে আচমকা দমবন্ধ হয়ে যাওয়া এই বছরটাকে বোধহয় ভুলে যেতে চাই আমরা। চলতে চলতে হঠাৎই যেন ২০২০-তে এসে থেমে গেছে পৃথিবী নামক এই জীবন্ত প্রাণীর গ্রহটা। যেন কখনোই এ বছরটা আসেনি! কিন্তু তা কি সম্ভব? বরং অসুখের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যেন এক আরোগ্য-দিগন্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা —

     ২০২০ আমাদের প্রকাশ‍্য মাস্ক(মুখোশ) পরাতে বাধ্য করল। যদিও মুখোশ আমাদের ছিল-ই। তবে তা অপ্রকাশ‍্যে, অন্তরালে। সময়-সুযোগ পেলেই আমাদের  এই ভালোমানুষীর অদৃশ্য  মুখোশটা খসে পড়ে বহুবার আসল চরিত্র বেরিয়ে পড়েছে। এবারে জীবন বাঁচানোর তাগিদে যা দৃশ্যমান হলো মাত্র।

      সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা  বহুদিন যাবৎ রপ্ত হয়েছি বটে, তবে লকডাউনের ঘরবন্দী ‘২০২০’ আমাদের অনলাইনে লেখাপড়া শেখা থেকে ঘরে বসে অফিস চালানো শেখালো। একদিকে আমাদের নিজস্ব শোক-দুঃখ-ভালোলাগা সবই যেমন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে ঠিক তেমনই এই ঘরে বসে থাকা বছরটায় সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের অনেক নাম না জানা প্রতিভাও উপহার দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু অসামান্য কিন্তু অবহেলিত-অপ্রকাশ‍্য শিল্পীর সন্ধান দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া।

       ২০২০ আমাদের ঘরবন্দী করে রাখলেও আমাদের ভেতরের হিংস্রতা আর অমানবিকতাকে প্রকাশ‍্যে এনেছে তীব্রভাবে, বারেবারে। আমরা নিষ্ঠুর হয়েছি করোনামুক্ত মানুষকে তাঁর নিজের ঘরে ঢোকার রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে। এ যেন অস্পৃশ‍্যতার নামান্তর এক আচরণ!

      মাইলের পর মাইল পথ হেঁটেছেন নিঃস্ব-কাজ হারানো-ক্লান্ত-অভুক্ত মানুষগুলো সন্তান-সন্ততিকে পিঠে-কোলে-কাঁধে চাপিয়ে, শুধুমাত্র ঘরে ফেরার তাগিদে। আমরা টিভির পর্দায় দেখেছি সেসব। কিন্তু কতজন রাস্তায় নেমে তাঁদের হাত ধরেছি? এগিয়ে দিয়েছি জলের বোতল? সহমর্মিতা কি শুধুই ভার্চুয়াল? ‘২০২০’ আমাদের জানান দিয়েছে যে সভ‍্য হতে আমাদের এখনো অনেক পথ হাঁটতে হবে।

        পিকচার আভি বাকী হ‍্যায় মেরে দোস্ত…… সবই কি নেগেটিভ! ‘২০২০’ আমাদের দেখিয়েছে কথায় কথায় যে স্বাস্থ্যকর্মী-চিকিৎসক-নার্সদের ওপর আমরা চড়াও হই অথবা  যে পুলিশকর্মী কিম্বা সাংবাদিকদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলি তাঁদের অনেকেই জীবন বাজী রেখে লড়েছেন। লড়েছেন আমাদের জীবন রক্ষা করার জন্য। সেইসব বীরযোদ্ধাদের অনেককেই কেড়ে নিয়েছে ‘২০২০’। তবে ‘২০২০’ এ সত্যটাও আমাদের সামনে তুলে ধরেছে যে মানুষের পাশে মানুষ-ই দাঁড়ায় নিঃস্বার্থভাবে।

       আরও কি চরম শিক্ষা দিয়েছে ‘২০২০’ আমাদের-  দেখুন!  চরম উন্নাসিকতায় যেসব সাফাইকর্মীদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাত না, তাঁদের জন্য হয়েছে পুস্পবৃষ্টি!!!!!!

 অনেক মানুষ চলে গেলেন এ বছরে। একদিন তো যেতেই হতো। কিন্তু বড় অসময়ে গেলেন। মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে চলে গেলেন। সেইসব স্বাস্থ‍্যকর্মী-পুলিশ-সাফাইকর্মীরা জানিয়ে গেলেন যে অন্যের জীবন বাঁচানোতেই থাকে পৃথিবীর সেরা সুখ।

      ২০২০-র অতিমারী থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমরা অপেক্ষায় আছি প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের সহজলভ্য ভ‍্যাকসিন আবিস্কারের। কিন্তু ২০২০ আমাদের ভেতরের যে নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার অসুখকে প্রকাশ‍্যে এনেছে, তার ভ‍্যাকসিন তো আমাদের নিজেদের কাছেই আছে। তাইনা !

          ‘২০২১’ নিশ্চয়-ই এক আরোগ্য-দিগন্তে হাজির করাবে আমাদের। আসুন, নতুন বছরে আমরা আমাদের মনের ভিতরে রোপন করি একটি সবুজের চারা। যার পাতায় পাতায় থাকবে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, আন্তরিকতা আর  সহমর্মিতা

   ভালো থাকবেন      ভালো রাখবেন

 

 

আপনার মতামত এর জন্য
[everest_form id=”3372″]

পুলক মন্ডল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top