আজি বসন্তে – পর্ব ১৯ // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

ইংরাজী ভাষায় নিজের নাম লিখুন ।

 35 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ১৯)

#সুব্রত_মজুমদার

একগ্লাস লস্যি নিলেন। বেশ ঘন ও মিষ্টি। উপরে ঘন মিষ্টি দইয়ের স্তর। তার উপরে কাজু পেস্তা কিসমিস ও চেরি।
মথুরার পেঁড়া বিখ্যাত। মায়ের জন্য নিয়ে যেতে হবে। লস্যির দাম মিটিয়ে পাশের পেঁড়ার দোকানে গেলেন ডাক্তার। সেখানে লেগেছে বিস্তর ঝামেলা। এক বৃদ্ধার সঙ্গে দোকানদারের কথাকথান্তর চলছে।

-“আমি বলছি তো ব্যাগট আমার হাতেই ছিল। কোন খালভরা ছিনতাই করে নিয়েছে গো…”

বৃদ্ধার কথা শুনে রেগে গেলেন দোকানদার। বললেন, “ওসব আমি জানে না। আপনার ডাকাইতি হোলো কি চোরি হোলো, মাল আপনাকে লিতে হোবে না লেকিন যে চারঠো খাইয়েছেন সেটার দাম চাই।”

বৃদ্ধার কাছে পয়সা নেই আর দোকানদার ছাড়বেন না। অগত্যা ডাক্তারবাবুকেই মাঝখানে আসতে হল। বললেন, “সব দাম আমি দিচ্ছি, উনি পরে আমাকে মিটিয়ে দেবেন। এতে নিশ্চয়ই আপনার কোনও আপত্তি নেই ? আর হ্যাঁ, আমাকেও কিলোদুয়েক দেন।”

দোকানদার নির্বিকার কণ্ঠে বললেন,”কোই বাত নেহি। হামার তো রুপেয়া লিয়ে কাম।”

পেঁড়া নিয়ে পয়সাকড়ি মিটিয়ে দিতেই দোকানদারের বিরক্ত মুখে হাসি ফিরে এল। বৃদ্ধা বলল,”খুব উপকার করলে বাপ। তুমি আমার সঙ্গে এস। তেত্থ করতে এসে ধার রাখতে নাই।”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৃদ্ধার অনুরোধে বাসের কাছে এলেন ডাক্তার। বৃদ্ধার নাম বিলাসী। পরিচিতরা ওনামেই ডাকছে তাকে । বাসের মালিক মাধব দাস ডাক্তারবাবুকে ছেড়ে দিতে নারাজ। তিনি হাত জোড় করে দাঁড়ালেন ডাক্তারের সামনে।

-“এবেলা আমাদের সঙ্গেই একটু ডালভাত খেয়ে যেতে হবে। জানি কষ্ট হবে কিন্তু তবুও…..”

এমন আন্তরিক লোক দেখেননি ডাক্তারবাবু। এ জীবনে বহু লোকের সঙ্গে মিশেছেন, কিন্তু এদের মতো সহজ সরল লোক চোখে পড়েনি তার। সুতরাং রাজি না হয়ে উপায় নেই। কাছাকাছিই একটা ডরমেটরি ভাড়া করা হয়েছিল। ডরমেটরির পাশেই একটা ছোট্ট রুম নিয়েছেন মাধববাবু। হিসেবপত্র সহ অন্যান্য কাজের জন্য নিরিবিলি জায়গা দরকার। আর ডাক্তারকে নিয়ে সেখানেই এলেন মাধববাবু ।

অনেকক্ষণ গল্প হল দুজনের। ডাক্তারবাবু বললেন তার জীবনে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনার কথা, তার এখানে আসার আসল উদ্দেশ্য। সব শুনে মাধববাবু বললেন, “ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রাখুন। তিনি দয়াময়, তার কাছে আপনার দুঃখ কষ্ট অবিদিত নয়। ধৈর্য্য ধরুন, আগামী দিন আপনার।”

দুপুরবেলা খাওয়ার সময় চমকে উঠলেন ডাক্তারবাবু, এ কাকে দেখছেন তিনি ! তাহলে খবরটা সত্যিই ছিল। ভুল খবর দেয় না পুঁটির মা। ‘মহাপ্রভু ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম’ এর মাধব দাসই এখন ভরসা। খাওয়া দাওয়া শেষ করে ড্রাইভারকে ফোন লাগান ডাক্তারবাবু।

-“হ্যালো চন্দন, তুমি হোটেলে চলে যাও। দিনতিনেক ওখানেই থাক। আমি ফোন করলে গাড়ি নিয়ে আসবে।”

ওপার হতে কি উত্তর এল শোনা গেল না। ডাক্তারবাবুর মুখেচোখে প্রাপ্তির আনন্দ। একটা শক দিতে হবে, বড় শক । আর তাহলেই ফিরতে পারে স্মৃতি। এখন ভগবানই ভরসা। গোটা সাফল্য নির্ভর করছে তার আশীর্বাদের উপর। একটু এদিক ওদিক হলে সব শেষ হয়ে যাবে।

মাধববাবুর কাছে এলেন ডাক্তার। কিছু টাকা হাতে দিয়ে বললেন, “বৃন্দাবন পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গী হতে চাই।”

-“কিন্তু তার জন্য এত টাকা…..! গোটা ট্যুরের ইনডিভিজুয়েল খরচই তো পনেরো দশ হাজার টাকা। আপনি তো সঙ্গে থাকবেন মথুরা হতে বৃন্দাবন।”

হাসলেন ডাক্তার। বললেন, “বাকি টাকাটা রেখে দেন। হোলির দিনের সমস্ত খরচা আমার। অন্যভাবে ভাববেন না কিন্তু। এটা আমার পক্ষ হতে ছোট্ট উপহার।”

আপত্তি করতে পারলেন না মাধববাবু। টাকাটা রেখে দিলেন। এতদিন ধরে লোকজন নিয়ে কারবার করছেন, লোক চিনতে ভুল হয় না। ডাক্তারবাবুটি যে লোক হিসেবে খুবই ভালো তা বুঝে গেছেন তিনি।

এদিকে বিলাসী বসেছে মজলিস জমিয়ে। পেঁড়ার দোকানের ঘটনাটা ইনিয়েবিনিয়ে বলছে সে। চোখ গোলগোল করে বলছে, “অমন লোক হয় না গো। শুনছি নিকি বড় ডাক্তার। খুব ভালো লোক গো।”

তনিমা হেসে বলল, “কানুর দেশে এসে হনু ? দেখতে এলে মথুরাপতিকে আর দেখে এলে মড়াকাটা ডাক্তারকে।”

বিলাসী নিরুত্তাপ গলায় বলল, “অমন বলে না মা। ডাক্তাররা হলেন ভগবানের সমান। সেই বানের বছর, ভেদবমি হল আমাদের ব্রজর বাপের, সবাই বলল বাঁচবে না। আমাদের গাঁয়ের নিধুডাক্তার বললে, কেঁদো না বৌমা তোমার স্বামীর দায়িত্ব আমি লিলাম । চারদিনে উঠে বসল ব্রজর বাপ।”

বিলাসীর মুখে ডাক্তারের কথা শুনে বাসের অনেকেই ডাক্তারের ভক্ত হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই দেখেছে ডাক্তারকে। ডাক্তারবাবু নাকি তাদের সঙ্গেই যাবে এই বাসে । তিনকড়ি ঘোষ তো মনে মনে স্থির করেই নিয়েছে যে বিলেতফেরত এই ডাক্তারকে দিয়ে একবার চেকআপ করিয়ে নেবে।

-“শরীরে আর তেমন বল পাই না রে। বাত কফ আর পিত্তি একসঙ্গে কুপিত হয়েছে। বাঁচার আশা নাই। তবু একবার দেখিয়েই নেব,…. কি বলিস জগাই ?”

তিনকড়ির কথায় পেটেন্ট হাসি হেসে জগাই বলল, “ঠিক বলেছ দাদু। বার্নিংঘাটে যাবার আগে একবার থরোলি চেকআপ দরকার। কত তেল কাঠ লাগবে তার হিসেবটা হয়ে যাবে। আমিও চেকআপ করাব দাদু।”

তিনকড়ি বিরক্ত হয়ে বলল,”তুইও চিতায় উঠবি নাকি ? পাগলে তো গাড়িচাপাও পড়ে না শুনেছি।”

জগাই কান এঁটো করা হাসি হেসে বলল, “ঠিক বলেছ দাদু। টিনার শোকে বারকয়েক মরতে গিয়েছিলাম। একবার তো ট্রেনের সামনে শুয়ে পড়লাম। তা সে ট্রেন আমার তিনহাত আগে এসে থেমে গেল। ইঞ্জিন বিগড়েছে। নতুন ইঞ্জিন এনে ট্রেন চালু করতে করতে তিনঘন্টা। বিরক্ত হয়ে উঠে চলে এলাম।

এর দিনতিনেক পর গেলাম হাওড়াতে। এখানে অন্ততঃ ইঞ্জিন বিগড়ালে নতুন ইঞ্জিন আনতে সময় লাগবে না। কিন্তু কপাল খারাপ। ট্রেন চলল তবে উল্টো দিকে। পেছনে পড়ে রইলাম আমি।”

-“তোকে যমে ভুলেছে রে গেছে তিনকড়ে । আরে খালভরা, তোর মনের রোগ কি ডাক্তারে সারাতে পারে ? একমাত্র রাধামাধবই তোকে উদ্ধার করতে পারে ।” ” মালা জপতে জপতে বলল বোষ্টমী।

তিনকড়ি কিছু বলল না। সে চেয়ে রইল করুন দৃষ্টিতে। নিজের জীবনের উপর যেন আর কোনও মোহমায়া নেই তার। জগাই ঠিক কথাই বলেছে, এবার চিতার কাঠ জোগাড়ের চিন্তা দরকার। আর দরকার চিন্তামণির চিন্তা। যিনি পার করবেন বৈতরণীর দুর্গম স্রোত হতে।

জগাই হেসে বলল, “তিনকড়ি দাদুর আর সে জোস নেই বোষ্টমী। দাদুর মনে পরিবর্তন এসেছে। আমিও আর সংসারে ফিরব না। এই সংসারে একটা পাগলার কিই বা দাম আছে ! তোমার রাধামাধবকে বোলো সে যেন তার দরজাতে আশ্রয় দেয়।”

জগাইয়ের কথায় মালাজপা থেমে গেল বোষ্টমীর। জপের থলেটাকে কপালে ঠেকিয়ে সে বলল,”রাধামাধব কি আমার একার রে বাবা, সে তো সবার। আর পাগলের কথাই যদি বলিস তো তার প্রেমে পাগল হয়ে সংসার ছেড়েছিল মীরা। রাজরাণী হয়েছিল ভিখারিনী। তবে সংসার ছাড়বি কেন বাপ ? সংসার ধর্ম বড় ধর্ম। আমার কথাই যদি বলিস তো বলব সংসার হতে পালিয়ে বেড়িয়েছি বাপ। ভগবান হতে পালিয়ে বেড়িয়েছি।”

-“আর আমি ? ” করুন মুখে বলল তিনকড়ি,”আমার কি হবে ? আমার কি উদ্ধার হবে না ? এ পাপের পাঁকে আর কতদিন ? ” হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল তিনকড়ি।

বোষ্টমী বলল,”হবে না কেন, বিল্বমঙ্গলের যখন উদ্ধার হয়েছিল তখন তোমারও হবে। তবে লোভের ওই চোখকে নষ্ট করতে হবে। লোভ না গেলে তো লাভ হয় না গোঁসাই।”

কাঁদতে লাগল সবাই। একেই বোধহয় সৎসঙ্গ বলে। আজ সবাই চলেছে উজ্জ্বল আলোর সন্ধানে। সেই আলোই তাদের ধ্রুবতারা। মুক্তির পথনির্দেশক।
চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *