আত্ম আলো – পর্ব ১৫ – দেবদাস কুন্ডু

[post-views]                                     [printfriendly]

===================================

 

এখন রাত কতো হবে? আলো জ্বালালো শীতাংশু ।একটা দশ।এখন কি গাড়ি পাওয়া যাবে? অবান্তর চিন্তা। কলকাতা শহরে রাতদিন বলে কিছু আছে নাকি। সে একটা উবের বুক করলো।

মেয়ে শিখিয়ে দিয়ে ছিল বটে। কত কিছু মানুষ পারে আবার কত কিছু পারে না। এই পারা না পারার মধ্যে ঝুলতে থাকে জীবন। জীবন কখনো এক জায়গায় গিয়ে শেল্টার নেয় না। নিতে পারে না। আমরা ভাবি কেন পারে না? কিন্তু জীবনেরও কিছু অসহায়তা থাকে। থাকে বিপন্নতা।

     আজ বড্ড উতলা শীতাংশুরashar মন। কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে মধুমিতার কিছু হয়েছে। প্রতিদিন ফোনে কথা হয়। কিন্তু সেদিন ভিডিও কল করেছিল। কি সুন্দর মুখ। চোখ দুটো গভীর সমুদ্রের মতো শান্ত। মনি দুটো পাখির চোখের মতো নীল। ঠোঁট দুটো  ফুলের মতো তাজা। যুবতী নয়। মুখে সময় দু একটা আঁচড় কেটেছে।

মুখে একটা পবিত্র ভাব। যেন এর আর্দশ জায়গা মন্দির। কিন্তু সে কি না – –

লাইফ ইজ মোষ্ট ইনসালটেড! সেদিন বলেছিল মধুমিতা, ‘শরীর খারাপ। ‘কি হতে পারে? করোনা?
না। অসুখ।

কি অসুখ?

ভেঙে বলেনি। শুধু বলেছিল, অসুখের কথা ভাবলে মনে হয় জীবনের আলো ফুরিয়ে এলো।
শীতাংশু বলেছিল, ‘আলো কোনদিন ফুরায় না। আমি মরে গেলে সব আলো নতুন শরীরে আশ্রয় নেবে। মৃত্যু হয় মানুষের।
ভুল বললে শীতাংশু। কষ্ট হচ্ছিল কথা বলতে মধুমিতার।

কি রকম?

মানুষের মৃত্যু হয় না। তাহলে এই পৃথিবীতে মানুষ নিশ্চিন্ন হয়ে যেতো। মৃত্যু হয় শরীরের।
কি রকম?
শরীর হলো কুঁড়ে ঘরের মতো। ঝড় উড়িয়ে নিয়ে যায় ।

বা:দারুন বললে তো।

তুমি ভাবছো আমি শরীর নিয়ে ব্যবসা করি। কি করে এইসব কথা বলছি। তাই তো?
হ্যাঁ।
ভুলে যেও না আমাদের কারবার শরীর নিয়ে। মানুষ নিয়ে নয়। কতো শরীরের মৃত্যু দেখলাম। মানুষ মরে কই?

আচ্ছা মানুষ বলতে তুমি কি বো্ঝো?

যার মধ্যে মান ও হুশ আছে।
আমি বলবো যার মধ্যে এটা নেই সেও মানুষ। কেন বলোতো?
কেন? মধুমিতা একটু ঝিমিয়ে পড়ছে।

সন্তান জন্ম দেয় নারী। সন্তান তো মানুষ। কিন্তু সমাজ তার ভিতর থেকে কেড়ে নিয়েছে মান ও হুশ। সে হয়েছে অমানুষ। কিন্তু তুমি তার সংগে মানুষের মতো ব্যবহার করো দেখবে সে খুব ভালো মানুষ।

কথাটা মন্দ বলো নি। রত্নাকর তো মানুষ হয়ে জন্মে ছিল। তারপর হলো দস্যু। সেখান থেকে আবার মানুষ।

      একটা বাইক ছুটে গেল সশব্দে। শীতাংশু চমকে উঠলো। বাইরে তাকালো। রাতের কলকাতা এর আগে দেখে নি সে। শহরে বাড়ি গুলো ঘুমাচ্ছে। রাস্তা নির্জন ।কিছু কিছু  রাস্তা দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল।

কিছু রাস্তা তমসার মতো। এখন একটা পাতা পড়লে শব্দ হবে। এতোটাই নি:শব্দ। ভাবা যায় না এই শহরটা সারাদিন কতো প্রবল শব্দের মধ্যে থাকে। দিনের সংগে মেলানো যায় না রাতকে। দিনে হাটের হৈ চৈ। রাতে শ্মশানের নিস্তবদ্ধতা। তাই কি এক কবি বলেছিল, একটা কলকাতার মধ্যে আরো অনেক কলকাতা। কবির কি সাংঘাতিক উপলব্ধি। ভাবা যায়! কবি হলো ঈশ্বর ।অথচ মর্যাদা দেয় না সমাজ পরিবার দেশ রাষ্ট্র। আর পাঁচটা মানুষের মতো তাকেও পেটের টানে ছুটতে হয়। সৃষ্টির অবকাশ কই তার?

এখন ওর নাইট ডিউটি চলছে। একদিকে ভালো হয়েছে। না হলে ওর প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো। প্রশ্ন এলেও সে উত্তর দিয়ে বেরিয়ে আসতো। গত এক সপ্তাহ হলো ফোন করছে না ফোন ধরছে না মধুমিতা । তবে কি সত্যি মধুমিতার কিছু হলো? বড় কোন অসুখ। যার পরিনতি অবধারিত মৃত্যু। জীবনের তো কোন গ্যারান্টি হয় না। কোন ডিড হয় নি কতো বছরের লিজ নিয়ে তুমি এখানে এসেছো।

এতোদিন মধুমিতার জন্য উতলা হয়নি মন। কিন্তু সেদিন ভিডিও কলে দেখে সে চমকে উঠেছিল। চেনা। চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছি? কিন্তু দেখেছি। কথা হয়েছে। কে এই মেয়েটা?

কোন দিকে যাবো স্যার?

সচেতন হয়ে উঠলো শীতাংশু। বলল, ‘বাঁ দিকে চলো।পাঁচ নম্বর মসজিদ বাড়ি স্টীট।

    একটু আগের নৈশব্দের কলকাতা এখানে ভেঙে খান খান। দোকানপাট সব খোলা। লোক গিজ গিজ করছে। কোন বাড়ি থেকে চটুল গান ভেসে আসছে। পাখির মতো দুটো হাত মেলে টলতে টলতে লোক আসছে যাচ্ছে। হৈ চৈ। চিৎকার। কে বলবে এখন রাত দুটো।

    পাঁচ নম্বর মসজিদ বাড়ি স্টীটে এসে দাঁড়াল উবের।


চলবে …..

 

 

আপনার মতামত এর জন্য

[everest_form id=”3372″]

দেবদাস কুণ্ডু

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top