আত্মীয়তা-// মোঃ হুমায়ূন কবির

আত্মীয়তা
মো. হুমায়ুন কবির
এক.
বানারিপাড়া ও মিরের হাটে ছোট-বড় নৌকায় যারা ধান-চালের কারবার করে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে নগদ-বাকী লেগেই থাকে। কুটিয়ালির ব্যবসায় কেউ শতভাগ নগদ টাকায় ব্যবসা করতে পারেনা। ছোট কুটিয়াল, যাদের দশ/বার মণ ধান কেনার সামর্থ নেই, তারা বড় নৌকার মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে ধান কেনে। সপ্তাহান্তে ধান সিদ্ধ-শুকনা করে রাইস মিলে ধান ভাঙিয়ে চাল হাটে বিক্রি করে। তাতে লাভ হোক বা লোকসান হোক, মহাজনকে ধানের দাম শোধ দিতে হয় যথা সময়ে। আবার বড় বড় মহাজন, যাদের তিন/চারশ মণ ধানের নৌকা, তারা আশুগঞ্জ, কাঠপট্টি, ভৈরব, ভোলা, কালাইয়া, চরমুগরিয়া ও মাদারিপুরের মতো বড়বড় ধান-চালের আরত থেকে বাকীতে ধান কিনে আনে এবং স্থানীয় ছোটছোট কুটিয়ালদেরকে বাকীতে ধান দেয়। তারাও বিশ্বস্ততার সাথে ধান থেকে চাল বানিয়ে হাঁটে-বাজারে বিক্রি করে, দু’পয়সা লাভ হয়, সেই লাভের টাকায় স্ত্রীর পরনে কাপড়, সন্তানের লেখাপড়া ও বইপত্র কেনা-বেতনাদি দেয়া আর বৃদ্ধ-বাবামার ওষুধ-বড়ির ব্যবস্থা হয়। তাই যোগিরাকান্দা, ওটরা, মানিককাঠি, সহিতকাঠী, জিরাকাঠি, চৌধুরির হাট, বুড়ির চর ও তালতলা গ্রামের কুটিয়াল সম্প্রদায়ের জীবনে রাতদিনের ঘামঝরা খাটনী আছে, নেই দু-দ- বিশ্রাম।
আমজাদ আলী ছোট কুটিয়ালদের একজন। সামান্য জমি-জমার পাশাপাশি পনের-বিশ মণ ধানের কুটিয়ালি আছে তার। তিন সন্তানসহ স্ত্রী ও মাকে নিয়ে সংসারে ছয়জন সদস্য। বাপ দ্বিতীয় বিবাহ করে আলাদা হয়ে গেছে দশ বছর আগে যখন সে স্কুলে লেখাপড়া করতো। সংকট তাকে এমন বাস্তবতার পরিচয় ধরিয়ে দিয়েছে যে ঘরে সুন্দরী স্ত্রীর সাথেও আজমাদ একটু রসিকতা করতে অভ্যস্ত নয়। তার চিন্তা কিভাবে ধান-চালের কারবার করে দু টাকা বেশি উপার্জন করা যাবে এবং ছেলেমেয়ের পাতে দুটা ডাল-ভাত দিতে পারবে। তার স্ত্রী খোদেজা বেগমও স্বামীর সাথে মাজায় কাপড় বেঁধে রাতদিন ধান সিদ্ধ-শুকনার কাজ করে মনপ্রাণ দিয়ে। তাই বাড়ির উঠান থেকে একমুঠ ধান কাকে খেয়ে গেলে বাঁশের বড় ছিপটা কাকের গায়ে ছুঁড়ে মারতে বিলম্ব করে না খোদেজা বেগম। এক আগউল ধান তাদের কাছে এক ডোলা। এক সের ধান থেকে তিন পোয়া চাল বের করতে পারলে তবেই লাভের মুখ দেখা যায়।
সেদিন রবিবারের হাট। সকাল থেকে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন; বৃষ্টি পড়পড় অবস্থা। দশমণ ধান থেকে সাত মণ চাল বানিয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় আমজাদ মিরের হাটে যখন পৌঁছায় তখন খান বিশেক বড় ও মাঝারি মাপের চাল কেনার নৌকা সবে এসে চরের কিনারে গ্রাফি লাগিয়েছে। চাল বেচা-কেনার হাঁক-ডাক তখনও শুরু হয় নি। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বাজারের অবস্থা ভাল যাবে না। নৌকায় নৌকায় চালের দাম দেখিয়ে আমজাদ ঘণ্টাখানেক পর নিজের নৌকায় এসে ছেলেকে বললো, রাজন, নগদ টাকায় কেউ চাউল কিনতে চায় না। বাজার পরতির দিকে। দোয়ারিকার এক বেপারী মণকে দশটাকা বেশি দিয়া কেনতে রাজী আছে, যদি তাকে এক হাটের জন্যে চাউল বাকী দেওন যায়।’
রাজনের বয়স মাত্র এগার বছর। স্কুলের পাশাপাশি বাবার সাথে সে হাটে-কলে যায়। বাবাকে সে ছাড়া সাহায্য করা বা পরামর্শ দেয়ার কেউ নেই। বাকীতে চাল বিক্রি করলে সেই বাকী টাকা উঠবে কিনা, না উঠলে কী হবে ততদূর ভেবে দেখার বয়স রাজনের ছিলো না। তবু সে বললো, তুমিই ভাল বোঝ বা’জান। চাউল বাড়ি ফিরাইয়া নিলে ওজনে কামতে থাকবো। সামনের হাটে যদি চাউলের বাজার আরো খারাপ অয়।’ রাজনের কথায় যুক্তি আছে।
তমিজউদ্দিনের নৌকার পাশে আমজাদ নৌকা বাঁধে। দরকাষাকষির এক পর্যায়ে তমিজউদ্দিন বলে, চাউলের দর ১২০ টাকা মণ। সাত মণ চাউলের মোট দাম ৮৪০ টাকা। তুমি ৪০ টাকা এখন নগদ নিয়া যাবা; বাকী ৮০০ টাকা সামনের রবিবার হাটে পারা; এই চাউল নিয়া ভোলা যামু। জানইতো, মোকামেও চাউলের দাম পইরা গেছে। বাকীতে চাউল বিক্রি না করলে দাম দিতে চায় না। আমার বাড়ি দোয়ারিকার উত্তরে মানিকদি গ্রাম। বাবুগঞ্জ থানার দক্ষিণ পাড়। জুম্মান চেয়ারম্যানের বাড়ির লগে আমার বাড়ি।’
ইন্দেরহাট, বানারিপাড়া ও মিরের হাটে যারা যুগযুগ ধরে কুটিয়াল ব্যবসায় জড়িত, তারা বাকীতে ধান-চাল বিক্রি করতে ক্রেতা-বিক্রেতার নাম-ঠিকানা জানা জরুরি মনে করে না। অশিক্ষিত-অল্পশিক্ষিত কুটিয়াল ব্যবসায়ীদের বড় মূলধন— বিশ্বাস। বিশ্বাসের উপর ভর করেই এরা যুগযুগ ধরে ধান-চালের কারবার করে আসছে। তাই তমিজউদ্দিন বেপারীর বাড়ির ঠিকানা বড় কথা নয়, তার মুখের ওয়াদাই যথেষ্ট।
তমিজউদ্দিনের নৌকায় চাল মেপে দিয়ে নগদ ৪০ টাকা খুতিতে ভরে আমজাদ কিছু তরি-তরকারি কেনার জন্যে চরে উঠলো । চরের কিনারে বাঁধা নৌকায় বসে রাজন দেখছে ছোট্ট নৌকায় মুরির মোয়া বিক্রেতারা ‘এই মোয়া এই মোয়া’ বলে চীৎকার করছে; আর বিদ্যুৎ গতিতে আগ্রহী ক্রেতার নৌকার কাছে গিয়ে মোয়া বিক্রি করছে। বাবা তরকারি কিনে ফিরলে রাজন বাড়িতে দুটি ছোট বোনের জন্যে মোয়া কিনে নেয়ার আব্দার জানায়। আমজাদ দুই টাকায় আধা সের মোয়া কিনে বাড়ির উদ্দেশ্যে নদী পাড়ি দেয়। বর্ষায় উম্মাতাল ¯্রােতে নৌকা মুহুর্তের মধ্যে হারতামুখী খালে প্রবেশ করে।
বাবো, আগামী হাটে মোরে একটা জামা কিন্যা দিও।
বাকী টাহা পাইয়া জামা কিনে দিমু। জোরে বৈঠায় ঠ্যালা দে।
দুই.
বাড়িতে তার যে আর একদাগ ধান ছিলো, তার চাল নিয়ে পরের রোববার আমজাদ আলী হাটে গেলো। প্রায় সকল বেপারীর নৌকা মোকাম করে আবার হাট ধরতে এসেছে। কিন্তু তমিজউদ্দিনের নৌকা আসে নাই। দোয়ারিকা-বাবুগঞ্জের কয়েকজন বেপারীর কাছে জিজ্ঞেস করে তমিজউদ্দিনের নৌকার কোন সংবাদ পাওয়া গেলো না। আমজাদ আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেলো। আজকের দশ মণ চাল বিক্রি করে দেড়শ’ টাকার মতো লাভ ও আসল টাকা নিয়ে ধানের হাট থেকে দশ মণ ধান কিনে বাড়ি ফিরলো সে। রাজনের জন্যে নতুন জামা আর কেনা হলো না। বাপ-বেটা উভয়ের মন খারাপ।
দেখতে দেখতে চার হাট গেলো। কেউ-ই তমিজুদ্দিনের হদিস দিতে পারলো না। কেউ কেউ বলছে, তমিজউদ্দিন হয়তো বড় কোনো সংকটে পড়েছে; নয়তো সে ইচ্ছে করে কারবার বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিবেশি কুটিয়াল কাছেম মৃধা আমজাদ আলীকে পরামর্শ দিলো, কত আর অপেক্ষা করবা। যে ঠিকানা মনে আছে সেই ঠিকানায় যাও। দোয়ারিকা তো আর বেশি দূর না।’
বাকীতে চাউল দিলাম, এখন দেখি জমা চালানসহ গায়েব। এমুন অইবে বুঝলে কি আর বাকী দিতাম? আমজাদ আলী আফসোস করে।
সেদিন শুক্রবার। আকাশ ভোর থেকে পরিষ্কার। আগের রাতেই আমজাদ আলী স্ত্রীকে বলে রেখেছিল, দোয়ারিকা যাবে সে তমিজুউদ্দিনের খোঁজে। না গেলে টাকা পাওয়া যাবে না। ভাল লুঙ্গি ও ভাল জামা পরে একটা ছাতি হাতে আমজাদ আলী বাড়ির সামনে দোয়ারিকাগামী লঞ্চ ঘাটের দিকে পা বাড়ায়। পিছন থেকে খোদেজা বেগম বলে, বিদেশের বাড়ি; অপরিচিত জায়গা, লোকজনের সাথে মন মেজাজ ঠিক রাইখা কথা কইও; টাহার চাইতে জীবনের দাম বেশি।’
লঞ্চ ভাড়া আসা-যাওয়া তিন টাকা এবং সারাদিনের নাস্তা ও খাবার জন্যে মোট দশ টাকাপকেটে নিয়ে আমজাদ আলী এম এল সৈয়দ নামের ছোট লঞ্চে উঠলো। সাত্রিশ বছরের যুবা পুরুষ আমজাদ আলী মনে মনে কল্পনা করে— যদি বাড়ি খুঁইজা পাওয়া যায়, টাকা হাতে হাতে আদায় করবে সে। টাকা না লইয়া বাড়ি ফিরবে না।
লঞ্চ চৌধুরীর হাট, উজিরপুর ও গুটিয়ার ঘাটেঘাটে যাত্রী নামিয়ে দিয়ে শেষ স্টোপেজ দোয়ারিকার ফেরি ঘাটের কাছে যখন ভিড়ল তখন বেলা সাড়ে নয়টা। হারতা থেকে দোয়ারিকা যেতে দু’ঘণ্টা সময় লাগে। যাত্রীরা বেশির ভাগ বরিশালে কোর্ট-কাচারি ও অফিস আদালতের কাজে যায়। তাই লঞ্চ ঘাটে ভেড়ামাত্র অপেক্ষামান কাঠবডির একখানা যাত্রীবাহী বাসে লঞ্চের যাত্রীরা হুড়মুড় করে উঠে পড়ে।
রাস্তার উত্তর পাশে কয়েকটি মুদি দোকান, তার পাশে একটি চায়ের দোকান । লোকজন চা-বিড়ি খাচ্ছে। আমজাদ চায়ের দোকানের একটি বেঞ্চে বসে এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সে একজনকে মানিকদি গ্রামে যাওয়ার পথ জানতে চাইলো। ‘সামনে একটা ভাঙা কাঠের পুল আছে, তার পূর্ব পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা উত্তর দিকে গেছে, সেই রাস্তার মাথায় হোসেন আলী মেম্বরের বাড়ি। তার কাছে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে, মানিকদি গ্রামের তমিজউদ্দিনের বাড়ি কোনটি।’ একজন তাকে একথা বলে রাস্তা দেখিয়ে দিলো।
জমিতে কর্মরত কয়েকজন কৃষক ও ডোবার পানিতে গরু গোসল করাতে ব্যস্ত একজন রাখালের কাছে জিজ্ঞেস করে প্রায় ঘণ্টাখানেক হেঁটে বড় একটা বট গাছের তলে এসে হোসেন আলী মেম্বরের বাড়ির সামনে দাঁড়ায় আমজাদ আলী। লোকজনের কথা মতো পুকুর দেখতে পায় সে। তারপর চোখে পড়ে একটা বড় দোচালা টিনের ঘর। বাড়ির চারদিকে ঝোঁপঝাড়ে ভরা। বাড়িতে প্রবেশ পথের মুখে একটা কুকুর শুয়ে অলস হাই তুলছে। কুকুরটাকে পাশ কাটিয়ে আমজাদ আলী বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ায়। কুকুরটাও লেজ নাড়াতে নাড়াতে তার পিছনে পিছনে গিয়ে তার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়, ঘেউ ঘেউ করে না। গলায় কাশির শব্দ করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে আমজাদ আলী বলে, ভাই সাব, বাড়িতে কেউ আছেন?
বন্ধ দরজার কপাট খুলে বের হয় ফ্রক পরা দশ-এগার বছরের একটি মেয়ে।
এই বাড়ি কি তমিজউদ্দিনের? তুমি কি তার মাইয়া?
হয়।
তোমার বা’জান কি বাড়ি আছে?
আছে। ডাকমু?
তারে কও যে একজন লোক আইছে দেখা করতে।
তমিজউদ্দিন গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে কাশতে কাশতে ঘর থেকে বাইরে এসে আমজাদ আলীকে ঘরে ডেকে নেয়। গলার স্বর ও গায়ের চাদর দেখে বোঝা গেলো, তমিজউদ্দিন অসুস্থ্য।
ঘরের বারান্দায় একটা চৌকি; পাশে একটা মাত্র হাতলযুক্ত পুরাতন চেয়ার। তাতে আমজাদকে বসতে দিয়ে তমিজউদ্দিন চৌকিতে উঠে চাদর জড়িয়ে বসলো।
কী ব্যাপার ভাই; আপনি দেখছি অসুস্থ্য; ব্যবসা-বাণিজ্য কি ছাইড়া দিছেন?
না ভাই। বিপদআপদের কি হাত-পাউ আছে? চাউল লইয়া নৌকা পাঠাইছিলাম ভোলার চরফেশন। আমার যাওয়ার কথা বরিশাল থেইকা লঞ্চে। আমি নৌকা ছাড়ার দুদিন পর যহন রওনা দিমু, বাবুগঞ্জের এক বেপারী আরশাদ মাঝি, সেও মীরের হাটের চাউল কিন্না চরফেশন মোকামে নৌকা পাঠাইছে। সে জানাইলো যে আমার নৌকা ডুবা চরের সাথে ধাক্কা খাইয়া ¯্রােতে উইলটা গেছে। নৌকায় তিনশ মণ চাউল, তিনজন ভাগী; একজন বেপারী। ওরা কোনো মতে সাতরাইয়া কুলে উঠে। চাউল ভরা নৌকার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নাই।’ এই কথা বলে তমিজউদ্দিন হাউ-মাউ করে কাঁদতে থাকলো।
ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা ও ওঠান-বাড়ির ছন্নছাড়া অবস্থা। তমিজউদ্দিনের কান্না-কাটিতে আমজাদ আলী এক কথায় বিশ্বাস করলো, চাউলসহ নৌকা ডুইবা গেছে সত্যই।
‘ভাই আমি বড় বেপারী না। তোমাদের হাট থেইকা নগদ-বাকিতে চাউল কিন্না বাবুগঞ্জ, চরমুগরিয়া ও ভোলার মোকামে মোকামে বিক্রি কইরা যে আয় হয় তা দিয়া সংসার চলে। এখন চাউলসহ নৌকাই ডুইবা গেছে; আমি এখন ফকির। তোমার মত আরো কয়েকজন পাওনাদার বাড়ি আইসা বকাঝকা দিয়া গ্যাছে। কী করমু?
পাওনা টাকা চাওয়ার পরিবর্তে আমজাদ আলী তমিজউদ্দিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল।
ভাই তমিজ, বাড়ি পর্যন্ত না আইলে তোমার এই সমস্যার কথা জানতাম কেমনে? এখন তুমি কি আবার কাজ-কারবার ধরবা না, বেপারী?
‘হ, আমার শশুর বিপদের সময় আগাইয়া আইসা বলছে, একখানা জমি বিক্রি কইরা কিছু টাকা দিবো, তার নৌকা আছে, নৌকা দিবো, আবার তোমাদের হাটে চাউলের কারবার শুরু করা যাইবে। কাজ-কারবার না করলে এত লোকের টাকা পয়সা কেমনে শোধ হইবে, সংসারই বা চলবে কী কইরা? আমজাদের এমন কথায় তমিজদ্দিনের মনে বল-ভরসা বেড়ে যায়। বলে, তোমার টাকা মাইরা খামু না। আমারে একটু সাইরা উঠতে দাও। আগামী সপ্তাহে চাউল কিনতে মীরের হাট যামু, তোমার টাকা দিয়া দিমু।
আমজাদ আলী আশ্বস্ত হয়। দুপুরের খাবার খেতে আর অপেক্ষা করে না সে যদিও তমিজউদ্দিন দুপুরের ভাত খেয়ে যাওয়ার জন্যে বেশ চাপাচাপি করছিলো। দোয়ারিকা থেকে হারতার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ার সময় বেলা দুইটা । তাকে লঞ্চ ধরতে হবে। লঞ্চঘাটে এসে হোটেলে ঢুকে দুইটা আটার রুটি ও কিছু ভাজি কিনে আমজাদ আলী খেয়ে নেয়। বরিশালের যাত্রী নিয়ে হারতার উদ্দেশ্যে লঞ্চ যথাসময়ে দোয়ারিকার ঘাট ছাড়ে। আমজাদ আলী নদীর ছোট্টছোট্ট ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবে—-টাকাগুলা পামু তো! কতবার আইতে হয় আল্লায় জানে।
তিন.
টাকা পাওয়া গেলো কিনা তা স্ত্রী জানতে চাইলে আমজাদ আলী কাপড় বদলাতে বদলাতে বলে, বেপারীর অসুখ, তার নৌকা চাউলসহ মেঘনায় ডুইব্বা গেছে। কারবার বন্ধ। তবে কইছে, সামনের হাটে অন্য নৌকা নিয়া চাউল কিনতে আবার আইবো। টাকা দিবো।’
‘হ, টাকা দিবো; দেইখো, এই টাকায় চারাগাছ অইবো, তবু টাকা পাওন যাইবো না।’ স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া।
বউয়ের কথায় আমজাদের গায়ে রাগ ধরে যায়। কিন্তু বউকে কিছু বলতে পারে না। পেটে ক্ষুধা। ভাত চেয়ে বলে, আগে ভাত খাই; তারপর সামনের হাট আসুক; দেহা যাইবো, টাকা না দিয়া কোথায় যায়? টাকা না দিলে মীরহাটের গুদিতে চুবাইয়া ধরমু না অ-রে। আমি ঐ গ্রাম চিন্না আইছি, চেয়ারম্যান মেম্বর ডাইক্কা সালিস বসামু; টাকা আদায় কইরা ছাড়মু; কষ্টের টাহা না?’
পারলে তা ভাল। তয়, দোয়ারিকা অনেক দূর। সেই খানে সালিস বসাইতে আবার টাকা লাগবো না?—স্ত্রীর মন্তব্য।
স্ত্রীর এই কথায় কান না দিয়ে আমজাদ আলী ডাল চরচরি ও আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে বসে যায়। স্ত্রী সন্ধ্যার আগে রাস্তা থেকে গরুটা আনার জন্যে রাজনকে ডাকতে বাইরে আসে। আজ ধান নিয়ে রাইস মিলে যাওয়ার তাড়া নেই। রাজন খেলতে গেছে। গোল্লাছুট ও দাড়িয়াবান্দা খেলা রাজনের খুব পছন্দ।
কয়েকদিন ধরে আবার বৃষ্টি। আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। বর্ষার দিন, রোদের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাতে কী? কুটিয়ালদের ধান সিদ্ধ করে তা থেকে নির্ধারিত দিনের মধ্যে চাল বের করতে হবে; সেই চাল হাটে বিক্রি করে দু টাকা লাভ করতে হবে, তবেই চলবেসংসার । গাথলার দিনে অর্থাৎ ঘন বৃষ্টি-বাদলের দিনে সিদ্ধ ধান শুকানোর জন্যে যখন রোদ পাওয়া যায় না, তখন কুটিয়ালদের স্ত্রী-মা-বোন ও কন্যারা ধান ওচার কাজে লেগে যায়। ওচা শব্দের অর্থ- তাফালে বা বড় লম্বা চুলায় বড় টিনে ধান দিয়ে দুই পাশে বসে চাল ভাজার মতো নাড়তে হয় এবং কড়া আগুনের তাপ দিতে হয়। তাতে এক সময়ে সিদ্ধ ধান শুকিয়ে মচমচ করে। একমণ ধান এভাবে ওচতে-ভাজতে প্রায় তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। দশমণ সিদ্ধ ধান ওচতে প্রায় দুইদিন যায়। এমন বর্বর খাটুনী খেটে বের করা চাল যদি কেউ বাকী নিয়ে টাকা না দেয়, তাহলে তারে কি মীরের হাটের গুদিতে চুবাইয়া মারতে হয় না? তাকে কি আল্লায় ক্ষমা করে?
ঘরে যে ধান আছে তা রোদের অভাবে টিনে দিয়ে ওচতে হবে। খোদেজা বেগমকে এই কঠিন কাজে সাহায্য করার আপন কেউ নেই। প্রতিবেশি কুলসুম কাজ করে দেয় খোজেদা বেগমের। বিনিময় একপেট খেতে পায়। বড়বড় জাহা-হাজি-আগউল ভরা ধান কুলসুম তুলতে পারে না; তবু সে চেষ্টা করে। কুলসুমের বাবা গরিব; বিবাহযোগ্য কুলসুমকে বিবাহ দেয়ার যেন কেউ নেই। আমজাদ আলীর ঘরে কাজের মেয়ে সে। রাতদিন খাটে । খোদেজা বেগমকে বড় ভাবির মতো ইজ্জত করে কুলসুম। কুলসুম এত কষ্ট করে এই ভাবনায় যে —-খোজেদা বেগমের ছোট ভাই রবিউলের বিবাহের কথা উঠছে। যদি তাকে পছন্দ হয়। রবিউল বেড়াতে আসলে কুলসুম বেশ সাজুগুজু করে। শিক্ষা নাই, কিন্তু বিবাহের বয়সে যৌবনের উত্তাপে কত কথাই না বের হয় কুলসুমের মুখ ফুটে। শুনতে ভালই লাগে রবিউলের।
ওচা ধানের চাল গুণে-মানে ভাল হয় না। বাজারেও তার দাম কম। আমজাদ আলীর এদাগে পঞ্চাশ টাকা লোকসান গুনতে হয়। তার মন খারাপ। তার উপর তমিজউদ্দিন কথা দিয়ে কথা রাখে নাই। দোয়ারিকার অন্য বেপারীদের কাছে জিজ্ঞেস করে তার সম্পর্কে কোনো ভাল খবর পাওয়া গেল না। যখন তিন টাকা এক সের চালের দাম, তখন ৮০০ টাকা বাকী পড়লে একজন কুটিয়ালের সর্বশান্ত হওয়ার কী আর বাকী থাকে?
চার.
পরপর চার হাট অপেক্ষার পর, আমজাদ আলী এবার তার ছোট ভাই রহমত আলীকে তমিজউদ্দিনের শশুড়ের বাড়ি গিয়ে উঠলো। শশুরের নাম রজব আলী দেওয়ান। জামাই যে চাল বোঝাই নৌকা হারিয়ে ধারদেনায় ডুবে গেছে তা তিনি বিলক্ষণ জানতেন। বাড়িতে তার বড় দুই ছেলে তোরাফ ও রহমত । তারাও পাওনাদার আমজাদ আলীকে বেশ সমাদর করে এবং তার অর্থকড়ি পরিশোধ করার আশ্বাস দেয় । রজব আলী দেওয়ান বুদ্ধিমান গ্রাম্য সালিস; বয়সের কারণে এখন আর বের হন না। তিনি আমজাদ আলীকে বশে রাখার জন্যে তার ছেলে রহমত ও আমজাদ আলীর ভাই রহমতের মধ্যে মিতা বা দোস্ত সম্পর্ক করার প্রস্তাব করে। আমজাদ আলী বাইরে যতটা কঠোরতা দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে তার মধ্যে একটা দরদী মন কাজ করতো।
তমিজউদ্দিনের শ্যালকের সাথে নিজের ভাইয়ের দোস্তি পাতানোর প্রস্তাবে আমজাদ আলী সহসা রাজী হয়ে যায় এই প্রত্যাশায় যে তার পাওনা টাকা একদিন উঠে আসবে। এখানে মেম্বর-চেয়ারম্যান এনে সালিসী করে টাকা আদায় করার চেয়ে আত্মীয়তার সুবাদে টাকা-পয়সার একটা সুরাহা করা ভাল হবে। অতঃপর দুইপক্ষের মধ্যে এখন গ্রামীণ রেওয়াজ মতো পরষ্পরের বাড়িতে একটু বেড়াতে না গেলে কেমন দেখায়? দুই রহমত পরষ্পর কোলাকুলি করলো। মিতা বলে পরষ্পরকে সম্বোধন করলো। এই বন্ধুত্ব ইহকালের সীমা ছাড়িয়ে পরকাল পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। প্রচলিত আছে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহপাক প্রত্যেকের জন্যে একজন দোস্ত আছে কিনা জানতে চাইবেন। সেই দিন এক দোস্ত, আর এক দোস্তের বড় উপকারে আসবে। কী সৌভাগ্যের কথা! রজব আলী দেওয়ান আমজাদ আলীর ভাই রহমতকে লক্ষ করে বললো, বাবা রহমত, আমি তোমারে আমার এই ছেলের মতই মনে করি। আশা করি তোমার বাবা বাঁইচা আছেন, তারপরও আমি তোমার বাবা হইয়া বললাম, যতদিন তোমরা জীবিত থাকবা, তোমাদের ছেলেমেয়েরা জীবিত থাকবে, ততদিন তোমরা আমার ছেলের মত এই বাড়িতে বেড়াইতে আসবা। আমার ছেলেমেয়েরাও তোমাদের বাড়ি বেড়াইতে যাইবে।’
হ, তালই সাহেব; আমরা আজ থেইকা পরষ্পরের আত্মীয় হইলাম। টাকাপয়সা দুই দিনের। আজ আছে কাল নাই। কিন্তু আত্মার আত্মীয় চিরদিনের। আপনারাও আমাদের বাড়িতে বেড়াইতে যাবেন। আমরাও আসমু। এখন দোয়ারিকা আমাগো একঘর আত্মীয় বাড়লো।’ রহমতের কথায় রজব আলী দেওয়ান অত্যন্ত খুশী হয়ে ঐ দিনই বাজারে বড় ছেলে তোরাফকে পাঠিয়ে বড় ধরনের বাজার করলো, মেহমানদের জন্যে বিরাট আয়োজন। বাড়ির কাছের কয়েকজন আত্মীয়কেও দাওয়াত করা হয় । বেশ ধুমধাম হয়। ঐ যাত্রায় আমজাদ আলী ও তার ভাই রহমত প্রায় দুই দিন সেখানে বেড়ায় । আত্মীয়তার বন্ধন পাকা হয়। রজব আলী তার জামাই তমিজউদ্দিনকে ডেকে বলে, যেভাবে হউক মিয়া, আমজাদ আলীর টাকার ব্যবস্থা কর; তার বউ ছেলেমেয়েকে না খাইয়ে রাইখা আমরা আত্মীয়তার বড়াই করতে পারমু না। এদের মতো ভাল মানুষ হয় না। তুমি আপন জামাই; আর আমজাদকে আমি ধর্ম জামাই ডাকছি। আমি মীরের হাট যাবো; আমজাদের স্ত্রী ও ছেলে মেয়েকে আনতে হবে। আমরা এই আত্মীয়তা তুচ্ছ মনে করি না।’
শশুরের কথার মর্ম বুঝে তমিজউদ্দিন বলে, নৌকা চাউলসহ ডুইবা না গেলে আমার কি এমন বিপদ হইতো । আল্লায় সহায় অইলে কারো দেনা আমি রাখমু না।’
পাঁচ
আমজাদ আলী দোয়ারিকায় বাকী টাকা আদায় করতে গিয়ে আত্মীয়তা পাতিয়ে প্রায় দশবারজনের একটি দলকে বাড়িতে দাওয়াত করে বেশ ধুমধামের সাথে আপ্যায়ন করলো। স্ত্রী খোদেজা বেগম এতে মন খারাপ করেনি। তারও আশা —হয়তো এই আত্মীয়তার সুবাদে বাকীপড়া টাকাগুলো উঠে আসবে। নতুন আত্মীয় হিসেবে রহমত আলী খোদেজা বেগমকে বড় গলায় আপা ডাকে; তার ছেলেমেয়েকে নিজের ভাগিনা-ভাগিনি ডেকে আপন করে নেয় সে। বড় ভাই তোরাফ থাকে বরিশালে। রহমত আলীরও কিছু কাজ-কারবার আছে বরিশালের চকবাজারে। নতুন আত্মীয়ের জন্যে রহমত আলী বরিশাল চকবাজার থেকে দামি শাড়ি-ব্লাউজ-জামা-কাপড় নিয়ে আসে। আমজাদ আলীও রহমতের ছোটবোন পিয়ারাকে বেড়াতে নিয়ে আসে; বানারিপাড়া বন্দর থেকে জামা-কাপড় কিনে দেয় তাকে। পিয়ারা ও তার ছোট ভাই টিটু দোয়ারিকা থেকে এবাড়িতে বেড়াতে আসে, বেশ কয়েকদিন থাকে। আবার যাবার সময় তারা সাথে করে রাজন ও তার ছোটবোন মিনুকে নিয়ে যায়। উভয়পক্ষের যাওয়া-আসায় আত্মীয়তা পাকা হতে থাকে।
একদিন খোদেজা বেগমের ছোট ভাই রবিউল পিয়ারাকে তাদের গ্রামের বাড়ি চন্দনাতে নিয়ে যায়। প্রজাপতি পাখা মেলে উড়তে পারলে যেভাবে আনন্দ পায়, পিয়ারাও রবিউলদের বাড়ি বেড়াতে গিয়ে সেই ভাবে আনন্দ পায়। রবিউলের বাবা নেই। বড় বোন খোদেজা বেগমই কর্তা। নতুন আত্মীয় কী খাবে, কোথায় ঘুমাবে তা খোদেজা বেগমকেই ছোট ভাইয়ের কানে কানে বাতলে দিতে হয়। বাবা মারা না গেলে রবিউলের মেট্রিক পরীক্ষা দেয়া হতো। এখন সে স্থানীয় বাজারে একটা টেইলার্সের দোকান দিয়েছে। তাতে সংসার চলে। মা ও ছোট এক ভাই নিয়ে রবিউলের সংসার। সমস্যা হলে বড়বোনই ভরসা।
চন্দনা থেকে পায় হেঁটে আমজাদ আলীর বাড়ি আসতে সময় লাগে ঘন্টা খানেক। মাঝখানে একটা বাজার। নাম নুরুল্লাপুর বাজার। বাজার সংলগ্ন একটা নামহীন বড় খালও আছে। খেয়া নৌকা ছাড়া লোকজন পারাপার হতে পারে না। তখন শীতের আরম্ভ। গ্রামের বাজারে বাজারে যাত্রাদলের প্যান্ডেল সাজানোর কাজ চলছে। রবিউল তার দুলাভাইয়ের বাড়িতে আসছে, সঙ্গে পিয়ারা। নুরাল্লাপুর বাজারের কাছে আদি দিপালী অপেরা দলের প্যান্ডেল দেখতে পেয়ে পিয়ারা বলে, আপনি যাত্রাগান দেখেন না?
দেখি।
আমাকে একদিন যাত্রাগান দেখাবেন?
রবিউল সহসা উত্তর দেয় না। পিয়ারাকে যাত্রাগান দেখাতে সে পারবে না তা নয়, কিন্তু তার ভগ্নিপতি ও বোন কী বলবে?
তোমাদের গ্রামের যাত্রাগানের দল আসে না?
আসে; কিন্তু আমাকে কেউ নিয়ে যায় না। যদি আপনি নিতেন, আমি যাত্রাগান শুনতাম।
আগামীতে যখন আইবা, তোমাকে আমি যাত্রাগানে নিয়া যামু।—- এই কথা বলতে বলতে রবিউল হাত ধরে পিয়ারাকে খেয়া নৌকা থেকে কুলে উঠতে সাহায্য করে। পিয়ারা রবিউলের হাত ধরে কুলে উঠতে উঠতে বলে, চন্দনা গ্রামটা খুবই সুন্দর। ইচছা করে এই গ্রামে থাইক্কা যাই।’
রবিউল পিয়ারার কথায় কী উত্তর দিবে ভেবে পায় না।
কিছু পথ হেঁটেই পিয়ারা প্রশ্ন করে, লেখাপড়া শেষ করলেন না কেন? একটা চাকরি করতেন, কত ভাল হইতো না?
রবিউল পিয়ারাকে ছোট্ট খুকী মনে করেছিল। কিন্তু পিয়ারা খুকী না। নবম শ্রেণিতে পড়–য়া গ্রামের মেয়ে পিয়ারা দেখতে যেমন সুন্দরী, তেমনি তার কথাবার্তাও বেশ মার্জিত। পিয়ারার মনের গভীরে কী আছে তা সে সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে পারলো না। তবে রসিকতার সুরে এটুকু বললো, দোয়ারিকা গিয়া কাম কী? একবারে থাইকা যাও, ব্যবস্থা করি।’
সত্যি কইতাছেন?
রবিউল নিঃশ্চুপ।
পিয়ারার মন রবিউলের প্রতি উতলা হওয়ার কারণ একটি—-রবিউল শান্ত, ভদ্র একটি যুবা পুুরুষ। অল্প শিক্ষিত মেয়ে ও ছেলের মনের কথা এই যে যাহাকে ভাল লাগিল তাহাকেই বিবাহ করিতে হইবে। দ্বিতীয় আর কথা নাই।
ছয়.
পিয়ারা রুপ ও চলন-বলন রবিউলকে আকৃষ্ট করে সন্দেহ নাই। রবিউলের প্রতি পিয়ারার মন দুর্বল তাও সত্য মনে হইতেছে। দোয়ারিকা ফিরে যাওয়ার আগে পিয়ারা একখানা চিঠি লিখল। তাতে কী লিখিল সে-ই জানে। কাগজখানা রাজনের মাধ্যমে রবিউলের হস্তগত হলো। একদিন রবিউল তার বোনের কাছে প্রস্তাব করে, বুয়া, যদি কিছু মনে না কর, পিয়ারাকে কি আমার জন্যে পছন্দ করা যায় না?
খোদেজা বেগম বুঝতে পারলো, পিয়ারাকে রবিউলের পছন্দ। ভাইকে একবাক্যে না করে দিতে তার ভাল লাগলো না। সে ছোট ভাইয়ের আব্দারের কথা স্বামীকে জানাইলে, আমজাদ আলী এক বাক্যে এই প্রস্তাব নাকোচ করে দেয়। কারণ ছয়-সাতমাস হয়ে গেলো তমিজউদ্দিন তার পাওনা টাকা দেয়ার কোন নাম করে না। আমজাদ আলী বউকে সাফ জানিয়ে দেয়, তজিমউদ্দিন আমার পাওনা টাকা শোধ না করা পর্যন্ত তার শালীর সাথে আমার শালার বিয়ার কথা হইতে পারে না।
দোয়ারিকা থেকে টিটু বেড়াতে আসে। এইবার আমজাদ টিটুকে তেমন যতœাদির মনোভাব দেখায় না। কিন্তু তার ছেলে রাজন টিটুকে পেয়ে আত্মহারা। উভয়ে সমবয়সী। টিটুর মারফত রবিউল পিয়ারার আর একখানা পত্র পাইল। পত্রের সারকথা এই যে, দোয়ারিকার মানিকদি গ্রাম ও চন্দনা গ্রাম অনেক দূর। যদি ভাইজান আমাদের সাথে আত্মীয়তা না করতেন, আপনাদেরকে চিনিতাম না। আপনার উপর আমার রাগ বা অভিমান করার অধিকার নাই। যদি সাহস করে প্রস্তাব করতে পারেন, আমি মাকে বলে আব্বাকে রাজী করাইতে চেষ্টা করিবো। আপনাদের চন্দনা গ্রামখানা আমার কত যে ভাল লাগে!’
রবিউল পিয়ারার দ্বিতীয় পত্র পেয়ে বোন খোদেজা বেগমকে সাফ জানিয়ে দেয় যে সে যদি বিবাহ করেই তাহলে পিয়ারাকেই বিবাহ করবে। ও দিকে রজব আলী দেওয়ান তার মেয়ের মনোভাব জানতে পেরে মেয়েকে মানিকদি গ্রামের আক্কাচ মাদবরের প্রবাসী ছেলে ফরিদের সাথে পিয়ারার বিবাহের কথা পাকাপাকি করে। পিয়ারা বাবার এই পরিকল্পনা জানতে পেরে সে তার মাকে সাফ জানিয়ে দেয়, যদি আমার বিবাহ হয়, তাহলে রবিউলের সাথেই বিবাহ হইতে হইবে।’
মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে রজব দেওয়ান আর দেরি করে না। ফরিদের বাবা আক্কাচ মাদবরকে খবর দেয়া হয়। আগামী শনিবার তার ছেলের সাথে পিয়ারার বিবাহ সম্পন্ন হবে। আক্কাচ মাদবর ছেলের বিবাহের উপলক্ষে বেশ কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করে। পিয়ারাদের বাড়িতেও বিবাহের আয়োজনে ধুমধাম পড়ে যায়। কিন্তু পিয়ারা তার সিদ্ধান্তে থাকে অটল ।
মানিকদি গ্রাম থেকে দোয়ারিকা লঞ্চঘাট দুই মাইল। নয়টার সময় বরযাত্রী আসবে। অন্ধকার থাকতে থাকতে একটা কালো বোরকা পরে পিয়ারা সবার চোখের অলক্ষ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলো। দোয়ারিকার লঞ্চ হারতার উদ্দেশ্যে ছাড়বে বেলা দুটার সময়। এতক্ষণ লঞ্চঘাটে পিয়ারার অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। তার বাপ-ভাই খোঁজ করতে নেমে পড়বে। যে নদীপথ লঞ্চে যেতে দুই ঘণ্টা লাগে, নদীর তীরবর্র্তী কাচা মাটির রাস্তা ধরে পায় হেঁটে যেতে সময় লাগে আট ঘণ্টা। প্রথম দোয়ারিকার ফেরিতে উঠে পিয়ারা শিকারপুর আসে। শিকারপুর থেকে উজিরপুর এবং উজিরপুর থেকে চতলবাড়ি ও ডাবেরকুলের রাস্তা ধরে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকে সে। নুরুল্লাপুর বাজারের কাছে খেয়া নৌকায় যখন সে উঠলো তখন তার শরীর দুর্বলতায় কাঁপতে থাকে। মনে সাহসও হয়। খেয়া থেকে নেমে সে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় চেনা পথ পেয়ে। অতঃপর আমজাদ আলীর বাড়ি এসে উঠে পিয়ারা। তখন প্রায় সন্ধ্যা।
ক্ষুধার্ত-ক্লান্ত বিধ্বস্ত পিয়ারাকে দেখে কিংকর্ব্যবিমূঢ় খোদেজা বেগম । আজমাজ আলী তখন বাড়িতে ছিলো না। পিয়ারার উপর রাগাত স্বরে খোদেজা বেগম কিছু একটা কর্কশ ভাষায় বলতে চাইছিল, তখন পিয়ারা দুই চোখের পানি ছেড়ে দেয়, হাত ধরে খোদেজা বেগমের। বলে, আপা, আমি যদি আপনার আপন বোন হইতাম, আপনি কি আমাকে আশ্রয় দিতেন না? আমি বাড়ি থেইক্কা পালাইয়া আইছি। আমি আর দোয়ারিকা ফিররা যামু না। বাবা এক বিদেশি পোলার সাথে বিয়া ঠিক করছে। ঐ পোলারে আমি চিনি না। যদি তাড়াইয়া দেন, আমি মীরের হাটের গাঙে ডুইবা মরমু; আপনি আমাকে রাখেন।’
ইতোমধ্যে আমজাদ আলী বাড়ি ফেরে। পিয়ারাকে দেখে সে অবাক হয়ে যায়। স্ত্রীর কাছ থেকে সব কিছু শুনে বিস্মিত হয় সে। পিয়ারাকে ধমক দিয়ে কিছুই বলে না। খোদেজা বেগম বলে, পাওনা টাকা আর পাবা না; পিয়ারা বানুকে পাইছ, রবিউলের জন্যে রাইখ্যা দাও, কুটিয়াল। কী আর করবা?’
পরদিন রবিবার হাটের দিন। দোয়ারিকা থেকে পিয়ারা বানুর বাবা ও ভাই তার খোঁজ নিতে আসার আগে মীরের হাট কাজী অফিসে পিয়ারা বানু ও রবিউলের বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *