আত্মপরিধির বিস্তার – তৈমুর খান

[post-views]

কবিতা তখনই পাঠ করতে বাধ্য হই যখন  কবি পাঠককে দিয়ে তা অনায়াসে পাঠ করিয়ে নিতে পারেন। অর্থাৎ কবিতা যখন হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে। সুন্দরী রমণী যেমন আরও সুন্দরী হয়ে ওঠে যখন তার অন্তরের আবেদনে এক অমোঘ আকর্ষণ থাকে। এরকমই একটি সৌন্দর্য ও আকর্ষণের কবিতা সংকলন ‘নাম লিখছে জাতিস্মর'(প্রথম প্রকাশ আগস্ট ২০২০) হাতে এসে পৌঁছেছে। কবির নাম আশরাফুল মণ্ডল। তাঁর কবিতা আগেও পড়ার সুযোগ হয়েছে, কিন্তু এই কাব্যটিতে আরও নিংড়ে দিয়েছেন তাঁর অনুভূতির দ্রবণকে। মোট ৫৩ টি কবিতায় আত্মজৈবনিক নিভৃতির স্বর প্রগাঢ় হয়ে উঠেছে।

      এই কাব্যে আশরাফুল ঘনীভূত হৃদয়ের উষ্ণতা বিছিয়ে দিয়েছিলে। কবিতা কতখানি নিজস্ব নিয়মে অন্তর্ভেদ করতে পারে, কতখানি আত্মবোধের তীব্রতায় বাজতে পারে, আবার কতখানি নীরবে তার অভিমান সহ্য করতে পারে—তারই খুব শান্ত ও আর্দ্র উচ্চারণ। প্রতিটি কবিতার মধ্যেই আছে ব্যক্তি আশরাফুলকে অতিক্রম করার প্রয়াস এবং চিরন্তন মানবিক আশরাফুল এর কাছে পৌঁছানোর তাগিদ। তাঁর ‘নধর ইচ্ছারাও স্বপ্নচাষী…’ হয়ে ওঠার মধ্যে দিয়েই কাব্যে তিনি প্রেমের সৌজন্য যেমন এনেছেন; তেমনি দেশ, জাতি, ইতিহাস, সংস্কৃতির মধ্যেও নিজস্ব সত্তার নিরন্তর যাপনকে প্রকাশ করেছেন। ক্ষয়ক্ষতির হানাহানির অহেতুক কর্মকাণ্ডের প্রতিও বিরুদ্ধতা গোপন করেননি। ব্যক্তিইচ্ছাটি স্বপ্নমেদুর আলোকসাম্যে পর্যটন করলেও সামাজিক ও পারিবারিক রসায়নে আত্মস্থ হওয়ার রোমন্থনটি জারিত করেছেন বারবার। কবিতায় লিখেছেন:

 ‘মায়ের ঢেঁকিতে ধান ভানার শব্দ চাই

 বাসন মাজার শব্দ চাই

 খড় কাটার শব্দ চাই…

 গরুর গাড়ির চাকার শব্দ শুনব

 পাখির কিচির-মিচির শুনব

 ঘাট ফেরত মায়ের ভিজে শাড়ির সপসপ…’

 মায়ের উনুনের ছাইয়ে বাসন মাজা, বাবার গাড়ি গাড়ি ধান সাজিয়ে পালুই দেওয়া, ভাইয়ের খিদে পেটে দুলে দুলে নামতা পড়া, সবই শৈশবের বারান্দায় আবিষ্ট করে। জীবনের দীর্ঘ ছায়ায় চকিত উদ্ভাস ঘটে ‘তুমি’ সর্বনামটির। এর মধ্যে দিয়েই প্রতিপক্ষকে কত রূপেই না দেখতে পাই! কখনো নিরীহ সন্ধ্যাতারার ছলছল চোখের নিষ্পলক তাকিয়ে থাকাতে। আবার কখনো কাগজের ভাঁজে আঙুলের গন্ধ লেগে থাকাতে। যে প্রেম দূরত্ব রচনা করেছে, সেই প্রেমই অমল আলোয় স্বর্গীয় আভাসে সিক্ত করে। তখন কবি লিখতে পারেন:

‘একটি নিরীহ সন্ধ্যাতারার ছলছল চোখ

 তাকিয়ে আছে নিষ্পলক।’

 আকাশের সন্ধ্যাতারা মানবিক স্পন্দনের নিসর্গদ্যুতি হয়ে জেগে ওঠে। তেমনি আর একটি কবিতায় সম্পর্কের সম্বোধনে চিঠির ভাষাও:

 ‘এখনও চিঠি পেতে আমার খুব ইচ্ছে করে। বড় ভালো লাগে

 কাগজের ভাঁজে কারোর আঙুলের গন্ধ লেগে থাকা।’

    সব নিয়েই অবিরাম অনন্ত অন্বেষণ, দীর্ঘতর বাঁচার সাধ। এই সাধকেই লালন করেছেন কবি আর কুয়াশার ভেতরের মুখকে বারবার দেখতে চেয়েছেন। কবির মধ্যেই বাহিত হয়ে চলেছে অন্তর্লীন সত্তার জাগরণ:

 ‘আমার সত্তার ভিতর আর এক সত্তায় শুনছি ছায়াদের পদধ্বনি

 মনে পড়ছে কবেকার সেই পাড়াগাঁ’র দিনরাত,

 একটা বেতাল নৃত্যের তালে আমরা অহর্নিশ

 আদি নেই অন্ত নেই বরাভয় এর পিঠে চেপে বসে আছি।’

       এই সত্তা অবিমিশ্র রহস্যের বাতাবরণ থেকে তার স্বরূপ উন্মোচন করতে চায়। কিন্তু সেই অতীত আজ অন্ধকার পাণ্ডুলিপি। সচকিত কবি বলে ওঠেন:

 ‘হে অগোচর মার্জনা করো

 খেয়াল খুশি যত,

 নোনা জলের স্বাদ ভুলে গেছি

 বারান্দার গল্পগাছা কেড়ে নিয়েছে কালান্তর।’

 কিন্তু কালান্তর স্মৃতিব্যঞ্জনের ঘোর থেকে মুক্ত করতে পারেনি। কবিতায় তা আরো ঘনিষ্ট ও উষ্ণপ্রবণ হয়ে উঠেছে:

 ‘বাউটি পরা হাতে মায়ের গোবর লেপা উঠোন ঢুলুঢুলু

 নোটেশাক তোলা বুবুজানের হাত ভরে দেয় স্মৃতিপট

 কী করে ভুলি ভিটেছাড়া সেই বিষাদসিন্ধু!’

       আর এসব অনন্তগামী কালান্তরের নৈর্ব্যক্তিক সত্তায় মিশে গেছে। নিজস্ব জীবনের স্মৃতিছায়ায় মিছিলের মেয়েরা মায়ের মুখ হয়ে উঠেছে। অনন্ত মহাশূন্যের ডহরে রূপান্তরিত হয়েছে।

               আশরাফুল কবিতায় একটা পথেরই অন্বেষণ করেছেন বারবার—সেই পথ সম্পর্কের। ঐতিহ্য আর অন্বয়ের ভেতর যা স্থৈতিক মানববৃত্তীয় ঐশ্বর্যে প্রদীপ্ত। উত্তরাধিকারী হিসেবে তাই বারবার পূর্বপুরুষের ছায়াকে অনুসরণ করেছেন। যতই বিভক্তির রথ আমাদের পর্যুদস্ত করুক না কেন তিনি ক্লান্তিহীন। মতিভ্রমের হাত ধরে দিন চলে গেলেও এবং চিমনির ধোঁয়া ছুঁয়ে নদী বয়ে গেলেও এবং পাহাড়ের চূড়া থেকে প্রলয় গড়িয়ে পড়লেও—আকণ্ঠ পিপাসায় শুষে নেওয়া চোরাবালিকে কবি শাসন করতে জানেন:

 ‘আকণ্ঠ পিপাসা ছুঁড়ে ফেলো চোরাবালি

 প্রলাপের নেশা মেখে খুঁজে নেব পথ।’

   ‘প্রলাপের নেশা’ যে দার্শনিক প্রত্যয় জীবনজোশকে জাগিয়ে নেওয়ার কৌশল তা কবি ভালো করেই জানেন। আর একটি কবিতায় (বাঁশির সুর আর চাঁদ চাঁদ গন্ধ) তা-ই স্পষ্ট করে দেন:

 ‘এক অদৃশ্য অভিসারে আমার সত্তা

 ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আমার পরিচিতির সীমারেখা

 সুরের মূর্ছনায় আমার অধিবাস

 বিশাল ছায়ার ডানায় আমার শ্রুতিপথ’

       অদৃশ্য অভিসারে নিজ সত্তাকে চালিত করে সভ্যতার বহুস্তর অতিক্রম করেছেন। বহু জীবনবোধের নিরীক্ষীয় চরাচরে আদিম প্রেক্ষিতের পুলককে সম্মোহিত করেছেন। তখন নিজেকে মনে হয়েছে:

 ‘আমি এখন অলীক মানুষ

 ভবিতব্য আমার ঠিকানা।’

 বাঁশির সুর নিয়ে নিরাকার বন্দরে পৌঁছে যান। কুয়াশাবিছানো শূন্যতায় গড়ে নেন চালাঘর। এভাবেই ব্যাপ্তি রচনা। ব্যাপ্তির ভেতরেই নাছোড় গল্পেরা বিরাজ করে। কবি বলেন:

 ‘পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই নাছোড় গল্পেরা’

 এই গল্পগুলিই তো প্রাণের, আবেগের, সমীহ ও সম্মোহনের, মৃত্যুর এবং সুন্নাহেরও:

 ‘গল্পে থাকুক আমার চলাফেরায়

 গল্প আমার কোজাগরী সাঁঝবেলা

 গল্প আমার কবরের রোশনাই’

    এই জীবনের গল্পেই আশরাফুল জীবনের দীর্ঘছায়া রচনা করেছেন। সেই মুহূর্তগুলিই পার্থিবতাসিক্ত হয়েও অনন্তদিশারী মানবিক আলোকসঞ্চারী মহাকালের উপলব্ধিকে শব্দায়িত করে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ এই কারণেই বলেছেন:’The best portion of a good man’s life is his little nameless, unencumbered acts of kindness and of love.’— (Wordsworth) অর্থাৎ একজন ভালো মানুষের জীবনের সেরা অংশটি হ’ল তার সামান্য নামহীন, নিরপেক্ষ দয়া ও ভালবাসার কাজ। আশরাফুল এই কাজটিতেই আসক্ত হয়েছেন বলেই ‘পূর্ণ হোক মগ্নতার ক্যানভাসে’ লিখেছেন:

 ‘আমার মগ্নতা প্রবল হয় আরো

 সুদীর্ঘ শালগাছের প্রাচীন ছায়ার কথা শুনি

 জানালার শার্সিতে কান পাতে আমার ভাষা

 ছায়াদের ধরবো বলে আরো মগ্ন হই।

 নিস্তব্ধ স্রোতে অস্পষ্ট ছায়ারা ভেসে যায়

 আমি শুধু ধ্যানস্থ বসে থাকি

 নির্নিমেষ ছায়া খোঁজে আমার ভবিতব্য…’

       সমগ্র কাব্য জুড়েই আত্মপরিধির এই বিস্তার কখনো জাদুবাস্তবতায়, কখনো স্বয়ংক্রিয় ক্রিয়ায় সংঘটিত হয়ে চলে। বহুমুখী প্রজ্ঞার সাবলীল অভিযাপনে মগ্নতার প্রহরগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন কবির আহ্বান:

 ‘এসো ছায়াসকল বারবার

 এক নদী ব্যথা আর সমূহ কথকতা গ্রহণ করো।

 পূর্ণ হোক আমার মগ্নতার ক্যানভাস…’

     মগ্নতার ক্যানভাস পূর্ণ করা তো জীবনপাতেরই অনিবার্য উচ্চারণ কবিতাকে আরও মানবীয় ও জীবনবাদী করে তুলেছে। তখন লিখতে চেয়েছেন আলোর গান:

 ‘এসো, আমরা নক্ষত্র-ডাকার বর্ণমালা শিখি

 কন্ঠে জাগাই আলোর গান।’

      এই আলোর গান সব দুঃখ ভেদ করে, মায়ের স্মৃতি ভেদ করে, শৈশব ও স্বপ্ন ভেদ করে তার স্বরলিপি সংগ্রহ করেছে। খিদের গল্প, বাবার গল্প, মনখারাপের গল্পে উঁকি দিয়েছে। দৃষ্টিকোণ ও রুচির ভেতর, কারুণ্য ও ফর্সা হাতের ছোঁয়াকে লালন করেছে। ঈদের খুশি ভাগ করেছে। উপন্যাস লেখার ইচ্ছাকে পোষণ করেছে। তারপর দিগন্ত হয়ে গেছে, মহাদিগন্ত:

 ‘আজন্ম গতির ঋণশোধ,

 দক্ষিণ-উত্তর ভরে ওঠে কানায় কানায়।

 মেঘেরা জানে সৃজনের স্বরলিপি

 মেঘেরা পারে বৃষ্টি ঝাপটে চলাফেরা।’

      এই দিগন্তেই মেঘের আনাগোনা। স্বরলিপির স্ফুটনাঙ্ক, বৃষ্টি ঝাপটে চলাফেরা। এই দিগন্তেই পসরা সাজিয়ে আজও লাজুক-কাঁপন  কবির প্রার্থনা:

 ‘হে সর্বভুক সন্ন্যাসী,

 আমাকে দাও নগ্নতার কৌশল—

 নক্ষত্র গান অগ্নিসাক্ষী করে তুলে দিই

 আমার দেহাতি দিন গুজরান…’

 আর এখান থেকেই উঠে আসে জাতিস্মর। জীবনের ছায়াময়ায় যার নবউত্থান, এমন অমোঘ উচ্চারণের তীব্রতা। একটা জীবনকে কেন্দ্র করেই মহাজীবনের উল্লাসে কবি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছেন। এখানেই কাব্যটির শিল্প সিদ্ধি।

————————————————————

 নাম লিখছে জাতিস্মর: আশরাফুল মণ্ডল, পালক পাবলিশার্স, মঙ্গলবাড়ি, মালদা। প্রচ্ছদ: অর্পণ। মূল্য:৮৮ টাকা।

তৈমুর খান 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top