আজ ২৫শে বৈশাখ

আজ ২৫শে বৈশাখ

সিদ্ধার্থ সিংহ

তখন রবীন্দ্র সদন-নন্দন চত্বরে সকাল থেকেই শুরু হয়ে যেত রবীন্দ্র জয়ন্তী উৎসব। ভোররাত থেকে লোকেরা আসতে শুরু করত। বেলা আটটা বাজতে না বাজতেই সমস্ত জায়গা দখল হয়ে যেত রবীন্দ্রানুরাগীদের কবলে। তিল ধারণের জায়গা থাকত‌ না।
নন্দনের দিকের প্রশস্ত ফটক দিয়ে আসতেন হৃদয় জয় করা সব গায়ক-গায়িকা আর আবৃত্তিকারেরা। তখন টিভিতে একমাত্র চ্যানেল ছিল দূরদর্শন। সরাসরি সম্প্রচার করত সেই অনুষ্ঠান।
কে আসতেন না সেখানে? নামীদামি থেকে উঠতি শিল্পীরাও।
সকাল হওয়ার আগেই লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেমেয়েরা তাদের পত্রিকা কাঁধের ঝোলায় ভরে হাজির হয়ে যেত সেখানে। প্রত্যেকটি পত্রিকাই বের করত রবীন্দ্রজয়ন্তী সংখ্যা।
কোনও পত্রিকার নাম পঁচিশে বৈশাখের কবিতা, কোনও পত্রিকার নাম পঁচিশে বৈশাখ দিল ডাক, কোনও পত্রিকার নাম চর্যাপদ।
কে ক’টা পত্রিকা বিক্রি করতে পারল, সেটা বড় কথা নয়। রবীন্দ্রসদন চত্বরে পত্রিকা নিয়ে হাজির হওয়াটাই ছিল সব চেয়ে বড় ব্যাপার।
এই একই উদ্দীপনা দেখা যেত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও। সেখানে শুধু পত্রপত্রিকাই নয়, জোড়াসাঁকোর ঢোকার রাস্তার দু’পাশেই পসরা সাজিয়ে বসে পড়ত‌ খেলনা থেকে শুরু করে মনোহারী দোকান। শান্তিনিকেতনী ব্যাগ থেকে ডোকরা শিল্প। মুখোশ থেকে চটের কারুকাজ করা গৃহস্থালি সরঞ্জাম।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখে আসা যেত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহার করা জোব্বা থেকে শুরু করে চেয়ার-টেবিল, এমনকী হস্তাক্ষরও। দেখা যেত তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘর। দেখা যেত মাটি দিয়ে তৈরি ত্রিকোণ ঝিকের উনুনও।
রবীন্দ্রসদন চত্বরে খানিকক্ষণ কাটিয়ে অনেকেই চলে যেতেন জোড়াসাঁকোয়। আবার কেউ কেউ জোড়াসাঁকোতে খানিকক্ষণ কাটিয়ে চলে আসতেন রবীন্দ্রসদন চত্বরে।
না, শুধু গান বা আবৃত্তি শোনার জন্য নয়, এই দিনটিকে পুরোপুরি উপভোগ করার জন্যও অনেকে ছুটে আসতেন এই দুই জায়গায়।
যাঁরা এই শহরে থাকেন না কিংবা থাকেন অনেক অনেক যোজন দূরে, তাঁরাও তাঁদের মতন করে শুধুমাত্র এই দিনটিতে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন করতেন নিজের নিজের এলাকায়। বেশ ঘটা করে। হত স্কুল প্রাঙ্গণে। ক্লাবঘরে। এমনকী, বাড়ির একটি ছোট্ট ঘরের এক কোণে। একদম একাকী।
শুধু পঁচিশে বৈশাখের এই একটি দিনই নয়, গোটা বৈশাখ মাস জুড়েই চলত রবীন্দ্র স্মরণ। রবীন্দ্র সংগীত। রবীন্দ্র নৃত্য। রবীন্দ্রনাথের নাটক। মানুষ বেঁচে থাকতেন রবীন্দ্রনাথে।
আজ সেই পঁচিশে বৈশাখ। অতিমারীর কবলে পড়ে সব বন্ধ, সব। সত্যিই কি সব বন্ধ?
না, তা নয়। প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হতে পারে। স্কুল বন্ধ হতে পারে। একসঙ্গে বেশি লোক মিলে রবীন্দ্র উৎসব উদযাপন করাও বন্ধ হতে পারে। কিন্তু মন? মনকে আটকাবে কী করে! উনি তো শুধু এই দিনটিতেই নয়, সারা বছরভর আমাদের মন জুড়ে আছেন। তাই মানুষ আজ দ্বারস্থ হয়েছেন অন্তর্জালে। সরাসরি লাইভ অনুষ্ঠানে।
যতই মহামারী আসুক, যতই দুর্যোগ আসুক, যতই আমাদের পায়ের তলা থেকে সরে যেতে থাকুক জমি, তবু তবু তবুও…
আমরা ঠিক পালন করব রবীন্দ্রজন্মোৎসব। গর্ব করে বলব— আজ ২৫শে বৈশাখ।

————

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top