কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৬ – সৌম্য ঘোষ

ধারাবাহিক প্রবন্ধ :
কবিতার রূপকল্প : পর্ব ১৬
 বিশুদ্ধ কবিতার আত্মমগ্ন ধারা       
            
  
                    প্রগতি আন্দোলন দ্বারা প্রাণিত সমাজসচেতন কবিতার ধারার পাশাপাশি প্রভাবিত হয়েছিল ” বিশুদ্ধ কবিতার আত্মমগ্ন ধারা” ।  এই ধারার কবিরা বুদ্ধদেব বসুর কলাকৈবল্যবাদকে গ্রহণ করেছিলেন । তাঁরা বুদ্ধদেব বসুকে তাঁদের ‘নেতা’ মেনে নিয়েছিলেন।  এঁদের মধ্যে আছেন —- সুনীল চন্দ্র সরকার , অশোক বিজয় রাহা , কামাক্ষী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ কুমার সরকার, নরেশ গুহ, রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরী, জগন্নাথ চক্রবর্তী, অরুণ ভট্টাচার্য, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আলোক সরকার প্রভৃতি।
                   কবি সুনীল চন্দ্র সরকার (১৯০৭-১৯৬১) মগ্ন মুগ্ধ কবি । তিনি আহ্বান করেন,
“আয় চলে এই জামতলায়
 দূর থেকে দ্যাখ বাড়িটা তোর ।”
দেশ ভাগ এবং তর্জনীর উদ্বাস্তু বন্যার কথা তিনি ভুলতে পারেন না ।
“ছেড়ে গ্রাম জমি জোত
 আজ এই শ্রেণী স্রোত
 হয় পৃথিবীর ।”
                 কবি অশোক বিজয় রাহা (১৯১০–৯০)
ছিলেন ‘রূপদক্ষ কবি’ । তাঁর কবিতায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য সৌন্দর্য চমৎকারভাবে রূপায়িত হয়েছে । এই দেশ যেন রূপকথার দেশ, সেখানে নিসর্গ আর প্রেমের অনুভূতি মিশিয়ে তাঁর কবিতার বই “উড়োচিঠি ঝাঁক”।
             কবি কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় (১৯১৭–৭৬) এই সময়ের একজন সুপরিচিত কবি ছিলেন ।
“মৈনাক, সৈনিক হক
 ওঠো কথা কও।
 দূর করো মন্থর মন্থরা
  মেদময় স্ফীত বৃদ্ধ জরা ।”
            কবি বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯১৬–) আজ প্রায় বিস্মৃত । তাঁর কাব্যগ্রন্থ “আকাশিনী ও  মৃন্ময়ী” ।
           বিশুদ্ধ কবিতার ধারা র তিনজন খুব উল্লেখযোগ্য কবি হলেন , কবি অরুণ কুমার সরকার (১৯২২–৮০) , কবি নরেশ গুহ (১৯২৪–২০০৯),কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী ( ১৯২২–২০০৯ ) । অরুণ কুমার সরকার মনোজ্ঞ কবিতা লিখতেন । তাঁর কবিতায় আছে জাত শিল্পীর প্রমাণ ।
        “স্মৃতি থেকে তাই এনেছি দু’মুঠো
          গন্ধ মদির আমনধান্য ‌।
          ওদুটি চোখের তাৎক্ষণিকের
         পাব কি পরশ যৎসামান্য ?”
আনন্দ চিত্তে বুদ্ধদেব বসুর কাব্যের রাজ্যে ভ্রমণ করেন তিনি এবং প্রার্থনা করেন, “যদি মরে যাই/ ফুল হয়ে যেন ঝরে যাই ।”
আদ্যন্ত প্রেমের কবি অরুণ কুমার লিখলেন,
      “বইতে পারিনা আমি এই গুরুভার
       এত প্রেম কেন দিলে এতটুকু প্রাণে।
       প্রেম জাগে দু নয়নে, প্রেম জাগে ঘ্রাণে
        প্রেম জাগে তৃষাতুর হৃদয় আমার ।”
                       কবি নরেশ গুহ বুদ্ধদেব বসুর ভাব শিষ্য। তাঁর প্রথম বই “দুরন্ত দুপুর” । এই কবি শৈলী দক্ষ ।
“আমাকে ডুবাও জলে, হাওয়ায় শুকাও,
 তবু গান দাও।”
প্রেমের কবি লিখলেন,
      “মাঘ শেষ হয়ে আসে
      ভোর হলো হীমে নীল রাত ।
       আলোর আকাশগঙ্গা ঢালে কত উল্কাপ্রপাত।
       আনত ওষ্ঠের তাপ বসন্তের প্রথম হাওয়ায় ।”
কবির  সংকল্প :
        “মৃত্যুকে দিয়ে মৃত্যুকে হবো পার,
         কবিতা আমার, কবিতা আমার ।”
আবার কখনো লেখেন :
         “এক বর্ষার বৃষ্টিতে যদি মুছে যায় নাম
      এত পথ হেঁটে এত জল ঘেঁটে কী তবে হলাম ?”
                  কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী এই সময়ের এক বড় মাপের কবি । তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ  একত্রে সংকলিত হয়ে ” ব্রহ্ম ও পুঁতির
মউরি ” । তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই “আরশিনগর”।
               এই ধারার দুই সফল কবি  জগন্নাথ চক্রবর্তী (১৯২৪– ৯২), অরুণ ভট্টাচার্য (১৯২৫–৮৫) ।
                 নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
               —————————–
  তাঁর কবিতার প্রেরণা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, আবার তিনিই বিশুদ্ধ কলাকৈবল্যবাদী কবিও নন।
তাঁর অবস্থা যেন মধ্যবর্তী । তিনি এই রোগ নয় সমাজের ব্যাখ্যাতা এবং দুঃস্থ  দিবসের ভাষ্যকার ।
তিনি     নীরেন্দ্রনাথ     চক্রবর্তী   ( ১৯২৪—২০১৮)
তিনি সময় কে তাঁর কবিতার দর্পণে নিজের মতন করে ধরতে সবসময় উদ্যোগী থেকেছেন। তাঁর বামপন্থী কবিতা “এশিয়া” । পরে তিনি রাজনৈতিক সংস্রব থেকে সরে যান । “আমার ভিতরে / দলবদ্ধ হবার আকাঙ্খা নেই ।/ দলভুক্ত কবি, তুমি গজভুক্ত কপিত্থ প্রায় । “
 ‘উলঙ্গ রাজা’ তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থ লেখার জন্য তিনি ১৯৭৪ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
দীর্ঘ সময় তিনি ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। নীরেন্দ্রনাথের প্রথম কবিতার বই ‘নীল নির্জন’, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এরপর প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা ‘অন্ধকার বারান্দা’, ‘নীরক্ত করবী’, ‘নক্ষত্র জয়ের জন্য’, ‘আজ সকালে’ সহ অসংখ্য কবিতার বই।
তাঁর কবিতা :
 ” অন্ধকার বারান্দা “
——————————
 “না, আমাকে তুমি শুধু আনন্দ দিয়ো না,
বরং দুঃখ দাও।
না, আমাকে সুখশয্যায় টেনে নিয়ো না,
পথের রুক্ষতাও
সইতে পারব, যদি আশা দাও দু-হাতে।
ভেবেছিল, এই দুঃখ আমার ভোলাবে
আনন্দ দিয়ে; হায়,
প্রেম শত জ্বালা, সহস্র কাঁটা গোলাপে,
কে তাতে দুঃখ পায়, ………..”
কিম্বা ,
|| অমলকান্তি ||
 “…………      ……..   …………
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল। “
অথবা তাঁর  বিখ্যাত জনপ্রিয় কবিতা :
   ” উলঙ্গ রাজা “
—————————
“………       ……..      ………
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?”
__________________________________________
লিখেছেন :—-   সৌম্য ঘোষ । চুঁচুড়া । হুগলী ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top