ইন্ধন কলমে – সুতপা ব‍্যানার্জী(রায়)

[post-views]

 

 

আঠাশ বছর বয়সী প্রিয়ম,জীবনে কিই না করেছে ভাগ‍্য ফেরানোর জন্য ক্রিকেট মাঠে কোচিং করিয়েছে, সেলসে কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত রুটিরুজির টানে ড্রাইভিং লাইসেন্স বার করে প্রফেশনাল ড্রাইভার। বাবা প্রাইভেট কোম্পানি থেকে বহুদিন অবসর নিয়েছেন।

তাই সংসারের চাকা ঘোরাতে, ও মালিকের গাড়ি চালায়। তবে এ সব জাঁতাকলেও নিয়মমত ওর একজন গার্ল ফ্রেন্ড আছে। গাড়ি চালাতে চালাতে মুখে গুটকা আর গার্ল ফ্রেন্ডের ফোন, এ দুটো নাকি ওকে দীর্ঘপথ জাগিয়ে রাখে আর ক্লান্তি দূর করে। গতকাল রাতে বন্ধু সংসর্গে কিঞ্চিৎ নেশাভাঙও করেছে।

ডিউটি বড় বালাই, আজ প‍্যাসেঞ্জার নিয়ে যাচ্ছে বিষ্ণুপুর। চুলের বাহারি ঢেউ আর মুখের মধ্যের গুটকা যেন ওকে অসীম প্রাণশক্তি জোগাচ্ছিল। মসৃণ রাস্তায় স্পিডোমিটারের কাঁটাও চড়ছিল। প্রিয়মের ফোনে ছোটখাটো মানঅভিমানের রোজনামচা চলছে। কোন কারণে ফোনের ওপারের ঝাঁঝটা আজ একটু বেশী। এপারের ঝাঁঝও কিছু কম যাচ্ছে না, কথাতে কথা বাড়ছে। জেগে থাকা যাত্রীরা বিরক্ত বোধ করছে,-একজন মুখের ওপর বলেও দিল।

তাতে প্রিয়মের হেলদোল কিছু বোঝা গেল না, স্পিডের দৌরাত্ম‍্যে গাড়ির নাচন, কোঁদন বেড়ে গেল, কিছু বলবার জো নেই, প্রাণটা ওরই হাতে বাঁধা। বেশীক্ষণ এই ভাবদর্শন কাজ করল না, ঘটেই গেল ঘটনাটা। তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থামল, ততক্ষণে গাড়ির বাঁদিকে ধাক্কা খেয়ে এক বাইক আরোহী ছ-সাত হাত দূরে পাল্টি খেয়ে পড়ল। ভুল দিক থেকে ইনডিকেশন ছাড়াই বাইক আরোহী নিজেই হঠাৎ নিজের ডান দিকে বাঁক নিয়ে গাড়ির বাঁদিকে এসে মারল।

ধাক্কা খাওয়া লোকটি অবশ্য উঠে দাঁড়াল, চারপাশ থেকে হইহই করে লোকজন ছুটে আসতে থাকায় প্রিয়ম গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল। গাড়ির বাঁদিকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঝনঝন করতে শুরু করল গাড়ি। ভেতরের মানুষগুলো গাড়িকে থামতে বলবে না যেতে বলবে বুঝতে পারছে না। গাড়ি কিন্তু তার স্বাভাবিক রাস্তা ছেড়ে অন‍্যদিকে বাঁক নিল।টেলিফোনিক প্রেম অনেকক্ষণ থেমে গেছে,- মাঝে ফোন করেছিল গাড়ির মালিক আর মাকে, সেগুলো ছিল উদ্বেগের ফোন।

সকলকে অবাক করে ও স্থানীয় থানাতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালো। গাড়ির যাত্রীদের বিষ্ণুপুর ঘোরার আনন্দ মাটি, কিন্তু করারও কিছু নেই, “পড়েছো যবনের হাতে খানা খেতে হবে সাথে।”-ও গাড়ির হেলে যাওয়া চাকা ঠিক করবার জন্য একটা লোহার রড বের করেছিল, ঘটনার উত্তেজনায়, সেই রড হাতে ও থানায় ঢুকে পড়ল। ওর ওই চেহারা দেখে ওসি বন্দুক বার করে বলে উঠল-“হ‍্যান্ডস্ আপ” পেছন পেছন যদি না গাড়ির যাত্রী ঘোষবাবু হাজির হতেন তাহলে উগ্ৰপন্থী হিসেবে প্রিয়মের লক আপে ঠাঁই হোত, কিংবা আ্যকশানে মরে যেত। ঘোষবাবু বুঝিয়ে বলায় থানার বড়বাবু এতক্ষণে বুঝলেন প্রিয়মের গাড়ি অ‍্যাক্সিডেন্ট করেছে।

বোঝামাত্রই ভ্রু কুঁচকে বললেন-“তা লোকটাকে একেবারে মেরে এসেছো,নাকি?” প্রিয়ম কিছুটা হাতেপায়ে ধরার মতো করে বলল-“আজ্ঞে লোকটার প্রায় কিছুই হয় নি,হয়তো ওর গাড়িটার হয়েছে, দেখুন আমার গাড়িরও খুব ক্ষতি হয়েছে।”সেকেন্ড অফিসার পুলিন রায় বলল-“ওই স্পটে সিভিক পুলিশকে ফোন লাগান না স‍্যার, আসল ঘটনা জানতে পেরে যাবেন।”ঘোষবাবু মনে মনে প্রিয়মের উদ্দেশ্য বললেন-নে এবার ভাল সাজার ঠ‍্যালা সামলা,-কাউকে কিছু না বলে বেটা যুধিষ্ঠির গাড়ি নিয়ে থানায় সারেন্ডার করতে চলে এলো।

সেকেন্ড অফিসার ফোন করার আগেই সিভিক ভলেন্টিয়ার জয়ন্তর ফোন আসে, প্রিয়মের থানায় চলে আসাটাকে স্থানীয় লোকেরা ওর পালানো ধরে নিয়ে রিপোর্ট করেছে, সেই খবরই দিচ্ছে ফোনে। ঘোষবাবু রাগ করে বাইরে এসে পরিবারের লোকদের এসব কথা জানালেন, ঘুরতে যাওয়া মাটি হতে বসায় সবার সব রাগ গিয়ে পড়ল প্রিয়মের ওপর। ওদিক থেকে মালিকও শাসাচ্ছে এরকম পরিস্থিতি ঘটিয়ে আর্থিক গুনাগার বাড়ানোর জন্য। এবংবিধ আক্রমণে জেরবার হয়ে বেচারি আবার খুলে বসল সেই ফোনের প্রেম পাঁচালী।

ছোট কর্তা, বড় কর্তা- অনেক রকম কর্তা কাহিনীর পর গাড়ির কাগজ আটকে রেখে গাড়ি ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া গেল। একটা ভাল খবর এলো গাড়িতে এসে ধাক্কা মেরে পড়ে যাওয়া ছেলেটা ভাল আছে। তবুও প্রিয়মের যেহেতু বাইক আরোহীর তুলনায় বড় গাড়ি তাই আর্থিক গুনাগার ওকে তথা মালিককে দিতে হবে।

এরমধ্যে পাঁচঘন্টা পার হয়ে গেছে, সকলে ঘটনার আকস্মিকতার ধকলে জেরবার। অবশেষে গাড়ি ছাড়লো, প্রিয়ম মুখে গুটকা নিলেও ফোন আর ধরল না, বরং সকলের সঙ্গে হাসিখুশি হয়ে গল্প করা শুরু করলো, এতে সকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কত রকম তার জীবন কথা, পেশার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো আস্ত একটা মানুষ, যে মানুষ স্বপ্ন দেখে, যার স্বপ্ন ভাঙে, যে মানুষ খড়কুটো আশ্রয় করে বাঁচতে চায়, বেঁচে ওঠে।

সকলে বিষ্ণুপুরে নাটমঞ্চ দেখতে নামে, গাইড মঞ্চের ইতিহাস বোঝাতে থাকে আর প্রিয়ম ঘোষগিন্নীকে গল্প করে ওর ছোটবেলায় যাত্রা করার কথা, ওর জেঠু যাত্রা দলে ছিল, বিভিন্ন জায়গায় শিশুশিল্পী হিসেবে প্রিয়মকে নিয়ে যেত। একবার এক পালায় ঘুমের দৃশ্যে প্রিয়ম সত‍্যি সত‍্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল-এই গল্পটা করতে গিয়ে প্রিয়ম যে হাসিটা হাসল তাতে যেন সারল‍্যের মণিমুক্তো ঝরে পড়ছিল। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ঘোষগিন্নী ভাবছিল আইটি সেক্টরে কাজ করা নিজের ছেলের কথা, কতদিন যে প্রিয়মের মতো এই নির্মল হাসিটা ও হাসে না।

কথার পিঠে কথা এগোতে থাকে, ঘোষগিন্নী বলে-“হ‍্যাঁ রে প্রিয়ম, তুই ওই গুটকা মুখে নিস কেন, জানিস ওতে মুখে ক‍্যানসার হয়।”-প্রিয়ম উত্তর দেয়-“জানলেও কি করব কাকিমা, ওটা না নিলে যে গাড়ি চালাতে চালাতে আমার ঘুম পেয়ে যায়।”ঘোষগিন্নী বলে-“কাকিমার অনুরোধ রইল ওসব ছাই ভস্ম ছাড়ার, ভেবে দেখিস। আর রাস্তায় কাকে এতো ফোন করিস বল তো?” প্রিয়ম লজ্জা পেয়ে বলল-“ও টিয়া, আমাদের পাড়াতেই থাকে।” ঘোষগিন্নী বলে-“গাড়ি থামলে ফোন করিস।

“প্রিয়ম বলে-“টিয়ার ফোন না ধরলে টিয়া ভীষণ খেপে যায় জানেন, খেপে গিয়ে যদি আমায় ছেড়ে দেয় কাকিমা।”ঘোষগিন্নী বলে-“ছাড়লে ছাড়বে, ওর জন্য রাস্তাঘাটে নিজের প্রাণটা দিবি নাকি?” প্রিয়ম বলে-“না না কাকিমা, এই সামনের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের বিয়ে, তারপর এই চাপটা আর থাকবে না।” বলেই প্রিয়ম ফিরিস্তি দিতে বসে, কিভাবে নতুন সংসার করার জন্য ও রোজগার বাড়াবার প্ল্যান করেছে।

ঘোষগিন্নী মনে মনে ভাবে নিজের ছেলের কথা, যে নিজের ব‍্যক্তিগত কোন কথা বাড়িতে শেয়ার করে না, আর এই অল্প শিক্ষিত ছেলেটা কেমন আন্তরিকভাবে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে।বেড়ানো সম্পূর্ণ করে ওরা বাড়ির পথ ধরলে, ঘোষগিন্নী ঘোষবাবুকে বলে-“বাড়ি ফেরার আগে আমরা প্রিয়মের ড্রাইভিংয়ের কাগজগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে যাব।”ঘোষবাবু উত্তর দিলেন-“আমরা কেন, ও প্রিয়মের মালিক এসে ছাড়াবে।” হঠাৎ ঘোষগিন্নী বলে বসল-“পারতে তোমার ছেলে রিপন যদি এরকম একটা বিপদ ঘটাতো, পারতে এরকম নির্লিপ্ত থাকতে?” ঘোষবাবু বলেন-“হঠাৎ এই তুলনাটা এখানে কেন, আচ্ছা দেখছি কি করা যায়।” বাকীদেরও একই মত থাকায় গাড়ি সেই থানায় যায়।

থানায় ডিউটি ইনচার্জ বিস্মিত হয়, প‍্যাসেঞ্জার টাকা গুনাগার দিতে চাওয়ায়। দশহাজার টাকা আর মুচলেকার বিনিময়ে প্রিয়ম ওর কাগজ ফেরত পায়। ফেরার সময় একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, প্রিয়ম মুখে আর গুটকা নেয় না। বদলে গুনগুন করে গান গায়।

…. “আকাশ জুড়ে খুশির ঝলক ছড়িয়ে পড়ে, সবাই মোরা ফিরছি আজ আপন ঘরে, উদাস হাওয়ায় মন যে আজ চিরউদাসী, স্নেহের বাঁধন জড়িয়ে প্রতি পলে আসি ফিরে, মায়ায় ভরা বিশ্বভুবন মাঝে, থাকতে যেন পারি আমি সকাল সাঁঝে।” বাড়ি পৌঁছে সবাই যখন লাগেজ নামাতে ব‍্যস্ত তখন প্রিয়ম ঘোষগিন্নীকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, ওনার হাতও প্রিয়মের মাথায় উঠে আসে, সঙ্গে থাকে এক রাশ স্নেহ। প্রিয়মের গাড়িটা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ঘোষগিন্নী বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।

 

 

আপনার মতামতের জন্য
[everest_form id=”3372″]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top