কিটকিটের অভিযান – পর্ব ১১ – সুব্রত মজুমদার

কুকুরছানাটা কুঁইকুঁই করে বলছে, –
“ওগো দাদা পায়ে পড়ি কর মাফ, কর মাফ,
আর যাবো নাকো তোমাদের কাছে, চাইবো না খেতে;
পায়ে ধরে এই কথা বলি সাফ, বলি সাফ।
পেটে বড় খিদে ও দাদা, পেট জ্বলে খিদের জ্বালায়,
ভোজবাড়ি এঁটো পাতে সবাই তো চেটেপুটে খায়,

আমি গেলে শুধু দোষ শুধু দোষ, আমি গেলেই যত পাপ।”

বড় কুকুরটা চোখ রাঙিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে বলছে,-
“তবে ওরে শয়তান বড় শিখেছিস কথা তুই,
এক কামড়ে সাড়ে দেব, এক আঁচড়ে গাল ছিঁড়ে নেব,

মেঝেয় পড়ে করবি তখন কুঁইকুঁই।”

 
কিটকিট আর থাকতে পারল না। সে লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে গেল বড় কুকুরটাকে। বড় কুকুরটাও বেশ সাহসী। সে কিটকিটকে পাত্তা না দিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে এল। কিটকিট তখন লাঠিখানা গুঁজে দিল কুকুরটির মুখে। তারপর ক্যারাটের একটা দাওপ্যাঁচ মারল কুকুটার মাথায়। লেজ গুটিয়ে কুঁইকুঁই করতে করতে দৌড় দিল বড় কুকুরটা।
বড় কুকুরটা পালিয়ে যেতেই কুকুরছানাটা ছুটে এল। কিটকিটের পায়ের কাছে কুঁইকুঁই করতে করতে বলল, “খুব উপকার করলে দাদা।”
কিটকিট বলল, “দাদা নয় বন্ধু। আমি হলাম কিটকিট, তুমি ?”

 

                  লেজ নাড়তে নাড়তে কুকুরছানাটা বলল, “আমি কুঁইকুঁই, ওই গ্রামের শেষে কুমোরের হাঁড়িরাখার ঘরটার পাশেই পড়ে থাকা খড়গুলোতে থাকি।”
-“কিন্তু ও তোমাকে মারছিল কেন ?”

 

-“ওর নাম ভো-ভো। ও আমাদের গ্রামের সবচেয়ে বদমাশ কুকুর। আজ ময়রাদের ঘরে ভোজ ছিল, সবার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম ভোজের পাতা হতে বেঁচে যাওয়া খাবার খেতে। কিন্তু তখনই ও আমাদের মেরে তাড়িয়ে দিল। আমি প্রতিবাদ করায় আমাকে মুখেকরে তুলে নিয়ে এসেছে এখানে।”

 

কুঁইকুঁই এর মাথায় হাত রেখে কিটকিট বলল,”খুব সাহসী তুমি। চিরকাল এভাবেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে যেও। আমার তো আর দাঁড়ালে চলবে না ভাই, আমি যাচ্ছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খোঁজে।”

 

কুঁইকুঁই বলল,”তুমি বরং আমাদের ঘরে চলো, আমার মা রাজকন্যা কঙ্কাবতীর গল্প বলে। মায়ের কাছে রাস্তার হদিশ পেতেও পারো।”

           কুঁইকুঁইয়ের সঙ্গে চলল কিটকিট। গ্রামের শেষে কুমোরের বাড়ি। বাড়ির পেছনে হাঁড়ি কলসি রাখার ঘর। ঘরের সামনে পলের স্তুপ। পল হল অগোছালো খড়। আর সেই পল কাজে লাগে হাঁড়ি কলসি নিয়ে যাওয়ার সময় মাঝখানে প্যাকিং দেওয়ার জন্য। যাতে ওগুলো ভেঙ্গে না যায়।
পলের স্তুপের ভেতরে ঘর করে রয়েছে কুঁইকুঁই এর পরিবার। তার মা বাবা আর গোটা ছয়েক ভাইবোন। কিটকিটকে দেখেই কুঁইকুঁইয়ের ভাইবোনেরা কুঁইকুঁই শব্দ করতে করতে লেজ নাড়াতে নাড়াতে বেরিয়ে এল।
কুঁইকুঁইয়ের মা বলল, “পাড়ার ছেলেদের মুখে সব শুনলাম বাবা। শোনার পর হতেই আমার ভয়ে শরীর কাঁপছে। কুঁইকুঁইয়ের বাবাকে এই যাচ্ছিল আর কি।”

 

কিটকিট বলল, “আমি ওই ভো-ভো কে জব্দ করে দিয়েছি। তা কিটকিট বলল যে আপনি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর গল্প জানেন, তাই আমি এলাম।”

কুঁইকুঁইয়ের মা বলল, “সে অনেক গল্পই জানি, শুনতে শুনতে ভোর হয়ে যাবে। “
কিটকিট বলল,”তবু বলুন আমি শুনব।”
গাছবাড়িতে মোটে একটাই ঘর। সেই ঘরে যত রাজ্যের ছবির মেলা। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে রং তুলি আর আঁকার অন্যান্য সরঞ্জাম। ঘরটা সম্ভবত কোনও শিল্পীর।
ঘরের এককোণে নজর যেতেই কিটকিট দেখল একটা গোবদামতো বানর চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। ছাদের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন একটা ভাবছে। মাঝে মাঝে লেজটা দিয়ে নিজেই নিজের নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।

 

“সে এক রুপকথার দেশ, বারোহাত কাঁকুড়ের তেরোহাত বিচি। সেই বিচিত্র ভেতর কঙ্কাবতীর দেশ। সহজেই যেতে পারে না কেউ। সেখানে বিশাল বিশাল পাহাড়ের মাথায় মেঘেদের দল খেলা করছে। আর সেই মেঘেদের মাঝখানে বারোহাত সেই কাঁকুড়।

পাহাড়ে ওঠাটা যেমন কষ্টের তেমনি কঠিন ওই কাঁকুড়ে পৌঁছানো। পাহাড়ের নিচে রাক্ষসদের বাস সেই রাক্ষসরা যেমন হিংস্র তেমনি বিশাল।…… “
রাজকন্যা কঙ্কাবতীর গল্প শুনতে শুনতে ভোর হয়ে এল। কুঁইকুঁই আর তার পরিবারের কাছ হতে বিদায় নিয়ে এগিয়ে চলল কিটকিট। দিনের পর দিন যায়, রাস্তা যেন শেষ হতেই হয় না। পথ ক্রমশ বন্ধুর হতে শুরু করেছে। নদীর খাইও বেশ সরু ও গভীর হচ্ছে ক্রমশ। আম জাম কাঁঠাল গাছের সংখ্যা কমে আসছে। বাড়ছে সরলবর্গীয় উদ্ভিদের সংখ্যা।

 

পাহাড়ের ধারেই কতগুলো ঘর। আর তারপরে পাহাড়ি জঙ্গলের শুরু। পিরামিডের মতো সব গাছগাছালি পাহাড়ের কোল বেয়ে উঠেছে। রাতের অন্ধকার আর ঝিঁঝির ডাক মিলেমিশে একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

                  পাহাড়ের গায়ে একটা সরাইখানা। সরাইখানার মালিক একটা পাহাড়ি ভাল্লুক। বেশ মোটাসোটা ও নাদুসনুদুস। কিটকিটকে দেখেই বলল, “ঘর চাই ? থাকবে ক’দিন ? দিনপ্রতি দু’শ টাকা।”
-“কিন্তু আমার কাছে তো কোনও টাকাপয়সা নেই !” বলল কিটকিট ।
ভালুকটা বলল, “তাহলে রাস্তা দেখ। বিনি পয়সায় তোমার সরাইখানায় আসা ঠিক হয়নি বাপু। যাও যাও আমার মেলা কাজ।”
কিটকিট মনের দুঃখে বেরিয়ে গেল সরাইখানা হতে। সরাইখানার পাশেই একটা গাছবাড়ি। গাছবাড়িতে আলো জ্বলছে। কিটকিট গেল সেখানে।
গাছবাড়িতে মোটে একটাই ঘর। সেই ঘরে যত রাজ্যের ছবির মেলা। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে রং তুলি আর আঁকার অন্যান্য সরঞ্জাম। ঘরটা সম্ভবত কোনও শিল্পীর।

ঘরের এককোণে নজর যেতেই কিটকিট দেখল একটা গোবদামতো বানর চিৎ হয়ে শুয়ে রয়েছে। ছাদের দিকে তাকিয়ে কিছু যেন একটা ভাবছে। মাঝে মাঝে লেজটা দিয়ে নিজেই নিজের নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।

কিটকিট বলল, “বানর ভাই… ও বানর ভাই….”
-“বানর ভাই আবার কি ? অপরিচিত কাউকে সম্মান দিতে শেখোনি ? আমার নাম বিচিত্র চিত্রকর। তুমি বিচিত্রদা বলেও ডাকতে পারো।”
কিটকিট একটু নরম পেলব গলায় বলল, “বিচিত্রদা, ও বিচিত্রদা, একটু থাকার জায়গা হবে গো ?”
-“সেটা হবে কি হবে না তা তোমার পরিচয় জানলেই বলতে পারব। এমনিতেই এটা কোনও সরাইখানা নয়, তবে তুমি ভালো লোক হলে থাকতে পার।”

 

কিটকিট বলল,”আমি কিটকিট, চলেছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খোঁজে । আমার কাছে কোনও টাকা পয়সা নেই বলে সরাইখানার মালিক তাড়িয়ে দিয়েছে।”

চলবে…

story and article

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top