কবিতা সমগ্র

শপথের পথেই আমার ঘর
রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

এ যাবৎ যতবার হেঁটেছি শপথের পথ
ততবারই একদিনে তেইশ ঘণ্টা রাত্রি ঘেঁটেছি
অবশিষ্ট এক ঘণ্টার সূর্যে
শুকিয়ে নিয়েছি তেইশ ঘণ্টার ঘাম…..

আম্রপালী বা আপেলের দিকে নজর নেই
চব্বিশ ঘণ্টায় একশো আটবার দণ্ডবৎ করে
বরং নু’য়ে আছি উপরোক্ত চার বাক্যের অঙ্কে
আজও শপথের পথেই আমার ঘর….

আমি আলোর উপাসক হলেও
গন্তব্যের নাম অন্ধকার
অন্ধকারেই চেনা যায় নক্ষত্ররাজি
অন্ধকারেই ফুটে ওঠে আলোর শ্রেষ্ঠত্ব…..

আর শপথ অর্থে আমার অভিধান বলে:
অমাবস্যায় চড়ে সূর্যের দেশে যাবো….।

 

ব্যর্থ নারী দিবস
কলমে  সবিতা কুইরী

আমি ধর্ষিত এক নারী
হ্যাঁ  ধর্ষিত হয়েছি আমি।
দিনটা ছিল দু হাজার এগারো আট ই মার্চ।
বর্ষণ মুখর এক দুর্যোগের দিনে ।
দিনের বেলায় অন্ধকার নেমে এসেছিল সেদিন।
টিউশন থেকে বাড়ি ফিরছিলাম।
পথে দাড়িয়ে থাকা কয়েকটি নেড়ি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ছুটে এসেছিল কিন্তু তারাও ঘ্রাণ নিয়ে
মুখ ফিরিয়ে আমাকে নিরপরাধ
প্রমান করল।
বিজ্ঞান বই এ পড়া কুকুরের ঘ্রাণশক্তির প্রমান যেন সেদিন
আরো একবার উপলব্ধি করলাম।
আজকেই ইতিহাস বই এ পড়ে ফিরছি
সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী
মানুষের কীর্তি কাহিনি।
গর্ব বোধ করছিলাম ।
আর বেশি পথ নেই
ভাবতে ভাবতেই বাড়ির আগে গাছগাছালিতে ঘেরা পোড়োবাড়িটা এসে গেল
ভীষণ দুর্যোগ ।
বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রপাত সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি।
সেখান থেকে ভেসে আসা মানুষের গলার আওয়াজ এ
আশ্বস্ত  হলাম ক্ষণিকের জন্য
যাক আর কুকুর গুলো জ্বালাতে পারবে না।
কিন্তু সেখানে
কয়েকটি নররাক্ষসদের দৃষ্টি
দেখে হাড় হিম হয়ে গেল
কিছু বুঝে ওঠার আগেই
অবর্ণনীয় অত্যাচারে জ্ঞানশূন্য হলাম।
কয়েক ঘন্টা পর পর চেতনা ফিরে বুঝলাম বেঁচে আছি।

আগে খবরের কাগজ টিভি
রেডিও তে এসব খবর পড়েছি।
মুখে মুখে মানুষের মহানুভবতার কথা শুনেছি।
তাই স্থির করলাম মরব কেন?
সব মানুষ তো পাশে আছে।
বাড়ি ফিরলাম।
ঘটনা আমার বলার  আগেই পাড়াপড়শিরা জেনে গেল
একেই বলে দেওয়ালেও কান আছে।
বাড়ির উঠোনে থিকথিক করছে
লোকজন।
দুর্যোগ কমেছে কিন্তু  একেবারেই নেমেছে বলা ভুল।
মাঝে মাঝে বিদ্যুত তখনও উঁকি ঝুঁকি বর্জ্রের গর্জন আর বৃষ্টি
কিন্তু উৎসুক মানুষ জনের ভুক্ষেপ নেই তাতে।
সবাই অ্যাকসিডেন্ট এ উদ্ধারের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
হসপিটাল যেতে লোকজনের অভাব নেই
মিডিয়ার ফোন নং জোগাড় করতে হল না
পুলিশ কে ডাকতে কোন হ্যাপা নেই।
আমি পাড়াপড়শি র গল্পের খোরাক
খবরের কাগজের হেড লাইনে
টিভি চ্যানেল গুলো আমার বাড়িতে লাইন দিয়ে বসে থাকে।
কবি  সাহিত্যিকদের  কলমের
ডগায় আমার স্থান।
এক ঝটকায় পাল্টে আমি হলাম নতুন আমি।
মানুষজন কাছে এসে তাদের নরপশু
বলে।নর রাক্ষুস বা এর থেকেও
নিম্ন মানের শব্দে আখ্যায়িত করে
মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় এখন।
কিন্তু দুরে গেলেই অন্য কথা
কেউ বলে মেয়ে মানুষ একা একা গেল কেন
কেউ বলে নিশ্চয় পোশাক ঠিক ছিল না
কেউ বা বলে নিশ্চয় কিছু ছিল
আমাদের কই হচ্ছে?
এভাবেই গেল কিছুদিন
আস্তে আস্তে আমার নামের খবরের কাগজ গুলো ঠোঙা
হয়ে বাজারে হাতবদল হল।
কেস এখন আদালতে ঝুলছে
মাঝে মাঝেই হাজির
বিরোধী পক্ষের বাকপটু উকিলবাবুর রকমারি প্রশ্ন
তির্যক মন্তব্যে মাঝে মাঝে
মনে হয় সেদিনের বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত মস্ত বড় ভুল ছিল।
খুড়তুতো বোন কে তার নিজের পছন্দ করা পাত্রের সঙ্গে
তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিলেন কাকু।
আর ভাল পাত্র তো এ বাড়িতে
আসবে না।
আমার পর দুটো বোনের ভাগ্য
থেকে আইবুড়ি নাম কি উঠবে?
এ চিন্তায়  পাড়াপড়শি র ঘুম খিদে যেন উঠে গেছে ।
আমি বোনেদের মধ্যে বড়
আমি তো কলঙ্কিত
না আইবুড়ি না বিবাহিত।
বাবা মাকে দেখি অসহায় দৃষ্টিতে
তাকিয়ে আছেন।
কি করি বলুন তো?
উপদেশ দিতে আপনারা ভালোই পারেন।
জানি বলবেন
শক্ত হও
পড়াশুনা শুরু কর
নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলবেন।
কিন্তু বিশ্বাস করুন আমার মাথা
কাজ করে না।
উৎসুক সমাজের নজর এড়িয়ে
কিছু করতে পারার ক্ষমতা নেই।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস
যা আমার কাছে অর্থ হীন।
আমার জীবনটাই তো অর্থহীন ।
আমি একটা সমস্যা ছাড়া তো আর কিছুই নয় এখন।
ভেবে পায়  না কাকে দোষারোপ করব?
ঐ নর রাক্ষুস গুলো কে? নাকি
সমাজ কে?
সমাধানের পথ কি আপনারাই বলুন।
এখন আমি কলঙ্কিত নারী।
বাবা মায়ের বোঝা
পাড়াপড়শি র বোঝা।আমার মুখ দেখলে নাকি অশুভ হয়।
আমার বোনেরা সংসারী হতে পারছে না।

আমি কি বেঁচে থাকার সিদ্ধান্ত
ভুল নিয়েছিলাম??

 

নারী
শ্রী রাজীব দত্ত 

আসলে কি  নাড়ীর টান ভাই
কখনো কি ভেবে দেখেছো তাই?
রক্তে-মাংসে গড়া স্নেহময়ী শরীরের কথা
সে যে স্নেহময়ী মা।
নারী দিবস উৎসবের আয়োজন
নাকি নারী সুরক্ষার প্রয়োজন।
অত্যাচার, ধর্ষণ চলেছে প্রতিনিয়ত
অন্যায়ের বিরুদ্ধে নারী পুরুষ গর্জে ওঠো।
সেদিন হয়তো ঘরের মেয়ে
নতুন আশা দেখবে
সমগ্র জাতি নতুন কিছু শিখবে।
হাত ধরো একে অপরের শক্ত করে
নারী জাতির উদ্দেশ্যে
সৃষ্টি যারা অঙ্গীকার
সেই নারী পূর্ণতা পাক এই সমাজের সাহায্যে।
যে  মা বোন বা প্রেমিকা তোমার প্রিয়
তারাও নারী
তাই সমগ্র নারী জাতিকে  সম্মানটুকু দিও।
আজ এই মহান দিনে এটাই হোক অঙ্গীকার

নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান অটুট থাক তোমার আমার।

 

নারী ও পুরুষের গল্প
মহীতোষ গায়েন

নারী দিবসে কবিতা লিখবো বলে
স্থির করেছি,নারী ও কলম হারিয়ে
গেল,যেমন হারিয়ে যায় ভালোলাগা
ভালোবাসার বাগানে শুরু আর্তনাদ।

নারীকে নিয়ে কবিতা লিখলে সবাই
রে রে করে তেড়ে আসছে,পুরুষকে
নিয়ে কবিতা লিখলে পুরুষ বলছে
আমি আবার কি দোষ করলাম কবি?

নারী ও পুরুষকে নিয়ে কবিতা লিখলাম
নারী বললো আমিইতো পুরুষের শক্তি,
পুরুষ বললো আমি নারীর পথ প্রদর্শক
সারা পৃথিবীতে চলছে এই দড়ি টানাটানি।

কৃষ্ণ ও রাধাকে নিয়ে কবিতা শুরু করবো
বলে ভাবছি,এমন সময় বাঁশি বেজে উঠলো,
দলে দলে রাধারা আসছে,দলে দলে কৃষ্ণরা

বাঁশি বাজাচ্ছে,ফুটছে শক্তি ও মৈত্রীর ফুল।

 

একটি বসন্তকালীন অভিযোগ
       শিবপ্রসাদ গরাই

আগুনরঙা পলাশের সঙ্গে আমার তীব্র বিরোধিতা
পলাশ ফুল দেখলেই মনে হয় তাতে লেগে আছে রক্তের রং
পলাশের লকলকে পাপড়িগুলি যেন আমার হৃদয়ের বেদনা
একটা সোজা রাস্তা ধরে যখন হেঁটে গেছি তোমার পাশেপাশে
তখনও রাস্তার পাশে পাশে ছড়ানো ছিল অসংখ্য পলাশের গাছ
বসন্ত এলে তার ডালে কালো ঘন কুড়ি সমস্ত পাতা ঝরিয়ে জেগে উঠতো
আর তখন থেকেই প্রতিদিন রাত্রে তীব্র যন্ত্রণায় ফেটে পড়ত আমার হৃদয়
বুঝতে পারতাম রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে
এর কোনো শেষ নেই
পলাশের ফুলগুলিও ফুটে ফুটে মাটিতে ঝরে পড়ে যাবে একদিন
সেদিনও এই যন্ত্রণার সমাপ্তি ঘটবে না ।

তুমি জানতে একথা
আমিও জানতাম
রক্তের সঙ্গে আমার আজীবন রক্তের সম্পর্ক
কিন্তু তাও প্রায় প্রত্যেক দিন আমরা পাশাপাশি হেঁটে যেতাম
আমার রক্তক্ষরণের দিনগুলোর যন্ত্রণার  উপশম হতে পারতে তুমি
কিছু কিছু দিন হয়েছও
কিন্তু পেনকিলার  খেলে যেমন তৎক্ষণাৎ যন্ত্রণার উপশম হয় যন্ত্রণার গভীরে যাওয়া যায় না
ঠিক তেমনই তোমার হাত আমাকে  যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলেও
চিরকালীন কোন উপশম  দিতে পারেনি
কিন্তু কিছুই করার ছিলনা ।

আজও একই রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে
পলাশ ফুল আগুন হয়ে আমায় খেতে আসে।

 

উর্বশী নদী ও রিক্ত পুরুষের গল্প
মহীতোষ গায়েন

কখনও  প্লাবন কখনও শান্ত
পূর্ণিমার চাঁদে মোহনিয়া নদী,
কখনও জোয়ার কখনও ভাঁটা
গোধূলির রঙে রিক্ত সে পুরুষ।

বেগবতী যৌবনা উর্বশী নদী,চলমান
জীবনের কথা এঁকেছে আহত পুরুষ,
সে এক ঘরছাড়া বাউল,বাসরের বাসি
ফুল সঁপে দেয় উত্তাল স্রোতের বুকে।

নিরিবিলি রাতভর স্রোতের শীৎকার
শুনে ক্লান্ত ঘুমায় সে পরকীয়ায় মজে,
কখনো ভাসায় তাকে,কখনো ডোবায়
নব-প্রেম খেলা করে ভাটিগাঙ বুকে।

সুরে সুরে বাঁধা পড়ে নদী,কামনার ফুলে
আবার সেজে ওঠে তাদের জীবন-বাসর,
সুখের গোলাপ বনে ঝড় ওঠে,সুরভিত
বাহারি বসন্ত-মৈথুনে তৃপ্ত নদী ও পুরুষ।

কাল থেকে কাল,ছয় ঋতু বারোমাস…
এভাবেই হিরণ্ময় প্রেম নদী ও পুরুষে
দীপ্ত হয়,কালের রাখাল সে পুরুষের

অতৃপ্ত প্রেম ভাসে উর্বশী নদীর বুকে।

 

ফসল বোনার ইতিকথা
মহীতোষ গায়েন

বহু বছর কেটে গেল! নিজেকে নিজের মত
দেখে নেওয়ার সময় এবার করে নিতে হবে,
আকাশ মেঘে ভরে যাবে,বৃষ্টিও হবে,উঠবে
ঝড়,দুর্যোগ কেটে গিয়ে সূর্য উঠবে আবার।

অসময়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করাটা খুব
জরুরি,লড়াইয়ের ময়দান সবার জন‍্য খোলা,
লড়াই থেকে নিজেকে সরালে অস্তিত্ব বিলোপ
হবে,তুমি ঘুরে দাঁড়াও,আগুনে আর কেন ভয়?

বহু বছর হয়ে গেল,নিজেকে নিজের মত করে
চেনার সময় এসে গেছে,চিনে নাও মানুষ,চিনে
নাও সময়,চিনে নাও জল বাতাস,চিনে নাও সব,
জেনে নাও হাওয়া মোরগের গতি,বিকশিত হও।

তুমি যদি আগুন নেভাতে না পারো আগুন তো
তোমাকে পোড়াবে,তুমি যদি আগুন জ্বালাতে
জান অন্ধকারে নিজের মুখও হারিয়ে যাবে,তুমি
যদি বৃষ্টি আনতে না পারো ফসল কিভাবে বুনবে?

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top