আজি বসন্তে – পর্ব ১৫ // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 25 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ১৫)

#সুব্রত_মজুমদার

এহেন জগাই একটু বড় হতেই পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণায় লাগল। সে হরেক রকমের গবেষণা। কখনও হজমশক্তি বাড়ানোর ওষুধ তো কখনও দাঁতের পোকা বের করার জাঁতিকল। পাড়ার লাস্যময়ী কিশোরী টিনা তার জগাইদার এহেন কেরামতি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।

এর দাম দিতে হয়েছিল টিনাকে, জগাইয়ের হজমশক্তি বাড়ানোর ওষুধ খেয়ে একটা গোটা দিন বাথরুমেই পড়ে ছিল সে। পরেরদিন শয্যাশায়ী। চোখের তলায় কালি। ডাক্তার বললেন, “আর একটু দেরি হলেই বাঁচানো মুশকিল হত। খুব সময়মতো ডেকেছেন।”

জগাইয়ের উৎসাহ তবু থামে না। সাপের ওঝা হতে বাঘের রিংমাষ্টার সব বিদ্যায় আয়ত্ত করেছে সে। পাড়ার লোক তার প্রতিভাকে ভয় পায় যথেষ্টই। জগাইয়ের সামনাসামনি হতে চায় না সহজে। কে জানে কোন এক্সপেরিমেন্টটা কার উপর করে বসবে !

একবার বিমল লোহারের বৌ দাঁতের যন্ত্রণায় ছটফট করছে, বিমলের সামর্থ্য নেই একটা ডাক্তার ডাকার। যদিও কোয়াক ডাক্তারের কোনও কমতি ছিল না গ্রামে। কিন্তু তারা এসেই যে বিল করবে তা বর্ষার দামোদরের চেয়েও বিপজ্জনক।

ডাক্তাররা আবার এক একটা যন্ত্র, পয়সা না দিলে ওষুধপত্র ফেরত নিয়ে যাবে। সুতরাং দিন আনে দিন খায় বিমলের পক্ষে ডাক্তার ডাকা বিলাসিতার ব্যাপার।

-“একবার জগাইকে ডাকি ? ছোঁড়া ডাক্তারের বাপ।” আমতা আমতা করে বলল বিমল।
বিমলের বৌ যন্ত্রণাকাতর গলায় বলল, “ওই আপদটাকে ডাকলে গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলব বলে দিলাম।”

ভয়ে কুঁকড়ে গেল বিমল। জগাইয়ের কেরামতি সে জানে। কিন্তু এ মূহুর্তে জগাই ছাড়া যে কেউ নেই সাহায্য করার মতো। এদিকে বৌ তো জগাইয়ের নাম শুনেই চিৎকার চেঁচামেচি করছে। তাহলে উপায় ?

হ্যাঁ, একটা কাজ করা যেতে পারে, কিছু টাকা ধার চাওয়া যেতে পারে জগাইয়ের কাছে। এতে অবশ্য বিপদের কিছু নেই। এমনিতেও জগাই খুব পরোপকারী। আর ওর যা টাকা তাতে সাতপুরুষ পায়ের উপর পা তুলে বসে খেলেও শেষ হবে না।

বৌকে একথা বলল বিমল। সব শুনে বৌ বলল, “ভালো বুদ্ধি করেছ। বলবে গম লাগাব। গম উঠলে শোধ করে দেব। খ্যাপা বুঝতেও পারবে না কিছু। তবে সাবধান, খ্যাপা যদি ঘুণাক্ষরেও জানে তবে বিপদের শেষ হবে।”

বিমলের মুখে একটা ধূর্ত হাসি খেলে গেল। গামছাটা কাঁধে নিতে নিতে বলল, “তুমি নিশ্চিন্তে থাক, ও খ্যাপার চৌদ্দপুরুষও টের পাবে না যে তোমার দাঁতে ব্যাথা।”

বিমল চলল জগাইয়ের কাছে। মনের ভেতর একটা চাপা ভয় কাজ করলেও নিজেকে ভেঙ্গে পড়তে দিল না সে। এ ঠাঁই বড় কঠিন, কিন্তু কঠিনকে পরাজয় করাটাই তো গৌরবের। সহজ কাজ তো সবাই করতে পারে। নরম মাটিতে আঁচড়ায় বিড়াল, কঠিন মাটিতে ঘা মারতে পারে একমাত্র মানুষ। জগাই তো সামান্য খ্যাপা, আরও কত বড় বড় খ্যাপা এল আর গেল। সেসব খ্যাপাদের দাড়ি ছিল। দাড়িই খ্যাপাদের শক্তি। সে হিসাবে জগাই নিতান্তই নির্বল।

এজগৎ মায়া। বৌ, দাঁতের ব্যাথা, জগাই, টাকা পয়সা সবই মায়া। এসবের চক্করে পড়ে বহুলোকের সর্বনাশ হয়েছে । কেউ কেউ দু’তিনখান বিয়ের পর সত্যিটা বুঝে কেটে পড়েছেন। কেউ আবার পারেনি। যেমন বিমল নিজেই। তার অবশ্য একটাই বৌ, কিন্তু সেই বৌয়ের ঠ্যালাতেই বাবাজীর মত হাল হয়েছে বিমলের। যে এই বৌকে সামলাতে পারে তার আবার সামান্য পাগলাকে ভয় !

এইরকম হাজারো তত্ত্বালোচনা করতে করতে জগাইয়ের কাছে হাজির হল বিমল। ততক্ষণে তার মন হতে সমস্ত দূর্বলতা দূর হয়ে গিয়েছে। বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল জগাইয়ের সামনে। জগাই তখন নিজের ল্যাবরেটরিতে নৃমল হতে বায়বীয় বল মানে রান্নার গ্যাস তৈরির চেষ্টা করছে।

বিমল এসে দাঁড়াতেই একটা বিকট আওয়াজ হল। গোটা ঘরে ছড়িয়ে গেল বিশ্রী দূর্গন্ধ। আওয়াজের প্রাবল্যে বিমল ততক্ষণে ভূতলে। তার সারা শরীরে এসে লেগেছে পরীক্ষাপাত্র হতে নির্গত থকথকে তরল। চোখ খুলেই ঠোঁটের উপর পড়া তরলটা একটু চেটে নিয়ে আবার অজ্ঞান হয়ে গেল সে।

জ্ঞান যখন ফিরল তখন নিজেকে কলতলার কলের মুখের নিচে পেল বিমল। জগাই তার শরীর হতে তরলটা প্রায় পরিস্কার করে দিয়েছে।

-“এ কি ছিল জগাই ?” ক্ষীণ স্বরে শুধাল বিমল।
জগাই হেসে বলল, “নৃমল। এই জ্বালানির সংকটের যুগে বিদেশের মুখের দিকে চেয়ে থাকব কেন ? এযুগে দরকার অপ্রচলিত শক্তির। এতে যেমন খরচাও কমবে তেমনি পরিবেশ দূষণও বন্ধ হবে।”

-“কিন্তু সেজন্য এসব গুগোবর কেন বাবা ? খুব দুর্গন্ধ। একটা ভালো দেখে গন্ধ সাবান নিয়ে আয় বাপ। খুব দুর্গন্ধ !” দুই হাতে করে নিজের গা’ রগড়াতে থাকে বিমল। জগাই দৌড়ে গেল ঘরে। একটা নীল রঙের সাবান নিয়ে এল।

সাবানটা গায়ে মাখতে মাখতে বিমল বলল,”খুব সুগন্ধ ! কোন কোম্পানির ?”
-“কোম্পানির সাবান আমি মাখি না কাকা। এটা আমার নিজের গবেষণাগারে তৈরি।”

এতক্ষণ বেশ উৎসাহ সহকারে সাবান মাখছিল বিমল, জগাইয়ের কথা শুনে হাত থেমে গেল। জগাইয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কি দিয়ে বানিয়েছিস ?”
-“এমন কিছুই না, খুব সস্তায় বানিয়েছি। মারাঠি মোগরার আতর…. ”
-“আর…. ”

-“আর….. আর চর্বি। সবচেয়ে সস্তা। ভাগাড়ের মরা কুকুর বেড়ালের চর্বি। প্রাকৃতিক। কোনও হিংসা নয়, নয় কোনও প্রকৃতি বিরোধীতা। অথচ কম দামে পুষ্টিকর…. হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ…. ” নিজের মনেই হাসতে লাগল জগাই।

বিমল তড়িঘড়ি দৌড়ে গিয়ে পড়ল পাশের পুকুরে। পাঁক মেখে ডুবের পর ডুব দিয়ে স্বস্তি পেল। উঠে আসতেই দেখল শুকনো কাপড় হাতে দাঁড়িয়ে জগাই।

গা মুছতে মুছতে বিমল বলল,”তোর কাছে আসা মানেই জীবনের বাজী রাখা। কখন টুক করে জীবনটা বেরিয়ে যায়, তার আগেই যেজন্য এসেছি সেটা বলে ফেলি। তোর কাকির দাঁ….. না মানে তোর কাকি দাদার বাড়ি যাবে, কিছু টাকা দরকার। দিবি ?”

-“দাদার বাড়ি ? খুব ভালো। কিন্তু কাকির তো দাঁতে ব্যাথা, যাবে কি করে ?”
-“তু… তুই কি করে জানলি ? সেরকম কিছুই নয়। টাকা দিবি কিনা সেটা বল।”

“দাঁড়াও” বলে জগাই ছুটল ভেতরে। ঘর হতে একখানা বড় বাক্স নিয়ে এসে বলল,”কাকি আর মা সমান। এই ছেলে বেঁচে থাকতে কাকি কষ্ট পাবে তা হয় না। এসো। ”

বাক্সটা নিয়েই বিমলের বাড়ির দিকে ছুটল জগাই। আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় পেছন পেছন ছুটল বিমল। আজ কিছু একটা হবেই। হয় বৌ মরবে নয় বিমল। জগাইয়ের হাত হতে বেঁচে ফিরলে বৌয়ের হাতে খুন হবে বিমল। কেউ বাঁচাতে পারবে না।

ঘরে গিয়ে বিমল দেখল সে এক বিভীষিকা কাণ্ড। বিমলের বৌ ছুটছে প্রাণের ভয়ে। আর একটা বড়সড় সাঁড়াশি নিয়ে জগাই ছুটছে তার পেছন পেছন। জগাই তার বিমলকাকিকে বলছে, “আমার উপর বিশ্বাস রাখ কাকি, কিচ্ছু হবে না তোমার। এই ধরব আর তুলে ফেলব।”
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *