আজি বসন্তে – পর্ব ১০

Subrata Majumdar

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 13 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ১০)

#সুব্রত_মজুমদার

অতসীর মা এমনিতে শান্তশিষ্ট গৃহকর্মপরায়ণা, কিন্তু মাঝে মাঝেই চিন্তাভাবনাগুলো গুলিয়ে যায় তার। ছোটবেলা হতেই এ অসুখ। বাপ মা বিয়ে দেওয়ার সময় এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি পাত্রপক্ষকে।

অতসীর বাবা সুনির্মল ব্যানার্জী বড়ই ভালোমানুষ। ঠিকেদারের অধীনে ম্যানেজারের কাজ করেন। কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়াতে হয় দূর দূরান্তরে। আজ অমুক জায়গায় পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ তো কাল কোনও জলাধারের উপর সেতু নির্মাণের কাজ। একাহাতে সংসার চালান কুমুদিনী।

কুমুদিনীর পাগলামির কথা সর্বজন বিদিত। কতদিন যে রান্না করার পর কুকুর ডেকে খাইয়ে দিয়েছে, বা বিনা জলেই ভাত চাপিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আর স্বাভাবিক ভাবেই ছেলে আর মেয়ের উপর পড়েছে গোটা সংসারের চাপ। অল্প বয়সেই অনেক অভিজ্ঞ হয়ে গেছে ওর ।

বছর আটেক আগের কথা, অতসী তখন বছর দুয়েকের আর ওর দাদা শঙ্কর বছর চারেকের, ছেলেমেয়েকে ফেলে কুমুদিনী চলে গেল জগন্নাথধাম। গোটা গ্রামের লোক নিন্দা আফসোস আর সমবেদনায় ভরিয়ে দিল। সুনির্মলবাবু কপালে হাত দিয়ে বসলেন। জীবনে এরচেয়ে বেশি অতান্তরে পড়তে হয়নি তাকে।

কথাবার্তা বেশ কিছুদিন হতেই চলছিল। ওপাড়ার বোষ্টমী যাবে জগন্নাথ দর্শনে, কেউ চাইলে তার সঙ্গ ধরতেই পারে। কথাতেই বলে ‘হাতে কড়ি পায়ে বল তবে করবি নীলাচল’। শরীরে যদি ক্ষমতা থাকে আর গাঁটে পয়সা থাকে তবে বোষ্টমীর কি আপত্তি ? যে খুশী সঙ্গে যেতে পারে।

কুমুদিনীর অবশ্য দুটোই আছে। স্বামীর পকেট ঝেড়ে ধানচাল বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা সে জমিয়েছে। ছিটগ্রস্তরা এদিক দিয়ে সচেতন হয়। এদের কাছ হতে এক পয়সাও বেশি হাতিয়ে নেবার ক্ষমতা কারোর নেই। কুমুদিনীও শ’খানেক টাকা জোগাড় করেছে । সেদিনের বিচারে সে অনেক টাকা। আর শারীরিক শক্তিরও অভাব নেই কুমুদিনীর। দলের আগে হাঁটতে পারে।

সুনির্মলবাবু কিন্তু পড়লেন চিন্তায়। একদিকে পাগল বৌ অন্যদিকে দুটো কচি ছেলেমেয়ে। যে বেরিয়ে পড়েছে জগন্নাথ দর্শনে সে যে কিভাবে ফিরে আসবে তা কেউই জানে না। দলের সাথে হেঁটে যাওয়ার মতো সুশীলাও সে নয়। সবার অলক্ষ্যে হয়তো পালিয়ে যাবে অন্য কোথাও। নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।

আগেভাগে জানলে বোষ্টমীর হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যেত, কিন্তু কুমুদিনী পালিয়েছে কাউকে না বলে। এখন ঘরে বসে চিন্তা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। তার উপরে আবার ছেলেমেয়েদুটোর দায়িত্ব। ওদের ছেড়ে কাজে যাওয়াও যায় না। আর ঘরে বসে থাকলেও তো চলবে না। না খেয়ে মরতে হবে।

পাশের বাড়িতে কিছু টাকা আর চালডাল দিয়ে অতসী আর শঙ্করের দেখভালের ব্যবস্থা করলেন সুনির্মল। গেলেন কাজে। ঠিক হল মাস দেড়েক পর কিছুদিনের ছুটি নিয়ে ফিরে আসবেন। তার মধ্যেই কুমুদিনীও ফিরে আসবে। সেইমতো মাসদেড়েক পরে ফিরে এলেন ঘরে। এসে দেখলেন জগমচ্ছব কান্ড। ঘরের উঠোনে আগাছা জন্মেছে, ছেলেমেয়েদুটো স্কুল না গিয়ে না গিয়ে বখে গেছে।

যে প্রতিবেশীকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন তাকে জিজ্ঞাসা করতেই সে বিরক্তির সুরে বলল, “সব দায়িত্ব কি আমার ? আপনার ছেলেমেয়েরা যে না খেয়ে মরেনি এটাই অনেক। আর পাগলের পেটে পাগলই জন্মায় ঠাকুরমশাই। আমার পক্ষে পাগলছাগল সামলানো সম্ভব না।”

সুনির্মলবাবু চরম রেগে গেলেন। বললেন, “নিজের ছেলেদের খেয়াল তো দিব্যি রেখেছ হে। আসলে জীবনে পয়সা আর স্বার্থ ছাড়া তো কিছুই বুঝলে না। তোমার এ উপকার সারাজীবন মনে থাকবে।”

সেইক্ষণেই মজুর ডেকে ঘর পরিস্কার করালেন। নতুন খড়ে চাল ছাওয়ালেন। গোটা ঘর ও উঠোন গোবর মাটি ও খড়ি দিয়ে নিকানো করালেন। ছেলেমেয়েদুটোকে দিয়ে এলেন স্কুলে। সবাই বলল,”নিজের লোক ছাড়া কি আর হয় ? বাপ এসে ঘরের হাল ফেরাল। ছেলেমেয়েদুটোর একটা ব্যবস্থা হল।”

দিন পনেরো পরে ঘরে ফিরল কুমুদিনী। সুনির্মলবাবু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি তো কুমুদিনীর ফেরার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। এই দুইমাস তিনি সকাল সন্ধ্যা এই চিন্তা করেছেন যে কুমুদিনী না ফিরলে কি হবে। যাই হোক সব চিন্তা ভাবনার ইতি করে ঘরে ফিরল কুমুদিনী।

গ্রামের স্কুল শেষ করল অতসী। এবার পড়তে গেলে মফস্বলে যেতে হবে। মেয়েছেলেকে অতদূরে পাঠানো যায় না। তাছাড়া অতসী কোনও মেমসাহেব নয় যে ব্যাটাছেলের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে ক্লাস করবে। সুতরাং তার পড়া ওখানেই ইতি।

সুনির্মলবাবু বললেন, “কাজের জায়গায় হাত পুড়িয়ে রান্না করে খেতে হয়, অতসী আমার সাথে চলুক। ও থাকলে আমার চিন্তা দূর হবে।”

কুমুদিনীও না করল না। মাথায় সামান্য ছিট থাকলেও সংসারের ভালোমন্দের ব্যাপারে উদাসীন নয় সে। তার স্বামী নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, যার তার হাতে খান না, সুতরাং অতসী গেলে আলুসেদ্ধ ভাতটাও তো বাবার মুখে তুলে দিতে পারবে।

অতসী গেল বাবার সঙ্গে। নিজের চেনাপরিচিত মাঠ ঘাট পথ নদী ছাড়িয়ে ছোটোনাগপুর মালভূর অরণ্য আর পাহাড় বেষ্টিত অজানা এক জায়গায়। এখানে নেই কোনও পরিচিত বন্ধু, নেই কোনও পরিচিত দৃশ্যপট। অতসীর বাবার কোম্পানি কাজ পেয়েছে এই এলাকায় রেলের লাইন পাতার। পাহাড় ফুটো করে যাবে রেলের লাইন। ক’মাস লাগবে কেউ জানে না।

সকাল হতেই কাজে বেরিয়ে যান সুনির্মলবাবু। তখন অতসীর সঙ্গী বলতে ঝুমুর আর দোনলা একটা বন্দুক। ঝুমুর একটা সাঁওতাল মেয়ে, চব্বিশ ঘন্টা অতসীর সঙ্গেই থাকে। দুজনে মিলে কতরকমের গল্পগুজব যে করে তার ইয়ত্তা নেই। আর বাবা এলেই অতসী তাবু হতে বের করে বন্দুক। বাপের তত্ত্বাবধানে বন্দুক চালানো শেখে সে।

একদিন সন্ধ্যার সময় ঘটল সেই কান্ড। সুনির্মলবাবু তখনও তাবুতে ফেরেননি। তাবুর পাশেই উঠল একটা গর্জন। বাঘের। গর্জন শুনেই কাঁপতে লাগল ঝুমুর । বলল, “আর বাঁচবে লাই গো বুন আর বাঁচবে লাই। চিবিন খেই লিবে গো…. আর বাঁচবে লাই।”

সেসময় এ অঞ্চলে বাঘের উপদ্রব আশ্চর্যের কিছু ছিল না। জঙ্গল আর পাহাড়ে ছিল প্রচুর বাঘ। তবে লোকালয়ে আসত কম। কারন খাদ্যের কমতি ছিল না। বন্য শূকর হতে হরিণ খরগোশ কোনও কিছুরই কমতি ছিল না। ফলে জঙ্গলময় দাপিয়ে বেড়াত বাঘমামা। সামনাসামনি মানুষ পড়লে জীবন নিয়ে ফেরার সূযোগ থাকত না।

বাঘের ডাক শুনেই আতঙ্কে কাঁপছে আশেপাশের তাবুর লোকজন। কারন বাঘের পক্ষে তাবুর ভেতরে ঢুকে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া খুবই মামুলি কাজ। আর বাঘের সঙ্গে লড়াই করাও কঠিন। বাঘ সাধারণত শিকারের মুখোমুখি হয় না। পেছন হতে আক্রমণ করে তুলে নিয়ে যায় শিকার। এজন্যই এই বাঘ শিকার করা কঠিন।

পাশের তাবুর চ্যাটার্জি সাহেব বন্দুক হাতে বিছানায় বসে বসে কাঁপছে। পায়ের কাছে বসে তীরধনুক নিয়ে বাঘের অপেক্ষা করছে সাগুন। সাগুন বলছে, “ডর মত বাবু, উ বাঘকে এক তিরে মেরে দুব।”

আবলুশ কাঠের মতো কালো বলিষ্ঠ দেহ সাগুনের। মনেও প্রচুর সাহস। কিন্তু তবুও কাঁপুনি থামছে না চ্যাটার্জি সাহেবের। কখন যে কি হয় বলা মুশকিল। সাগুনের উপর বিশ্বাস নেই তার। ওই অতবড় ও ধূর্ত বাঘের কাছে তীরধনুকের কোনও দাম নেই।

কপাল খারাপ হলে এমনিই হয়। বাঘটা আবার গর্জন করে উঠল। এবার চ্যাটার্জি সাহেবের তাবুর পাশেই। ভয়ে লাফিয়ে উঠলেন চ্যাটার্জি সাহেব। গিয়ে পড়লেন সাগুনের সামনে। আগে বাঘের গর্জন আর তার পরে পরেই নিজের সামনে কিছু একটা লাফিয়ে পড়তে দেখে তীর চালিয়ে দিল সাগুন। তীর গিয়ে লাগল চ্যাটার্জি সাহেবের পেছনে। অনেকটা গেঁথে গেল।

ভুল বুঝতে পেরে এগিয়ে এল সাগুন। ক্ষতস্থানটা দেখে আফিকরে বলল, “ই বাপ ! কাপাল ভালো তীরে বিষ দিই নাই। না হলে বাবু……”

চ্যাটার্জি সাহেব যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতেই গালাগালি করতে লাগলেন। সে গালাগালি এখানে লেখার যোগ্য নয়। তবে সাগুন যে তার কতটা বুঝল তা বলা শক্ত।

চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *