কবি চন্ডীদাস

STORY AND ARTICLE :

কবি চন্ডীদাস
===========
সৌম্য ঘোষ
==========

প্রথম পর্বের অংশ:
~~~~~~~~~~~~
বৈষ্ণব মতকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্য—— বৈষ্ণব সাহিত্য। পঞ্চদশ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের ভাব-বিপ্লবকে কেন্দ্র করে গোটা বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব সাহিত্যের জন্ম হয়। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের সূচনা হয় চতুর্দশ শতকে বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাসের সময়। তবে ষোড়শ শতকে এই সাহিত্য বিকশিত হয়। বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রধান অবলম্বন রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা।
বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের আদিকবি বলে বিবেচিত হন। চতুর্দশ শতকে বিদ্যাপতি ও চন্ডীদাস এবং ষোড়শ শতকে জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস — এই চারজনকে বৈষ্ণব সাহিত্যের ‘চতুষ্টয়’ বলা হয়।
প্রথম পর্বে কবি বিদ্যাপতি সম্বন্ধে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয় পর্বে কবি চন্ডীদাস
সম্বন্ধে আলোচিত হলো:
~~~~~~~~
দ্বিতীয় পর্ব :
~~~~~~~~~

কবি চন্ডীদাস আনুমানিক ১৪১৭ খ্রিঃ
কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ‌ তিনিও প্রাকচৈতন্য যুগের কবি। ১৪৪৭ খ্রিঃ মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। বীরভূম
জেলার নান্নুরে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। ‌ কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন,। বাঁকুড়ার ছাতনায় তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল— দুর্গাদাস বাগচী। ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁরা বাসুলি দেবীর সেবক ছিলেন। ‘রামী’ নামক এক রাজক কন্যার প্রেমে তিনি আসক্ত ছিলেন।
বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে পূর্বরাগ, নিবেদন, আক্ষেপানুরাগ পর্যায়ে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ। তার কাব্যে মন্ডলকলার ঐশ্বর্য লক্ষ্য করা যায়। বিশেষতঃ তাঁর কাব্যের বিশিষ্টতা হল—–
সহজ সরল ভাষায় হৃদয়ের গভীর ভাবে ব্যক্ত করা। তিনি ব্যঞ্জনার কবি। ‌ তাঁর চিত্রিত শ্রী রাধা
সহজ-সরল গ্রাম্য নারী, লজ্জাশীলা, ভীরু, সংকুচিতা। চন্ডীদাস তাঁর কাব্যে শ্রীরাধাকে
ভাবতন্ময়ী, কৃষ্ণগতপ্রাণা, বাহ্যজ্ঞানশূন্যা এক যোগিনী নায়িকা। চন্ডীদাসের পদগুলির মধ্যে একটি মানবিক আবেদন আছে।
আধুনিককালে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় চন্ডীদাসের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ‌ চন্ডীদাসের কবিত্বের বিশ্লেষণ ও পরিচয় আমরা যথার্থভাবে প্রথম পাই —- রাজেন্দ্রলাল মিত্রের লেখা “বিবিধার্থ সংগ্রহ” প্রবন্ধে। চন্ডীদাসের সহজিয়া রাগাত্মিকাশ্রয়ী পদ প্রথম আবিষ্কার করেন— নগেন্দ্র নাথ বসু। ‌ চন্ডীদাসের পদ যে
মহাপ্রভু শ্রীশ্রী চৈতন্যদেব আস্বাদন করতেন,
তা জানা যায় কৃষ্ণদাস কবিরাজের
“চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে। ‌
কবির কাব্যে আছে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার সেই অমৃত মন্ত্র ——–

“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”

চন্ডীদাস মরমিয়া কবি, মিষ্টিক কবি।

আমার শ্রদ্ধেয় পাঠকদের জন্য চন্ডীদাসের কিছু পদ সংগ্রহ করে উপস্থাপন করলাম:—-

পর্যায়: পূর্বরাগ ও অনুরাগ
~~~~~~~~~~~~~~~~

* সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম
* রাধার কি হইল অন্তরে ব্যাথা
* ঘরের বাহিরে দন্ডে শতবার
* একে কুলবতী ধনী তাহে সে অবহেলা
* কাহারে কহিবো মনের মরম
*এমন পিরিতি কভু দেখি নাই শুনি

পর্যায়: রূপোল্লাস
~~~~~~~~~~~~~~
* কানুন কুসুম যিনি কালিয়া বরণ খানি

পর্যায়: অভিসার
~~~~~~~~~~~~
*হে ঘোর রজনী মেঘের ঘটা

পর্যায়: বংশী ও নিত্যশিক্ষা
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*আজু কে গো মুরলি বাজায়

পর্যায়: প্রেম বৈচিত্ত্য ও আক্ষেপানুরাগ
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

*যতই নিবাইতে চাই নিবাই না যায় রে
* বধু কি আর বলিব তোরে
* কি মোহিনী জানো বধূ কি মোহিনী জানো
* মন মোর আর নাহি লাগে গৃহকাজে
*কালো জল ঢালিতে সই কালা পড়ে মনে

পর্যায়: নিবেদন
~~~~~~~~~~~~~
*বধু কি আর বলিব আমি
*বধু তুমি যে আমার প্রাণ
*জপিতে তোমার নাম বংশী ধরি অনুপাম

পর্যায়: মাথুর
~~~~~~~~~~~~
*ললিতার কথা শুনে হাসি হাসি বিনোদিনী
*রাইয়ের দশা সখীর মুখে

পর্যায়: ভাবোল্লাস ও মিলন
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
*সই জানি কুদিন সুদিন ভেল
* বহুদিন পরে বঁধুয়া এলে

================================
(ধারাবাহিক)

লেখক— সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।
=================================

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top