কিটকিটের অভিযান – পর্ব ১ – সুব্রত মজুমদার

 [post-views]

দিব্যদৃষ্টি
 
           শীতের রাত, প্রচন্ড ঠান্ডা পড়েছে। বেলাবেলি খাওয়াদাওয়ার পর কম্বলের তলায় আশ্রয় নিতেই চোখজুড়ে ঘুম এলো। কেউ লেপের তলায় বরফ গুঁজে দিলেও সে ঘুম ভাঙ্গবে না। কিন্তু ঘুম ভাঙ্গলই। একটা ফিসফিসে আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। চোখ খুলে দেখলাম মাথার কাছে দাঁড়িয়ে কিটকিট। আমার পোষা খরগোশ। 
 
কিন্তু  এ কি দেখছি ! এ কি বেশ কিটকিটের ! পরনে একখানা জামাইমার্কা ময়ূরপুচ্ছ ধুতি আর রঙিন সুতোর কাজকরা পাঞ্জাবী। একটা লাঠির ডগায় পুঁটলি বেঁধে লাঠিটাকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 
 
বললাম, “এ সব কোথায় পেলি ?” 
কিটকিট তার সামনের তীক্ষ্ণ দাঁতগুলো দাঁত বের করে হেসে বলল, “চললাম।” 
-“চললাম মানে ? এত রাতে জোকারের মতো সেজে যাচ্ছ কোথায় ?” 
-“রাজকন্যার খোঁজে।” 
-“রাজকন্যার খোঁজে ? হুঁ, যে একাই সাহস করে মাঠে চরে ঘাস খেতে পারে না সে যাবে রাজকন্যার খোঁজে ! তা তোকে রাজকন্যা দেবেই বা কে ?”
 
কিটকিট একটু ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, “সাহস তো তোমারও নেই, সেদিন যে ঘরে সাপ ঢুকল, কি কীর্তি করলে তখন ! লাঠি নিয়ে সে কি তড়পানি। শেষমেশ মা না আসলে কি যে হত !”
একটু দমে গেলাম। স্নেহভরে বললাম,”এই রাতবিরেতে বেরোসনি বাপ ! বাইরে সাপ বাঘ কুকুর ট্রেন বাস কতকিছুর উপদ্রব।”
 
             কিন্তু এ কথাতেও চিঁড়ে ভিজল না। কিটকিট দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, রাজকন্যা সে আনবেই। অভিমান করে বলল,”ওসব বলে লাভ নেই, আমি চললাম। তবে যাবার সময় তোমাকে দিব্যদৃষ্টি দিয়ে যাই, যাতে তুমি আমার যাত্রাপথ স্পষ্ট দেখতে পাও । এতে যেমন তোমার আশঙ্কা দূর হবে তেমনি আমার বীরত্ব আর সাহস দেখে অবাক হয়ে যাবে।”
-“দিব্যদৃষ্টি ? সে তো পেয়েছিল সঞ্জয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময়। তুই দিব্যদৃষ্টি দেবার কে রে ? আমাকে বোকা পেয়েছিস ?” আমি রেগেমেগে বললাম।
 
কিটকিট আলতো হেসে বলল,”তোমাদের যেমন  তারাপীঠসিদ্ধ কামরুপসিদ্ধ সব সাধুবাবারা আছেন তেমনি আমাদেরও আছেন। তারাপীঠের নদীর এপারে যে প্রাচীন বটগাছটা আছে না ওখানেই আমাদের মূষিকবাবা থাকেন, তা কমকরে হাজার দেড়হাজার বছর বয়স উনার।”
বললাম,”দেড় হাজার বছর বয়সী সাধু ! গুল দেওয়ার জায়গা পাসনি ! দ্বারকা নদীর ধারে অতবড় সাধুবাবা আছে আর আমি জানালামই না। থাকে কোথা, গাছের তলায় ? “
 
-“গাছের তলায় কেন, হাজার দুয়ারি ঘর আছে উনার। বিড়াল টিড়াল এলে এক দরজায় ঢুকে আরেক দরজায় বের হয়ে যান।”
-“বিড়ালকে তো ইঁদুরে ভয় করে বাপ। “
আমার কথা শুনে একটু হতাশ হয়ে কিটকিট বলল,”তবে কি মানুষ ? হা ভগবান, এই বুঝলে তুমি। মূষিকবাবা একটা কিলো দশেকের ধেড়ে-ইঁদুর। ছোটোখাটো খাঁসিও বলতে পার। সে যাইহোক, বাবার দেওয়া দিব্যদৃষ্টিটা নাও।”
 
এই বলে সে তার ঝোলা হতে গুঁড়োমতো কিছু একটা বের করে আমার নাকের কাছে ছিটিয়ে দিল। সেই গুঁড়ো আমার নাকে ঢুকে প্রলয়ঙ্কর অবস্থা। সে কি হাঁচি। 
আমি রেগে গিয়ে বললাম,”ব্যাটা গর্দভ এই তোর দিব্যদৃষ্টি ? গদাইকাকার নস্যির ডিবেটা চুরি করে এনেছিস তুই।”
কিন্তু কে শোনে কার কথা। আমার মুখে দিব্যদৃষ্টি ছড়িয়েই আলতো পায়ে কেটে পড়েছে কিটকিট।
 
           – কঠিন সে পথ-
 
 
       গদাইকাকার নস্যির গুণ আছে বটে, চোখের সামনে যেন চব্বিশ ইঞ্চি টেলিভিশন চলছে। মহাভারতের যুগে এমনটা ছিল কিনা জানি না তবে এ যে রীতিমত চমকপ্রদ ব্যাপার তা নিঃসন্দেহেই স্বীকার করে নিতে হয়।
টিভিটা দেখেই মনে পড়ল ভারত-অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ম্যাচের কথা। হাইলাইটটা যদি দেখা যায়। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা, কোথায় বা রিমোট আর কোথায় বা নব কোত্থাও কিচ্ছু নেই। আধুনিক স্মার্টফোনের মতো আগাপাশতলা গোটাটাই স্ক্রিন।
 
সেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা রাস্তা। দু’দিক গাছপালা আর ঝোপঝাড়, চাঁদের আলো গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে রাস্তায় এসে পড়ছে। অপূর্ব সে দৃশ্য। আর সেই রাস্তা দিয়ে একেলা হেঁটে চলেছে কিটকিট, কাঁধে তার লাঠিতে বাঁধা পুঁটলি।
 
রাস্তা মোটেই সুবিধার নয়। খাড়া হয়ে দাঁড়ালে কিটকিটের দৈর্ঘ্য আড়াইফুটের বেশি হবে না। এদিকে কিটকিটের চারপাশে যেসব শত্রুরা ওঁত পেতে আছে তারা  আকার ও আয়তনে কিটকিটের চেয়ে অনেক অনেক বড়।
ঝাঁকড়ামাথা মহুলের গাছটা পেরোতেই পাশের জঙ্গল হতে একযোগে ডজনখানেক শেয়াল ডেকে উঠল-
 ‘হুক্কিহুয়া……
কন গেয়া ? কন গেয়া ?”
 
 
কিটকিট তার কাঁধের লাঠিটা বাগিয়ে ধরে চিৎকার করে বলল,”আমি কিটকিট, রাজকন্যা খুঁজতে যাচ্ছি। তোমরা কে ?”
শেয়ালের দল বলল,”হুক্কিহুয়া…..তোর জীবন গেয়া… তোর জীবন গেয়া…. “
হাতের লাঠিখানা মাথার উপর বনবন করে ঘুরিয়ে কিটকিট বলল,”একবার সামনে এ এই দেখ। লাঠির ঘায়ে সবকটাকে শুইয়ে দেব মাটিতে।”
 
শেয়ালেরা বিপুল বিক্রমে ছুটে এল কিটকিটের দিকে। ঝাঁপিয়ে পড়ল কিটকিটের উপর। কিন্তু কিটকিটের সঙ্গে কি পারে। লাঠির আঘাতে ছিটকে পড়ল সবাই। ‘মর গেয়া…ফাট গেয়া… খুন হুয়া… হুক্কিহুয়া…’ বলে দৌড়ে পালাতে লাগল সবাই।
 
…. চলবে 
সুব্রত মজুমদার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top