আসগর আলী এবং রাহেলা বেগমের অনুভূতি যেখানে সমান্তরাল

ভর সন্ধ্যায় গ্রামের এ চায়ের দোকানটিতে লোক সমাগম বেড়ে যায়। সারাদিনের ক্লান্তি জুড়ানোর তীর্থ গাজলু মিয়ার এ চায়ের দোকান। গ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় দোকান এটি। গ্রামের প্রায় সকল শ্রেণী ও বয়সের লোকই ভিড় করে এখানে। এ ভিড় যতটা না চায়ে চুমুক দেয়ার জন্য, তার চেয়েও বেশি আড্ডা জমানোর জন্য। যত সংখ্যক লোকের সমাগম ঘটে গাজলুর দোকানে সে তুলনায় বেচা-বিক্রি কম। কেবল চেয়ারগুলো দখল হয়ে থাকে আর সোহেল নামের পিচ্চিটার দিকে একের পর এক হুকুম আসে, ‘ওই পিচ্চি, এক গেলাস পানি দিয়া যা!’ পানির কোনো দাম নাই, পানি পানে তাই লোকেরা কোনো কার্পণ্য করে না! গাজলুর দোকানে সবচেয়ে বেশি অর্ডার আসে ‘এক গেলাস’ পানির! কেবল সন্ধ্যা থেকে রাত দশটার ভেতরে তার দোকানে এক ড্রাম পানি শেষ হয়ে যায়! সেখানে চা বিকোয় মাত্র দশ-বারো কাপ! গাজলু প্রায়ই বিড়বিড় করে, ‘প্রতি গেলাস পানি এক টাকা কইরা নিতে লাগলে কেউ আর পানি খাইতে চাইবো না!’ তারপর আওয়াজ তুলে ঘোষণা করে, ‘আইজ থেইকা প্রতি গেলাস পানি এক টাকা! দেখি কে কত পানি খাইতে পারে!’ গাজলুর সে ঘোষণার তোয়াক্কা কেউ করে না! গাজলু খুব বিরক্ত হয়। বিরক্তি সে লুকোয় না। যে টেবিলে ঘণ্টাখানেক ধরে একটা দল আড্ডা দেয়, গাজলু তাদের তাড়িয়ে দেয়। তারা অবশ্য চলে যায় না, দোকানের একপাশেই দাঁড়িয়ে থাকে এবং সুযোগ বুঝে আবার টেবিল দখল করে ফেলে। দোকানের বাইরে এমনিতেই ভিড় থাকে। দোকানের ভেতরে মাঝারি সাইজের মোট ছয়টা টেবিল, প্রতি টেবিলের দুপাশে ছয়টা করে চেয়ার, যত লোক এখানে সমাগত হয় সে তুলনায় তা কিছুই না! অনেককেই তাই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

প্রতিদিনের মতোই সব চলছিল। চেয়ার-টেবিল দখল করে আড্ডা চলছিল। গাজলু উঠে এসে তাড়িয়ে দিচ্ছিল। তাড়া খেয়ে লোকগুলো কিংবা ছেলেগুলো দোকানের বাইরে কোনো একপাশেই অবস্থান করছিল। সোহেলের কাছে ‘এক গেলাস’ পানির হুকুম আসছিল একের পর এক। প্রতিদিনের মতোই সব চলতে থাকতো হয়তো, যদি না দোকানের একপাশের চেয়ারে এসে বসতো আসগর আলী!

আসগর আলী এসে বসার পর প্রায় সকলেরই নজর পড়ে সেদিকে। আসগর আলীকে দেখে অধিকাংশেরই ‘চেনা চেনা লাগে, তবু অচেনা’ ধরনের অনুভূতি হয়! যার ফলে প্রায় প্রত্যেকের মুখ কিছুটা হা হয়ে থাকে। আড্ডাবাজদের চলতে থাকা গুঞ্জন প্রথমে থেমে কিছু মুহূর্ত পরে আবার শুরু হয়। কেউ-ই ঠিক চিনতে পারে না আসগর আলীকে। অথচ আসগর আলী এই গ্রামেরই লোক। প্রায় দশ বছর পর সে ফিরে এলো গ্রামে। প্রায় দশ বছর আগে হঠাৎ করেই আসগর আলী উধাও হয়ে গিয়েছিল।

আসগর আলীর এমন কোনো বিশেষত্ব ছিল না, নিরীহ-গোবেচারা আসগর আলীর তেমন কোনো পরিচিতিও ছিল না। বিশেষ কিছু একটা করতোও না সে, কামলা খেটে বেড়াতো মানুষের বাড়িতে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময় কেউ তাকে সালাম ঠোকা তো দূরের কথা নিকট বন্ধু-স্বজন ছাড়া কেউ তার সাথে কুশল বিনিময়ও করতো না। নিতান্তই যদি কোনো কাজে তাকে দরকার পড়তো তবেই কেবল চলতি পথে কেউ কেউ তার নাম ধরে হাঁক ছাড়তো আর বলতো, ‘আরে, আসগর মিয়া, তোমারেই তো খুঁজতেছি! কাইল একবার বাড়িত আইসো। কিছু কাম করা লাগবো।’

আসগরের নামে মিয়া নেই, আছে আলী। নামে মিয়া থাক বা না থাক গ্রামের অধিকাংশ পুরুষেরই প্রচলিত পদবি ‘মিয়া’। আর আসগর আলীর মতো নিরীহ-গোবেচারা মানুষদের নাম-পদবি বিশেষ একটা গুরুত্ব বহন করে না। আসগর আলীরা তাই কখনো আসগর মিয়া হয়ে যায়, কখনো হয়ে যায় আসগরর‌্যা!

প্রায় দশ বছর আগে হঠাৎ করেই আসগর আলী গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যায়। যেহেতু সে বিশেষ কেউ ছিল না, সেহেতু বিষয়টা প্রথমে কারো নজরে আসে নি। কিন্তু বেশ কিছুদিন পেরিয়ে যাবার পর কোনো এক সন্ধ্যায় গ্রামের এই চায়ের দোকানের জমাট আসরে কেউ একজন যখন বলে ওঠে, ‘আচ্ছা, আসগররে ম্যালা দিন দেখতেছি না! কাহিনিটা কী, কেউ কইতে পারেন!’ তখন উপস্থিত সকলেরই মনে পড়ে গ্রামে আসগর নামে এক লোক ছিল, অনেকদিন হলো তাকে দেখা যাচ্ছে না! এরপর দু-চারদিন আলোচনায় থাকে আসগর, খোঁজ-খবর হয়। তারপর একসময় সবাই ভুলেই যায় যে আসগর নামে কেউ একজন ছিল এই গ্রামে!

উধাও হওয়ার দশ বছর পর আজ হঠাৎ আসগর আলীকে দেখে কেউ আর তাই চিনতেই পারে না! যেহেতু বিশেষ কেউ ছিল না, এবং দীর্ঘসময় যেহেতু তাকে দেখা যায় নি সেহেতু গ্রামের মানুষের স্মৃতির তলানিতে গিয়ে পড়েছিল আসগর আলী। স্মৃতির তলানি থেকে আসগর আলীকে খুঁজে আনতে তাই সময় লাগে! আর খুঁজে পাওয়ার পর স্বভাবতই একটা উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, ‘আরে! আসগর মিয়া না!’

আসগর আলী মুচকি হেসে মাথা নেড়ে হ্যাঁ-সূচক জবাব দেয়।

পাশ থেকে কেউ একজন আরো স্পষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বলে, ‘তুমি কি আমগো সেই আসগর মিয়া!’

আসগর আলী এবারও মুচকি হেসে মাথা নেড়ে হ্যাঁ-সূচক জবাব দেয়।

কেউ কেউ অবশ্য স্মৃতির কোনো স্তরেই আসগর আলীকে আর খুঁজে পায় না! পাবার কথাও না, এখানে যারা এখন আড্ডা দেয় তাদের অধিকাংশই দশ বছর আগে হাফ প্যান্ট পরে মার্বেল খেলতো! আবার তখন যারা আসগর আলীকে চিনতো বা ন্যূনতম জানাশোনা ছিল তাদের অনেকেরই এখন বয়স হয়েছে, এসব আড্ডায় তারা আর তেমন সামিল হয় না! সুতরাং, আসগর আলীর সাথে অধিকাংশেরই স্মৃতিগত সম্পর্ক নেই! কিন্তু তাতে আসগর আলীকে নিয়ে কৌতূহল-আগ্রহ কমে না, বরং আরো বেড়ে যায়।

উপস্থিত সকলেই আসগর আলীতে মনোযোগী হয়। এতদিন কোথায় ছিল, কী করতো, কেনই বা এমন উধাও হয়ে যাওয়া—নানান কৌতূহলী প্রশ্নবাণে আসগর আলী বিদ্ধ হতে থাকে। কৌতূহল আরো বাড়িয়ে দেয় তার ডানহাত, যে হাতটি কবজির নিচ থেকে কাটা! যে সময় সে উধাও হয় সে সময় তার হাত কাটা ছিল—এমনটা কেউ মনে করতে পারে না! কৌতূহলী হয়ে লোকেরা আসগর আলীর দিকে তাকিয়ে থাকে!

আসগর আলীকে বিচলিত দেখায় না। খুব শান্ত-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে প্রত্যেকের কৌতূহল মেটাতে সচেষ্ট থাকে।

আসগর আলী তার নিরুদ্দেশকালের যে বৃত্তান্ত বর্ণনা করে তার সার-সংক্ষেপ এরকম—গ্রামে তার বিশেষ একটা মর্যাদা ছিল না, কামলা খেটে আয়-রোজগারও বিশেষ একটা হতো না বলে সে ঠিক করে শহরে চলে যাবে। কাউকে কিছু না জানিয়ে নীরবেই সে শহরের পথে রওনা হয়। শহরে যাওয়ার পথে এক ডাকাত দলের সাগরেদের সাথে আসগর আলীর পরিচয় হয়। কথায় কথায় ডাকাত দলের সাগরেদের সাথে ভাব হয়ে যায় আসগর আলীর। আসগর আলীর অবস্থার কথা শুনে ডাকাতের সাগরেদ তাকে দলে যোগ দেয়ার প্রস্তাব করে। আয়-রোজগার তো হবেই, বদলাবে অবস্থাও। কারো হুকুমের গোলাম হয়ে থাকতে হবে না আর, কেউ আর তাচ্ছিল্য করতে পারবে না, উল্টো সালাম ঠুকবে, সমীহ করবে। গোনায় ধরবে সবাই—সম্মান করে না হোক, অন্তত ভীত হয়ে! আসগর আলীর ভালো লাগে ব্যাপারটা। কিন্তু সাহসে কুলোয় না! জীবনে কারো সাথে মারামারি তো দূরের কথা, ঝগড়া-বিবাদেও জড়ায় নি কখনো, ধমক দিয়ে কথা বলে নি কাউকে! কেউ লাগতে এলেও না! মার খেয়েছে, তবুও মুখ খোলে নি! কামলা খাটতে গিয়ে কতদিন মালিকের কটু কথা শুনতে হয়েছে, গিলতে হয়েছে লাথি-ঘুষি! তবু প্রতিবাদী হয়ে ওঠে নি আসগর আলীর কণ্ঠ! মুখ বুজে সব সহ্য করার দক্ষতার জন্য যদি কোনো পুরস্কারের চল থাকতো তবে সে পুরস্কার আসগার আলী ছাড়া আর কারো হাতে উঠতো না! সে মানুষ করবে ডাকাতি! আসগর আলী নিজেই নিজের ভেতরে চমকে ওঠে! প্রথমে সে তাই সায় দেয় না। কিন্তু ডাকাত সাগরেদের কথাগুলো মাথায় ঘুরতে থাকে। টাকা হবে, মানুষের সালাম মিলবে, কারো গোলামি করতে হবে না—এমন সুযোগ কি সে আর সহজে কখনো পাবে! আমতা আমতা করে তাই শেষ পর্যন্ত বুক টান করে দাঁড়িয়ে যায় আসগর আলী। হয়ে যায় ডাকাত দলের সদস্য!

অবশেষে আসগর আলীর টাকা হয় ঠিকই, কিন্তু মাঝখান থেকে হারাতে হয় ডানহাতের কবজি! বছর খানেক আগে এক রাতে ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে যায় তাদের দল। গ্রামের লোকেরা আগে থেকে টের পেয়ে যায় ডাকাতের আগমনের কথা। গ্রামের লোকেরা তাই রাম-দা, বটি, লাঠিসোটা নিয়ে ওঁৎ পেতে ছিল। গ্রামের লোকের তাড়া খেয়ে কোনোরকমে জান নিয়ে ফিরতে পারলেও কোনো এক যুবকের রাম-দায়ের এক কোপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আসগর আলীর ডানহাতের কবজি! এরপরে সে আর কোনো ডাকাতিতে সঙ্গী হয় নি। জানের ভয় ঢুকে যায়। তবু দলের আস্তানাতেই থাকতো। একসময় তার দল তাকে ছেড়ে দেয়—এই জন্য যে, এক হাত অকেজো অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার কোনো প্রয়োজন নেই। ভালো টাকা জমেছে, নিজে কিছু করে-কর্মে খাওয়া ভালো। তাই দল থেকে বেরিয়ে শহরে কয়েক মাস ঘুরে বেড়িয়ে নিজ গ্রামে ফিরে এলো আসগর আলী।

আসগর আলীর এ কাহিনি প্রথমে অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করলো না! বানানো গল্প মনে হলো! আসগর আলীর মতো নিরীহ-গোবেচারা একটা লোক করবে ডাকাতি! কোনোভাবেই তা বিশ্বাস করা যায় না! কিন্তু চোখের সামনে জলজ্যান্ত কাটাহাত¬-—কিছুটা হলেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করে! যদিও এখানেও বিকল্প যুক্তি দাঁড় করানো যেতে পারে। নিশ্চয় অন্য কোনো কুকর্ম করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। তাই এতোদিন পালিয়ে ছিল! কিন্তু এ যুক্তি ধোপে টেকে না বেশিক্ষণ। আসগর আলীর বেশভুষাই বলে দেয়, তার পকেটের অবস্থা ভালোই। সেটা নিশ্চয় এমনি এমনি আসে নি।

তারপরও ব্যাপারটা অমীমাংসিত থেকে গেলো। শক্তভাবে বিশ্বাস করা গেলো না যে, আসগর আলীর মতো নিরীহ-গোবেচারা একটা মানুষ গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার পর ডাকু হয়ে ফিরে এসেছে! তবু, আসগর আলীকে আর ঘাটানো হলো না। অমীমাংসিতভাবেই আজকের মতো ক্ষান্ত দেয়া হলো।

অন্যদিনের চেয়ে ব্যতিক্রমী সময় কাটলো গ্রামের লোকেদের। পুরোটা সময় আলোচনার কেন্দ্রে থাকলো আসগর আলী। যাকে কেউ কখনো গোনায় ধরতো না, সে মানুষটা আজ গ্রামের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেলো! যে গাজলু তার দোকান থেকে লোক তাড়িয়ে দেয় সে গাজলুও আগ্রহী-কৌতূহলী হয়ে বসে পড়েছিল আসগর আলীর সামনে। আসগর আলীকে এককাপ চা-ও খাওয়ালো ফ্রিতে! ব্যাপারটা কেমন যেন একটা উৎসবের আমেজ তৈরি করে দিয়েছিল!

রাতের ভেতরেই সারা গ্রামে রটে গেলো আসগর আলীর কাহিনি। পরের দিন দুপুরের ভেতরে রটে গেল আশেপাশের গ্রামেও। লোকজন দলবেঁধে আসতে লাগলো আসগর আলীকে দেখতে, আসগর আলীর কাটাহাত দেখতে!

পরের কয়েকদিনে ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হয়ে গেলো যে আসগর আলী আর মামুলি কেউ নেই। তার চাল-চলন হাবভাব স্পষ্ট করে দিতে লাগলো যে সে মোটা মাল-পানি কামিয়েই ফিরেছে। তারপরও তার ডাকাতির বিষয়ে যেটুকু সংশয় ছিল সেটাও দূর হয়ে গেলো যখন সে ভরা বাজারে দুইজনকে পেটালো! কী ঘটেছিল কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারে নি, আকস্মিকভাবে ঘটেছিল ব্যাপারটা, লোকজন অবাক হয়ে শুধু দেখলো—আসগর আলী একহাতে চার হাতের দুইজনকে পিটিয়ে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো! মানুষের আর বিশ্বাস করতে আপত্তি থাকলো না যে, এই আসগর আলী নিরীহ-গোবেচারা সেই আসগর আলী না, এইটা ডাকু আসগর আলী!

স্বভাবতই আসগর আলীকে লোকেরা সমীহ করা শুরু করলো। সালাম ঠোকা শুরু করলো। গায়ে পড়ে কেউ আর আসগর আলীর সাথে লাগতে যায় না। আসগর আলী চায়ের দোকানে এলে তাকে চেয়ার-টেবিল ছেড়ে দেয়া হয়। আসগর আলীর ব্যাপারটা খুব ভালো লাগে। সে সবার সাথেই স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখে। সহজে মেজাজ দেখায় না। তবে, চেহারায় একটা ভারিক্কি ভাব ফুটিয়ে রাখে। মাত্র কয়েকদিনেই সে পাবলিক ফিগারে পরিণত হয়।

কিন্তু এর মধ্যেও কিছু লোক থাকে যাদের ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে প্রবল আপত্তি। এই আপত্তিটা তারা লুকোয় না। বরং অবিশ্বাসী কণ্ঠে আসগর আলীর কাছে খুটিয়ে খুটিয়ে জানতে চায়—‘সত্য কইরা কও তো আসগর মিয়া, তুমি কি আসলেই ডাকাত দলে ছিলা! সত্যই ডাকাতি কইরা বেড়াইতা!’

আসগর আলী অস্থির হয় না, উত্তেজিতও হয় না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের জবাব দেয়। জবাবে তারা সন্তুষ্ট হয় না, আরো খুটিয়ে খুটিয়ে জানতে চায়—‘আমার কিন্তু ঠিক বিশ্বাস ঠেকতিছে না! তোমার মতো একটা লোক ডাকাতির করার মতো হিম্মত রাখতে পারে! দেখো মিয়া, হুদাই গুল-পট্টি মাইরা বেড়াইও না! সত্য কিন্তু চাপা থাকে না, একদিন না একদিন বাহির হইয়া আসবি!’

আসগর আলী তবুও হতাশ হয় না, বিচলিত হয় না। অবিশ্বাসী লোকগুলোকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে। তারা সন্তুষ্ট হয় না বা হতে চায় না। তারা নানারকম যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়! সেদিন যেমন গাজলুর দোকানেই তারা আলোচনার মাধ্যমে কিছু সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, ‘আসগর নিশ্চয় কোনো আকাম করতে গিয়া হাত কাটছে! তারপর চুপেচাপে গ্রাম থেকে পালায়া শহরে গিয়া ভিক্ষা করছে! শুনছি শহরে ভিক্ষা কইরা অনেকে বড়লোক হইয়া যায়! আসগরের কাটাহাতের কারণে তার জন্য আরো সহজ হইছে! এভাবে ভিক্ষা কইরা টাকা কামাইয়া আসছে সে! ডাকাতি-ফাকাতি ওইসব কিছু না!’

কেউ একজন বলে, ‘কিন্তু গ্রামে কোনো আকাম কইরা হাত কাটলে মাইনষে কি জানতো না? আমরা জানতাম না!’

‘কিন্তু সে তো কাউরে কিছু বইলা বা জানায়া যায় নাই, পালায় গ্যাছে! কোনো আকাম না করলে কি কেউ পালায়া যায়!’

‘হইতে পারে রোজগারের জন্য শহরে গেছিল। গ্রামে কেউ যখন তারে গুনতো না, তার তো কেউ ছিলও না, তো আর কারে বইলা যাইবো! আর হইতে পারে শহরে এক্সিডেন করছে, তারপর হাত কাটা পড়ছে!’

‘ঠিক কথা! হইতেই পারে! কিন্তু শহরে গিয়া কাটাহাত নিয়া ভিক্ষা কইরা টাকা কামাইছে এইটা নিশ্চিত!’

‘তাইলে সেদিন যে বাজারে মারামারিটা করলো! এতো সাহস আগে তো ছিল না আসগরের!’

‘ওইটার মইধ্যেও ঘাপলা নাই কে কইতে পারে! যেহেতু তার পকেটে টাকা আছে, এমন তো হইতেও পারে যে, ওই লোক দুইটারে সে কিছু টাকা দিয়া একটা নাটক সাজাইছে!’

যুক্তিগুলো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে যায় তাদের মাঝে। তাদের আলোচনায় স্পষ্ট বোঝা যায়, আসগর আলীর কাটা হাতের ইতিহাসের চেয়ে তাদের কাছে ডাকাতির বিষয়টা মুখ্য। হাত যেভাবেই কাটুক, তারা আসগর আলীকে ভিক্ষুক মানতে রাজি আছে, কিন্তু ডাকু নয়! আসগর আলীর কানেও আসে কথাগুলো। বিষয়গুলো নিয়ে আসগর আলীর ভেতরে কোনো অস্থিরতাই কাজ করে না। বরং এই অবিশ্বাসী লোকগুলোকে আসগর আলী বিশেষ পছন্দ করে। আসগর আলী নিজেও চায় না এই লোকগুলো বিষয়টা বিশ্বাস করে ফেলুক। এই অবিশ্বাসী লোকগুলো ঘুরে-ফিরে বিষয়টা আলোচনায় নিয়ে আসে। তাকে বারবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনে লোকগুলো। আসগর আলীকে নিয়ে আলোচনা চলছে, বিষয়টা তার খুব ভালো লাগে। আসগর আলী খুব উপভোগ করে বিষয়টা। আসগর আলী তাই অবিশ্বাসী লোকগুলোর ওপর ক্ষিপ্ত হয় না।

বিশ্বাসী লোকগুলোও আসগর আলীকে নিয়ে আলোচনা করে, আসগর আলীর কাছে আগ্রহ নিয়ে ডাকাতির গল্প শুনতে চায়। আসগর আলী তাদের চেয়েও অধিক আগ্রহ নিয়ে ডাকাতির গল্প শোনায়। তবে বিশ্বাসী লোকগুলো কেবল আসগর আলীর সামনেই তাকে নিয়ে আলোচনা করে, আর অবিশ্বাসীরা আলোচনা করে সামনে-পেছনে দুভাবেই। আসগর আলীর এই আলোচনাটা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে অবিশ্বাসী লোকগুলোর বদৌলতেই। ডাকাতির গল্প একদিন ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু অবিশ্বাসী লোকগুলোর সন্দেহ এতো সহজে মিলিয়ে যাবে না! এ কারণেই অবিশ্বাসী লোকগুলোকে আসগর আলীর বিশেষ পছন্দ। আসগর আলী তো জানেই, অবিশ্বাসী লোকগুলো আড়ালে ‘পুরাই গুল মারতিছে! ডাহা মিথ্যা!’—এই ধরনের মন্তব্য প্রায়ই করে! আসগর আলী তাতে কিছুই মনে করে না। পুরো ব্যাপারটাই সে বেশ উপভোগ করে!

গ্রামে আসগর আলী তার সংসার গোছানো শুরু করলো। পুরোনো ভিটেটা ছিলই, ওখানে দালান বাড়ি উঠে গেলো। কিছু জমি কিনে নিল। তারপর নিজেই চাষবাস শুরু করল। ইহকুলে আসগর আলীর কেউ নেই। বিয়েও করা হয় নি এখনো। এই সুযোগে সে কাজটাও সেরে ফেললো! গ্রামের মেম্বারের জামাই হয়ে গেল আসগর আলী।

প্রতি সন্ধ্যায় গাজলুর দোকানে রীতিমতো আসর বসে আসগর আলীকে নিয়ে। লোকেরা খুব আগ্রহ নিয়ে আসগর আলীর ডাকাতির নানা গল্প শুনতে চায়। আসগর আলী তাদের হতাশ করে না। প্রতিদিন নতুন নতুন কাহিনি শোনায়। তার প্রতি লোকেদের এই আগ্রহটা আসগর আলী খুব উপভোগ করে।

গাজলুর দোকানে বিক্রি-বাট্টা বেড়ে গেছে আগের তুলনায়। গাজলুর ধারণা, আসগর আলীর জন্যই অবস্থার এই পরিবর্তন। শুকনো মুখে তো আর গল্পের আসর জমে না! এ কারণে তার দোকানে আসগর আলীকে নিয়ে যখন আসর বসে গাজলু তখন আর কাউকে তেড়ে যায় না! বরং নিজেও সে আসরে আসগর আলীর কাহিনি উপভোগ করে।

রাহেলা বেগমের গরুটা সন্ধ্যার পরেও বাইরেই বাঁধা থাকে। প্রায় দিনই গরুটা গোয়ালে তুলতে রাত হয়ে যায়। রাতে গরু তোলার সময় প্রায় দিনই আসগর আলীর সাথে দেখা হয়ে যায় রাহেলা বেগমের। চায়ের দোকানে আড্ডা শেষে এ পথ দিয়েই ফিরতে হয় আসগর আলীকে। রাহেলা বেগমকে দেখলে আসগর আলীর অস্থিরতা বেড়ে যায়। সে খুব দ্রুতই রাহেলা বেগমকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চায়। রাহেলা বেগমকে দেখলে আসগর আলীর ডানহাতের কাটা অংশে চিনচিনে একটা অনুভূতি হতে থাকে। এ অনুভূতি আসগর আলীর জন্য খুবই যন্ত্রণাদায়ক। সে রাহেলা বেগমের সামনে তাই বেশিক্ষণ থাকতে চায় না।

আসগর আলীর কাটা হাতটার দিকে তাকালে রাহেলা বেগমেরও অস্থিরতা বেড়ে যায়। রাহেলা বেগম আসগর আলীর দিকে সরাসরি তাকাতেই পারে না! যত দ্রুত সম্ভব গরু তুলে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যেতে চায়। গ্রামের আর সবার মতো রাহেলা বেগমেরও আসগর আলীর কাটা হাতের প্রতি কৌতূহল আছে। কৌতূহলটা আর সবার চেয়ে অবশ্য ভিন্ন। আসগর আলীর কাটাহাতটা দেখলে বা হাতটার কথা মনে পড়লে রাহেলা বেগমের সে রাতের কথা মনে পড়ে যায়।

রাহেলা বেগম তখন ব্যাপারির বাড়িতে কাজ করে। মাস ছয়েক আগে মারা গেছে তার স্বামী। তিন বছর বয়সি ছেলে আর দুই বছর বয়সি মেয়ে নিয়ে তখন রাহেলা বেগমের মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁয় নেই। ব্যাপারির বাড়িতে কাজ জোটে রাহেলা বেগমের, থাকার ব্যবস্থাও হয়। কিন্তু ব্যাপারির বাড়িতে অতিরিক্ত ঘর না থাকায় বারান্দার একপাশে রাতে শোবার ব্যবস্থা করা হয়। বারান্দার অংশটা একটা কাপড় দিয়ে ঘিরে দেয়া হলেও সেটাকে উন্মুক্ত আবাসই বলতে হয়।

প্রথম প্রথম আতঙ্কে রাত কাটলেও কিছুদিনের ভেতর অভ্যস্ত হয়ে পড়ে রাহেলা বেগম। রাহেলা বেগম সিথানের পাশে একটা রামদা নিয়ে ঘুমাতো। অভ্যস্ত হয়ে পড়ার পর নিশ্চিন্ত ঘুমের একরাতে রাহেলা বেগমের আতঙ্ক সত্য হয়ে আবির্ভূত হয়। গভীর ঘুমের ভেতরে রাহেলা বেগম তার বুকের বামপাশে একটা হাতের স্পর্শ ও চাপ অনুভব করে। হাতটি যখন বুকের বামপাশ দুমড়ে-মুচড়ে দিতে থাকে, রাহেলা বেগমের ঘুমটা তখন ভেঙে যায়। রাহেলা বেগম পাশ ফিরে শুয়ে ছিল। ঘুম ভাঙতেই সে এদিক-ওদিক কোথাও না তাকিয়ে এক ঝটকায় রামদা বের করে পেছন ফিরে কোপ বসিয়ে দেয়। কোপটা কোথায় পড়লো না পড়লো সেটা রাহেলা বেগমের বিবেচনায় ছিল না! কোপাটা দেয়ার পর চাপা একটা আর্তনাদ কানে এলো রাহেলা বেগমের। তারপর দেখতে পেল অন্ধকারের ভেতর একটা ছায়ামূর্তি দৌড়ে চলে যাচ্ছে। চাদর দিয়ে শরীর ঢাকা ছিল ছায়ামূর্তিটার। রাহেলা বেগম এক ঝলকের জন্যও দেখতে পায় নি কোনো মুখ, চাদরে ঢাকা থাকার কারণে পেছন থেকে কোনো শরীরের গড়নও বোঝা যায় নি, তাই বোঝার কোনো উপায় ছিল না কে ছিল লোকটা! কেবল দেখতে পেলো তার পাশে একটা হাতের কবজির নিচের অংশ পড়ে আছে। হাতটা ছিল ডানহাত!

রাহেলা বেগম অবশ্য নিশ্চিত নয় সে রাতের ছায়ামূর্তিটা আসলে আসগর আলীই ছিল কিনা। সেটা নিশ্চিত হওয়ার তো কোনো সুযোগও নেই। আসগর আলীর কাছে গিয়ে তো সে আর জিজ্ঞেস করতে পারে না—‘আচ্ছা, সে রাতে আপনিই কি আমার বুকে হাত দিয়েছিলেন!’ রাহেলা বেগমের তাই নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। তবুও আসগর আলীকে দেখলে রাহেলা বেগমের অনুভূতিটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। রাহেলা বেগমকে দেখলে চিনচিনে যে অনুভূতিটা হয় আসগর আলীর কাটাহাতের মাথায়, আসগর আলীর কাটাহাতটা দেখলে একই অনুভূতি হয় রাহেলা বেগমের বাম স্তনের বোঁটায়…

প্রকাশিত: উত্তরা প্রতিদিন ও বামিহাল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top