কৃপণ

কৃপণ
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

দেবদার সাথে আমার পরিচয় একদম আকস্মিক । এক বন্ধুর বিয়েতে গেছিলাম ডানকুনি । অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে ডানকুনি স্টেশন বেশ অনেকটা দূরে । অটো ছাড়া দ্বিতীয় কোনো যান বাহন নেই । বন্ধুর বাবা অবশ্য একটা টাটা সুমো ভাড়া করে রেখেছিলেন । স্টেশন যাত্রীদের জন্যই ব্যবস্থা । আমার দুর্ভাগ্য । রাত এগারোটায় যখন স্টেশনে যাবার তোড়জোড় করছি , ড্রাইভার জানালো গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেছে । পেট্রল পাম্প অনেক দূরে । একটা অটো অনেক কষ্টে ধরে এনেছে । বেরিয়ে পড়লো তেল আনতে । স্টেশনের যাত্রী সেই মুহূর্তে মাত্র দুজন । আমি আর দেব দা । তখন অবশ্য দেবদাকে চিনতাম না ।
উনি আমাকে আগ বাড়িয়ে বললেন , চলুন , এগারো নম্বরে যাই ।
প্রথমটায় বুঝতে পারি নি । বোকার মত বলে ফেললাম , এখানে এগারো নম্বর কোথায় ?
হন্টন । স্রেফ দু পায়ে হেঁটে মানে এগারো নম্বরে ।
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম ।
দেবদা বলল , গল্প করতে করতে চলে যাবো । অটোর ভাড়া বেচে যাবে । নেমন্তন্ন বাড়ি খাবার পরে হাঁটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো ।
অগত্যা হাঁটা লাগলাম । শুরু হল গল্প বলা । দেবদা একাই বক্তা । নিজের জীবনের নানা ঘটনা বলতে লাগলেন । বাড়ির অবস্থা ভালো । চাকরি করেন সরকারি অফিসে । বরানগরে বাড়ি । অফিস হাতিবাগানে । বাসে করে যান । নিজের থেকে ভাড়া দেন না । ফাঁকি মারতে ওস্তাদ । ফাঁকি মারার টেকনিক আছে । আমাকে শেখালেন সেই টেকনিক । বাসের পেছন গেট দিয়ে উঠে মাঝামাঝি দাঁড়ানো । পেছন গেটের কন্ডাক্টর টিকিট চাইতে এলে ,সামনের দিকে এগিয়ে যান । আর সামনের গেটের কন্ডাক্টর এলে পেছন দিকে সরে আসেন । কন্ডাক্টর দুজনে কনফিউসড হয়ে যায় । কিছু বুঝে ওঠার আগেই সামনের গেট দিয়ে নেমে যান । তবে বিপদ হয় । মাঝে মধ্যে ধরাও পড়তে হয়েছে । শুরু হয় বচসা । তারপর গালাগালি । একদম অকথ্য ভাষায় ।
আমি একটু উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম , এতে কত টাকা সেফ হত , দেবদা ?
তখন দু টাকা করে ভাড়া ছিল । তাও ধর , মাসে কুড়ি দিন এভাবে ভাড়া ফাঁকি দিতে পারলে পুরো একশো টাকা থেকে গেল । ওই একশো টাকা দিয়ে আমার মাসে সাতদিন বাজার হয়ে যায় । জানিসতো পয়সা খরচ করতে আমার খুব গায়ে লাগে ।
আর একটা ঘটনা শোন , আমার একমাত্র ছেলে । খুব ভালো ছেলে । যেমন রাখি , তেমন থাকে । ক্লাস এইটে উঠে আবদার করলো একটা সাইকেল কিনে দিতে হবে । বন্ধুরা সাইকেল করে স্কুলে যায় । সে ও যাবে । আমার ধান্দা অবশ্য আলাদা ছিল । পাড়ার কোনো একটা ছেলেকে ফিট করতে পারলে তার সাইকেলে করে আশা যাওয়া । পুরো ফ্রি তে । অনেক টাকা সেফ হয়ে যায় । কিন্তু এবার ওর মা ছেলের সাথে ধরলো । কি আর করা ব্যাজার মুখে বেরিয়ে পড়লাম ছেলের জন্য সাইকেল কিনতে ।
আমি বললাম কাদের শো রুমে গেলেন ?
আমার দিকে হা করে তাকিয়ে দেবদা বলল , তুই পাগল হয়েছিস ।
আপনি থেকে দেবদা সরাসরি তুইতে নেমে এল । বলল , শো রুম ! নতুন সাইকেলে কত দাম জানিস ? আমার এক মাসের বাজার খরচ ।
সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল খুঁজতে লাগলাম । একটা চোরাই মাল পেয়ে গেলাম ভালো কন্ডিশনে । অনেক সস্তায় । হাফ দামেরও কমে ।
মনে মনে বললাম , গুরু , তুমি একটা জিনিস ।
মুখে বললাম , তোমার জবাব নেই , দেব দা ।
খুশি হয়ে বলল , এতো কিছুই নয় । টাকা পয়সা খরচের ব্যাপারে আমি খুব হিসেবি । ফালতু খরচ আমার দ্বারা হবে না । সে তুমি যেই হও ।
বৌদির ক্ষেত্রেও কি তাই ? সেখানেও কি হিসেবে করবে ? যদি বা কর , বৌদি তোমাকে ছেড়ে দেবে ?
শোন , তোর বৌদি আমাকে হাড়েহাড়ে চিনেছে । বলে আমি নাকি হাড় কেপ্পন । পয়সার পিশাচ । আমার মত কৃপণ সে জীবনে দেখে নি । আমার বয়েই গেল । দেখ নি তো দেখ নি । আরে , আমি হোলাম …. বাচ্চা । গায়ের মধ্যে টাকা পড়ে গেলে মুখে করে তুলতে পারি । তাহলে তোকে একটা ঘটনা বলি , শোন ।
গত তিন বছর ধরে শীত টা খুব জাকিয়ে পড়ছে ।তোর বৌদির ভালো একটা সোয়েটার নেই । ফুলশয্যার ত্বত্তে যে সোয়েটারটা পেয়েছিল , সেটাই এত বছর চালালো । ওটার আর কিছু নেই । একদম জ্যালজেলে । অনেক জায়গায় উল উঠে ফুটো হয়ে গেছে । ও দিয়ে আর যাই হোক , শীত মানায় না । এসব আমি জানি । কিন্তু
কিসের কিন্তু ?
যতবার আমাকে একটা নতুন সোয়েটার কিনে দেবার কথা বলে ততবার বলি সামনের বছর কিনে দেব । এই ভাবে এত বছর টেনে এনে গত শীতে একটা নতুন কিনে দিয়েছি ।
যাক , দিয়েছ তাহলে । তা দাম কত পড়লো ? বৌদির যখন , দামী তো হবেই ।
তুই খেপেছিস ? ওরে , এক একটা টাকা মানে আমার বুকে র এক একটা পাঁজর । নিজের হাতে নিজের বুকের পাঁজর কি খোলা যায় ?
তাহলে ?
গত বছর পুরো শীত কালটা আজ যাই কাল যাই করে কাটিয়ে দিলাম । ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে যখন আমাদের এখানে মোটামুটি ভালোই গরম পড়ে যায় তখন একদিন তোর বৌদিকে নিয়ে গেলাম কলেজস্ট্রীটে ।
ওখানে কেন ? শীতের দু মাস ভুটিয়ারা ওখানে দোকান দেয় । সারাদিন খোলা । সার সার দোকান । ঠিক দুমাস পরে আবার চলে যাবে । ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ওরা তখন উঠে যাচ্ছে । অনেকে চলেও গেছে । ঝড়তি পড়তি কিছু মাল অবশিষ্ট । মোটামুটি যাহোক একটা দাম পেলেই তখন বেঁচে দিতে ব্যস্ত । দরদাম শুরু করে দিলাম । যতটা কমানো যায় । একটা দোকানে খুব সস্তায় একটা রঙ চটা ফুলস্লিভ সোয়েটার পেলাম । তোর বৌদি পড়ে দেখলো । একদম ফাইন । কিন্তু তোর বৌদির নজরে এল ঠিক পেটের কাছটায় একটা ফুটো । ফুটো মাল তোর বৌদি নেবে না । আমিও ছাড়বো না । প্রায় একঘন্টা ঘুরেছি । এত সস্তায় কোথাও পাবো না । বোঝালাম যে একটু সেলাই করে নিলেই হবে । এমনিতে দারুন সুন্দর । তোমাকে খুব ভালো মানিয়েছে । সুযোগ বুঝে ভুটানিকে আর একটু চাপ দিয়ে খানিকটা দাম আরও কমালাম । আমি তখন আনন্দে আত্মহারা ।
তোর বৌদি আর কি বলবে ? চেনে তো আমাকে । পিঁপড়ে যদি গুড় খায় , ওই পিঁপড়ে টিপে গুড় বের করবো । কাগজে মুড়িয়ে দিয়ে দিল সোয়েটারটা । বেশ কিছুটা আসার পর আবার ছুটে গেলাম ওই দোকানে ।
কেন ? তোমার জন্য একটা কিনবে বলে ?
নারে ব্যাটা । ঝগড়া করে খানিকটা উল নিয়ে এলাম । ওই কালারের উল আবার বাজার থেকে কিনবো নাকি ? বিনা পয়সায় এক রকম কেড়ে আনলাম একদলা উল । এ বছর থেকে তোর বৌদির গায়ে নতুন সোয়েটার । কেমন দিলাম বল ?
স্টেশনে পৌঁছে গেছি । ট্রেন ঢুকছে । তার মধ্যেই বললাম , দাদা , একটু পায়ের ধুলো দাও ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top