আজি বসন্তে – পর্ব ২

 12 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ২ )

#সুব্রত_মজুমদার

বাস হতে নেমেই বিলাসীকে নিয়ে বাজারের দিকে চললেন ঠাকরুন। ঢুকলেন গিয়ে একটা কাপড়ের দোকানে। অনেক বেছেবেছে একটা রঙিন শাড়ি, শায়া আর ব্লাউজ কিনলেন। দেখেশুনে বিলাসী তো অবাক। গালে হাত দিয়ে বলল, “অ মা….! হা গো কাকি বেধবা হয়ে রঙিন কাপড়…! ওই দিদিমণির মতন মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি তোমার ?

ঠাকরুন হেসে বললেন,”কাপড় কিনলেই কি নিজেকেই পরতে হবে ? তোকেও তো দিতে পারি।”
বিলাসী অবাক হয়ে বলল,”মা গো মা ! আমি কি কচি ছুঁড়ি যি ওই কাপড় পরব। ”
ঠাকরুন বললেন, “তাহলে তোর এত মাথা ঘামিয়ে কি লাভ ? সময় হলেই সব বুঝতে পারবি ।”

ঠাকরুন চললেন বাসের দিকে। সবাই নেমে গেলেও কয়েকজন এখনও বসে আছে নিজের নিজের সিটে। অযথা নামার ব্যাপারে তাদের ঘোর আপত্তি। ওরা আরও একটু ঘুমিয়ে নিতে চায়। তনিমা অবশ্য তাদের মতো নয়, তবে ওর সবচেয়ে বড় শত্তুর হল নিজেরই মন। পোড়া মন শান্তিতে থাকতে দেয় না। শুধুই বিষাদের জাল বোনে, সে জাল মাকড়সার জালের চেয়েও সূক্ষ্ম আর জটিল।

-“একটু এদিকে আসবে মা ?”
পরিচিত আওয়াজে সম্বিত ফিরল তনিমার। চোখ তুলে বলল, “কিছু বলছিলেন মাসিমা ?”
ঠাকরুন স্মিত হেসে বললেন, “হ্যাঁ, এদিকে এস।”
উঠে দাঁড়াল তনিমা। ধীর পায়ে চলল ঠাকরুনের সঙ্গে। কাছেই একটা ‘পে অ্যান্ড ইউজ’ বাথরুমে গিয়ে ঢুকল ওরা। মেয়েদের কাপড় চোপড় ছাড়ার জায়গায় এসে সদ্য কিনে আনা কাপড়-ব্লাউজটা তনিমার হাতে দিয়ে ঠাকরুন বললেন,”পরে এস। ”

-“মাসিমা…!”
-“কাপড়টা পরে এস।” আদেশের সুরে বললেন ঠাকরুন। ঠাকরুনের সে আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা তনিমার নেই। সে ধীর গতিতে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এল। পরনে লাল মেঝের উপর সুতোর কাজকরা তাঁতের কাপড় । ভৈরবী যেন ষোড়শীমূর্তি পরিগ্রহন করেছেন। লাবণ্য ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
মৃদু হেসে তনিমার দিকে এগিয়ে গেলেন ঠাকরুন। চুলটা খোঁপা করে বেঁধে দিয়ে একটা রজনীগন্ধার মালা জড়িয়ে দিলেন। কপালে এঁকে দিলেন কুমকুমের ফোঁটা। কুমকুমের ফোঁটাটা নিতে নিতেই শিউরে উঠল তনিমার। এ যে অন্যায়, এ পাপ ! স্বর্ণেন্দুর সঙ্গেই যে তার সব রং মুছে গেছে।

মনে পড়ে স্বর্ণেন্দুর কথা। ও যখন তনিমাকে দেখতে এসেছিল তখন তনিমার পরনেও ছিল এরকমই একটা লাল রঙের সুতির কাপড়। এরকমই সুন্দর করে কবরী বেঁধেছিল তনিমা। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল স্বর্ণেন্দু। যখন দুজনকে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হল তখন তনিমার দিকে তাকিয়ে স্বর্ণেন্দু বলেছিল – “‘তন্বী শ্যামা শিখরদশনা পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী…… অপূর্ব।”

সেইক্ষণেই স্বর্ণেন্দুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল তনিমা। সে আজ অতীতের সুখস্বপ্নমাত্র । দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তনিমা।

সাজগোজ শেষ হওয়ার পর যখন বাইরে বেরিয়ে এল তনিমা তখন ওকে দেখে চক্ষুস্থির সবার। এ যে অবিশ্বাস্য। তনিমা একটু একটু করে এগিয়ে আসতে লাগল। যেন একটা শুয়োপোকা তার গুটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে আস্তে আস্তে। প্রসারিত করছে তার রঙিন ডানা। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবাই।
এই দৃষ্টিনিবদ্ধ চোখগুলোর মধ্যে যেমন প্রকৃতিপ্রেমিক আছে তেমনি আছে শিকারিও। তবে শিকারির দৃষ্টি ডানার চটকদার রঙে নিবদ্ধ থাকে না, তার লোভাতুর জিভ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। বহুদিনের ক্ষুধার প্রশমনের আশার ঝলক দেখা যায় তার চোখে।

তিনকড়ি ঘোষ বয়স বাহাত্তর, শরীর শীর্ণ ক্ষয়াটে। ছ’বারের গ্রামপ্রধান তিনি। অর্থ বৈভব পেশিশক্তি সবকিছুই ছিল তার। ছিল। হ্যাঁ, অতীত কাল। ইংরেজিতে পারফেক্ট ফারফেক্ট কিছু একটা বলত হয়ত, বাংলাতে শুধুই অতীত। আরও আছে হয়ত, কিন্তু এতেই যথেষ্ট।

এতদিনের উপার্জন, এতদিনের তৈরি করা প্রতিষ্ঠা কিছুই নেই আজ। রাজনৈতিক ক্ষমতার হাল ধরেছে অন্য লোকে, টাকা পয়সার উপর কুণ্ডলি পাকিয়ে বসেছে ছেলে বৌমা, শরীরে হাজারটা রোগ, – ফিরেও তাকায় না কেউ।

তনিমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তিনকড়ি। দৃষ্টি সরাতে পারছে না সে। শিকারি যেন নিজেই শিকারে পরিণত হয়েছে। হরিণ শাবকের দুটো টলটলে কাজলটানা চোখের বিভ্রমে পড়ে বিভ্রান্ত হয়ে গেছে ময়াল। তার চোখের জাদু আর কাজ করছে না।
-“দিদিমণিকে তো খুব সুন্দর লাগছে। একদম ডানাকাটা পরী। এরকম সাজলে তো পারো।” অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথাগুলো বলল তিনকড়ি।

কথাগুলো শুনেই তিনকড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল তনিমা। এতে খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল তিনকড়ি। মিচকি মিচকি হাসতে লাগল। ওই হাসি দেখে আরও জ্বলে উঠল তনিমা। বলল,”বয়স কত হল ?”
-“তা বাহাত্তর তো হবেই। ” খিঁক খিঁক করে হাসতে হাসতে বলল বুড়ো।

তনিমা বলল, “ওজন্যই। বাহাত্তুরেতে গেলে তবেই নাতনির বয়সি মেয়ের দিকে নজর পড়ে।”

বুড়ো বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বলল, “আহা রেগে যাচ্ছ কেন ! নাতনির বয়সী বলেই তো ঘুরেফিরে দেখছি। একসময় তোমার মতো মেয়েরা হত্যে দিয়ে পড়ে থাকত আমার পায়ে। সিগারেটের প্যাকেটে এককলম লিখে দিতেই চাকরি হয়েছে কতজনের। ”

আর দাঁড়াল না তনিমা। “ইউ বাস্টার্ড… ” বলে রোষকষায়িত চোখে তাকিয়ে গটগট করে বাসের ভেতরে ঢুকে গেল সে। খিঁক খিঁক করে হাসতে লাগল বুড়ো।

একটু পরেই বাজার সেরে এলেন মাধবাবু। ড্রাইভারের মুখে সব শুনে রেগে গেলেন ভীষণ। গেলেন তিনকড়ি বুড়োর কাছে। গম্ভীর গলায় বললেন, “এসব কি তিনকড়িবাবু ? ”
-” কেন কি হল আবার ?”
-“আপনি তনিমা দিদিমণিকে কি বলেছেন ?”

আবার সেই খিঁক খিঁক শব্দে হেসে উঠল বুড়ো। হাসতে হাসতে কেশে ফেলল। তারপর অনেক কষ্টে কাশি থামিয়ে বলল, “পাগলের কথা ধরছেন কেন মশাই ! ও আস্ত একটা পাগল মেয়েছেলে, আর নাহয় ছিনাল। নাহলে ভাবুন বিধবা হয়ে রঙিন শাড়ি পরে ঠোঁটে লিপস্টিক নিয়ে কেউ ঘোরে।”

প্রায় লাফিয়ে উঠলেন মাধববাবু “ইউ……”
কটুকথা বলতে গিয়েও থেমে যেতে হল মাধব দাসকে। ব্যবসার খাতিরে গাধাকেও বাপ বলতে হয়, পেটের দায় বড় দায়। বলতে পারলেন না কটুকথা। গলা নামিয়ে বললেন,”অপরের ব্যক্তিগত জীবনে দখলদারি করি উচিত নয়। অনেক তো বয়স হল, এবার একটু ভগবানের নাম করুন।”
চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *