কিটকিটের অভিযান – পর্ব ১০ – সুব্রত মজুমদার

[post-views]
story and article

এরকম বন আগে দেখেনি কিটকিট। ঘন বনে ঠিকমতো সূর্যের আলো পড়ে না। পাতার ফাঁক দিয়ে দু’একফোঁটা রোদ গোল গোল চাকার আকারে মাটিতে এসে পড়ছে। মাটি বললেও ভুল বলা হয়, কারণ শুকনো পাতার স্তুপের আড়ালে মটি নজর হয় না।

শালগাছের উপরে পরজীবী লতার নীল নীল ফুল ফুটে আছে। গাছের কোটরে টিয়াপাখিদের আস্তানা। একটা বড়সড় মহুয়া গাছের উপর গিলোইয়ের লতা উঠেছে। বুনো শুয়োরের দাঁতের আঘাতে বা হরিণের শিঙে লেগে সেই লতাদের সঙ্গে মাটির সংযোগ হয়ে গেছে বিচ্ছিন্ন । সেই লতা হতে সরু সরু মূল নেমেছে অজস্র ধারায়।

কুরচিগাছগুলো ফুল ফোটানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তাদের সবুজ পাতাগুলোতে পাখিরা উড়ে উড়ে পোকা ধরছে। একটা ছোট্ট পাখির মুখ হতে ফসকে পড়ে গেল একটা পোকা। পড়বি তো পড় কিটকিটের নাকের উই। একদম চমকে উঠে তিড়িংবিড়িং লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল সে। ব্যাপার দেখে কাঠবেড়ালিটার সে কি হাসি। হেসেই বাঁচে না বেচারা।

একটু দূরেই একদল বুনো-শুয়োর সপরিবারে খাবার অন্বেষণ করছে। ওদের মধ্যে যে সর্দার সে মাটি খুঁড়ে একটা খাম-আলু বের করছিল, কিটকিটকে দেখে একটা ‘ঘোঁত’ আওয়াজ করে আবার নিজের কাজে মন দিল।

কাঠবেড়ালি কিটকিটকে নিয়ে গেল একটা পাতা-বাদাম গাছের কাছে। সেখান হতে একগুচ্ছ পাতা-বাদাম তুলে এনে কিটকিটকে দিল। বলল, “এটা খাও। খেতে খুব মজা। শরীরে বল হবে খুব।”

কিটকিট কাঠবেড়ালিটার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। ঠিকই বলেছে কাঠবেড়ালিটা, ওর হাত আর পায়ের পেশীগুলো খুবই বলিষ্ঠ ও মজবুত। পাতা-বাদামগুলো খেতে শুরু করল কিটকিট। খুবই সুস্বাদু।

খাওয়া দাওয়ার পর গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়ল কিটকিট। গাছের ডালে গিয়ে শুল’ কাঠবেড়ালি। ঘুম যখন ভাঙল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। দুজনে ছুটে গেল জাদুকরের ঘরের কাছে। কিটকিট জাদুকরের দরজার সামনে এসে হাঁক দিল, “ও জাদুকর, বাড়িতে আছ ?”

এবারেও জাদুকরের কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। কিটকিট আবার ডাকল। কোনও উত্তর নেই। এখন বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। খিদে তো লাগবেই জাদুকরের, তখন ও বেরোবেই।
রাত একপ্রহরে জঙ্গলের পশ্চিম হতে শেয়ালদের ডাক শোনা গেল। ওরা রাতেরবেলা পাহাড় হতে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপছে আর নিজেদের দুঃখের কথা বলছে।

“হুয়া হুয়া হুক্কি হুয়া, ঠান্ডা লেগে পরাণ গেয়া,
সকাল হতে কিছু না খায়া, এবার বুঝি প্রাণ গেয়া।”
সঙ্গে সঙ্গে জাদুকরের ঘর হতে আওয়াজ ভেসে এল, –
“যা হয়েছে ভালোই হুয়া, হুক্কি হুয়া হুক্কি হুয়া ।
আমার ঘরে এস ভায়া, নিয়ে মাংস মিঠাই মুড়কি মোয়া।
বহুত দিনসে নেহি খায়া, এখন কিছু আনো ভায়া।”
শিয়ালের দল উত্তরে বলল-
“তোমার জন্য মরছি ভায়া, হুক্কি হুয়া সকল গেয়া।
দুষ্টু তুমি, নেইকো হায়া, এড়িয়ে চলি তোমার ছায়া।”

এই সূযোগে কিটকিট বলল,”জাদুকর গো, ও জাদুকর, দয়াকরে একবার বাইরে এসো ! সেই সকাল হতে ডাকছি তোমায়।”

জাদুকর বলল,”জঙ্গলের পাশেই গ্রাম, গ্রামে আজ ভোজ আছে। ওখান হতে আমার জন্য মাছ মাংস ভালোমন্দ নিয়ে এলে আমি বেরোতে পারি। “

কিটকিট আর কি করে, সে চলল পাশের গ্রামের উদ্দেশ্যে। কাঠবেড়ালি কিন্তু সঙ্গে যেতে রাজি হল না। সে শুধু শুধু মরতে রাজি নয়।

কিন্তু কিটকিটের ক্ষমতা নেই ছাগল বা ভেড়া চুরি করে আনার। ওদের থেকে আকার ও আয়তনে অনেক ছোট সে। অপরদিকে হাঁস মুরগি চুরি করাও শক্তকাজ। তাই বুদ্ধি করে একটা কৃষকের রান্নাঘরে ঢুকল সে। কৃষকটির বৌ রাতে রুটি আর মাংস রান্না করেছিল। খুব সুগন্ধ ভেসে আসছে সেই রান্না হতে।

কিটকিট আর দেরি না করে কিছু মাংস আর কয়েকটা রুটি ভরে নিল একটা পাত্রে। তারপর সেই পাত্রটা একটা ঝোলাতে ভরে চলল বনের দিকে। আশাকরাযায় এতেই খুশি হবে জাদুকর।
জাদুকরের গর্তের কাছে এসে দাঁড়াল কিটকিট। এবার আর ডাকতে হল না। মাংসের গন্ধে নিজেই বেরিয়ে এল জাদুকর। দেখতে অনেকটা শেয়ালের মতো লাগলেও নীল বর্ণ আর কাটা লেজ দেখে সহজেই সম্ভ্রম জাগে। কোথায় যেন সে শুনেছে এর কথা।

হ্যাঁ মনে পড়েছে কিটকিটের, দিদির একটা বইয়ে একটা লেজকাটা আর একটা নীলবর্ণ শেয়ালের গল্প ছিল। সে যা হবে হোক গে তাতে কিটকিটের কি, কিটকিটের কেবল দরকার রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খোঁজ।

এদিকে গর্ত হতে বেরিয়েই কিটকিটের হাত হতে খাবারগুলো কেড়ে নিতে নিতে বলল, “দাও দাও, অনেকদিন খাইনি। দাও।”
খাবারগুলো নিয়ে গোগ্রাসে খেতে লাগল জাদুকর। এই সূযোগে কিটকিট বলল, “রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খবর তুমি জানো ?”
জাদুকর বলল, “জানি তো। আরও উত্তরে যাও। সেখানে মেঘের দেশ। আর সেই মেঘের দেশেই মেঘের ভেলার উপর ভাসছে ঘুমন্ত রাজকন্যা। মনপবনের টানে সেই নৌকা চলে। সেই নৌকা আমার কাছে আনলেই আমি ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেব রাজকন্যার।”

জাদুকর আর কাঠবেড়ালির কাছে বিদায় নিয়ে কিটকিট চলল আরও উত্তরের পথে।

-কুঁইকুঁই আর ভোভো-

রাস্তা চলতে চলতে ভোর হয়ে এল। সকালবেলা একটা গ্রামের ধারের ঝোপে ঢুকে বিশ্রাম করতে লাগল কিটকিট। পুকুরে লোকের আনাগোনার কমতি নেই। সন্ধ্যা না হলে ঝোপ হতে বেরোনোর মুশকিল।

সন্ধ্যার ঠিক আগে একটা আর্তচিৎকার শোনা গেল। একটা ছোট্ট কুকুরছানার কান্না। কুঁইকুঁই করে কাঁদছে। ঝোপ হতে বেরিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখল একটা কুকুরছানাকে একা পেয়ে মারধর করছে একটা পেল্লাই বাঘাকুকুর।

 

চলবে…..

আপনার মতামতের জন্য

 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top