আজি বসন্তে – পর্ব ১১ // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 15 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ১১)

#সুব্রত_মজুমদার

কপাল খারাপ হলে এমনিই হয়। বাঘটা আবার গর্জন করে উঠল। এবার চ্যাটার্জি সাহেবের তাবুর পাশেই। ভয়ে লাফিয়ে উঠলেন চ্যাটার্জি সাহেব। গিয়ে পড়লেন সাগুনের সামনে। আগে বাঘের গর্জন আর তার পরে পরেই নিজের সামনে কিছু একটা লাফিয়ে পড়তে দেখে তীর চালিয়ে দিল সাগুন। তীর গিয়ে লাগল চ্যাটার্জি সাহেবের পেছনে। অনেকটা গেঁথে গেল।

ভুল বুঝতে পেরে এগিয়ে এল সাগুন। ক্ষতস্থানটা দেখে আফিকরে বলল, “ই বাপ ! কাপাল ভালো তীরে বিষ দিই নাই। না হলে বাবু……”

চ্যাটার্জি সাহেব যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতেই গালাগালি করতে লাগলেন। সে গালাগালি এখানে লেখার যোগ্য নয়। তবে সাগুন যে তার কতটা বুঝল তা বলা শক্ত।

এদিকে বন্দুক হাতে নিয়ে তাবুর দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে অতসী। শূন্যে ছুড়ল গুলি। গুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়তে শুরু করল বাঘ। এ তল্লাটে আর থাকবে না সে। বাঘ পালিয়ে যেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সবাই। ততক্ষণে নির্মলবাবুও এসে গেছেন। মেয়ের বাহাদুরি দেখে গর্বে বুক ভরে উঠল তার।

নির্মলবাবু ডিউটিতে চলে গেলে ঝুমরির কাছে গল্প শুনতে বসে অতসী। বনের গল্প, পাহাড়ের গল্প, পশুপাখিদের গল্প । মুগ্ধ হয়ে শোনে অতসী।

ঝুমরি বলে চলে সেই আদি যুগের কথা। পৃথিবী তখন জলে জলময় ছিল। চারদিকে না ছিল কোনও ডাঙ্গা। চাঁদের মেয়ে তার গায়ের ময়লা দিয়ে তৈরি করল দুটো পাখি। হাঁস আর হাঁসিল। হাঁস আর হাঁসিল উড়ে চলল দূর দূরান্তরে । কিন্তু কোথাও একটুও মাটি নেই। ফলে খাবারও নেই।

ভগবানকে তাদের কষ্টের কথা জানাল তারা। ভগবান তখন জলের ভেতর হতে মাটি তুলে আনার জন্য বোয়াল মাছকে পাঠালেন। বোয়াল মাছ ব্যর্থ হল। একইভাবে কচ্ছপ ও কাঁকড়াও ব্যার্থ হয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়াল ভগবানের সামনে। ভগবান তখন কেঁচোকে ডেকে বললেন, “যদি তোমাকে দায়িত্ব দিই তবে পারবে ?”

কেঁচো বলল, “আপনার আশীর্বাদ থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারব প্রভু।”
ভগবান বললেন, “তবে যাও, কাজে লেগে পড়।”

কেঁচো তখন মাটি খেতে লাগল আর কচ্ছপের পিঠের উপর মলত্যাগ করতে লাগল। এইভাবে ক্রমে ক্রমে স্থলভাগের সৃষ্টি হল। তখন সেই ডাঙ্গাতে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ল হাঁস আর হাঁসিল। দুটো ডিম হতে একটা ছেলে ও একটা মেয়ে হল। পিলচু হাড়াম আর পিলচু বুড়ি। এরাই আদি মানব মানবী।

এই পিলচু নামের অর্থ জানা নেই ঝুমরির। কিন্তু আধুনিককালে ভাষাতত্ত্ববিদরা এই নামকরণের অর্থ খুঁজে বের করেছেন। ‘চুপি-ল বাঁড়য়া হড়ং’ এর একটি অপভ্রংশ রূপ হচ্ছে পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ি । ‘চুপি ল বাঁড়য়া হড়ং’ অর্থাৎ লেজ বিশিষ্ট বানর হতে লেজহীন মানুষ হওয়ার কাহিনী এটা । এখানে ‘চুপি’ অর্থ ‘লেজ’ আর ‘ল’ কথার অর্থ পুড়ে যাওয়া। ঘুরেফিরে রামায়ণের লঙ্কাকান্ডে পৌঁছে যাই আমরা।

গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ে অতসী। হারিয়ে যায় স্বপ্নের রাজ্যে। সেখানে চারিদিকে শুধু জল আর জল। যেমনটা সে শুনেছে মায়ের মুখে। জগন্নাথের মন্দিরের কাছে জল আর জল। এক তালগাছ দু’তালগাছ তিনতালগাছ ঢেউ। লাফ দিয়ে সেউ ঢেউয়ের উপরে উঠেছিল অতসীর মা। সে খুবই মজার ব্যাপার।

অতসী দেখল সেও চলে এসেছে জগন্নাথে। বালির উপর বিশাল বিশাল মূর্তি। আর মূর্তির পাশেই ঘননীল জলের রাশি। সেই জলে ঢেউ উঠেছে বিশাল বিশাল। অতসীর এক এক লাফে সেই ঢেউগুলোর চূড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। হঠাৎই কি একটা দেখে জল হতে সরে এল সে।

আরে কি ওগুলো ? বিশাল বিশাল সব কচ্ছপ জলের উপর পিঠ তুলে ভেসে আছে। আর ওই কচ্ছপগুলোর পিঠের উপর একটা করে কেঁচো মুখটা জলে ডুবিয়ে মাটি তুলছে। রাশি রাশি মাটি। পাহাড় সমান মাটি জড়ো হয়ে তৈরি করেছে বিশাল ঢিবি। আর ঢিবির আড়ালেই দুটো জ্বলজ্বলে চোখ। ওটা কি ?

বন্দুক বের করে অতসী। গুলি ছোড়ে – ‘গুড়ুম্’ ।
ঘুমন্ত অতসীর মুখে গুড়ুম্ গুড়ুম্ শব্দ শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় ঝুমরির। সে নাড়া দেয় অতসীকে, “বুন, ও বুন ! কি হল তুর ? সপন দেখছিস ?”

ঘুম ভেঙ্গে চোখ কচলাতে থাকে অতসী। ঝুমরি তখন একটা কয়েতবেলের আধভাঙ্গা খোলা এনে অতসীর সামনে ধরে বলে, “খাবি ? লুন দিয়ে ত্যাল দিয়ে মেখেছি রে বুন।”

ঝুমরির হাত হতে কয়েতবেল মাখাটা নিয়ে মজা করে খেতে থাকে অতসী। ঘরে থাকতে এরকম কতবার মেখে খেয়েছে সে। ঘরের কথা মনে পড়তেই দু’চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। মনে পড়ে গেল খেলার সাথীদের কথা, দাদা শঙ্করের কথা। কোনোদিনও কি ফিরতে পারবে না ঘরে ? বাবার কাজ কি শেষ হবে না ?

মাস দুয়েক পরের কথা, গোটা এলাকাজুড়ে জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। মোটা শাল-চাদরেও ঠান্ডা কাটছে না। এই এত ঠান্ডার ভেতরেও সাঁওতাল মজুরদের পরনে কটিবাসমাত্র। এরা ঠান্ডায় কাঁপে, শুকনো ঘাস বা খড়ের ভেতরে ঢুকে রাত কাটায়, আবার কখনো আগুন জ্বেলে গোল করে ঘিরে আগুন পোহায়।

-“আমাকে একট মোটা কাপড় দিবি বুন ?”
মোটাকাপড় মানে চাদর। বাবুদের দেওয়া একটা পাতলা কাপড় পরেই শীত কাটছে ঝুমরির। তাই অতসীর কাছ হতে একটা চাদর পাওয়া গেলে খুবই ভালো হয় তার। ঝুমরির কথা শুনে একগাল হেসে অতসী বলল, “কেন দেব না দিদি, একটু দাঁড়াও।”

অতসী উঠে গেল বড় তোরঙ্গটার কাছে। তোরঙ্গটা খুলে বের করে আনল একটা চাদর। চাদরটা পুরোনো হয়ে গেলেও যেমনকার তেমনি আছে। কেবল রংটা একটু ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। চাদরটা এনে হাতে দিতেই আনন্দে নেচে উঠল ঝুমরি। চারখানা নিয়ে বারবার গালে ঠেকাতে লাগল সে। এ আনন্দের জুড়ি খুঁজে পাওয়া ভার। লটারিতে কোটি টাকা পুরস্কার জিতলেও এমন আনন্দ হয় না লোকের।

পাহাড় কেটে রেলপথ তৈরি করছিল কোম্পানি। আর সে কাজে নিয়োজিত ছিল প্রচুর সাঁওতাল মজুর। সারাদিন খাটাখাটনির পর মজুরি নিয়ে যেত সাউয়ের দোকানে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনে ফিরত বসতিতে। কাজের জায়গার কাছেই বেদেদের তাবুর মতো ছোটো ছোটো তাবুতে ছিল তাদের বাস। কোম্পানির দৌলতেই। কারন কর্মক্ষেত্র হতে ওদের বাসস্থানের যা দূরত্ব তাতে আসাযাওয়া করলে কাজ এগোবে না।

সন্ধ্যার পর বসতির সামনে আগুন জ্বালিয়ে শুরু হত নাচ আর গান। হাড়িয়ার নেশায় মেতে উঠত নারীপুরুষ সবাই। বাবুদেরও ডাক পড়ত মাঝে মাঝে। ঝুমরির এক রাতে নিয়ে গিয়েছিল অতসীকে। বলেছিল, “লাচ গান হবে। মাদল বাজবে, সিরিং করব।”
-“তুমি গান করতে পার ?”
-“খুব জানি। বাহা সিরিং জানি, আরও কত সিরিং জানি।”

বাবার অনুমতি নিয়ে অতসী এসেছিল ঝুমরিদের নাচগানের আসরে। খুব অবাক লেগেছিল ওর। ওর গ্রামের আশেপাশেও সাঁওতাল গ্রাম আছে, কিন্তু এরকম করে তো গায় না। বরং সন্ধ্যা হতেই ঝিমিয়ে পড়ে পচুইয়ের নেশায়। আর এখানে ? এখানে কর্মক্লান্ত মানুষগুলোর চোখে ঘুম নেই। ওরা গাইছে বাজাচ্ছে আর নাচছে।

একদল মেয়ে হাতে হাতে ধরে নাচছে। ঝুমরি ওদের মধ্যমণি। আর সেই নাচের দলের মুখোমুখি হয়ে মাদল বাজাচ্ছে দুটো সাঁওতাল যুবক। এদের একজনকে চেনে অতসী। সাগুন। এই সাগুনের সঙ্গে ঝুমরির ভালোবাসা। লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলে ওরা। ঝুমরির বর খুব রাগী আর মাতাল। ওকে ছেড়ে সাগুনকে বিয়ে করবে ঝুমরি।

-“আয় আয়, আমাদের সঙ্গে লাচবি আয়।” অতসীকে উঠিয়ে নিয়ে গেল ঝুমরি। হাতে হাত ধরে মাঝখানে ঝুমরির বাঁয়ে দাঁড়াল অতসী। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের পায়ের তাল মুখস্থ হয়ে গেল ওর।

নাচ আর গানের মধ্যেই যে কখন রাত গভীর হয়ে এল কেউ জানে না। নাচতে নাচতে ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই। অতসীর যখন ঘুম ভাঙ্গল তখন ব্রাহ্ম মূহুর্ত। আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। পাখির দল বাসাতে বসেই ডাকাডাকি শুরু করেছে। এখনও বের হয়নি তারা। অতসীর বাবা এসময়ই উঠে স্নান করে প্রাতসন্ধ্যা করেন। মেয়েকে ডাকেন না তিনি। তবুও ঘুম ভেঙ্গে যায় অতসীর। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে সব দেখে।

চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *