আজি বসন্তে – পর্ব ১৬ // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 19 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ১৬)

#সুব্রত_মজুমদার

বিমলকাকি ত্রাহিরব তুলে বলছে, “খ্যামা দে বাবা, ও আসুরিক চিকিৎসা আমি সহ্য করতে পারব না। তোর হাত হতে বেঁচে ফিরলে তোর কাকাকে যমের বাড়ি পাঠাব। বেআক্কেলে লোকের বেঁচে থেকে কি দরকার ?”

জগাই যে ধরনের লোক তাতে যে সে থামবে না তা বেশ বুঝেছিল বিমল । তাই সে নিশ্চেষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাঁড়াশি বাগিয়ে পোঁকালাগা আর ভালোতে মিলিয়ে খান চারেক দাঁত তোলার পর বিজয়ের আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল জগাই। বিমলের হাতে দাঁত চারটে দিয়ে বলেছিল,”রেখে দাও কাকা, কাকিকে দিয়ে বলবে ইঁদুরের গর্তে ফেলে দিতে।”

-“কিন্তু বাবা, তোমার কাকি তো মরার মতো পড়ে আছে।” ভয়ে ভয়ে বলল বিমল।

গর্বের হাসি হেসে জগাই বলল, “কোনও চিন্তা নেই কাকা, কাকি সন্ধ্যার আগেই উঠে বসবে।”
-“সেখানেই তো ভয় রে !” গালে হাত দিয়ে বসে পড়ল বিমল।

বিকেলেই জ্ঞান ফিরেছি বিমলের বৌয়ের কিন্তু খুব দুর্বল। দিনদুয়েক পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বিমলের উপর। চিৎ করে ফেলে একটা নোড়া নিয়ে বসল বিমলের বুকে। গর্জন করে বলল,”আমার চারটে গেলে তোরও চারটে যাবে। তুইও বাঁচবি না।”

এরপর কি হল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জগাইয়ের কাছে যাওয়া মানে আবার বিপদের সামনাসামনি হওয়া, তাই জগাইয়ের রাগ বিমলের উপর ঝাড়ল বিমলের বৌ। চার চার মোট আটটি দাঁত আশ্রয় পেল নিকটবর্তী ইঁদুরের গর্তে।

টিনাকে নিয়েও কম ঝামেলা হয়নি। টিনার পেছনে আদাজল খেয়ে লেগেছিল পিন্টু। বড়লোক বাপের ছেলে। ঠাকুর্দারা সর্ষে পিষে তেল বের করত। সেই প্রবণতা এখনও বিদ্যমান। পিন্টুর বাপ হরিভক্ত লোক, কপালে চন্দনের ফোঁটা আর গলায় মালা। মুখে হরিনাম। কিন্তু মন পড়ে আছে কলাবাগানে। অপরকে নিংড়ে না নিলে মনের সন্তুষ্টি হয় না।

কিন্তু দৈত্যকুলে প্রহ্লাদের মতোই কৃপণের ঘরে জন্ম নিয়েও পিন্টু হয়ে উঠল মহা খরুচে । ঘন্টায় ঘন্টায় রোদচশমা বদল করে তো তিনমাসে ছ’মাসের বাইক। গোলাপফুল পকেটে করে দাঁড়িয়ে থাকে গার্লস ইস্কুলের গেটে। নতুন যুগের নতুন রোমি।

হেডমিস্ট্রেস কমলিকা রায় খুব গম্ভীর প্রকৃতির ও বদমেজাজি। সব শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন রোমিওকে হাতেনাতে ধরার। ধরেই পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তারপর দাঁড়িয়ে থেকে থার্ড ডিগ্রি দেওয়া করিয়ে প্রেমভুত তাড়াবেন।
তিনি সফল হলেন তবে সেটা ঠিক সফলতা বলা যায় কিনা সন্দেহ আছে। রোমিওর পরিবর্তে ধরা পড়ল তারকাটা জগাই।

জগাই যাচ্ছিল তার বন্ধু গাঁটকাটা নিমাইয়ের ঘর। সিঁদকাটার প্রশিক্ষণ শিবির খুলেছে নিমাই। জগাই যাচ্ছিল ক্লাসে। সব বিদ্যাই শিখে রাখা দরকার, কোনটা কখন কাজে দেয় বলা মুশকিল।

গার্লস স্কুলের কাছাকাছি আসতেই ঘটল বিপত্তি। সাইকেলটা বিগড়ে গেল জগাইয়ের। ব্রেক ফেল। জগাইয়ের ব্রিটিশ আমলের সাইকেল গিয়ে ধাক্কা মারল বাইক ঠ্যাসান দেওয়া পিন্টুকে। পিন্টু গিয়ে পড়ল পাশের নর্দমায়। সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার।

পিন্টুকে ধাক্কা দেওয়ার পরেই জীবন বাঁচাতে সাইকেল হতে ঝাঁপ মারল জগাই। গিয়ে পড়ল পাশের কুলঝোপে। কর্দমাক্ত অবস্থায় নর্দমা হতে উঠেই জগাইকে মারতে এগিয়ে গেল পিন্টু, কিন্তু দরজার দিক হতে একটা হইচই শুনে ঘাবড়ে গেল সে। বাইকে উঠেই পিঠটান দিল।

দরজার কাছেই ঘাপটি মেরে বসেছিল কমলিকা ম্যাডামের দলবল ছুটে গিয়ে ধরল জগাইকে।
এই পৃথিবীতে প্রতিদিন নানান ঘটনা ঘটে, কোন ঘটনা কার উপর ছাপ ফেলে যায় বলা মুশকিল। সেই ঘটনা টিনাকে আকর্ষিত করল জগাইয়ের দিকে। জ্বলন্ত আগুনের দিকে ছুটে যাওয়া পতঙ্গের মতো ছুটে গেল টিনা। পরিণতির কথা একবারের জন্যও ভাবল না সে।

জগাই পাগল হলেও প্রেমিক হিসেবে ভালো। নিজের চেয়েও ভালোবাসত টিনাকে। কিন্তু সেই টিনাই ল্যাং মারল একদিন। জগাইকে ছেড়ে চলে গেল পিন্টুর কাছে। মনে বড় আঘাত পেয়েছিল জগাই। জীবনের সেই প্রথম আর সেই শেষবারের মতো কেঁদে ছিল।

জগাইয়ের গল্প শেষ হতে না হতেই উঠে দাঁড়ালেন মাধব দাস। গাড়িতে গিয়ে বসতে হবে এবার। গাড়ি ছাড়বে। পাগলের জীবনের বেদনার্ত শেষাংশটুকু শুনে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বাসের দিকে চলল সবাই। পরের গন্তব্য মথুরা।

বাসে বসেই দরাজ গলায় গান ধরল বোষ্টমী।
মাধব… মাধব হে….
কোথা তুমি কিশোর ব্রজের ননীচোর,
বারিধারা তাপিত নিদাঘে।
কোথা তব চরণের মঞ্জুল কিঙ্কিণী
বাজিছে রিণিঝিণি আদরে সোহাগে ।
মোরা ব্রজবালা চাহি পথপানে-
দিন গণি হায় সজল নয়ানে,
রিক্ত রসালে দুলিছে দোলা একা
মাধবী কাঁদিছে মাধব বিরহে।

দেখতে দেখতে রাত নেমে এল। দিনের ক্লান্তি আর বিষন্নতাকে গ্রাস করতে লাগল সর্বগ্রাসী তন্দ্রা। গোটা বাস যেন নিঝুম স্তব্ধ। পাশ দিয়ে সাঁই করে চলে যাওয়া গাড়িগুলোও সেই নির্জনতাকে ভেদ করতে পারে না। সবাই যেন একা। বহুর মাঝেও না থাকার আস্বাদ। শহরের ব্যস্ততার মাঝে যেমন হতাশাগ্রস্ত লোকটি একা তেমনি এখানে একা সবাই। এটাকে নির্জনতা বললে কিছু ভুল বলা হয় না।

এই তন্দ্রাজড়িত বাসের ভেতর জেগে দু’জন। একজন বাসের ড্রাইভার। ওকে তো জেগে থাকতেই হবে। জীবনমৃত্যুর কাণ্ডারী ওই লোকটা। আর আরেকজন হলেন মাধববাবু। ড্রাইভারের পাশটাতে বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবছেন তিনি। ভাবছেন নিজের ফেলে আসা অতীতের কথা। কুয়াশায় মোড়া অতীত। আর সেই কুয়াশায় ডুবে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে।
চলবে..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *