কবিতার রূপকল্প – ৩য় পর্ব – অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র 

মধ্যযুগের বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন কৃষ্ণনগর রাজসভার কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র । ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম । ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু । কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রেরণা ও আনুকূল্যে ভারতচন্দ্রের ” অন্নদামঙ্গল কাব্য” রচিত হয় । “অন্নদামঙ্গল” কাব্যের তিনটি ভাগ ।

প্রথম ভাগ “শিবায়ন বা দেবীমঙ্গল”, দ্বিতীয় ভাগ “কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দরের কাহিনী” এবং তৃতীয় ভাগে আছে “মানসিংহ- প্রতাপাদিত্য- ভবানন্দের” কাহিনী। একমাত্র অন্নদা ছাড়া কাব্যের তিনটি ভাগের মধ্যে কোন যোগ নেই। নামে মঙ্গলকাব্য হলেও , প্রকৃতিতে পুরানো মঙ্গলকাব্যের সঙ্গে তেমন মিল নেই। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, এই কাব্য থেকেই আমাদের বাংলা সাহিত্যে “secular sprit” – এর জন্ম ।

মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্রের তুল্য বিদগ্ধ কবি আর নেই বললেই চলে । অনেক সমালোচক তাঁর কাব্যের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ এনেছেন । এই অভিযোগ পুরোপুরি অনায্য নয় । ভারতচন্দ্র মধ্যযুগীয় নন , আধুনিক যুগেরও নন , তিনি যুগসন্ধির কবি । যে সময় অন্নদামঙ্গল লিখিত হয় তখন সদ্য মোগল শাসনের অবসান ঘটেছে । দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতায় সর্বব্যাপী অবক্ষয় দেখা দিয়েছিল । ” নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায় ” এমনই ছিল পরিস্থিতি।

তৎকালীন অভিজাত বর্গের রুচিবিকারকে তৃপ্ত করতেই এই কাব্যের সৃষ্টি ।কিন্তু অশ্লীলতা এই কাব্যের প্রধান আকর্ষণ নয় । তাঁর কাব্যের প্রধান আকর্ষণ ভাষাগত পরিপাঠ্য । স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, এমন শব্দ কুশল কবি মধ্যযুগের বাংলায় আর আবির্ভূত হয় নি । তাঁর কাব্যের কারুকার্য শব্দের দীপ্তি আমাদের মোহিত করে । কাব্যে শব্দ নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি আধুনিক মনের মানুষ ছিলেন । শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার ব্যবহারে ছিলেন supreme literacy craftsman . অসামান্য কুশলতায় তিনি অন্নদামঙ্গল কাব্যে সংস্কৃত ছন্দ ব্যবহার করেছিলেন । তাঁর চিত্রিত চরিত্রগুলির মুখের কথা দৃপ্ত সংহত ও ক্ষুরধার । দরিদ্র কবির প্রতি দারিদ্র জর্জর কবিপত্নী উক্তি ,

” মহাকবি মোর পতি কত রস জানে ।
কহিল বিরস কথা সরস বাখানে ।।
পেটে অন্ন বস্ত্র যোগাইতে নারে ।
চালে খড় বাড়ে মাটি শ্লোক পড়ি সারে ।।”
এই কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ,

” কহিল কবির স্ত্রী —
রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো
রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো
মাথার উপরে বাড়ি পড়ো পড়ো
তার খোঁজ রাখো কি !
গাঁথিছ ছন্দ দীর্ঘ হ্রস্ব
মাথা ও মুণ্ড , ছাই ও ভষ্ম;
মিলিবে কি তাহে হস্তী অশ্ব
না মিলে শস্যকণা ।।”

মানব জীবন নিয়ে সংহত অভিজ্ঞতার প্রকাশের ভারতচন্দ্র যত পরমার্থতা পেয়েছে তেমনটি অন্য কোন কবি পাননি ।
” ঝাঁপানি কাঁপনি সার কেবল উৎপাত ।
অধর দংশিতে চায় ভেঙে যায় দাঁত ।।”
কিম্বা,
” ভবিষ্যতে ভাবি কেবা বর্তমানে মরে ।
প্রসাবের ভয় তবু পতি সঙগ করে ।।”

আবার ,
” মাতঙ্গ পড়িলে দরে পতঙ্গ প্রহার করে ”
বা,
” নীচ যদি উচ্চভাষে সুবুদ্ধি উড়ায় হেসে”

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র মৃত্যু হয় । ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা সিরাজউদ্দৌলা কে পরাজিত করে । তৎপরবর্তীকালে সমগ্র বাংলার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামাজিক বিশৃঙ্খলা সর্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল । এইরূপ অশান্ত পরিবেশের মধ্যে রায়গুণাকর তাঁর বাকবিন্যাসে সরসতা নিয়ে বিরাজমান ছিলেন । তাঁর রচনায় আধুনিক ভাবনার চিহ্ন পাওয়া যায় । তিনি তাঁর পূর্বজ কবিদের মতো ধর্ম ভাবে ভারাক্রান্ত ছিলেন না।

বিদ্যা-সুন্দরের যৌনবিহারকে তিনি আধ্যাত্মিক অপার্থিবতায় উপস্থাপিত করেননি । ঐহিকতা ও বাস্তবতা তাঁর কাব্যের প্রধান লক্ষণ । সেই সময়ে অবস্থান করেও তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে secular . সব ধর্ম তাঁর কাছে সমান ছিল ——- “পুরানে কোরানে দেখ সকলই ঈশ্বর ” । তাঁর কাব্যের প্রধান উপাদান ছিল আদিরস ও হাস্যরস । কিন্তু সেটা অধিকাংশ সময়ে পরিশীলিত । মাত্র একবার তাঁর কাব্যে মানব রসের অসামান্য সাক্ষাৎ পাওয়া যায় ঈশ্বরী পাটনী কাহিনীতে । দেবীঅন্নদা গঙ্গানদী পার হওয়ার সময় এই খেয়ামাঝি কে বর দিতে চাইলে সে প্রার্থনা করে, ” আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে ” । এই প্রার্থনা অনাদিকালের দৈব হতদরিদ্র বাঙালি নর-নারীর স্নেহ ব্যাকুলতার প্রতিধ্বনি ।

Soumya Ghosh

লিখেছেন —–  অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।   চুঁচুড়া। হুগলী ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top