আজি বসন্তে – পর্ব ১৪ // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 21 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ১৪)

#সুব্রত_মজুমদার

সেসব দিনের কথা মনে পড়লেই বুকটা হুহু করে ওঠে। এরপর দিনগুলো পেরিয়ে গেল নদীর জলের মতো। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হল, নাতি নাতনি হল। আর একদিন বিজয়াকে সাদা শাড়ি পরিয়ে বিদায় নিলেন চন্দ্রকান্ত। একটা যুগের শেষ হল। শেষ হল একটা অধ্যায়ের।

বলতে বলতে দু’চোখে জল গড়িয়ে পড়ল ঠাকরুনের। নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে তনিমা বলল, “যা চলে গেছে তা চলে গেছে। আমাদের হাতে তো নেই কিছুই। পারলে তো আমিই ধরে রাখতাম স্বর্ণেন্দুকে। কিন্তু তা হবার নয়।”

ঠাকরুনের গল্প শুনে বিহ্বল হয়ে উঠল জগাই । হাত তুলে উঠে দাঁড়াল সে।
-“আমি বলব… আমি…. এরপর আমার পালা।”
-“কি বলবি হতচ্ছাড়া ?” জগাইয়ের দিকে তাকাল বিলাসী।
জগাই হাসি হাসি মুখ করে বলল,”আত্মকথা। অটোবায়োগ্রাফি।”

-“শোনাই যাক, পাগল কি করে হয় সেটাও জানা দরকার। শুরু কর বাপধন।” উৎসাহ দিয়ে বলল তিনকড়ি।

জগাই শুরু করল তার কাহিনী। কাহিনী না বলে মহাকাব্য বলাই ভালো। কারন জগাই তো আর যে সে লোক নয়, এ জগতের বিস্ময় সে। অক্সফোর্ড ডিকশনারির অর্ধেকটা তার মুখস্থ। এমন প্রতিভা লন্ঠন হাতে করে খুঁজতে হয়।

জন্মের পরপরই যে ছেলে নার্সের মুখে পেচ্ছাব করে দেয় সেই ছেলে যে বড় হয়ে একটা রত্ন হবে তা বুঝেছি সবাই। জগাইয়ের বাপ বিধান সান্যাল গর্ব করে বলেছিলেন , “আমার ছেলে জগৎকে মোহিত করে রাখবে, ওর নাম রাখলাম জগমোহন।”

আর সেই জগমোহনই ঘষতে ঘষতে হল জগাই।
পাড়ার জ্যোতিষঠাকুর সর্বানন্দ পাঁজিপুঁথি দেখে বলেছিলেন, “গ্রহাবস্থান ভালো নয় হে, রাহু কোষ্ঠবদ্ধ হয়ে চিঁচিঁ করছে, কেতুও পুকুর-ঘর করতে করতে বিরক্ত হয়ে জলরাশিতেই বসে আছে। নড়ছে না। শনি মঙ্গল মুখোমুখি কুস্তি লড়ছে। গতিক ভালো নয়।”

বিধান সান্যাল সর্বানন্দর দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে বললেন, “এ আর নতুন কি, আমার ছকে তো রাহুর এক পা মীনে তো এক পা কন্যায়। আপনার বাবা ছক দেখে বলেছিলেন আমি নেতা হব। পাল্টিবাজ যোগ আছে আমার। কিন্তু কোথায় কি ! আরে পাগলের বংশ আমাদের নেতা হাতা হলে চলে ? আমার ছেলেও পাগলই হবে।”

বাপের কথাকে সত্যি করে দিয়ে পাগল হল জগাই। এতটাই পাগল যে পাড়ার বদমেজাজি কুকুরটাও ওকে এড়িয়ে চলে। অল্প বয়সে এত প্রতিভা যে পাড়া প্রতিবেশীর অনিদ্রা বদহজমের মতো উপসর্গ শুরু হল। পাড়ায় সবাই হাইপারটেনশনের রোগী।

কুটুমজন আত্মীয়স্বজনেরা ওপাড়ামুখো হয় না। এমনকি রাজনৈতিক নেতারাও প্রচারে আসেন না।
ফুটন্ত মল্লিকার মতো সৌরভ ছড়িয়ে পড়ল দিক দিগন্তরে। বাঁশপার্টির নেতা মনু সরখেল তো সব শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন। পরিহাস করে বললেন, “যত্তসব ভয়পুকটে লোকজন। আমি যাব ওই জগাইয়ের কাছে। দেখব কি করতে পারে ও।”

মনু সরখেল এলেন প্রচারে। আর বেছে বেছে সেই জগাইয়ের পাড়াতে। হাতা চামচাদের কড়া নির্দেশ দিলেন যে ওই পাগলা জগাইটা যেন কোনোভাবেই কাছাকাছি আসতে না পারে। হাতা চামচারাও মাথা নেড়ে বলল, “কোনও চিন্তা নেই দাদা, আমরা আছি।”

মনের আনন্দেই প্রচার করছেন, কখনো হাত জোড় করে কখনো হাত নাড়িয়ে জনসংযোগ করছেন। মনে কোনও সংশয় কাজ করছে না তার। হঠাৎই একজন চামচা কানে কানে কিছু বলল নেতার। নেতা চমকে উঠে দেখলেন তার সাদা পাতলুন হলুদ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কিভাবে ? প্রকৃতি তো ডাক দেয়নি।

সঙ্গে সঙ্গেই মিছিল ক্যানেল। যেতে যেতে নেতা বললেন, “এসব অন্তর্ঘাত, বিরোধী দলের কাজ। এর পরিবর্তে অনশনে বসব আমি।”

পালিয়ে বাঁচলেন নেতা। জানা গেল এই কাজটি শ্রীমান জগাইয়ের। বেসনের সাথে পচাডিম মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে লাগিয়ে দিয়েছে পাতলুনে। ভিড়ের মাঝে কখন যে ঢুকে গিয়েছে ছেলেটা বুঝতেই পারেনি কেউ।

স্কুলের বন্ধুরাও এড়িয়ে চলত জগাইকে। জগাই যেন মূর্তিমান সমস্যা। শুধু জগাই বন্ধুবান্ধব কেন শিক্ষকদের মধ্যেও কাজ করত ভয়। এই বুঝি কিছু ঘটে গেল। কিন্তু যার জন্য এতকিছু সেই জগাই থাকত নির্বিকার। মুখে লেগে থাকত পেটেন্ট করা সেই হাসি।

ইতিহাসের ক্লাস চলছে, ইতিহাসের মাষ্টার জগবন্ধু পাল পড়াচ্ছেন সান-ইয়াৎ-সেন এর কথা। গোটা ক্লাসে পিনড্রপ সাইলেন্স। হঠাৎই উঠে দাঁড়াল জগাই।
-“স্যার একটা কোশ্চেন আছে।”
-“বলে ফেল্।” গম্ভীর মুখে বললেন জগবন্ধু মাষ্টার।

জগাই নির্বিকার মুখে বলল, “স্যার সান-ইয়াৎ-সেন কি বিরাজ সেনের মতো ময়রা ছিল ?”
প্রশ্ন শুনে মুখ ঝুলে গেল জগবন্ধু মাষ্টারের। বিরাজ সেন স্থানীয় সেন সুইটসের মালিক। আর সেন সুইটসের আমসন্দেশের আর আমদইয়ের খ্যাতি এলাকাজুড়ে।

মাষ্টারমশাইও সেন সুইটসের নিয়মিত খরিদ্দার। হঠাৎ করে সেই সেন সুইটসের বিরাজ সেনের সঙ্গে সান-ইয়াৎ-সেনের সম্পর্ক কল্পনা করে কেমন যেন হয়ে গেলেন। চোখের সামনে একটা গ্লোব ঘুরতে লাগল। গ্লোবের মানচিত্রগুলো মিলেমিশে সাদা হয়ে আসছে।
কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ বাবা, একদম রক্তের সম্পর্ক। একাঘাটে ক্ষৌরকর্ম।”

উত্তর শুনে হো হো করে হাসতে লাগল সবাই। জগাই তবু নির্বিকার। লোকে এতদিন জানত হিন্দি-চিনি ভাই ভাই, কিন্তু বাঙালি-চিনিও যে ভাই ভাই সে তত্ত্ব আবিষ্কার করেছে জগাই। গর্বে তার বুক ভরে এল। খাদ্যসঙ্কট মিটে যাবে এবার। আরশোলা, ছারপোকা, গঙ্গাফড়িং খেতে আর আপত্তি কি ? একভাই খেলে আরেকভাইও খেতে পারে অনায়াসে।

প্রস্তাবটা শুনেই থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন বাংলা স্যার। অবাক হয়ে বলেছিলেন, “দেশে খাদ্যসংকট মিটবে বলছ ? তা বেশ। তোমার বাবাও আমার ছাত্র ছিল। তবে ওর এতটা পাগলামি ছিল না।”

-“হ্যাঁ স্যার আমরা খানদানি পাগল। তবে বাবা বলেন যে আমি সবার উপরে। বংশের নাম উজ্জ্বল করেছি আমি।” গর্বভরে বলে জগাই।

বাংলা মাষ্টার কি যেন ভেবে নিয়ে বলেন, “কিন্তু কি জান তো, আমার আবার হজমশক্তি দূর্বল, তোমার ওইসব আরশোলা টারশোলা ঠিক হজম হবে না। আপাতত আমাকে বাদ দিয়ে বাকিদের দেখ। ”

জগাই না দমে গিয়ে বলল,”সব আমি জোগাড় করব স্যার, সম্মিলনি পার্টি।”
বাংলা মাষ্টার তবুও রাজি হলেন না। অন্যান্যরাও তাই। সুতরাং নিজে নিজেই চেখে দেখতে হল। খুবই সুস্বাদু। চিনাদের টেষ্টের দাম আছে।

এহেন জগাই একটু বড় হতেই পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণায় লাগল। সে হরেক রকমের গবেষণা। কখনও হজমশক্তি বাড়ানোর ওষুধ তো কখনও দাঁতের পোকা বের করার জাঁতিকল। পাড়ার লাস্যময়ী কিশোরী টিনা তার জগাইদার এহেন কেরামতি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *