আসবি না ? – ড. ময়ূরী মিত্র

 

mayuri mitra

ভালো নাম ক্ষুদিরাম | নিজে নিজেকে ডাকত কাসুটি বলে | খেয়াল করতাম নিজেকে কাসুটি নামে পরিচয় করানোর সময় কী এক আরাম লাগত তার কন্ঠে — তার জিভে | জিজ্ঞেস করলে গম্ভীর মুখে বলত — এ আমার ফ্রান্সি নাম | “‘ফরাসি” না বলে বলত ফ্রান্সি | যেমন তার বিশেষ্য তেমনি তার বিশেষণ | আর তেমনি সে নিজে |

খোঁচা নোংরা চুল , চকরা হাফ প্যান্ট , লাল সবুজ গেঞ্জি | মুখে ভাঙা পাইপ | তার ডগায় বিড়ি |জ্বলছে ফুকফুক | নিজের সম্পর্কে ক্ষুদিরামের প্রাথমিক এবং প্রধান দাবি ছিল — সে নাকি actually ফ্রান্সের চিত্রকর | বিয়েও করেছে ফ্রান্সি মেয়েকে | নীল চোখের ফর্সা ফর্সা ফ্রান্সি ছেলেমেয়ের জন্ম দিয়েছে | তারপর just ভালো লাগেনি বলে কদিন কলকাতায় এসেছে |

মিশকালো ক্ষুদিরাম যখন এইসব ঢপগুলো দিয়ে যেত সহ্য করে যেতাম | বিশ্বাস করতে মন চাইত | ক্ষুদি সম্পর্কে আমার পেয়ার মহব্বতের শুরু বোধহয় তার গুলগুলো হজম করা থেকে |
ক্ষুদি আঁকত মানুষের মুখের পোর্ট্রেট | সে অবশ্য বলত — মুখের নয় ,মনের পোর্ট্রেট | মানে মানুষটাকে সামনে বসিয়ে যেই ছবিটা আঁকতে শুরু করবে ক্ষুদি — তখন মানুষটির মনের যে অবস্থা তাই নাকি ফুটবে তার তুলিতে | ক্ষুদির আরো দাবী –আপনা থেকেই মনের প্রতিবিম্ব তৈরি হয়ে মানুষটার মুখটাই পাল্টে দেবে | বুঝলাম আবার গুল |

তবু বাবা কাজ দিলেন তাঁকে | প্রথমদিন আঁকলে আমার ঠাকুর্দাকে | দেখলাম ক্ষুদির ছবিতে ঠাকুরদার মুখের বদলে মাস্টারদা সূর্য সেনের মুখ | পাইপে টাটকা বিড়ি ধরিয়ে অনেকখানি বেকার তৃপ্তি নিয়ে ক্ষুদি বললে — ওটাই নাকি আমার real ঠাকুরদা এবং এতদিন আমরা নাকি কেউ তাঁকে চিনতে পারিনি | সেদিন আমাদের বাড়িতে আমার ক্ষুদির প্রথম রোজগার একশ টাকা | একে একে ক্ষুদির কলায় আমার চিরশান্ত ঠাকুমা রাধারানী হলেন মাতঙ্গিনী | আর বাবা নিজে হলেন অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি |

অনেক একশো গেল বাবার | আর অনেক কটা বিড়ি গিলে আরো পুঁটকে হয়ে গেল প্রিয় ক্ষুদি | আরো রোগা আর আরো বেঁকে আরো ছোট | তার regular খোরাকি আর জুগিয়ে পারেন না বাবা | পাঠালেন সুন্দরমে — পুরোনো কালের কিছু নাট্যজনের ছবি আঁকতে হবে তাকে | সেখানেও অনাসৃষ্টি করে ফেলল ক্ষুদি | গিরিশ ঘোষ আর শিশিরবাবুর ধড়মাথায় তুলকালাম বেঁধে গেল | কোনটা কার কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারছে না | ক্ষুদি নিজেও না | বললে — এ হলো একজন ফ্রান্সি শিল্পীর জেনুইন confusion |
বাড়ি ঢোকা বন্ধ হল ক্ষুদিরামের | হাতে তখন তার টাকাপয়সা নেই | এদিকে আমারও প্রেম বাড়ছে | বললাম —আমার ছবি আঁক | তোমার যা খুশি আঁক | টাকা দেব | সেদিন অদ্ভুতভাবে পাশ কাটাল ক্ষুদি | বলল –আঁকার সময় সবার মন নাকি তার চোখে আসে | শুধু আমার মনটাই নাকি সে দেখতে পায় না |

কষ্ট হলেও ক্ষুদিকে বাঁচাতে বাড়ি থেকে এনতার চুরি শুরু করলাম | মাছের মাথা দিয়ে ডাল [ ক্ষুদির প্রিয় ] আধখাওয়া সিগারেট , টুথপেস্ট | বাড়ির নিমগাছের ডাল কেটে ব্রাশের মত ছেঁটেও দিলাম | আমার চুরি অনুযায়ী চলল ক্ষুদির জীবন | ধরুন — কোনোদিন পাউরুটি আর সর চুরি করেছি আগে |ক্ষুদি খেয়েও ফেলেছে মাখিয়ে মাখিয়ে | তারপর পেস্ট চুরি | তখন ক্ষুদি বসল মর্নিং ব্রাশ করতে | প্রেম যেদিন বাড়ত উকুন বেছে চুলও আঁচড়ে দিতে গেছি | ক্ষুদি তাড়া করেছে আমায় | তারপর পাড়া ভরে খিস্তি ফাটিয়েছে | হাতে পয়সা না থাকায় সেসময় তার মেজাজ এমনই খচ্চর টাইপ হয়ে থাকত | যত রাগত সে ,তত আমার ইচ্ছে হত ওই গাছতলাতেই বসে থাকি ক্ষুদির গা চটকে |

তবু আমার ছবি আঁকল না ক্ষুদি | কত কাঁদলাম | কত গাল দিলাম | তার সেই এক কথা –আমার মন কল্পনায় আসে না তার | জ্বরে পড়লাম | ধুম জ্বর | কোনরকমে দোতলার ঘরের জানলা দিয়ে মুখ গলালাম | বাড়ির সামনে নিমগাছের তলা দিয়ে ক্ষুদি চিল্লাচ্ছে —ও মা ময়ূরা ,ও মা এই যে আমি | জ্বর সারল | বাড়ির বাইরে এসে দেখলাম –গাছতলায় ক্ষুদির জামা কাপড় ,বিড়ি পাইপ কিছু নেই | চিৎকার করে ঘরে এলাম | মা হাতে দিলেন একশ টাকা | ক্ষুদি দিয়ে গেছে | বলে গেছে — জ্বর মুখ তো মেয়েটার | কিছু ভাজাভুজি কিনে খাবে |
ফেরেনি | আর ফেরেনি আমার ভাতের পাতের গন্ধলেবু | আমার চিত্রকর —-চিত্রপটে আমি | আবার আসিস |

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top