কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৬ – সুব্রত মজুমদার

[post-views]
.

.

কথাটা কিটকিটেরও পছন্দ হয়ে যায়। সে মনে মনে দিদিমণিকে দোষ দিতে থাকে। জাদুকরের সাথে দেখা হওয়ার যেটুকু আশা ছিল সেটাও শেষ হয়ে গেল। এখন আর কিই বা আছে করার।

কাকেশ্বরানন্দ বলল,”লাঠিখানার ভেতরে সামান্য কিছু জাদু অবশিষ্ট থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু আমার তো আবার উপোষ এসব মুখে দেওয়ার কথা ভাবাও পাপ।” দু’ডানা দিয়ে দু’কান মোলার চেষ্টা করল সে। কিন্তু সফল না হয়ে ক্ষান্ত দিল।
কিটকিট মহা উৎসাহে বলল, “কই আমাকে দাও তো। গত দু’দিন হতে দাঁতে শান দেওয়া হয়নি আমার।”

কাকেশ্বরানন্দ লাঠিখানা ছুড়ে দিতেই কিটকিট সেটাকে মহোৎসাহে চিবোতে লাগল। কিন্তু কোথায় কি, জাদুর চিহ্নমাত্রও নেই। তবে বেশ মজাদার। চিবিয়ে সুখ আছে।

এদিকে গাছের তলা দিয়ে একটা ইঁদুর যাচ্ছিল। নেতা ইঁদুর। সামনের নির্বাচনে জাঁতিকল চিহ্নে দাঁড়িয়েছে সে। সঙ্গে কয়েককজন হাতা চামচা চপস্টিক। দলবেঁধে এতগুলো ইঁদুর যেতে দেখে জিভ দিয়ে জল ঝরতে লাগল কাকেশ্বরানন্দর। সে এক ছো তে নেতাটাকে তুলে নিয়ে উড়ে চলল দূর আকাশে।

হাতা চামচা চপস্টিকদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেছে। তারা তাদের নেতার জন্য আক্ষেপ করতে করতে আর কাকেশ্বরানন্দকে গালি পাড়তে পাড়তে যে যেদিকে পারছে দৌড় দিচ্ছে।

কেউ কেউ তো গাছের কোটরে লুকিয়ে পড়ে সামান্য মুখ বের করে বলছে, “সামনে আয় ব্যাটা কাক, তোকে ভেজে খেয়ে ফেলব।”
এদিকে গুরুকে ওভাবে পালিয়ে যেতে দেখে হাবল আর ক্যাবলও ‘ঘ্যাকো-ঘ্যাকো’ করতে করতে দৌড় দিল । সেদিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিটকিট।

  – চল্লিশ পূর্ণ একের তিন ভুত ও জাঁতিকল পার্টি-

হাবল আর ক্যাবলের অপেক্ষা করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল, আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। ওরা এল না। কিটকিট ইতিমধ্যেই বারদশেক মাঠে নেমে সবুজ ঘাস খেয়ে এসেছে। পেট ঢিপ করে এসে বটের তলায় বসে বসে গান জুড়েছে সে।

কিটকিটের গান শেষ হতে হতেই কতগুলো খোনা গলার একসুরে গেয়ে উঠল।

-“কে.. কে তোমরা ?” আঁতকে উঠে বলল কিটকিট।
খোনা গলাগুলো বলল, “আমরা ভুত, চল্লিশ পূর্ণ একের তিনজন ভুত। এই বটগাছেই থাকি।”
কিটকিট অবাক হয়ে বলল, “চল্লিশ পূর্ণ একের তিন আবার কি ? একের তিন তো ভগ্নাংশ। দিদির বইয়ে আছে। ভুত কি কখনও ভগ্নাংশে হয় ?”

ভুত গুলো বলল, “হয় হয়। ভুতেরাই একমাত্র ভগ্নাংশে হতে পারে। স্কন্ধকাটাদের মুন্ডুগুলোর কি হবে ? ওগুলোই আমরা হিসেবে একের তিন ধরি। ভোটের সময়ও ওরা একের তিন। তিনজন একসঙ্গে না এলে ভোট দিতে পারবে না। পোলিং অফিসার ঘাড় ধরে বের করে দেবে।”

কিটকিট গম্ভীর হয়ে বলল, “হুমম্ ! কিন্তু এতক্ষণ তোমরা করছিলে কি ?”

ভুতগুলো বিরক্তির স্বরে বলল,”সারাদিন শুয়ে শুয়ে তোমাদের বকবকানি শুনছিলাম। ওই কাকটার ক্যা-ক্যা আর গাধাদুটোর ঘ্যাকো-ঘ্যাকো আওয়াজে ঘুমের দফারফা হয়ে গিয়েছে। ভাগ্যভালো আজ জাঁতিকল পার্টির মিছিল ছিল। ওদের নেতাটাকে নিয়ে কাকটা চলে যেতেই শান্তি ফিরে এল। শান্তিতে ঘুমোলাম।”

-“কিসের মিছিল ?”
-“শয়তান জাদুকরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অবস্থান ছিল ওদের। সেখানেই যাচ্ছিল ওরা ।”
ওদের কথা শুনে কিটকিটের মনে একটা আশার আলো জ্বলে উঠল। জাঁতিকল পার্টির সঙ্গে গেলেই জাদুকরের সন্ধান মিলবে।
কিটকিট বলল,”ওই জাঁতিকল পার্টির ইঁদুরগুলো কোথায় থাকে তোমরা জানো ?”

ভুতগুলো মাথা চুলকে বলল,”আমাদের তো জানা নেই। মাঝে মাঝেই এই পথ দিয়ে হইহল্লা করে যায়। তবে দাদু জানলেও জানতে পারে।”
-“কোন দাদু ?”

-“আমাদের দাদু। মহামহোপাধ্যায় কবিরত্ন স্মৃতিতীর্থ ন্যায়বিশারদ ভুতনাথ শর্ম্মা। তবে উনি আমাদের চল্লিশ পূর্ণ একের তিনের হিসেবে পড়েন না। উনার কাছে যেতে চাইলে নিয়ে যেতে পারি। এই ছরকুটা, যা তো এই খরগোশটাকে দাদুর কাছে নিয়ে যা।”
কথা শেষ হওয়া মাত্রই একটা দাঁত ছরকুটে ভুত বেরিয়ে এল গাছের ডালপালার ভেতর হতে। বোধহয় এরই নাম ছরকুটা। একগাল হেসে ছরকুটা বলল,”চলেন স্যার।”

কিটকিট রেগে গিয়ে বলল,”স্যার ট্যার নয়, স্যার শুনলে আমার ভয় করে। মাষ্টাররা খুব মারকুটে হয়। দিদির ইংরেজি বই খেয়ে ফেলেছিলাম বলে লাঠি নিয়ে তেড়ে এসেছিলেন স্যার।”
ছরকুটা মুখখানা আরেকটু ছরকুটে করে বলল, “বুঝলম।”

কিটকিট আর ছরকুটা চলল অন্ধকার মেঠো পথ দিয়ে। দুদিকে ধানের খেত আর মাঝখানে সরু একফালি রাস্তা। রাস্তাটা চলে গেছে গ্রামের দিকে। গ্রাম ঢুকতেই বাঁশের বন আর তার মাঝে মাঝে ডোবা। বাঁশের বন যেখানটায় শেষ হয়েছে সেখানেই শুরু হয়েছে মহুলিপাড়া। মহুলিপাড়া আর বামুনপাড়ার মাঝে একটা ফাঁকা অংশ। সেখানেই একটা বিশাল বেলগাছে লাল শালু বাঁধা। গাছটার কাছে এসেই ছরকুটা হাঁকল, “ও দাদু বাড়ি আছ গো….”

গাছের উপর হতে একটা জলদগম্ভীর গলা ভেসে এলো, “কে রে ? কে ?”
-“আমি ছরকুটা গো দাদু।”
-“ও, দাঁড়া বাপ আমি আসছি। বুড়ো মানুষ গাঁটে গাঁটে বাত, ওঠানামা করতে কষ্ট হয় রে। তা তোর সঙ্গে কে ও ?”

ছরকুটার জবাব দেবার আগেই কিটকিট বলল, “আমি কিটকিট, চলেছি রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খোঁজে। ঘ্যাঙরচাঁদের কাছে শুনলাম কঙ্কাবতীর খোঁজ জানে উত্তরের জাদুকর। আর এখানে এসে শুনলাম জাঁতিকল পার্টির ইঁদুরেরা চলেছে জাদুকরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে। আপনি কি জাঁতিকল পার্টির ইঁদুরেরা কোথায় আছে তা জানেন ?”

বেলগাছ হতে হুঁকোহাতে নেমে এলেন এক বৃদ্ধ, পাহাড় প্রমাণ তার চেহারা। পরনে ধুতি আর কাঁধে সাদা ধবধবে পৈতে। নামতে নামতেই বললেন,”রোষো রোষো, কি বললে যেন… “

-“আজ্ঞে জাঁতিকল পার্টি।”
-“হ্যাঁ, একবার ওরা এসেছিল আমার কাছে। ওদের নেতার আটহাজার সাতশ উনপঞ্চাশতম বিয়েতে। পুরোহিত হয়ে গিয়েছিলাম।”

-“অতগুলো বিয়ে !” অবাক হল কিটকিট।
দাদু বললেন, “এ তো ওদের কাছে মামুলি ব্যাপার। ধান পাকলে ওরা কমপক্ষে সাতটা করে বিয়ে করে। বউগুলো ধানের শিষ কেটে নিয়ে গিয়ে গর্তে জড়ো করে। ধানের ভান্ডার পূর্ণ হয়ে গেলেই সবকটা বৌকে দূর করে দেয়।”
-“খুব দুষ্টু তো ওরা।”

চলবে…..

.
[post-views]
.

আপনার মতামত এর জন্য
[everest_form id=”3372″]

সুব্রত মজুমদার

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top