আগান বাগান

#আগান_বাগান
#শম্পা_সাহা

“গাংনী মরা ন‍্যাংটা,তখন থেকে বলে যাচ্ছি,ঝাঁকাসনি,ঝাঁকাসনি, তবু ঝাঁকাবি?আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!”পাঁচ ছ বাড়ি পরের সেভেনে পড়া ছেলে ন‍্যাংটেশ্বর হাইত আম গাছটা ঝাঁকিয়েই চলেছে।ইস্কুলে আজ আচারয়ালা আসেনি ,কিন্তু আজ যে ওর বড় আম মাখা খেতে ইচ্ছে করছে!

খাঁদু পিসি মারলো ছুঁড়ে এক ঝাঁটা।খ‍্যাংরা ঝাঁটাটা অনেকদিন ধরে পড়ে আছে,একেবারে ন‍্যাড়া মুড়ো।পিসি ভাবছিল বাড়ির সামনে পিসের ক্ষয়ে যাওয়া নীল হাওয়াই চপ্ললটা,যেটা খাঁদু পিসির বাবা হচেন বিশ্বিস কিনে দিয়েছিল পেত্থমবার জামাই ষষ্টি তে,ওটাই ঝাঁটার দোসর করে টাঙিয়ে দেবে।অনামুখো,ওলাউঠো পারার লোকজন তাদের এই আম জামের বাগানে যা বিষ নজর দেয়,যা বিষ নজর দেয়!

ছেলেপুলে হয়নি পিসির ,বেচারি হরে দরে দুখানি মানুষ।আর আছে বাড়ি লাগোয়া আম কাঁঠালের বাগান।তো সেই বাগানইতো পিসির রোজগারের একমাত্তর উপায়।তা তাদের দিকে নজর দিলি তো পিসির বুক ফাটবেই!

হুঁ হুঁ বাবা এমনি না!ওই হাড় হদ্দ,হাড় হাভাতে ,পাড়ার সব নচ্ছার লোকের নজর এড়াতে পিসী রোজ বিকেলে বাগান,উঠোন ঝাড় দিয়ে গা ধুয়ে ইয়া বড় কাজল লতা নিয়ে বেরোন।ঘুরে ঘুরে সব গাছের গোড়ায় কাজলের টিপ পড়িয়ে দেন।সারারাত খাঁটি সর্ষের তেলে সেই কাজল পারা হয়।

কে না জানে নজর এড়াতে কাজলের টিপ যাকে বলে অব‍্যর্থ,একে বারে কোভ‍্যাক্সিনের মত,সেটা কোভিশিল্ড বা স্পুটনিক ও হতে পারে।মোদ্দা কথা প্রটেকশন!নজর এড়াতে একেবারে ধন্বন্তরী।কিন্তু যেমন দাবাই ভি অওর কড়াই ভি,তেমনি এক্সট্রা প্রটেকশন হিসেবে ওই ঝাঁটা, জুতো।

কিন্তু ঝাঁটা তো ছোঁড়া হল, গেল হাতছাড়া হয়ে!সে আবার এমনই হতচ্ছাড়া ঝাঁটা,পাঁচিলের এপাড়ে তো পড়তে পারতিস?না দেখো!

পিসি রাগে গজগজ করেন,”সব শত্তুর,সব শত্তুর!”ঝাঁটা আনতে গেট খুলে দেখেন ঊঁনপাঁজুড়ে ন‍্যাংটা ছোঁড়া ও নিয়েই পালাচ্ছে!
“আবার আসিস,ঠ‍্যাং খোঁড়া করে দেবো!তবে আমার নাম ক্ষ‍্যামাদে সুন্দরী বিশ্বিস”!পিসি শাসিয়ে আসেন।

আসলে পিসির এতো আদর যত্ন বাগানের প্রতিটা গাছে তাই ,একেবারে নধর কান্তি ফল ধরে ফি বছর।আর পিসি গুণে গেঁথে সে বিক্কিরি করে দেন হরেরাম গুছাইতের কাছে।তার ওই বাঁধা মহাজন।আসলে হরেরাম বাবু ক্ষ‍্যামাদে সুন্দরী কে একটু ইয়েও করেন।যখন মিষ্টি করে পিসিকে দেখে চোখ মটকে হাসেন আহা!মনে হয় যেন ভালুকে শাঁকালু খাচ্ছে!পিসি মনে মনে ফিতা না রিবন কি একটা হয়ে যান।তাইতে ওই বাগানের ফলে অধিকার একমাত্র হরেরাম গুছাইতের।সেখানে পিসে লাটেশ্বর বিশ্বিসের মতামত ও যাকে বলে নস‍্যি।

এদিকে আমাদের লাটু পিসেমশাই ,বেচারা পিসির চুনো মাছের ঝোল,আর নালতে শাক খেয়ে পয়সা জমানো মোটেও পছন্দ করেন না।”আরে বাবা ছেলেপুলে নেই, অত পয়সা কি হবে শুনি?”

কিন্তু খাঁদু পিসিকে বোঝায় কে?তাকে বোঝাতে গেলেই এক ঝাপট,”তুমি থামো!তুমি কি বুঝবে সংসার কাকে বলে?আমার বলে সংসারের সাত সতেরো সামলাতে জীবন যায়!”
বৌয়ের সামনে আর কারই বা মুখে রা ফোটে?তার উপরে আবার চেহারা খানা যদি খাঁদু পিসির মত চুনো মাছ খেয়ে ঝনঝনে কটকটে হয়,তাহলে তো হয়েই গেল।তর্জনীর এক খোঁচা বুকের পাঁজরে খেলে না ,তিন দিন কোঁ কোঁ করতে হবে!ওসব করোনো ফরোনা সব ফেল।পিসে তাই বাবা চুপ!

কিন্তু মন!মন কি বাঁধন মানে।পাশের বাড়ির গদাই লস্করের বৌ রাঙাজবা!আহা যেমন নাম তেমন রূপ, যেন এই সবে ফুটলো।যখন চোখ মটকে তাকায় না,পিসের হাড় যেন মটমট করে ওঠে।পিসে ভেবে পায় না , সব মেয়েদের দৃষ্টিই কেন বুকের পাঁজরের মানে ইয়ে হিরদয়ের দিকে।খাঁদু এমন ছুঁচ মার্কা চোখে তাকায় মনে হয় ফেঁড়ে দিল আর রাঙাজবা, পিসের “রাঙু”,এমন করে তাকায় মনে হয় ভেঙ্গে দিল,ইয়ে মানে অন‍্য কিছু ভাববেন না, মন মানে মনের মানে হিরদয়ের কথাই হচ্ছে।

তো এক আষাঢ়স‍্য প্রথম দিবসে,ইয়ে কেমন ভাব এসে গেছে দেখেছেন?আষাঢ়স‍্য না, আষাঢ়স‍্য না,জৈষ্ঠস‍্য কোনো এক দিবসে ,তার শেষে মানে রাত্রে, সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

মাঝরাতে অ্যাঁঙঙঙঙঙঙঙ…করে দরজা খুলে গেলো,যেমন সেই হাতুড়ি মার্কা ফিনাইল এক্সের শনিবারের বার বেলায় দরজা খুলতো।একটা ছায়া মুর্তি বেরিয়ে এল।গুটি গুটি ছায়া মুর্তি এগিয়ে যাচ্ছে ঝো‍ঁপের দিকে।তারপর চারিদিক নিস্তব্ধ,চকাস চকাস শব্দ…

“তবে রে গাংনী মরা ন‍্যাংটা, রাত্তিরে ও তোর হাত থেকে ছাড়ান নেই?”, সেই পেছন ক্ষয়া নীল হাওয়াই চপ্পলের একপাটি উড়ে চলল একেবারে শব্দভেদী বাণ হিসেবে।একেবারে টার্গেটে লক্ষ‍্যভেদ।
“ওরে বাবাগো ,মা গো ,পিসি গো ,ঠাকুমা গো…”

একি একি এ কি শুনছেন খাঁদু পিসি ।এতো ন‍্যাংটা র গলা নয়,এ যে বড় চেনা গলা!এ তো সেই মিনসে টার!

ধবাস করে গদাই লস্করের বাড়ির সদর দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

এক ছায়া মুর্তি হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে আরেক ছায়া মুর্তিকে,সঙ্গে চাপা গর্জন,”চল পোড়ারমুখো মিনসে ,আজ তোরই একদিন কি আমার একদিন!”, আর অন‍্য ছায়া মুর্তি চলার পথে জড়িয়ে ধরছে ,বাগানের আম ,জাম,কাঁঠালের ডাল।আজ কে তাকে বাঁচায়?

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top