কথারা

 2 total views

#কথারা
#শম্পা_সাহা

রিয়া কখনো উপুড় হচ্ছে, কখনো চিৎ। আর প্রাইমারের ওপর সাদা পেইন্ট করা সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে যাচ্ছে অনর্গল।

সৌমিক চেয়েছিল একটু ফুল লতাপাতার বা স্টার দিয়ে সিলিং টা সাজাতে, রিয়া রাজি হয় নি, ওর সাদা সিলিং ভালো লাগে সেই ছোট্ট থেকেই।

রিয়া সারাদিন ফাঁকা থাকলেই কথা বলে, একা একা। কখনো কাঁদে, কখনো চিৎকার করে , কখনো হাসে, সবটাই একা!

রিয়া কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ। অন্তত কেউ তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখতে পায়নি। এছাড়া ও একটা বেসরকারি ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার। বেশ মোটা মাইনে, আর সৌমিক ও সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হবার সুবাদে ওদের মিলিত মাইনে মাস গেলে প্রায় সোয়া লাখ তো বটেই!

ওদের বিয়ের মাত্র দুবছর বয়স, এর মধ্যে বাচ্চা কাচ্চা! কোনো প্রশ্ন ই ওঠে না। সৌমিক তো ওসব ঝামেলাতেই যেতে চায় না। “ভারতবর্ষের লোক সংখ্যা এখনি একশো তিরিশ কোটি, দেশ টা উচ্ছন্নে পাঠাতে আমাদের অবদান না রাখলেই নয়? ” ব্যস, এ নিয়ে রিয়া আর কথা বাড়ায় নি।

বিয়ের পর ওরা হানিমুনে শিলং গিয়েছিল। পাহাড়, অর্কিড, হোটেলের উষ্ণতা আদানপ্রদান যেন এক স্বপ্ন মনে হয়। আহা সকালে উঠে পাশাপাশি বসে কফির স্বাদ আর চোখে সদ্য ঘুম ভাঙা নতুন বিয়ের ঘোর!

তারপর? তারপর থেকে অফিস আর বাড়ি, বাড়ি আর অফিস! রিয়া এমনিতে ইন্ট্রোভার্ট, ওর ব্যাঙ্কে বসে টাকাগুনতেই বিশেষ ভালো লাগে।

বেশ কাস্টোমার স্লিপ বা চেক এগিয়ে দেয়, আর গুনে টাকা দেওয়া বা নেওয়া। তাতে যে ওর কথা বলতে হয় না, এ যেন ওর বাঁচোয়া!

তবে বিয়ের পরপর রিয়ার মন খারাপ করতো, বাড়ির জন্য, মায়ের জন্য, ওর নিজের ঘরে রাখা বড় টেডি টার জন্য, জানালার সামনে রাখা বেগুনী অর্কিড টার জন্য।এমনকি বাড়ির ঢোকার মুখের স্যাঁতসেঁতে গন্ধটার জন্য ও ওর মন খারাপ করতো।

মাঝে মাঝে চলে যেতো দুম করে। সৌমিক কে জানানোর কোন দরকার পড়তো না। ওরা আজকালকার দম্পতি, সেই আগের মত পারমিশন টারমিশন বড্ড সেকেলে!

কিন্তু ফোন না করে বাড়ি গিয়ে বেশিরভাগ দিন ই দেখত কলাপসিবল গেটে তালা। আর ফোন করলে মা নানা মিটিং এ ব্যস্ত!

রিয়া বোঝে, বাবা মারা যাবার পর এই এনজিওর চাকরি টাই ওদের বাঁচিয়ে রেখেছে। মাকে দোষ দিতে পারে না। ফোন করলেও মা হয় ব্যস্ত, আর নয়তো কিছু ক্ষণ কথা বলেই বলে, “সোনাই, ফোনটা রাখি? আমার একটা ইমপর্ট্যান্ট কল ঢুকছে! “, ব্যস্ ফোন কেটে যায়।

ব্যাঙ্কে এমনিতেই ডেস্ক থেকে মাথা তোলার উপায় নেই, আর তাছাড়া ওদের ব্রাঞ্চে মাত্র তিনজন মেয়ে। ও বাদে বাকিরা সবাই আনম্যারেড, ফলে কানে হেডফোন, সারাক্ষণই গুজগুজ করতে থাকে। তাছাড়া রিয়া চট্ করে অত সবার সঙ্গে মিশতে পারে না।

অফিস তো কেটে যায়, কিন্তু বাড়ি ফিরে দেওয়াল গুলো যেন ওকে গিলতে আসে। কত কিছু মনে হয়, রাগ, অভিমান , ভালোলাগা! কিন্তু কাকে বলবে?

সৌমিকের ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটা। তার পর কোনোরকমে খেয়েই আবার নানা প্রজেক্টের কাজ। রিয়া জানে, সৌমিক বিদেশ যাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে, তাই এই প্রোমোশনটা ওর চাইই চাই।

রিয়া নিজের পাশের বেড সুইচ টা নিভিয়ে শুয়ে পড়ে, কিন্তু ঘুম আসে না। সারাদিনের না বলা কথারা, যেগুলো ও বলতে চায়, যে ভালোবাসার আকুতি, একা থাকার অভিমান, বাসে অসভ্য লোকের ইঙ্গিত, সে সব ই ওর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।

রবিবার দিন গুলো তো যেন আরো ভয়ংকর। সেদিন অবশ্য ও একটু দেরি করে ওঠে। রান্নার মাসী আসে ঠিক আটটা। সৌমিক ব্রেকফাস্ট সেরে বেড়িয়ে যায় ক্লাবে, আড্ডা দিতে। রিয়া জানে এটাও ওর বস কে খুশি করার একটা ট্রিক।

তাই রিয়া ও একটা ট্রিক বের করেছে। কাজের মাসী চলে গেলে, রোজই ও কথা বলে। রবিবার বাদে অনান্য দিনগুলোতে সকালে হয় না, কিন্তু সন্ধ্যেতে রোজ রোজ , আর রবিবার তো সারাদিন রিয়া কথা বলে।

একা একাই কখনো সিলিং, কখনো দেওয়াল, কখনো আলমারি, বন্ধ টিভি এ সবের দিকে তাকিয়ে ও কথাগুলো বলে যায়। কখনো কখনো টিভি চালিয়ে টিভির চরিত্র গুলোর সঙ্গে ও অনর্গল বকে চলে।

ওর না বলা গোপন ইচ্ছে, অনিচ্ছে, চাওয়া, পাওয়া যা শোনার কারো সময় নেই, না ওর বন্ধুদের, না সৌমিকের না ওর মায়ের। সেই কথা গুলো ওর মনের আগল থেকে বের হয়ে ঘুরপাক খেতে থাকে রিয়ার চারপাশে। রিয়া তৃপ্ত হয়, আনন্দিত হয়, পরিপূর্ণ হয়। আর কথারা জমা হয় রিয়ার মনের বাইরে, তৈরি করে এক ঘূর্ণিঝড়, যার কেন্দ্রে চুপটি করে বসে থাকে রিয়া, একা, একেবারে একাই।

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *