এই করেছ ভালো – মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়

এই করেছ ভালো

সুজয় সিগারেটের একটা এ ক্লাস রিং শুন্যে উড়িয়ে বলল –দূর, তাই আবার হয় নাকি? গল্প তো গল্পই| আমি অবাক হয়ে খানিকক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থেকে বললাম –হয় বন্ধু হয়, তোমার তো মাথা মোটা, তাই অনেক কিছু বুঝতে তোমার অনেক সময়ই লাগে| সুজয় পকেট থেকে আবার একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে বলল – জানিস এটার দাম কত?বললাম- এরসে তো বঞ্চিত দাস, জানবে কি করে? খুব কায়দা করে সিগারেট ধরিয়ে সুজয় বলল – লিখিস গল্প অথচ নেশা করিস না,এটা কি করে হয়?

নেশা ছাড়া আবার গাল গল্প হয় নাকি? মুচকি হেসে বললাম- হয় বন্ধু হয়, আমি নেশা করি না বটে তবে নেশা ধরাতে আমি ওস্তাদ|ধরাবো নাকি তোকে? সুজয় হান্সলো| ব্যঙ্গের হাসি| গোল্লায় যাক সুজয়| আমি বলি আমার কথা| আমার বয়স মেরেকেটে বত্রিশ|লম্বায় ছ ফুট তো হবই, বেশি ও হতে পারি| আদিমাস্টার মশায় বলতেন- তুই ব্যাটা ভগবানের লগা| ভগবান তোকে দিয়ে গাছ থেকে তেনার ইচ্ছামত ফলটা মূলোটাপাড়িয়ে নেবেন| তোর ভাগ্যে লবডন্কা| আদি স্যারের কথা খেটে গেছে | আমি একটা ভালো বিদেশী কোম্পানিতে কাজ করতাম| তাড়িয়ে দিয়েছে| টুইসন করে যা পাই তাতে যে কেউ ঈর্ষায় জ্বলতে বাধ্য| কোনোনেশা করিনা বলে রক্ষে |

ধোপ দুরস্ত পোশাক জোটেনাতবে দেদার সিনেমা দেখি, কফি হাউসে আড্ডা মারি , আর কিনি ক্লাসিকাল গানের সিডি| মেয়েরা আমাকে বেশ পছন্দই করে| বর্তমানের নামী মহিলা ঔপনাসিক দোয়েল মিত্র প্রায়শই বলেন –একদিন আসবেন না আমার বাড়ি| জমিয়ে গল্প করা যাবে| কোনদিনই যাওয়া হলনা ভদ্র মহিলার বাড়ি| শুভমিতার গল্প বলব? কলকাতার এক অভিজাত পরিবারে জন্মেছিল শুভমিতা| এক নামকরা কলেজে পড়ে স্নাতক হলো| চাকরি নিল একটা স্কুলে| কয়েক মাসের মধ্যে ছাড়ল সেই চাকরি| জয়েন করলো একটা এন জি ও তে | কিছুদিন যোগাযোগ ছিল আমার সঙ্গে| তারপর একদিন কোথায় যেন চলে গেল মেয়েটা| মালবিকার কথা বলব?

কি হবে বলে? আপনারা তো চেনেন না ওকে| তবেওর একটা কথা আমার খুব মনে পড়ে | ও প্রায়শই বলত – আমাকে দেখলে ওর নাকি খুব কান্না পায়| কোনদিনই জানতে পারলাম না কেন| একবার কি হয়েছিল জানেন? আমি আর আমার বন্ধু সুচেতনা শহীদ মিনারের তলায় বসে গল্প করছিলাম| বিষয় তিশয় সেরকম কিছু ছিল না| ওই এলো মেলো চর্বিত চর্বন| সেখ্হানে কবি সোমদেব ও ছিলেন আবার বলিউডের নায়ক দেবকুমার ও ছিলেন| চিনে বাদাম চিবুতে চিবুতে গল্প হচ্ছিল| হটাত কি হলো জানেন? সুচেতনা দুম করে বলে উঠলো আমার জন্য ও নাকি শহীদ মিনার থেকেও ঝাঁপ দিতে রাজি আছে| জোর ভয় পেয়ে গেলাম|

কি জানি বাবা, সাহিত্য পড়া মেয়ে, সত্যিই যদি ওপর থেকে ঝাঁপ দেয়? আমি লুফতে পারব ওকে? বললাম- এটা তো অত্যন্ত ভালো কথা| আমার জন্যে যে কেউ ঝাঁপ দিতে পারে আমি তো স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি| তা এক কাজ কর ছোট টুলথেকে ঝাঁপ দিয়ে প্রাকটিস শুরু কর| মানুষ তো প্রাথমিক প্রাকটিস এর পরেই বড় কাজে হাত দেয়, তাই না? সেদিনকার মত ট্রাম এ তুলে দিয়ে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম| এক ঘন্টা অন্তর ফোন করে জানলাম ও অ্যাকচুয়ালি করছে টা কি | পাঁচদিনসুচেতনার দেখা নেই| ফোন করি, ফোন বেজে যায়, ধরেনা কেউ| মনের মধ্যে শহীদ মিনার উঁকি দিচ্ছে দিনরাত| রোজ সকালে কাগজ খুলেই আগে পড়িহতাহতের খবর| ঠিকানা জানা ছিল|

একদিন সন্ধ্যে বেলায় সাহস করে চলেই গেলাম সুচেতনাদের বাড়ি| সাহেবী কোম্পানির বড়বাবু বাবা সামনেই বসে ছিলেন| প্রনাম করলাম|বেশ কেতাবি ঢঙে ভদ্রলোক জিগ্গেস করলেন আমি কে? কি চাই? একটুওঘাবড়ে না গিয়ে পেড়ে ফেললাম কথাটা|- দেখুন আমি সুচেতনার খুব ভালো বন্ধু| আমরা দুজন দুজন কে খুব ভালো করে চিনি, বেশ কয়েক বছর তো হবেই.. তো ওকে আমি চাই… একচুয়ালি ও আমাকে ছাড়া বাঁচবে না বলেছে| কথাটা তখন শেষ হয় নি, সুচেতনার বাবা উঠে গেলেন| নিয়ে এলেন ভারী সুন্দর একটা কার্ড| আমার হাতে দিয়ে বললেন – টেক ইট ইয়ং গাই … রিড ইটকেয়ারফুলি| কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা নিলাম | বিয়ের কার্ড| ওপরে লেখা আছে –সুচেতনা ওয়েডস সুজয়|

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top