ইন্টারভিউ – অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

 [post-views]

আশির দশকের শেষাশেষি সুদীপ যেদিন কাগজে কলমে  ইতিহাসের ছাত্র হয়েও পাসকোর্সের  বাংলার ডেপুটেশন ভ্যাকান্সির পদে, কর্ড লাইনের একটি স্কুলে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল সেদিন সকাল থেকেই বিরামহীন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল. সুদীপের বাবা বারণ করে ছিলেন. সুদীপ বলেছিল,  এই প্রথম সুযোগ তাই যত কষ্টই হোক  –  যেতেই হবে.
সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ সুদীপ বেগমপুর স্টেশনে নেমে দ্যাখে কেউ কোথাও নেই. এক অকথিত আনন্দে সুদীপের মনটা ভরে গেলো, সব ক্যান্ডিডেটস তাহলে  আসতে পারে নি. একটা সুযোগ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে. স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে একটি চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলো স্কুলটি কমবেশী  প্রায় আড়াই মাইল. হেঁটেই যেতে হবে. সুদীপ প্রথমে প্যান্টটা গুটিয়ে নিলো. এক হাতে ছাতা অন্য হাতে মার্কশিটের ফাইলটা বুকে চেপে ধরে হাঁটতে শুরু করলো.  এক একটি গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছে. স্কুল কৈ? পাড়ার বারান্দায় তাসের আড্ডাও চলছে. বাইরের সদর প্রায় বন্ধ. গরু ছাগলের দল গোয়াল থেকে উঁকি মারছে. একজন টোকা মাথায় দেওয়া কাপড়টা হাঁটুর ওপর গোটানো পথচারী সুদীপকে দাঁড় করিয়ে জানতে চাইলো, কোথায় যাবে ভাই?
বিষণ্ন সুদীপ উত্তর দিল , ‘বাকসা   হাইস্কুলে’ চাকরির একটা পরীক্ষা আছে তাই যাচ্ছি. ওহ, তাই বলো,  বেকার ছেলে, কাজের টানে এই দুর্যোগেও আসা হয়েছে. তা বাড়ি কোথায়? -দেবীপুর. আর কত সময় লাগবে সুদীপ জানতে চাইলো.
এই রাস্তার শেষেই হাই স্কুল. হেড মাস্টার খুব কড়া. কিন্তু নামী লোক.
সুদীপ স্কুলে পৌঁছে দ্যাখে যা ভেবেছিলো তা ঠিক নয়, ইতিমধ্যেই বারোজন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে. সে আনলাকি  থার্টিন.
যাই হোক,  বেলা বারোটায় ইন্টারভিউ শুরু হলো. ক্ষিদেয় সুদীপের তখন  গা পাক দিচ্ছে. জল ছাড়া সঙ্গে কিছুই নেই. সুদীপকে মেঝেতে বসে পড়তে দেখে একজন বিবাহিতা দিদি স্থানীয় ক্যান্ডিডেট জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কী শরীর খারাপ লাগছে? আমার কাছে রুটি আছে- খাবেন? সুদীপ বিনীত ভাবে জানতে চাইলো, ‘আপনি আসল সমস্যাটা কী করে বুঝলেন? ‘
দিদিটি কোন উত্তর না দিয়ে টিফিন কৌটোটা হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমার জনাই -এ বাড়ি, কাছেই, আপনি অভুক্ত, তিনটে রুটি আর আলুর তরকারি আছে,  খেয়ে সুস্থ হয়ে নিন.’
এরকম সহৃদয় মানুষ সুদীপ আগে দেখে নি. মেয়েরা মায়ের জাত মুখ দেখলে সত্যিই বুঝতে পারে.
রুটি গুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে সুদীপ পেট ভরে জল খেয়ে নিলো. এখন মনে হচ্ছে, সে মহাসমুদ্র পেরিয়ে যেতে পারবে. কিন্তু দিদিটিকে  কী বলে ধন্যবাদ জানাবে মাথায় এলো না , শুধু বললো,  ‘আপনাকে কোনোদিন ভুলবো না. ‘
ইতিমধ্যে সুদীপের ডাক এসে গেলো. প্রথমে পড়াতে হবে.বোর্ড ওয়ার্কও করতে হতে পারে.
আসতে পারি?
আসুন সুদীপ বাবু.
আপনি মধুসূদনের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি পড়ান তো.
সুদীপ একবার সামনের দিকে তাকিয়ে সকলকে নমস্কার জানালো. সামনে ছাত্র, ছাত্রীদের সারি. পেছনে কয়েক জন উৎসুক দৃষ্টিতে সুদীপের দিকে তাকিয়েআছেন.  এর মধ্যে নিশ্চয়ই প্রধান শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ শিক্ষক আছেন.
সুদীপ তন্ময় হয়ে পড়াতে শুরু করলো.কবিতাটি আবৃত্তি করে এক একটি লাইনের মানে বোঝাতে বোঝাতে এগোতে থাকলো— ঘরে কোন শব্দ নেই.
পড়ানো শেষ হতেই একটি মেয়ে প্রশ্ন করলো, কবির জন্ম স্থান বাবা -মায়ের নাম কী?
সুদীপ হাসি মুখে উত্তর দিল.
পেছন থেকে একজন জানতে চাইলো কবিতাটির নামকরণ সম্পর্কে যদি কিছু বলেন.
সুদীপ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিলো.
‘সুন্দর, ধন্যবাদ. এবার আপনি আসুন’-পেছন থেকে কে যেন বলে উঠলেন.
বাইরে বেরোতেই সবাই ঘিরে ধরলো. কী এতো পড়াচ্ছিলেন ভাই?
আমাদের তো দাঁড়াতেই দেয় নি —
সেই দিদি একমুখ হাসি নিয়ে বললেন, আপনার কাজটা হয়ে যাবে.
সুদীপ বললো, এখনও তো ইন্টারভিউটাই বাকি.

এক এক করে প্রার্থীরা সত্যিই বেরিয়ে এলো.
এবার ডাক এলো সুদীপের. বোর্ডে
মোট পাঁচজন রয়েছেন. প্রধান শিক্ষক আত্ম পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-অতো দূর থেকে আপনি আসবেন কী করে? আমাদের তো সাড়ে দশটায় স্কুল বসে.
সুদীপ উত্তর দিলো, চেষ্টা করবো স্যার.
একজন জানতে চাইলেন, সনেটের জন্ম কোথায়? আচ্ছা, আপনিতো ইতিহাসের ছাত্র. বাংলা এতো ভালো পড়ালেন কী করে? —
প্রধান শিক্ষক জানতে চাইলেন,  আপনার সহ পাঠক্রমিক রেকর্ডস বলছে আপনি একটি দৈনিকে লেখালিখি করেন. কিছু পান?
সুদীপ বলে, ‘একটি আর্টিকেলে পঞ্চাশ টাকা করে দেয়. ‘
ভেরি গুড.
তা শিক্ষকতা করবেন না সাংবাদিকতা?
এখনো ঠিক করিনি.
আচ্ছা আবার দেখা হবে.
ঐ  স্কুলে সত্যিই অস্থায়ী পদে সুদীপের চাকরিটা হয়ে ছিল. সেই বছরটা সুদীপের কাছে বেশ লাকি ছিল. আরও দুটি স্কুলে ডাক পেয়ে ছিল. কিন্তু কোনোটাই স্থায়ী ছিল না.
তাই কয়েক মাইল দূরের  একটি  স্কুলেই জয়েন করে ছিল. বাংলার শিক্ষক পদে.
সুদীপ আসলে পেশাদার   সাংবাদিক হতে চেয়েছিলো. হতে পারে নি—-
শিক্ষকতাই তার ভবিতব্য ছিল.
অনেক বাধা পেরিয়ে, ইতিহাসের একজন  আদৰ্শবাদী শিক্ষক হিসেবে সুদীপ কর্ম জীবন শুরু করেছিল.
সংসারের  দাবী মেনে সেখানে সুদীপ মানিয়েও নিয়ে ছিল.
কিন্তু সময় তাকে সুখে থাকতে দেয় নি.

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top