আজি বসন্তে – শেষ পর্ব // সুব্রত মজুমদার

 23 total views

#আজি_বসন্তে (শেষ পর্ব )

#সুব্রত_মজুমদার

জগাইয়ের কথায় মালাজপা থেমে গেল বোষ্টমীর। জপের থলেটাকে কপালে ঠেকিয়ে সে বলল,”রাধামাধব কি আমার একার রে বাবা, সে তো সবার। আর পাগলের কথাই যদি বলিস তো তার প্রেমে পাগল হয়ে সংসার ছেড়েছিল মীরা। রাজরাণী হয়েছিল ভিখারিনী। তবে সংসার ছাড়বি কেন বাপ ? সংসার ধর্ম বড় ধর্ম। আমার কথাই যদি বলিস তো বলব সংসার হতে পালিয়ে বেড়িয়েছি বাপ। ভগবান হতে পালিয়ে বেড়িয়েছি।”

-“আর আমি ? ” করুন মুখে বলল তিনকড়ি,”আমার কি হবে ? আমার কি উদ্ধার হবে না ? এ পাপের পাঁকে আর কতদিন ? ” হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল তিনকড়ি।

বোষ্টমী বলল,”হবে না কেন, বিল্বমঙ্গলের যখন উদ্ধার হয়েছিল তখন তোমারও হবে। তবে লোভের ওই চোখকে নষ্ট করতে হবে। লোভ না গেলে তো লাভ হয় না গোঁসাই।”

কাঁদতে লাগল সবাই। একেই বোধহয় সৎসঙ্গ বলে। আজ সবাই চলেছে উজ্জ্বল আলোর সন্ধানে। সেই আলোই তাদের ধ্রুবতারা। মুক্তির পথনির্দেশক।

সন্ধ্যা হতেই খাওয়া দাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল সবাই। এবারের গন্তব্য বরসানা । কোনও বিশেষ কারনে তাজমহল বন্ধ বলে বরসানা হতে সোজা বৃন্দাবন। পরশু হোলি। বৃন্দাবনের ফাগুয়াতেই মাতবে সবাই।

গাড়িতে বসে স্ত্রীর কথা ভাবছেন ডাঃ রায়। এ বিরহ তো আর সহ্য হয় না। কানুর বিরহের রাধার কি এরকমই হাল হয়েছিল ? জানা নেই ডাক্তারবাবুর।

হঠাৎই নিস্তবদ্ধতা ভেঙ্গে গান ধরল বোষ্টমী।

সখি মরি মরি কিবা রূপ
যে রূপের তরে পরাণ বিদরে অন্তরে নাহিক সুখ।
রঙে সে যে কালা জগৎ উজালা পরাণে আগুন জ্বালে,
সেই শ্যাম শশী ভাবি দিবানিশী দহি সই পলে পলে।
[সে তো রে সই আর এল না, আমার পরাণের প্রিয় কালা কাল বলে আর এল না। ] যদি থাকে হরি ব্রজপুর ছাড়ি মথুরার কারাগারে,
থাকুক সেথায় মন যাহা চায় কে বা রুধিতে পারে।
[ও সই সে নিঠুরে আমার কাজ কি আছে ?
আমার যা যাওয়ার তাই গিয়েছে। ]

গান শেষ হতেই দেখা গেল নিঃশব্দে কাঁদছেন ডাক্তার। পাশে বসে থাকা মাধব দাস বললেন, “কি এমন দুঃখ আপনার ? ঈশ্বর তো দু’হাত ভরে দিয়েছেন।”

বিষাদের হাসি হাসলেন ডাক্তার। বললেন, “এতকিছু দিয়েও আমাকে নিঃস্ব কাঙাল করেছেন। কেড়ে নিয়েছেন আমার ভালোবাসাকে। আজ সব বলব আপনাকে। আপনার সাহায্য না পেলে তো আমার এখানে আসা বৃথা হয়ে যাবে।”

মাধববাবুকে খুলে বললেন সব কথা। শুনে অপার বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন মাধববাবু। একটা লোক আর কত কষ্ট পেতে পারে ? ভগবান কেন যে এত দুঃখ দেন মানুষকে !

ডাঃ রায়, কলকাতা কেন সারা পশ্চিমবঙ্গের বুকে একটা পরিচিত নাম। একেবারে ধন্বন্তরি সার্জেন। লোকে বলে সাক্ষাৎ ভগবান। তার জীবনটা মাখনের মতোই মসৃণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হল না। টাকা পয়সা নাম খ্যাতি সবকিছুকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করে দিল একটা ঘটনা। জীবনের সব সুখস্বপ্নকে একলহমায় শেষ করে দিল।

দিনটা ছিল ফাল্গুনেরই এক সন্ধ্যা, ডাঃ রায় বেরিয়েছিলেন টোপর মাথায় বিয়ে করতে। মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা ছিলই, সেই উত্তেজনা মিট্টিকে নিজের করে পাওয়ার আনন্দে । মিট্টি ডঃ রায়ের হবু বৌ। পোষাকি নাম একটা আছে, কিন্তু ওই মিট্টি নামেই ওকে ডাকেন ডাঃ রায়।

কিন্তু ওই যে কপালের লিখন। ডাঃ রায়ের গাড়ি ধাক্কা মারল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা লড়ির পেছনে। সে বিভৎস অ্যাক্সিডেন্ট। মিট্টির ঘরে সে খবর পৌঁছতেই কান্নার রোল উঠল। সবাই ধরে নিল যে বেঁচে নেই ডাঃ রায়। আর এই শোক সামলাতে পারল না মিট্টি। কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেল।

জ্ঞান যখন ফিরল তখন ঘরের লোক দেখল আলাদা মিট্টিকে। সদ্য স্বামীহারা বিধবা। ডাক্তার কাউন্সেলিং কোনোকিছুই বাদ গেল না, কিন্তু মিট্টির কোনও পরিবর্তন নেই।

-“কিন্তু আপনি যে বললেন মিট্টি আপনার স্ত্রী। বিয়ে তো হয়নি।”
-“রেজিস্ট্রি ম্যারেজ আমাদের হয়েই ছিল। শুধু সাতপাক সিঁদুরদানই হয়নি।” বললেন ডাঃ রায়।

-“হুম্ !” কি যেন ভেবে নিলেন মাধববাবু তারপর তার মুখচোখে হাসি খেলে গেল। বললেন, “মিট্টিকে আমি চিনেছি। মেয়েটাকে দেখে কষ্ট হত আমারও। ওর বয়সী একটা মেয়ে আছে আমার। সেই অর্থে আজ থেকে তুমি আমার জামাই হলে। মেয়ে জামাইয়ের জন্য যথাসাধ্য করব আমি। তুমি নিশ্চিন্তে থেকো।”

বাস এসে পৌঁছল বরসানায়। সেখানে চলছে লাঠমার হোলি। বাস থেকে নেমেই মাধববাবু গেলেন বিজয়া ঠাকরুনের কাছে। আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে কি যেন বললেন। সবশুনে ঠাকরুন বললেন,”সে তুমি চিন্তা কর না বাবা, এই বড়াইবুড়ি থাকতে রাধাকৃষ্ণের মিলন আটকাবে না।”

মাধববাবু চললেন সবার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। ঠাকরুন চললেন দোকানে। ব্রজগোপিনীদের মতো সাজাতে হবে আমাদের রাইকিশোরীকে।

দেখেশুনে বিলাসী বলল, “খুব ভালো হবে কাকি। মেয়েটাকে দেখে খুব মায়া হয়।”

কেনাকাটা সেরে তনিমার কাছে এলেন ঠাকরুন । বললেন,”পরে নে তো।”

-“কি যে বলেন না মাসিমা। একদিন নাহয় পেরেছিলাম আপনার অনুরোধে, কিন্তু তাই বলে বারবার ?”
ঠাকরুন কঠিন গলায় বললেন, “হ্যাঁ বারবার। যা বলছি তাই কর। আজ হোলি খেলব। লাঠমার হোলি।”
-“লাঠমার হোলি ? সে আবার কি ?”

ঠাকরুন হেসে বললেন, “বরসানার হোলি হল লাঠমার হোলি। শ্রীকৃষ্ণ দলবল নিয়ে এসেছিলেন বরসানা, রাধা আর তার সখিদের রং মাখাতে। আমাদের রাইকিশোরীও কম যায় না। সে তার সখিদের নিয়ে বের হল রাস্তায়। সঙ্গে বড় বড় লাঠি। লাঠির বাড়ি খেয়ে কানাই আর তার দলবলের অবস্থা হল দেখার মতো। সেদিন হতেই প্রচলন হল লাঠমার হোলির । বৃন্দাবন হতে ছেলেরা আসে বড় বড় ঢাল নিয়ে। বরসানার মেয়েরা লাঠি দিয়ে পেটায় ওদের। আর বৃন্দাবনের ছেলেরা ঢাল দিয়ে সে লাঠির বাড়ি আটকায়। তারপর চলে রং মাখানোর পর্ব। আমরাও লাঠমার হোলি খেলব।”

অগত্যা সাজতে হল তনিমাকে। সাজল সবাই, কেবল ঠাকরুন আর বিলাসীর মতো কয়েকজন ছাড়া। শুরু হল লাঠমার হোলি। ছেলেরা রং নিয়ে এগিয়ে আসতেই মেয়েরা ছুটে এল লাঠি নিয়ে। ঢাল উঁচিয়ে বসে পড়ল ছেলেরা। মেয়েরা তখন দমাদ্দম বাড়ি মারতে লাগল। আর সঙ্গে গাইতে লাগল গান।

মারো মারো ও ইয়ারো কিসন কালা,
মারো মারো বৃন্দাবন ছোরো কো।
রং লায়ে ও নটখট মোরি লিয়ে,
মৎ দেখো ও ভোলে সুরৎ কো।
তড়পায়ে জখমায়ে এ দিলকো ও কালা,
তোড়ো তোড়ো নটখট কি বাহন কো।

হঠাৎই ঘটে গেল অঘটন। লাঠি হাতে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তনিমা। আর তার সামনে পড়ে আছেন ডাঃ রায়। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না তনিমা, সেই দৃশ্য দেখেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। সবাই মিলে ধরাধরি করে আনা হল ডরমেটরিতে।

বিছানায় শুয়ে আছে তনিমা। জ্ঞান ফেরেনি এখনও। রংটং ধুয়ে এসে তনিমার চিকিৎসায় লেগেছেন ডাঃ রায়। হ্যাঁ, ডাঃ স্বর্ণেন্দু রায়। মিট্টি ওরফ তনিমার হবুবর। তার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা।

-“সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে।” বললেন মাধববাবু।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় ভাবে তাকিয়ে রইলেন ডাঃ রায় । আর তখনই জ্ঞান ফিরল তনিমার । ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে। চোখ খুলেই দেখল স্বর্ণেন্দুকে। তড়িঘড়ি উঠেই জড়িয়ে ধরল।
-“কোথায় ছিলে তুমি ?”

ডাঃ রায় মৃদু হেসে বললেন,”তোমার কাছেই। যখন সশরীরে ছিলাম না তখন ছিলাম মনের গহীনে। আড়াল হলেই কি বিচ্ছেদ হয় ? আমি তোমার মাঝে আছি ছিলাম থাকব।”

কথা জোগাল না তনিমার আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল তার স্বর্ণেন্দুকে। ঘর হতে বেরিয়ে এল সবাই। ওদেরকে কিছুটা সময় দেওয়া দরকার।

পরদিন গাড়ি পৌঁছল বৃন্দাবনে। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে ফাগুয়া। হোলির আনন্দে মেতেছে সবাই। খ্যাপা জগাই হতে তিনকড়ি, ঠাকরুন হতে বিলাসী সবাই মেতেছে বসন্তের এই উৎসবে।

ঠান্ডাইয়ের গ্লাস হাতে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন ডাঃ রায়। উঁহু, তনিমার স্বর্ণেন্দু। আর তখনই একমুঠো আবীর নিয়ে ছুটে এল তনিমা। লাগিয়ে দিল স্বর্ণেন্দুর গালে। স্বর্ণেন্দুও নিজের গালে লাগা সেই আবীর হতে কিছুটা নিয়ে লাগিয়ে দিল তনিমার গালে। অপলকে চেয়ে রইল একে অপরের দিকে। পাশেই ফাগুয়ার গান ধরেছে জগাইয়ের দল। মেতে উঠেছে আজি বসন্তে।

– – – –

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *