উপহার – অন্তরা মন্ডল এবং অনিকেত

 [post-views]

এক

এই প্রথমবার ট্রামে উঠল আত্রেয়ী। সাউথ কলকাতার জনপ্রিয় বালিগঞ্জ অঞ্চলে জীবনের ২২ টা বসন্ত ওই বাবার চার চাকা, ওলা-উবের আর আকাশপথের কথা ছেড়ে দিলে খুব বড় জোর বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অটোয় ওঠা, ব্যাস এইটুকুতেই আবর্তিত।
-তুই জানলার ধারে বস
আবীরের কথায় অবাক চোখে এগিয়ে গেল আত্রেয়ী। এই কয়েক মাসে বেশ ভালই বন্ধুত্ব জমে উঠেছে আত্রেয়ী-আবীরের। আর কয়েকটা ছেলে-মেয়ের মতই এই তো সেদিন, সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনের সিঁড়িতে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল ওরা, ঠিক এসকেলেটর থেকে প্লাটফর্মে পা দেওয়ার মুখে শাড়ির আঁচল আটকে গিয়েছিল আত্রেয়ীর জুতোর হিল এ। আবীরই ধরেছিল সেদিন হাতটা।
-‘Thank You’ একটু অপ্রস্তুত ভাবেই বলেছিল আত্রেয়ী কোন সম্বোধন ছাড়াই।
-‘it’s Ok আপনি ঠিক আছেন তো?’ আত্রেয়ী শুনতে পেয়েছিল কিনা কে জানে! মেট্রো এসে গিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিল আবীর আত্রেয়ীকে দেখে।
নতুন শহরে ২ বছর হতে চলল, দুর্গাপুর থেকে এসে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করছে বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে। বাবা-মা, ভাই নিয়ে অল্প টানাটানির সংসার তাই নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য ভালই খাটতে হয় আবীরকে। সকাল বিকেল মিলিয়ে সপ্তাহে মোট ২৪ জনের বিজ্ঞান শাখার দায়িত্ব তার কাঁধে। শখ বলতে গান শোনা, বই পড়া আর অল্প লেখা লিখি। লেখা লিখি করে বলেই বোধহয় উল্টোদিকের মানুষের ভিতরটা স্পষ্ট দেখতে পায়।

তারপর সেদিন মে মাসের কাঠফাটা রোদে কিছু বই কিনতে বই পাড়ায় ঢ়ুঁ মেরে প্যারামাউন্ট যাওয়ার প্ল্যান করছিল প্রেসিডেন্সি কলেজের দর্শনের থার্ড ইয়ারের ছাত্রী আত্রেয়ী, সুলেখা, পিউ। ভাগ্যক্রমে সেদিনও চোখাচুখি হয়েছিল একবার আবীর আর আত্রেয়ীর, কিন্তু কথা বলা হয়ে ওঠেনি। কারণ! সেই গাড়ি এসে গিয়েছিল ।

সেদিন কি একটা দরকারে আবীর বেরিয়েছিল কালীঘাট যাবে বলে, কলেজ থেকে ফিরছিল আত্রেয়ী। মেট্রোয় টিকিট কাউন্টারের সামনে আবারও অনিবার্য সাক্ষাত আবীর আত্রেয়ীর।
-চিনতে পারছেন?
কিছুটা অপ্রতিভ গলায় আত্রেয়ী বলেছিল –’হ্যাঁ নিশ্চয়ই, সেইদিন আপনাকে থাঙ্ক ইউ টা ভালভাবে বলা হয়নি।’
তারপর এসি মেট্রোর কামরায় উঠেছিল আবীর আত্রেয়ী র হালকা গল্পের রোল। ছেলেটা বেশ মিশুকে মনে মনে ভেবেছিল আত্রেয়ী। তার এই ২২ বছরে ছেলে ইয়ারদোস্তের সংখ্যা হাতে গোনা।

-চল নামবো এবার
বলেই হাতটা ধরে দরজার সামনে এগিয়ে গেল দুজনে। বেশি কিছুনা, প্রিন্সেপ ঘাটের সবুজ গালিচায় হেঁটেছিল ওরা খালি পায়ে, খেয়েছিল ভাঁড়ের চা, গঙ্গার ঘাটে বসে পা ভিজিয়েছিল আত্রেয়ী এই প্রথম বার।
-এই বাদামটা দে তো
দেওয়ার আগেই প্রায় ছিনিয়ে নিল আত্রেয়ী,
-ম্যাডাম রাগ কমলো?
কপট রাগের দৃষ্টি দিয়ে আত্রেয়ী বলল –’আর দ্বিতীয়বার এরকম করবি না, আমি কিন্তু মানব না।
‘তুমি’ টা কখন যে ‘তুই’ তে গিয়ে ঠেকেছে খেয়াল করেনি দুজনেই।

দুই

ঠিক পুজোর আগেই ছিল আবীরের জন্মদিন, একটা নীলচে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি কিনেছিল আত্রেয়ী। কলেজের অ্যাসাইনমেন্টের চক্করে বাড়ি যেতে পারেনি আবীর। সন্ধ্যেবেলা বন্ধুদের দেওয়া পার্টিতে আত্রেয়ীও এসেছিল। হই-হুল্লোড়, দেখনদারি খুব একটা পছন্দ করেনা আবীর সেটা জানত আত্রেয়ী, তাই পাঞ্জাবিটার সাথে ছোট একটা চিরকুট ও দিয়েছিল সাথে –
-‘পাঞ্জাবিটা পুজোয় একদিন পড়িস’
মনে মনে বেশ খুশীই হয়েছিলো আবীর। নিজেকে প্রশ্ন করছিল, এই ছয়মাসে আত্রেয়ী কে কি সে ভালবাসতে শুরু করেছে? নাকি শুধু বন্ধুত্ব? যদি বন্ধুই হয় তাহলে আত্রেয়ীয়ের কথা তার কলমে বার বার উঠে আসতে চায় কেন?
আবীর জানত ওলা-উবের এ স্বছন্দ আত্রেয়ী, কিন্তু কখনও তর্ক করেনি আবীরের সাথে অটোয় উঠতে, ঝালমুড়ি খেতে। বরং আবীর তর্ক করেছে যখন আত্রেয়ী ওলার ভাড়া দিতে চেয়েছে। প্রায়ই কবিতা শুনতে চায় আত্রেয়ী, আবীর শুধু সেগুলোই পাঠায় যেখানে নেই আত্রেয়ীয়ের খোলা চুলের গন্ধের কথা, সেই প্রথম দিনের হাতে হাত লাগার কথা, সূর্যাস্তে গঙ্গার জল দেখে আত্রেয়ীর অবাক দুটো চোখের কথা। কেমিস্ট্রির ফর্মুলার প্যাঁচে লেখার হাতটা হারিয়ে যায়নি দেখে মনে মনে খুশীই হয় আবীর। ইদানীং বেশিই লেখালিখি হচ্ছে আবীরের।

তিন

পঞ্চমীর দিনেই নর্থ কলকাতা ঢুঁ মেরে এসেছিল দুজনে। লং স্লিট কুর্তি, কানে বড় আফগানি দুল আর ছোট্ট টিপে বেশ দেখাচ্ছিল আত্রেয়ীকে। সরাসরি না বললেও কথায় কথায় প্রকাশ করেছিল আবীর।
-এরকম সেজেগুজে আমায় ছাড়া বেরোবিনা কিন্তু, বাচ্চা মেয়ে বলে কখন তুলে নিয়ে যাবে।
বাচ্ছা শুনেই মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠলো আত্রেয়ী
–ঢং! তুই অনেক বুড়ো হয়ে গেছিস যেন!
সপ্তমীতে শাড়ি পরে এসেছিল আত্রেয়ী, সব বন্ধুরা মিলে দক্ষিণ কলকাতা চষে ফেলার কথা।
ষষ্ঠবারেও ফোনটা ধরল না আবীর, আবীর তো কখনও দেরী করে না! আজ কি হল? নিজের মনেই প্রশ্ন করল আত্রেয়ী। হোয়াটসঅ্যাপও সিঙ্গেল টিক হয়ে রইল। কয়েকটা ঠাকুর দেখেই সেদিন বাড়ি ফিরে গেছিল আত্রেয়ী, সন্ধেবেলাও বেরোলোনা। বাবার প্রকাশনের ব্যবসা। ব্যস্ত ব্যাবসায়ী শান্ত স্বভাবের মানুষ জোর করেনি আত্রেয়ীকে, শুধু পাশে বসে বলেছিল, – ‘কিছু হয়েছে মা’?
নিজেই বুঝে উঠতে পারছিল না আত্রেয়ী কেন কষ্ট পাচ্ছে। আবীর তার খুব ভালো বন্ধু, খেয়াল রাখে তার, একবার জানালো না যে সে আসবে না। অভিমান হয়েছিল আত্রেয়ীর, আগে কখনও এমনটা হয়নি তার। গল্পের বই বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পরা মেয়েটা বার বার হোয়াটসঅ্যাপ চেক করছিল, ডবল টিক পরার আশায় নাকি অন্য কিছু।

চার

-হ্যালো সুলেখা, আমি আবীর বলছি
-আরে আবীরদা কেমন আছো? কোথায় ছিলে এত দিন? সেদিন এলে না, কিছু জানালেও না। লক্ষ্মী পুজোও চলে গেল, কোন খবর নেই তোমার।
-হুম, ভালো আছি।
সবটা খুলে বলল আবীর, তার সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজও দিল সুলেখাকে।
পরের দিন দুপুর বেলা সুলেখা পৌঁছে যায় আত্রেয়ীর বাড়ি, সুলেখাকে দেখে একটু অবাকই হয়েছিল আত্রেয়ী,
-কিরে, কি ব্যাপার?
-চল আজ আমরা কফি হাউস যাব। রেডি হয়ে নে চটপট।
সুলেখার মুখে কফি হাউস আচমকা রেগে গিয়েছিল আত্রেয়ী, আবীরের সঙ্গেই প্রথমবার সেখানে পা রেখেছিল সে,বেশ মজার স্মৃতি আছে ফোনে বন্দী হয়ে।
-না অন্য কথাও চল, এমনিও আমার বাইরে যেতে ইচ্ছা করছে না।
-না তোকে যেতেই হবে, আজ আমি তোর কোনও কথা শুনব না
-আজ ছাড় অন্যদিন যাবো,পাক্কা।
-না তোকে আজ যেতেই হবে আমার কতদিনের ইচ্ছা, চল চল চল…
কফি হাউস এ ঢোকার মুখেই সিগারেটের ধোঁওয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে আবীরকে আবিষ্কার করল আত্রেয়ী। সিগারেট খেতে আগেও দেখেছে কিন্তু এমন চিন্তিত,বিধ্বস্ত আবীরকে নয়।
-এইজন্য তুই কফি হাউস আসতে চাইছিলিস,এরকম করতে পারলি তুই আমার সাথে? কি দরকার তোর…
-আরে থাম থাম, আমার রাগটা ওর ওপর ঝাড়ছিস কেন, আমি সুলেখাকে বলেছিলাম।
এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল আত্রেয়ী।
-ভালো লাগছে না আমার, বাড়ি যাচ্ছি আমি,তোরা গল্প কর।
-শোন না, যাস না প্লিস। এই বলে আবীর আত্রেয়ীয়ের হাতটা চেপে ধরল আটকানোর জন্য! আত্রেয়ীও যেন ছাড়াতে চাইল না।
-বল কি বলবি
পরবর্তী আধঘণ্টায় আবীর যা বলল সংক্ষেপে দাঁড়ায়, -অফিসে মিথ্যে অভিযোগের কারণ দেখিয়ে বাবার চাকরিটা চলে গেছে,আমি ষষ্ঠীর দিন রাতে খবর পেয়েই পরদিন ভোর বেলা ছুটেছিলাম। চাইনি তোর পুজোটা মাটি হোক, পরে ভেবেছিলাম জানাবো কিন্তু পারিনি। তোর আনন্দের কথা ভেবেই তোকে আর… আবীরের কথা শেষ হওয়ার আগেই আত্রেয়ী বলে ওঠে,
-মুণ্ডু বুঝেছিস তুই আমায়! উদ্ধার করেছিস আমায়! সব যখন নিজেই বুঝে নিয়েছিস তো এখন আমায় বলছিস কেন, আমায় তো বন্ধু বলে ভাবিস না, তাই তো ভয় পেয়েছিলি।
আবীর বুঝে উঠতে পারে না কি বলবে, এরকম কিছু সে আশা করেনি, এর আগে আত্রেয়ীকে এতটা রেগে যেতে সে দেখেনি।

-কি খাবি বল?কোল্ড কফি আর কাটলেট বলি?জিজ্ঞেস করে আবীর।
-না,আজ আমি যা যা বলব তাই তাই খাওয়াবি আমায় তুই।
আত্রেয়ীয়ের মুখ থেকে এমন শুনে অজান্তেই একবার পকেটে হাত চলে গিয়েছিল আবীরের। সেদিন আত্রেয়ী অর্ডার করেছিল সব আবীরের পছন্দের খাবার। বিল দেওয়ার সময় আবীরের হাতটা ছেপে ধরে বলেছিল
-আমার রাগ ভাঙাতে হলে ট্রাম চড়াতে হবে,প্রিন্সেপ ঘাট নিয়ে যেতে হবে।
সেদিন কফি হাউসের বিল আত্রেয়ীই দিয়েছিল। বাচ্ছা বলে খ্যাপানো মেয়েটার মুখ থেকে আচম্বিত এমন কিছু শুনবে আবীর ভাবেইনি। শান্ত হয়ে আবীরের কথা গুলো সব শুনেছিল, বাকি বন্ধুদের মতো শুকনো স্বান্তনা দেয়নি, মানসিক দৃঢ়তা দিয়েছিল।
-ম্যাডামের যা হুকুম!এবার ওঠ বাড়ি ফিরতে হবে তো, নাকি এখানেই থাকার ইচ্ছা আছে!
-আর কিছুক্ষণ বসি না? আজ আর যাওয়ার তাড়া দিস না, বাড়িতে ম্যানেজ করে নেব দেরি হলে। আত্রেয়ীর কথা ফেলতে পারল না আবীর, আত্রেয়ীর চোখটা আজ একটু বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে! হয়তো দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের প্রাপ্তি।

পাঁচ

ডিসেম্বর-জানুয়ারী পরীক্ষার চাপেই কাটল দুজনের। মাঝে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময়। আবীর হাতে বানানো একটা গ্রিটিংস কার্ড দিয়েছিল। ছোটবেলার আর্ট এবং ক্র্যাফটের শখটা আত্রেয়ীর জন্য আরও একবার ঝালিয়ে নিল আবীর। এদিকে আত্রেয়ীয়ের পরীক্ষাও শেষ, সে তার বাবা মায়ের সাথে কিছু দিনের জন্য পুরী ঘুরতে যায়, বাঙালির ভ্রমণ পরিকল্পনা আজও “দি-পু-দা” তেই আটকে। অন্যদিকে আবীরের ছোট ভাইয়ের সামনেই উচ্চমাধ্যমিক, শনি রবিবার গুলো কলকাতা দুর্গাপুর করেই কেটে যায়, ভাইয়ের শেষ মুহূর্তের সে পাশে থাকে বড়দাদা হিসাবে। বাবা একটা ছোট কম্পানিতে ঢুকেছে, অল্প স্বস্তি ফিরেছে পরিবারে, তবু আবীর বসে নেই, অবিরাম চেষ্টা করছে পড়াশোনার পাশাপাশি একটা পার্ট টাইম কাজের। একটা সময় ছিল যখন লোকে বলত কলকাতায় টাকা ওড়ে, এখন সময়ের পরিবর্তন এসেছে। বাবা,মা, ভাইকে একদিন কলকাতায় নিয়ে আসবে, নিজের তৈরি করা বাড়িতে, একথা আত্রেয়ীকেও বলেছে সে। আত্রেয়ী কখনও হাসেনি বরং আরও উৎসাহ দিয়েছে, কিছু চাকরির খোঁজ এনে দিয়েছে সে।

-হাতে সময় নিয়ে যাবি, রাস্তায় বেড়িয়ে বেশি তাড়াহুড়ো করিস না, ভালো হবে গান, চিন্তা করিস না, আর ফিরে এসে জানাবি কিন্তু কি হল, চল টাটা।
এই বলে আবীর ফোন টা রেখে দিয়ে পড়াতে চলে গেল, আত্রেয়ীও স্টুডিও যাবে বলে রেডি হতে শুরু করল। আত্রেয়ীয়ের স্বপ্ন ও বড় গায়িকা হবে, আবীরও চায় আত্রেয়ী গান নিয়ে এগিয়ে যাক। রূপসী বাংলা, তারা মিউজিক এর ঠিকানা আবীরই এনে দিয়েছিল। শুধু কলেজে নয়, আত্রেয়ীয়ের গান যেন সবাই শুনতে পায়, গোঁটা শহর শুনতে পায় এমনই ইচ্ছা আবীরের।

ছয়

বাড়ির সরস্বতী পুজোয় গান গেয়ে হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকে পোস্ট করার আগে কি মনে হল আবীরকে পাঠিয়ে জানতে চাইল কেমন হয়েছে। হয়তো আবীর বাকি বন্ধুদের থেকে আলাদা হয়ে উঠছিল তার কাছে। সামনেই আত্রেয়ীয়ের জন্মদিন আসছে, বন্ধুদের জন্মদিন ভুলে যাওয়ার জন্য স্কুল-কলেজে বেশ ভালই নামডাক ছিল আবীরের, কিন্তু ২১শে মার্চ দিনটা দিব্যি মনে আছে আবীরের।নিজের অজান্তেই আত্রেয়ী যেন আবীরের খুব কাছের হয়ে উঠেছে। কি দিতে পারে সে আত্রেয়ীকে? ভেবেছিল লেখার ঝড় তুলবে, কিছু লিখে দেবে সে আত্রেয়ীকে, মনের কথা কিছুটা প্রকাশ করবে, কিন্তু তিন লাইনের বেশি কিছুই লিখেতে পারেনি । কি কিনে দেবে সে আত্রেয়ীকে সেটাই এখন মুল চিন্তার বিষয় আবীরের কাছে ।
এরই মধ্যে আবীর বেশ কিছু জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় চাকরিগুলো পেল না, অবশেষে একটা জায়গায় পেয়েছে তবে পার্ট টাইমার হিসাবে, সেটাই বা মন্দ কি, যা সময় এটাই অনেক। এই ভাবতে ভাবতে ঘড়িটাকে সুন্দর রঙিন কাগজে মুড়ে ফেলল।
-সেকি তুই এসে গেছিস? একটা ছায়া দেখে দাঁড়া আমি আসছি… কিন্তু আমি তো লেট করিনি, সাড়ে এগারোটা বাজতে এখনও সাত মিনিট বাকি আছে।
ফোনটা রেখে কি যেন একটা ভেবে মুচকি হাসতে লাগল আবীর। আজ ২১শে মার্চ। বসন্তের রঙ লেগেছে প্রকৃতিতে। আবীরের দেওয়া সেই শাড়িটা পরেই আজ এসেছে আত্রেয়ী,একটা ছায়া দেখে দাঁড়ালো সে। আত্রেয়ীকে দূর থেকে দেখে আবীর একটু থমকে গেল! আত্রেয়ীর সৌন্দর্য যেন মুগ্ধ করে রামধনুকেও! তার নির্মল হাসি যেন ভোরের বাতাসের থেকেও স্নিগ্ধ। নিজের অন্যান্য জন্মদিনের থেকেও বেশি উৎসাহী আত্রেয়ী আজ।
-ইস তোর জন্মদিনে তোকেই দাঁড় করিয়ে রাখলাম। বলেই কান ধরল আবীর। আরও কিছু বলবে ভেবেছিল কিন্তু সদ্য ফোঁটা পলাশের মতো আত্রেয়ীকে কেমন অচেনা ঠেকল ওর, এমন ভাবে কখনও দেখেনি আগে আত্রেয়ীকে।
-তোর হাত টা দে। বলেই সুন্দর কাগজে মোড়া চারচৌক বাক্স আত্রেয়ীয়ের হাতে দিল আবীর।
-এটা শুধু সময়ই দেখাবে, কিন্তু তোর সাথে রাখলে আমার ভালো লাগবে,শুভ জন্মদিন,গানটা কখনও ছাড়িস না।
-আর তোকে?
পাল্টা এমন প্রশ্ন তার দিকে আসতে পারে এমনটা কস্মিনকালেও কল্পনা করেনি আবীর। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া একটা হাসি দিয়ে সামাল দিতে যাচ্ছিলো ঠিক তার মাঝেই আত্রেয়ী তার ব্যাগ থেকে কাগজে মোড়া একটা জিনিস বার করে আবীরের দিকে এগিয়ে দিল, -এটা খুলে দেখ তো।
আবীর কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিলো তার আগে আবার আত্রেয়ী বলে উঠলো,
-উঁহু, কোন প্রশ্ন না করে আগে খুলে দ্যাখ ভেতরে কি আছে।
রঙীন কাগজ খুলতে খুলতেই সাত-পাঁচ ভাবার চেষ্টা করছিল আবীর, তার আগেই দেখতে পেল একটা বই, ওপরে জ্বল জ্বল করছে ‘উপহার- আবীর বসু’
একঝলক আত্রেয়ীর দিকে তাকিয়েই কয়েকটা পাতা ওলটাতে ওলটাতে চোখ বোধহয় ঝাপসা হয়ে আসছিল, আবীর কখনও ভাবেনি স্কুল জীবনে নিছকই মূল্যহীন লেখাগুলো আত্রেয়ী এভাবে অতি মূল্যবান করে তুলবে। নিজের অবসরে সময় কাটানোর জন্য লেখাগুলো আজ আত্রেয়ীয়ের জন্য সবাই জানতে পারবে। আত্রেয়ীকে জড়িয়ে ধরল আবীর,আত্রেয়ীও মানা করেনি, হয়তো এমন কিছুই চেয়েছিল ও নিজেও।
-দাঁড়া দাঁড়া,আরও একটা জিনিস আছে। বলেই ব্যাগ থেকে একটা চেক বার করে আবীরের হাতে দিল আত্রেয়ী।
-আটাত্তরটা কপি বিক্রি হয়ে এখনও অব্দি এটা হাতে এসেছে, নে ধর্, আমি কিন্তু নিজের থেকে দিচ্ছিনা। এটা তোরই প্রাপ্তি।
আবীর অবাক হয়ে তাকিয়েছিল আত্রেয়ীয়ের দিকে, বুঝে উঠতে পারেনি যে কি হচ্ছে, এটা কি স্বপ্ন নাকি এমন এক বাস্তব যা রূপকথার থেকেও মধুর! এই গল্পের যেন শেষ চায় না তারা। নিজের লেখাগুলো দেখে যেন তার মধ্যেকার শিশুটা আনন্দে লাফাচ্ছে, এক আলাদা শিহরণ জেগে উঠেছে মনে। আর আবীরের এইরূপ উচ্ছ্বাস দেখে যেন আত্রেয়ীও খুব খুশী হয়েছে।

অনেকটা সময়য় একসাথে কাটিয়েছিল তারা,রাতে আত্রেয়ীয়ের বাড়িতে বেশ বড়ই একটা পার্টির আয়োজন হল, ওর ছোটবেলা বড়বেলার বন্ধুরাও ছিল। বেশ হইহুল্লোর হল, নতুন গাউন, প্রচুর গিফট, দারুন খাওয়া দাওয়া এসবে ওর বিশেষ মন নেই। কারণ দিনের সেরা সময়টা সে পেয়ে গেছে, আবীরের থেকে, ওর বইটা হাতে পাওয়ার পর আবীরের সেই উজ্জল মুখ যেন দিগন্তের আভাকেও ছাপিয়ে গেছে। অনেক গিফট পেয়েছে, কিন্তু ওর মন পরে আছে আবীরের দেওয়া ঘড়িটার দিকে, ও নিশ্চিত ওটা শুধু একটা ঘড়ি নয়, ওতে আরও কিছু আছে যা শুধু খালি চোখে দেখা যায়না, অনুভব করতে হয় অন্তর দিয়ে। দুদিন পরেই ভাইয়ের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তাই সেদিন রাতেই দুর্গাপুর ফিরতে হল আবীরকে।
সে বার গঙ্গারঘাটে আবীরের থেকে জোর করে একরকম ভাবে ছিনিয়ে নিয়েছিল আত্রেয়ী পড়বে বলে। বাবাকে গিয়ে কবিতাগুলো দেখাতেই কাজ হয়েগেছিল আত্রেয়ীয়ের। আত্রেয়ীকে নিয়ে বেশ কটা কবিতা ছিল তারই মধ্যে, সেগুলো সে নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিয়েছে, এগুলো শুধু তারই জন্য, অন্য কেউ পড়লে এর মাধুর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর বইটা নাড়াচাড়া করে দেখছিল আবীর। সেই স্কুল জীবন থেকে লিখে আসা পাগলামো গুলোকে সত্যি করে দিল আত্রেয়ী। এমন ভাবে ভাবতে পারলো ও?

গল্পের বই নয়, আত্রেয়ী সেনের হাতে আছে আজ চারচৌকো বাক্সের মধ্যে থাকা চিঠি। শহরের ব্যস্ত রঙীন জীবন ছেড়ে কখন যে ময়দানের সানসেট আর গঙ্গার পাড়ে বসে গরম বাদাম ভাজা আর চা, ওলা-উবের ছেড়ে পায়ে হেঁটে কলকাতা ঘোরা এত প্রিয় হয়ে উঠবে বুঝতে পারেনি আত্রেয়ী। ফেসবুক ছেড়ে গল্পের বই আর কবিতায় মন বসবে সেটাও ভাবতে পারেনি বোধহয়। জানলার বাইরে আজ ফুল মুন,আর সেই একই জ্যোৎস্নায় আত্রেয়ীয়ের হাতে আবীরের চিঠি, আবীরের কোলে… কি বলবো বলুন তো? আত্রেয়ীয়ের দেওয়া নতুন উপহার নাকি নতুন ভাবে কাউকে পাওয়ার আনন্দ। হাতের সিগারেটটা আজ হাতেই শেষ হয়ে যাবে হয়তো আবীরের…।।

 

সমাপ্ত

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top