উপহার

উপহার
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

কলেজ জীবনে আমরা ভাড়া থাকতাম দমদমের পেয়ারা বাগানে । তখন দমদম আজকের মত এত উন্নত হয় নি । আমাদের পাড়ায় মধুদার চায়ের দোকান ছিল আমাদের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা । সকাল সন্ধ্যে দয়াময় দেবতার নামে দু’বেলা আড্ডা না মারলে আমাদের পেটের ভাত হজম হত না ।
মাঝে মধ্যে রাত্রি বেলায় হত পিকনিক । মধুদার রান্না মাংস যে একবার খেয়েছে , তার অন্য কারোর রান্না মাংস ভালোই লাগবে না । এই পিকনিক হত কিভাবে ? আমাদের মধ্যমনি সুশীলদা । গ্রূপের নেমন্তন্ন যেখানেই থাকতো , সুশীলদা র নির্দেশে টাকা তোলা হত উপহার কেনার জন্য । টাকাগুলো সব ফান্ডে রেখে শধু একগোছা ফুলের তোড়া উপহার দিতাম । সেই টাকা দিয়েই পরে জমিয়ে পিকনিক ।

আড্ডায় এক একজন মহীরুহ । গল্পের আড়ৎ নিয়ে এসে বসতো । বিভিন্ন ধরনের গল্প । ক্রিকেট মাঠ থেকে পাড়ার ফুটবল , রাজনৈতিক সভা থেকে পাশের বাড়ির বৌদি , শ্মশান ঘাট থেকে নেমন্তন্ন বাড়ির উপহার । বাদ যেত না কিছুই । সুশীল দা একবার বলা শুরু করলে আর কেউ কথা বলার সুযোগ পেত না । একমাত্র আমি ছিলাম শ্রোতা । নিষ্ঠাবান শ্রোতা । সেইজন্য গল্পকাররা সকলেই আমাকে বেশ পছন্দ করতো । সুশীলদা একটু বেশি স্নেহ করতেন ।
একদিন সন্ধ্যে বেলায় যথারীতি আড্ডা জমেছে , এমন সময় বিনয় একটা নেমন্তন্নের কার্ড নিয়ে ঢুকলো । বিনয়ের বোনের বিয়ে । সুশীল দা কার্ড বাদ দিয়ে খামটা বিনয়ের হাত থেকে কেড়ে নিল । খামের পেছনে আমাদের নাম এক দুই তিন করে লেখা । আমাদের আড্ডার প্রায় সকলের নাম আছে । বিনয় বিনয়ের সাথে হাত জোড় করে নেমন্তন্ন করতে যাচ্ছিল । সুশীল দা ওর পেছনে সপাটে কিক ।
বলল , ন্যাকামি ছেড়ে যেখানে যাচ্ছিস ,সেখানে যা ।
আর কথা না বাড়িয়ে বিনয় চলে গেল ।
সুশীলদা বলল , বিনয়ের বোনকে কিছু উপহার দিতে হবে । তার কি পছন্দ আমরা জানি না । সবচেয়ে ভালো ক্যাশ টাকা দিয় দেব । পার হেড দুশো টাকা ।
এটা একদম গদবাধা কথা । প্রতিবার একই কথা বলে সুশীল দা ।
সরকার দা প্রতিবাদ করে বলবে , টাকাটা একটু বেশি হয়ে গেল না ? এই মাসে অনেকগুলো বিয়ের নেমন্তন্ন ।
উৎপল সরকারদাকে সমর্থন করে বলবে , আমারও একটু অসুবিধে আছে । একশো টাকা করলে ভালো হয় ।
বুলেট বলবে , ওই একশো টাকাই ঠিক আছে ।
বাকিরা সবাই একমত অর্থাৎ ওই একশো টাকা ।
সুশীল দা বলল , আমরা মোট চোদ্দজন ।
প্রতিবারের মত এবারও পটল আর টুকাই বলল , আমরা থাকছি না ।
তাহলে বারোজন । একশো টাকা করে হলে বারোশো টাকা । ঠিক আছে । সুশীল দা চ্যাপ্টার ক্লোস করলো এই বলে যে সকলে মধুদার কাছে টাকা জমা করে দেবে আর যারা যারা টাকা দেবে তাদের নামের পাশে মধু দা একটা করে টিক মারবে ।
অনুষ্ঠানের দিন যথারীতি দুশো টাকা দিয়ে একটা ফুলের তোড়া কেনা হবে । ওটাই আমাদের তরফ থেকে উপহার ।
সেবার আমাদের সকলকে সুশীলদা সাংঘাতিক লজ্জ্বায় ফেলে দিয়েছিল । পরে অবশ্য বলেছিল যে ওটা একটা ফান । সুশীল দার ভাইপোর অন্নপ্রাশন । বিনয় দায়িত্ব নিল । টাকা তুলে মধুদার কাছে জমা রেখে ফুলের তোড়া নিয়ে আমরা হাজির । একটা ছোট বাচ্চাকে ফুলের তোড়া ! দেখতে কেমন লাগে ? তাছাড়া অন্যেরা ভাববে কি ? কাকুর বন্ধুরা ফুলের তোড়া উপহার দিয়েছে । আমার খুবই খারাপ লাগলো । লাগলে কি হবে ,কিছুতো বলা যাবে না ।
সুশীল দার বৌদির হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে সবে আমরা পেছন ফিরেছি , সুশীলদার ডাক ।
ফুল দিলি । এই খামটা দিবি না ?
বিনয় বলল , কিসের খাম ?
কেন , টাকার । যেটা তোরা তুলেছিস আমার ভাইপোকে উপহার দিবি বলে ।
আমরা এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি ।
সুশীলদা বলল , আমি জানতাম তোরা টাকাটা আনতে ভুলে যাবি । তাই তোরা চলে আসার পরে আমি সাইকেল নিয়ে গেলাম মধুদার দোকানে । টাকাটা নিয়ে এলাম । বিনয় , তুই খামটা বৌদির হাতে দিয়ে দে ।
বুলেট বলল , সত্যি সুশীলদা , তোমার জবাব নেই ।
বছর তিনেক ছিলাম দমদমে । এর পরে আমরা চলে যাই লেকটাউন । ওখানে একটা বাড়ি কেনে বাবা । মধুদার দোকানের আড্ডা শেষ হয়ে গেল । চাকরি পেলাম অফিস পাড়ায় । দশটা পাঁচটার ডিউটিতে জুড়ে গেলাম । হারিয়ে গেল সুখের সে দিনগুলো । মাঝে মধ্যে খুব ইচ্ছে করতো একবার যাই সেই পুরনো আড্ডায় । যাওয়া হয় নি । বড্ড ব্যস্ত । এরপর বিয়ে করে ঢুকে পড়লাম সংসারের জাঁতাকলে । আমার এক সহকর্মী বলেছিল , বিয়ের পর প্রথম বছর সুখী দম্পতি , দ্বিতীয় বছর শুধু দম্পতি , তৃতীয় বছর থেকে দম দেওয়া পতি । আমি এখন দম দেওয়া পতির দলে । প্রতিদিন সকালে আমার স্ত্রী আমাকে দম দিয়ে ছেড়ে দেয় । দম দেওয়া পুতুলের মত তার নির্দেশে সব কিছু করি । তবুও সে কলকব্জা ঘেঁটে দেখে আমি কোনো যন্ত্রের রদ বদল করেছি কিনা । তার সমস্যার কারন আমি একটু বেশি মাত্রায় ভালো । এত ভালো স্বামী সে ভাবতেই পারে না । সেইজন্য তার সন্দেহ ।
অনেক বছর বাদে হঠাৎ একদিন ডালহৌসি মিনিবাস স্ট্যান্ডে সুশীলদার সাথে দেখা । একচুয়েলি সুশীলদাই আমাকে দেখেছে । টেনে নিয়ে গেল ট্রাম কোম্পানির ক্যান্টিনে । দুটো ডিম টোস্ট আর চায়ের অর্ডার দিয়ে আমরা বসলাম একটা ফাঁকা টেবিলে । সুশীলদা বুক পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করলো । একটা বের করে এগিয়ে দিল আমার দিকে ।
তারপর নিজেই বলল , সরি , তুই তো এসব খাস না । সেই আগের মত একদম লাল্টু রয়ে গেছিস ।
বিড়িটা দু আঙুলে নিয়ে কানের কাছে ধরে টিপে টিপে ঘোরালো । তারপর বিড়ির সামনে পেছনে দুবার ফু দিয়ে ফস করে লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে নিল ।
এক মুখ ধোয়া ছেড়ে বলল , কেমন আছিস ? কি করছিস ?
আমার সম্পর্কে যেটুকু বলার সব বললাম ।
সুশীলদা স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে শুরু করলো তার ফেলে আসা জীবনের কথা ।
বুঝলি , আমাদের ওই আড্ডাটা আর নেই । সবাই কেমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে । মধু দা মারা গেছে । দোকান ঘর ভেঙে ওই জমিতে তৈরী হয়েছে বিরাট ফ্ল্যাট ।
তারপরে হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল , আমাদের উপহার দেবার কথা মনে আছে তোর ?
সে আর থাকবে না । তোমার ভাইপোর অন্নপ্রাশনে যা নাটক করলে ।
ওই নাটকই আমার জীবনের কাল হল ।
কি ভাবে ?
তোরা তো চলে এলি । আমি জানি এরপর আমার গুষ্টির পিন্ডি চটকিয়েছিস । আচ্ছা , আমার ব্যান্ডেলের পিসিকে মনে আছে তোর ?
কোন পিসি ?
ও তুই তাহলে চিনিস না । বাবার দূর সম্পর্কের বোন ।

পিসির খুব ইচ্ছা তার সইয়ের মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার । বাড়ির লোক রাজি । তারপর ঠিক কায়দা করে ঐ ধুমসি কালো মেয়েটাকে আমার কাঁধে ঝুলিয়ে দিল । তার যে ভেতরটাও কালো তখন বুঝতে পারি নি । বুঝলাম বিয়ের এক বছরের মাথায় । ওরা চার ভাই এক বোন । প্রত্যেকেই এক একটা মাল ।
তুই তো জানিস আমি একটা ছোটো মোটো চাকরি করি । খাটনি বেশি , মাইনে কম । প্রতি বছর পুজোতে আমার স্ত্রীর আবদার তার বাপের বাড়ির সবাইকে দামী উপহার দিতে হবে । ধার দেনা করে দিতে বাধ্য হতাম । এরপর আসতো ভাইফোঁটা । বাপের বাড়িতে গিয়ে ভাইদের শধু পঞ্চ ব্যঞ্জনে রেঁধে খাওয়ালেই হবে না । সাথে দিতে হবে নামি ব্রান্ডের দামি শার্ট আর ট্রাউসার ।
বলতাম , এই তো পুজোয় দিলাম এত দাম দিয়ে । আবার ভাইফোঁটায় কেন ? আমার কি টাকার গাছ আছে ?
ব্যাস , শুরু হয়ে যেত ঝগড়া । তার যে কি ভাষা তোকে কি বলবো |
প্রতি বছর অশান্তি লেগেই থাকতো । মনে মনে বলতাম , শালা , তোর ফ্যামিলির চোদ্দগুস্টির কেউ কোনদিন দামি ব্র্যান্ডের জামা কাপড় পড়েছে ? পরের পয়সায় ফুটানি ।
উপায় নেই গোলাম হোসেন । শান্তি বজায় রাখতে শালা আমাকেই হার মানতে হত । একজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ধার করে কিনে দিতে হত গিন্নির ভাইদের জন্য দামী উপহার ।
ধার তো করছি কিন্তু শোধ দেব কি ভাবে ? কাবলিওয়ালার মত লোকটা লেগে থাকলো আমার পেছনে । ভয়ে ভয়ে লুকিয়ে বেড়াই । একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে দেখি লোকটা দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার বাড়ির দরজার সামনে । বাধ্য হয়ে কথা দিলাম তিনদিনের মধ্যে টাকা সুদ সমেত ফেরত দেব ।
অফিসে ক্যাশিয়ারবাবু না এলে আমাকে ক্যাশ সামলাতে হত । ভাগ্যক্রমে পরেরদিন ক্যাশিয়ারবাবু আসেন নি । যা জীবনে করিনি তাই করলাম । ক্যাশ থেকে টাকা চুরি । কাজে লাগলো না । ধরা পড়ে গেলাম । পুলিশ ধরে নিয়ে গেল । মারের নাম বাবাজি । গড়গড় করে সব বলে দিলাম । পরদিন সকালে কোর্টে চালান করে দিল । ছয় মাসের জেল । সাথে জরিমানা । অনাদায়ে আরো তিন মাস । পুরো নয় মাস জেল খেটে গত জুলাই মাসে ছাড়া পেয়েছি । চাকরিটা গেছে । বৌ বাপের বাড়ি চলে গেছে । ডিভোর্স দেবে । চোর স্বামীর সাথে থাকবে না । শালা , এই ডিভোর্সটা আগে দিতে পারতিস । তাহলে তোর ভাইদের উপহার দেবার জন্য আমাকে চুরি করতে হত না । চোর তকমা পিঠে সেঁটে গেছে । ওই পাড়া ছেড়ে দিয়েছি ।
এখন তাহলে কোথায় আছ ?
নোয়া পাড়ার দিকে ভাড়া উঠেছি । জেলে বস্তিতে থাকি । মাছের ভেড়িতে পাহারাদারের কাজ করি । পার্টির কাজে কলকাতায় এসেছিলাম । তোর সাথে দেখা হয়ে গেল । চলি ভাই । ভালো থাকিস ।
মিনি বাসের জানলার ধারে সিট্ পেয়েছি । বিকেলটা কেমন মেঘলা হয়ে এলো । হুহু করে ঠান্ডা হাওয়া আসছে । গালে হাত দিয়ে বসে ভাবছি যে উপহার একদিন সুশীলদার কাছে মজার ছিল , সেই উপহার তার জীবনে অভিশাপ হয়ে এলো । ভাগ্যের কি পরিহাস ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top