কিটকিটের অভিযান – পর্ব ৮ – সুব্রত মজুমদার

[post-views]
.

তেইশের একের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছে এক বুড়ো ইঁদুর। কিটকিট চিনতে পারল বুড়োকে। পুকুরপাড়ে দেখা হওয়া সেই দাদু। কিটকিট এগিয়ে গেল তার কাছে। বলল, “দিদু তুমি এখানে থাকো ?”

বুড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “গোটা ঘরটাই তো আমার। এই হতচ্ছাড়ারা দুটো ঘরই দখল করে দেশসেবা করছে। সবকটা মরবে।”

কিটকিট বুঝল দাদু রেগে আছে। সে বুড়োর কাছে গিয়ে বলল, “অমন করে বলো না দাদু।

বুড়ো ফিক করে হেসে বলল,”বলি কি আর সাধে রে ভাই, খুব রাগেই বলি। তবে তোকে আর ওদের কাছে যেতে হবে না, আমিই দেব জাদুকরের ঠিকানা।”

কিটকিটের আর উৎসাহ ধরে না। সে বলল, “খুব উপকার হবে গো দাদু। আমি কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ দেব।”

বুড়ো বলল,”এখান হতে বেরিয়ে সোজা উত্তরে চলে যাবে। তিরিশ মাইল দূরে একটা নদী। তিরতির নদী। সেই তিরতির নদীর ধারে শালের বন। বনের ভিতর আছে পিয়ালের গাছ। আর সেই গাছের তলায় রয়েছে জাদুকরের পাতালপুরী। তবে যতটা ভাবছ অতটা সহজ নয়, রাস্তায় অনেক বিপদ। খুব সাবধানে যেও ভাই।”

বুড়োর কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল কিটকিট।

               -তিরতির নদী আর টিমটিম মাছ-

      মাঠ ছাড়িয়ে গ্রাম, গ্রাম ছাড়িয়ে মাঠ আর আরও আরও পথ পেরিয়ে অবশেষে পাওয়া গেল সেই নদীর ঠিকানা । একটা কাঁদর বয়ে চলেছে  তিরতির করে । এই কাঁদরটাই নাকি মিশেছে সেই নদীতে।

কাঁদরের জল বয়ে চলেছে ধীর গতিতে। যেন কোনও তাড়া নেই তার। ধারে ধারে কাশঝোপ, কুলঝোপ আর বিভিন্ন গাছের জটলা। কাঁদরের ধারে একটা আকড় গাছের ডালে বাসা বেঁধেছে একটা মাছরাঙার পরিবার।

গাছের ডালে বসে দুটো মাছরাঙা স্থির দৃষ্টিতে জলের দিকে তাকিয়ে আছে। কিটকিট জলের ধারে দাঁড়াতেই জলে একটা আলোড়ন হল। মাছরাঙাদুটো বিরক্ত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল।

 এরপর কিটকিটের দিকে তাকিয়ে মাছরাঙাবৌ বলল, “কে গো তুমি ? আমার শিকারটা নষ্ট করে দিলে কেন ?”

কিটকিট অবাক হয়ে বলল, “আমি আবার তোমার শিকার নষ্ট করলাম কখন ? আমি তো এই এলাম। আর তোমার শিকারের আমি জানিই বা কি ! “

মাছরাঙাবৌ বলল, “আমরা একদৃষ্টে জলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, একটা মাছ নজরে পড়তেই তুমি চলে এলে। তোমাকে দেখে মাছটা গেল পালিয়ে। ”

কিটকিট দুঃখপ্রকাশ করে বলল, “আমি এসব জানি না গো। জানলে পরে এমন করতাম না। তবে তোমাদের দুঃখ ভুলিয়ে দিতে আমি একটা গান করতে পারি। শুনবে ?”

মাছরাঙা বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ জমে যাবে। আমি শিস দেব আর তুমি গান করবে। আমার বৌ তৎক্ষণে কয়েকটা মাছ ধরে আনবে। গানশেষে সবাই মিলে খাব মজা করে।”
কিটকিট বিষন্ন মুখে বলল,” আমি তো মাছ খাই না গো, আমি শাকপাতা খাই।”

মাছরাঙা বলল,”তবে তাই সই, আমরা মাছ খাব আর তুমি কিছু ঘাস খেয়ে নেবে। এই কাঁদরের ধারে অনেক মিষ্টি মিষ্টি ঘাস। নাও এবার শুরু কর।”

কিটকিট শুরু করল গান-
লাগে, দাদাগো মনে বড় খুশি লাগে।
তিরতির বয় জল গাছপালা চঞ্চল
মৃদু মৃদু হাওয়া বয়, পুলক জাগে ।।
এই মোর বেশ ভালো পথে পথে,
আছে সঙ্গের সঙ্গীরা সাথে সাথে,
চলি দূর দূর পথে দিনে রাতে,
পথের স্বপ্নমায়া চক্ষে লাগে।।
নিশিদিন এই ভালো পথচলা,
পথেই সূর্য ওঠে ফুরায় বেলা,
পথের ক্লান্তি শেষে গহীন ঘুমের দেশে,

পথকে আপন করি স্বপন রাগে।।

গান শেষ হতেই মাছরাঙা বলল,”তা ভাই তুমি যাচ্ছ কোথায় ?”
কিটকিট বলল, “আমি চলেছি তিরতির নদীর খোঁজে। ওখানে শালের বনের ধারে জাদুকরের ঘর। তার কাছেই পাব রাজকন্যা কঙ্কাবতীর খবর।”

মাছরাঙা বৌ কিটকিটের হাতে দুটো মাছ দিয়ে বলল,”পুঁটলির ভেতর রেখে দাও, কাজে লাগবে। তবে খুব সাবধানে যেও ভাই। এই কাঁদর গিয়ে মিশেছে তিরতির নদীর সঙ্গে। যেখানে মিশেছে সেখানে কঙ্কটার বাস। ও বড় ভয়ানক। ওর দাঁড়ার সামনে যেও না।”

কিটকিট মাছদুটো পুঁটলিতে ভরে নিতে নিতে বলল, “তোমাদের কথা মনে থাকবে। সাবধানে থেক গো…. এলাম।”

কাঁদরের ধার দিয়ে এগোতে থাকল কিটকিট। পথে কত যে পাখির সঙ্গে দেখা হল তার ইয়ত্তা নেই। রাস্তায় দেখল একটা কাকের সঙ্গে কোকিলের লড়াই। সে ধুন্ধুমার কাণ্ড। কোনোপক্ষই আপোষে রাজি নয়।

কিটকিট বলল, “তোমরা লড়াই করছ কেন বাপু, মিলেমিশে থাকতে পার না ?”
কাক বলল,”ও কেন বলে আমার গলা কর্কশ ? ওর গলার এমন কি বাহার ? যে ওর সুনাম করে আমি তাকে দুচোখে দেখতে পারি না।”

কোকিল তার সুললিত গলায় বলল, “পারলি আর না পারলি, আমার বয়েই গেল। আমি কি তোকে গান শোনাতে যাই নাকি রে ?”

কিটকিট বুঝল এদের ঝগড়া থামানো যাবে না। বরং এদের মাঝে পড়ে জীবন যেতে পারে। কাক আর কোকিলের আঁচড়ে দু’চার জায়গা কেটে গেছে কিটকিটের। তাই মানে মানে কেটে পড়ে সে।

আরেকটু এগিয়েই কাঁদর মিশেছে নদীর সঙ্গে। জায়গাটা বেশ গাছপালায় ভর্তি। ইতস্তত মাটি উঁচু হয়ে আছে। কাঁকড়ার ঢিবি। নরম কাদামাটির ঢিবির নিচে বসে আছে তারা।
কাছে যেতেই একটা ঢিবি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল বিরাট একটা কাঁকড়া। দাঁড়া উঁচিয়ে তেড়ে এল কিটকিটের দিকে।

কিটকিট ভয়ে ভয়ে বলল, “তুমি কে ? আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি ?”

কাঁকড়াটি বলল-

 “দুই দাঁড়া করে খাঁড়া কটকট করি,
যাকে পাই তাকে ধরি দাঁড়া চেপে মারি।
ভয়ডর নাই মোর সদা থাকি রেগে,
 কঙ্কটা নাম হয়, শুনে সবে ভাগে।”

কিটকিট বলল, “সে তুমি যে হবে সেই হও, তোমার সঙ্গে তো আমার কোনও ঝগড়া নেই, শুধু শুধু ভয় করতে যাব কেন ? রাস্তা ছাড় । ”

চলবে….

আপনার মতামতের জন্য
[everest_form id=”3372″]
Subrata Majumdar

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top