কাকু – অভিষেক সাহা

পৌষ সংক্রান্তি চলে গেছে দিন দুই হল। তবে শীত আবার ফিরেছে কলকাতায়। সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। দিন সাতেকের জন্য একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার এখন স্বমহিমায়। এখন রাত আটটা দশ। দিহান দাঁড়িয়ে আছে রাসবিহারী মোড়ে। সবুজ সিগন্যাল পেয়ে গাড়িগুলো ছুটে চলেছে রুদ্ধশ্বাস গতিতে, চেতলার দিক থেকে এসে, গড়িয়াহাটের দিকে।

দিহান রাস্তা পেরিয়ে যাবে সুভাষ দার চায়ের দোকানে। ওর আরও দুই বন্ধু আসবে। ঘন্টাখানেক আড্ডা মেরে তারপর বাড়ি ফিরবে। সারাদিন টিউশন পড়িয়ে এই একটা ঘন্টাই দিহানের অক্সিজেন। এমনিতেই করোনার জন্য রাস্তা এখন তাড়াতাড়ি ফাঁকা হয়। বেশি রাত পর্যন্ত রাস্তায় লোক থাকে না। তার উপর ঠান্ডা ফিরে আসায় সংখ্যাটা আরও কমেছে। দু’মাস আগে ছত্রিশে পা দেওয়া দিহান এখনও বিশুদ্ধ সিংগেল। বিয়ে করা তো দূর, কনফার্ম গার্লফ্রেন্ডও নেই ওর।

করোনা, লকডাউন এসব কিছু পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। রাতের এই ঘন্টাখানেকের আড্ডাটাই ওর বুকের উপর চেপে বসা চিন্তার পাথরটাকে একটু হলেও নাড়িয়ে দেয়। ধেয়ে আসা গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে দিহান।

হঠাৎ দেখে ওপার থেকে দুটো মেয়ে, বছর কুড়ি থেকে পঁচিশের মধ্যে, সাথে একজন বয়স্ক মহিলাকে নিয়ে গাড়ির ঘনত্ব একটু কম দেখে হাত দেখিয়ে এপারে আসছে। মনে মনে বিরক্ত হয় ও। “এদের এত তাড়া কিসের ! “

” কাকু মেট্রোতে ঢোকার গেটটা কোনদিকে ?” রাস্তা পেরিয়ে এসে দিহানকে সামনে পেয়ে ওই মেয়ে দু’টোর একজন দিহানকে জিজ্ঞেস করে। পাশে বয়স্ক মহিলা। মেয়েটা বেশ সুন্দরী। মুখে মাস্ক পড়া নেই। কথা বলার সময় গালে টোল পড়ে। দিহানের জ্যাকেট ভেদ করে অচেনা ঠান্ডা বাতাস ওর হৃদয়ে গিয়ে লাগে। এর থেকে অর্ধেক সুন্দরীও যদি ও পেত, ওর এই ব্যাচেলর দশা কবে মুছে যেত! কিন্তু “কাকু ” শব্দটা কানে যেতেই সব কেমন যেন মিইয়ে গেল।

” রাস্তা পেরিয়ে ওই দিকে।” ডানহাতের তর্জনী দিয়ে দেখিয়ে দিল দিহান। বয়সের ছাপ এখন আর কোন কিছু দিয়েই আড়াল করা যাচ্ছে না। না হলে এই শীতের রাতে ওর টুপি-মাস্কে ঢাকা মুখ দেখেও পঁচিশ অনুর্ধ মেয়ে ওকে কাকু বলে ডাকে! বেশ হতাশ হল ও।

দু’টো মেয়ের একজন ওদের থেকে একটু পেছনে ছিল, ও দিহানের সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর চাপা গলায় ওকে বলল, ” মা সঙ্গে থাকলে আমার দিদি রাস্তায় সব ছেলেকেই কাকু বলে !”

abhisek saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top