আজি বসন্তে – পর্ব ৯

 10 total views

#আজি_বসন্তে (পর্ব ৯ )

#সুব্রত_মজুমদার

এতবড় একটা নদী ধূ-ধূ করছে। শুধু বালি আর বালি। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গর্ত। এ যেন মানুষের জীবন, যে জীবনে দুঃখ আঘাত আর বিষন্নতার বালি ধূ-ধূ করছে। কখনো কখনো বিধাতার পরুষ আঘাতে সেই ক্ষত দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুর ধারা। জীবন প্রকৃতি যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

তনিমাও কম আঘাত পায়নি এ জীবনে, সে হারিয়েছে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয়তমজনকে। আজ যাকে মন্ত্র পড়ে পিন্ড দিল তনিমা। যে মানুষটার পাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল নিজের হাতে যত্ন করে রাঁধা সুস্বাদু সব পদ, আজ তাকেই দিতে হল বালির পিন্ড। এদিনটা না এলেই বোধহয় ভালো হতো।

জগাই তো মহাখুশি। পাগলাটে হাসি হেসে বলল, “বালি ! বালির পিন্ড ! দারুণ আইডিয়া । এইসব হতচ্ছাড়ির উপযুক্ত খাবার। ** আমাকে ল্যাং মারবি !”

                  তিনকড়ি তার প্রথমপক্ষের স্ত্রীকে পিন্ড দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলল। তিনকড়ির মতো লোকেরাও তাহলে কাঁদে। তাদেরও ভেতরে একটা আলাদা মানবিক সত্ত্বা কাজ করে। তিনকড়ির কাঁধে হাত রাখল জগাই। বলল,"কি দাদু, দিদার কথা মনে পড়ছে ? "

হাউমাউ করে কেঁদে উঠল তিনকড়ি। জগাইয়ের হাতদুটো ধরে বলল,”জীবনে অনেক ভুল করেছি রে ভাই, অনেক ভুল। তোর দিদার মতো মেয়েকে আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি। ওর মন বোঝার চেষ্টা করিনি কোনোদিন। সারাজীবন শুধু মোহের পেছনে ঘুরেছি। সব ভুল, সব ভুল !”

-“ভুল আর ঠিক নিয়েই তো জীবন দাদু। তুমি চিরদিন ভুল করেই গেলে আর আমার উপর ভুল হয়েই গেল। স্থান কাল পাত্র পাল্টালেও বিষয়টা কিন্তু একই থাকে। কেঁদো না দাদু, তোমার চোখে জল মানায় না।”

তিনকড়িকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল জগাই। তিনকড়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একদৃষ্টিতে পিন্ডের দিকে চেয়ে রইল।

ফল্গুর পর হল বিষ্ণুপদে পিন্ডদান। গয়াসুরের শিলাময় দেহের উপর ভগবান বিষ্ণুর পদচিহ্ন। ভক্তের শেষ ইচ্ছা রেখেছেন হরি। আর সেজন্যই গয়াসুরের দেহের উপর বিষ্ণুপদে পিন্ড দিলেই মহামুক্তি। তবে অপঘাতে মৃত্যু হলে আগে পিন্ড দিতে হবে প্রেতশীলায়। সে জায়গা গয়া হতে অনেকটাই দূরে। পাহাড়ের উপর।

প্রেতশীলায় পিন্ডদান সম্পন্ন করে সবাই গেল বোধগয়ায়। যাকে বুদ্ধগয়াও বলা হয়। ভগবান বুদ্ধের তপোভূমি। এখানেই বোধিবৃক্ষের তলায় পরমজ্ঞান লাভ করেছিলেন ভগবান বুদ্ধ। বিশাল ভব্য মন্দিরের সামনে এসেই অবাক হয়ে গেল বিলাসী।

-“এ কি ঠাকুরের মন্দির গো কাকি ?” শুধাল সে।
ঠাকরুন বললেন, “বুদ্ধদেবের। ভগবানের অবতার রে।”
কিছুই বুঝতে পারল না বিলাসী। কিন্তু বোঝার ভান করল সে। তিনকড়ি জগাইকে কনুই মেরে বলল, “বুদ্ধদেব তো জানি, কিন্তু ভালোকরে তো জানি না। তুই জানিস ?”

জগাই বলল, “জানি না মানে, সব জানি। জয়দেবের গীতগোবিন্দতে পড়েননি
‘নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ শ্রুতিজাতং সদয়হৃদয়দর্শিতপশুঘাতম্ ।
কেশব ধৃতবুদ্ধশরীর জয় জগদীশ হরে ।।”
তিনকড়ি বিরক্ত হয়ে বলল, “ওসব হহ টহ রাখ্, বাংলাতে বল।”

জগাই চোখ গোলগোল করে বলল,”ভগবানের নবম অবতার । নেপালের কপিলাবস্তুতে শাক্যরাজ শুদ্ধদ্রোণের পুত্র হিসেবে জন্ম নেন। জগতের হিংসা পাপ তাপ হতে মানুষকে উদ্ধার করতে অহিংসার কথা বলেন উনি। প্রণাম কর দাদু প্রণাম কর।”

হাঁটুগেড়ে প্রণাম করল তিনকড়ি । সেইসঙ্গে ভগবানের কাছে বাতের রোগটা ভালো করে দেওয়ার আর তৃতীয় পত্নী মনোরমার মন ভালো করে দেওয়ার প্রার্থনা জানাল।

       দর্শন শেষে বাসের কাছে ফিরে এল সবাই। রান্না হয়ে গেছে। একটু দেরি হলেও তাতে খেদ নেই কারোর। বোধগয়া এত সুন্দর জায়গা যে দেখতে দেখতে সময়ের জ্ঞান থাকে না। মাধববাবু বললেন, "সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়ব আমরা। প্রথমে যাব বেনারস তারপর বৃন্দাবন হয়ে মথুরা। মাঝে তাজমহলে দাঁড়াব।"

            খাওয়া দাওয়ার পর শতরঞ্জি পেতে বসল সবাই। বাস ছাড়ার আগে একটু গড়িয়ে নেওয়া যাবে। বাসের সিটে হেলান দিয়ে ঘুম এলেও সে ঘুমে শান্তি নেই। বাসের দুলুনিতে ঘুমের মজা দীর্ঘপথের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দীর্ঘপথ সিটে বসে থাকলে পা ফুলে যায়, ঘাড়ের পেশিতে টান ধরে। তবে অনেকেরই কাছেই আবার এই দীর্ঘযাত্রা যথেষ্ট উপভোগ্য হয়।

      শতরঞ্জিতে বসে বসে গল্পগুজব চলছে। ঠাকুরুন বলছেন তার শৈশবের কথা। হারিয়ে যাওয়া শৈশবের স্মৃতির মধুর রোমন্থন। তনিমা, জগাই, বিলাসী, মাধববাবু, তিনকড়িরা বসে বসে শুনছেন সেই কথা। এ যেন বাগদাদের বাজারে বসে গল্প বলছে কোনও মুশাফির।

চৈত্র মাস, তিরতির করে বয়ে চলেছে একটা ছোট্ট নদী। নদীর স্বল্প জলে সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে। সেই জলে মাছ ধরছে একটা ছোট্ট মেয়ে। একখন্ড কাপড় উর্ধ্ব ও নিম্নাঙ্গ বেষ্টন করে পরা। সারা শরীরে একটাও অলঙ্কার নেই। একটা চুড়িও না।

মেয়েটি গামছা দিয়ে ছোটো মাছ ধরছে। জল কম হলেও মাছগুলো খুব ধূর্ত। গামছার ঘেরা বন্দির ভিতর আসতেই চাইছে না তারা। মেয়েটি নাছোড়বান্দা, মাছ সে ধরবেই। দীর্ঘ একঘন্টার পরিশ্রমের পর খানকতক প্যাড়ামাছ নিয়ে ঘরের দিকে চলল সে।

-“অতসী, ও অতসী ! কোথা গেয়ছিলি লা ?” সমবয়সী একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল। মেয়েটির হাতে একটা বালতি, সম্ভবত নদী হতে জল আনতে চলেছে ও।
-“মাছ ধরছিলাম।” বলল অতসী।
-“পেলি ?”

গামছার ভাঁজ খুলে মাছগুলো দেখাতেই মেয়েটি অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, “মাত্তর চারটে ! কাল আমি আর দাদা ধরছিলাম । এক পোয়া। ”

উত্তর দেওয়ার আগেই কি একটা দেখে ছুটতে লাগল অতসী। মেয়েটা পেছন ফিরে দেখল লাঠি হাতে ছুটে আসছে অতসীর মা। নিশ্চয়ই না বলে ঘর হতে বের হয়েছে অতসী। আজ অতসীর পিঠ আর আস্ত থাকবে না। দুধকলমির ডাল ভেঙে ফেলবে ওর পিঠে।

অতসীর মা এমনিতে শান্তশিষ্ট গৃহকর্মপরায়ণা, কিন্তু মাঝে মাঝেই চিন্তাভাবনাগুলো গুলিয়ে যায় তার। ছোটবেলা হতেই এ অসুখ। বাপ মা বিয়ে দেওয়ার সময় এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি পাত্রপক্ষকে। অতসীর বাবা সুনির্মল ব্যানার্জী বড়ই ভালোমানুষ। ঠিকেদারের অধীনে ম্যানেজারের কাজ করেন। কর্মসূত্রে ঘুরে বেড়াতে হয় দূর দূরান্তরে। আজ অমুক জায়গায় পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজ তো কাল কোনও জলাধারের উপর সেতু নির্মাণের কাজ। একাহাতে সংসার চালান কুমুদিনী।

কুমুদিনীর পাগলামির কথা সর্বজন বিদিত। কতদিন যে রান্না করার পর কুকুর ডেকে খাইয়ে দিয়েছেন, বা বিনা জলেই ভাত চাপিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই।
চলবে….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *