এ কেমন হঠাৎ প্রেমে দিবস পালন?

শিরোনাম :
এ কেমন হঠাৎ প্রেমে দিবস পালন?

তন্ময় সিংহ রায়

জীবন মানেই যথাসম্ভব নিজের আখেরটা গোছানোর স্বপ্নে বিভোর থেকে কিছু সামাজিকতার বাধ্য পালন নয় , সেখানে থেকে যায় এমন কিছু মূল্যবান সামাজিক দায়িত্ব ,
যা সম্পন্ন করতে হয় সমবেতভাবে , আর সেগুলোকে উপেক্ষা করা যায় তো না’ই , উচিৎও নয় কোনভাবেই।
আবার কিছু কাজ করতে হয়
নিঃসঙ্গভাবেই।
জ্ঞান-বুদ্ধির কুঁড়ি থেকে পরিপূর্ণ বিকাশ পর্যন্ত প্রায় আমৃত্যু , সত্যিই কি কোনদিন এ পৃথিবীকে আমরা ভাবতে পেরেছি বা পারি আমাদের একান্তই নিজেদের একমাত্র পরম সুখের আবাসস্থল হিসেবে?
না হোক সবাই , অন্তত সিংহভাগ যদি আমরা পারতাম ভাবতে , তো আজ কি দেখতে হত পরিবেশের দেহের অর্ধউত্তীর্ণ দগ্ধ এই বিভৎস ও করুণ চেহারাটা?
না দেওয়ালে পিঠ ঠেকে , হাপিত্যেশে ফেলতে হত দীর্ঘনিঃশ্বাস?

১৯৯০ সালে সৌরমণ্ডলের যথাসম্ভব কাজ শেষ করে ভয়েজার-১ এর বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি পর্ব , এমন সময়ে বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী , জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী , বিজ্ঞান লেখক ও মার্কিন মহাকাশ প্রকল্পসমূহের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব কার্ল এডওয়ার্ড সেগান-এর অনুরোধে ভয়েজারের ক্যামেরাকে যে মুহূর্তে করা হয়েছিল পৃথিবীর দিকে , ৬ বিলিয়ন কিমি দূর থেকে পৃথিবীকে সে সময়ে দেখতে লাগছিল একটা উজ্বল ছোট্ট নীল বিন্দুর মতন!
আর ৬ বিলিয়ন দূরত্ব থেকে নেওয়া এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম ও শেষ ছবি।
সেই ছবি দেখে আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর হয়ে ওঠা মনের এই মানুষটার মূল্যবান বক্তব্যের প্রধান অংশ ছিল এমন যে ,
‘অনন্ত মহাবিশ্বে আমাদের পৃথিবী একটা ধুলোর কণাও নয়!
এমন কোন জায়গা এখনও নেই যেখান থেকে আমরা বিপদে পড়লে আমাদের কেউ উদ্ধার করতে আসবে বলেও মনে হয়।
এখন পর্যন্ত পৃথিবীই এমন স্থান যেখানে আমরা বসবাস করতে পারি , আর এমন কোন জায়গাও নেই যেখানে মানবজাতি থাকার জন্যে যেতে পারে , হ্যাঁ আমরা পৃথিবী থেকে অনেক জায়গাতেই গেছি , কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারিনি!
এখন আপনি এই পৃথিবীকে পছন্দ করুন আর নাই করুন , আমাদেরকে থাকতে হবে এখানেই! আমার মতে এই ছবি (ছোট্ট নীল বিন্দু) আমাদেরকে কর্তব্যের কথা বলে।
আমাদেরকে একে অপরের প্রতি আরও অধিক নরম ও সহনশীল আচরণ করতে হবে , যাতে আমরা এই ছোট্ট বিন্দুকে আমাদের বসবাস উপযুক্ত করে একেও রাখতে পারি বাঁচিয়ে!’

মাঝে মধ্যে মনের জরায়ুতে প্রশ্নগুলো জন্মেই শুরু করে লাথি মারতে ,
প্রতি বছরের একটা নির্দিষ্ট তারিখে এই মাতৃ দিবস , বন্ধুত্ব দিবস , জল দিবস , পরিবেশ দিবস ইত্যাদি বিশেষত গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো ঘটা করে এবং
কাল্পনিকভাবে পালন করা হচ্ছে তো নিয়মমাফিক ঠিক’ই , কিন্তু এগুলোর তাৎপর্য বা গুরুত্বের বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে ঠিক কতটা পরিমাণে?
সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন এতে হচ্ছেই বা ঠিক কতটুকু?
কারণ মাঝেমধ্যেই জীবনের নানান উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে আমাদের অসচেতনতা , অবহেলা , অযত্ন , দায়িত্বজ্ঞানহীনতা প্রভৃতিগুলো সমাজে ফুটে বেরিয়ে পড়ে জ্যোৎস্নার আলোর মতন!
সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের অতিমারি বোধহয় এর উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ।
বৃদ্ধাশ্রম তো আজও আছে কানায় কানায় পূর্ণ , বা পৃথিবীর পরিবেশ তো অজ্ঞান অবস্থাতে আজও আছে আই সি ইউ’তে পড়েই!

প্রকৃতিতে অষ্টম আশ্চর্য তো টেনে টেনে খুঁজে বের করেছে মানুষ , কিন্তু মানুষ’ই হওয়া উচিৎ নবম আশ্চর্যের তালিকায় এক্কেবারে প্রথম!
কারণ মানুষের এই মনের রহস্যের বৈচিত্র্যতা , গভীরতা ও ব্যাপ্তি বোধহয় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব রহস্যের কাছে প্রতীয়মান হবে ছোট!

বিষয়টা যেন প্রতি বছর ক্রমশই উঠছে হয়ে কেমন যেন এক কার্টুন কার্টুন ব্যাপার!
প্রতি বছর আমরা পরিবেশের দেহ ও মনকে সুস্থ-সবল বা ফুরফুরে তাজা করি জিভ বা কলমের দৌড়-ঝাঁপে , বাস্তবে কম অথবা নয়।
আর এটাই তো গর্বের সাথে করে আসছি আমরা দীর্ঘদিন ধরে।
অর্থাৎ প্রতিবছর ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ সম্পর্কে বিশেষ সচেতনতার প্রমাণ দিতে আমরা করে থাকি নানান সব কৃতকর্ম।
কত ছবি? কত ক্যাপশন? কত বড় বড় কথা?
গন্ডা গন্ডা প্রতিশ্রুতি ইত্যাদি।
এই যেমন আমরা গাছ লাগাই কম , জ্ঞান বা নির্দেশ দিই বেশি , আবার ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে আমরা পরিবেশের প্রতি যখন খুশি , যতবার ও যতটা খুশি হতেই পারি চেঙ্গিস খান।
এদিকে ‘মা দিন’ আসলেই মাতৃ ভক্তি বা প্রেম আমাদের তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে জেগে?
তেমনই ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ আসলেই যেন আমাদের চেতনা ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে ভিসুভিয়াস হয়ে , কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ঠিক পরদিন’ই থেকে সারাটা বছর আবার তা থেকে যায় শীতঘুমে!
কারণ কি তবে এই যে , এটা আমাদের ব্যক্তিগত ঘর নয় , বারোয়ারী?
তাই বৃথা খাটা-খাটনির মাধ্যমে যত্ন-আত্তি বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাটা বোকামি ও সময়ের অসৎব্যবহার , কিংবা লোকদেখানো সচেতনতা?
বা সমস্ত দায়িত্বই সর্বদিক থেকে হওয়া উচিৎ সরকারের বা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের?
এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা , স্বার্থপরতা , অলসতা
ও অসচেতনতাই ধীরে ধীরে যে মানব সভ্যতার অস্তিত্বের চুলের ঝুঁটি ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিশ্চিত পৌঁছে দিচ্ছে ধ্বংসের করাল গ্রাসে ,
তা কি আমরা বুঝেও , চাইছিনা বুঝতে?
না ভাবছি বুঝলেও কিছু এসে যায় না।
কিংবা ভাবছি , জো ভি হোগা দেখা জায়েগা?
নিশ্চিহ্ন হওয়ার সময় আসন্ন বলাটাও কিন্তু এখানে নিছক অযৌক্তিক কিছু নয়।
1972 , 5 June থেকে শুরু করে 2021 , 5 June. পর্যন্ত ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ নিষ্ঠার সাথে পালন করার পরেও , দৈহিক ও মানসিক অত্যাচার করে করে এই ৪৯ বছরে কি ভয়ানক সর্বনাশ করে ছেড়েছি আমরা আমাদের এই সাজানো-গোছানো অপরূপ পরিবেশের?
কিন্তু আমরা এই ৪৯ বছরে নিজেদের সাধের শরীরকে সাবান , শ্যাম্পু ও ক্রিমে ঝকঝকে ও মোলায়েম করে গেছি ক্রমাগত , কারণ এটা প্রিয় ও নিতান্তই ব্যক্তিগত দেহ , আর নিজেদের ঘর সাজিয়ে চলেছি মহার্ঘ্য সব গ্যাজেটে!
হঠাৎ কোন একদিন যদি পরিবেশ ফিরে পায় তার বাকশক্তি , তো প্রথমেই সে চিৎকার করে বলবে ,
‘ওহে!… বিকৃত মস্তিষ্কের সর্বশ্রেষ্ঠ
ডিগ্রিধারী ,
ঘরের শত্রু বিভীষণ?
কোনদিন , কি ক্ষতি করেছি তোদের?
যে ঘরে থেকে শান্তিতে গলাধঃকরণ করিস ঘি-মাখন আর মন্ডা-মিঠাই ,
যে গৃহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম তোদের উপহার দেয় নিশ্চিন্তের গহীন ঘুম ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা , সে ঘরের কোষগুলোকেই হলদে-লাল আগুনে একটু একটু করে পুড়িয়ে চলেছিস ক্রমাগত?
ভেবেছিস গভীরভাবে কখনও , এর ভবিষ্যৎ পরিণামটা ঠিক কি?’

বর্তমানে পরিবেশের প্রতি মানুষের কর্মকাণ্ড অতিতের যে কোনো সময়ের তুলনায় দিনের পর দিন ধরে উঠছে হয়ে আগ্রাসী!
ফোর্বস ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে , ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আমেরিকান রাজনীতিবিদ ও লেখক এবং ওয়াশিংটন হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ-এর সদস্য ড্রিউ হ্যানসেন
মানুষের অযাচিত কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ ভবিষ্যৎ বিশ্বের যে যে ক্ষতি হতে পারে , তা একবার উদাহরণসহ যুক্তি বিজ্ঞানের প্রয়োগে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে ,
* ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বে প্রতি বছর বিলুপ্ত হয়ে চলেছে ৬ মিলিয়ন হেক্টর প্রাথমিক বনভূমি।
* বিশ্বের ৬৫ মিলিয়ন বছরের ইতিহাসে বিভিন্ন প্রাণীর বিলুপ্ত হওয়ার গতির চেয়ে এ সময়ের গতি তুলনামূলকভাবে ১০০০ গুণ দ্রুত।
* সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যা ২০৫০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ১০০০ কোটি বা ১০
বিলিয়ন ,
যার ফলে পরিবেশ ব্যাপক মাত্রায় হারিয়ে ফেলবে এর ভারসাম্য!
একদিকে বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় প্রতিনিয়তই ক্রমবর্ধমান , আর এই বাড়তি জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটানো থেকে শুরু করে তাঁদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া নিশ্চিত করতে বিশ্বের পরিবেশের ওপর সৃষ্টি হচ্ছে অবিরত
বাড়তি চাপ , যা ক্রমশই হয়ে পড়ছে অসহনীয়!
অপরদিকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাড়তি কোনো উদ্যোগ আসছে না কোন
কাজেই ,
ফলে অদূর ভবিষ্যতে বাড়তি জনসংখ্যার কারণে বিশ্ব পড়বে মারাত্মক বিপদের মুখে!
এবং এই মহা-বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে ২০৫০ সালেই!
এদিকে বাণিজ্যিকভাবে কৃষিকাজের ফলে পরিবেশ ধ্বংস , বনভূমি কেটে সম্পদ বৈচিত্র আহরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামেও পরিবেশ ধ্বংস , মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার , এসবের ফলে বিশ্ব ক্রমে
হারিয়ে চলেছে মানুষ-সহ সমস্ত প্রাণীর বাসযোগ্যতা , আর এর পরিণামস্বরূপ ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তনের মতন মারাত্মক প্রতিক্রিয়া!
* যুক্তরাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে এবং এই সংখ্যাটা আজ বেড়ে চলেছে ক্রমেই ,
বলাবাহুল্য সারা বিশ্বের চিত্রটা এর থেকে ব্যতিক্রম কিছুই নয়!
যদিও এ সমস্ত কারণে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন একমাত্র পুঁজিবাদকেই।

আমাদের অতিরিক্ত লোভ-লালসা ও চাহিদার কারণে আজ বহু জীব হারিয়েছে তাঁদের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য , হয়ে গেছে বা যাচ্ছে নিশ্চিহ্ন!
প্রকৃতি অবিরত হারিয়ে ফেলছে তাঁর স্বাভাবিক রূপ ও লাবণ্য!
আর এ সমস্ত অসহনীয় কারণেই এ গ্রহটা অসম্ভব দুঃখ , রাগ , অভিমান ও যন্ত্রণায় বাধ্য হয়ে হয়তো বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার একমাত্র পথ , তবুও আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসচেতনতার বীজ উঠছে বেড়ে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top