কে জাগে রে – উদয়ন গোস্বামী

 [post-views]

কথা ও উৎসব এর ফেসবুকেই আলাপ।কবিতা লিখত দুজনেই। কথা বাপ মা মরা। উৎসব নিজগৃহে নিঃসঙ্গ। কাজেই, আলাপ জমতে সময় লাগল না বিশেষ। মেসেজগুলো কথার দিক থেকেই আসত বেশি। উৎসব ভাবল- ভালোবাসে বোধহয়। এর পর ফোন। কথা বলত কথা । শুনত উৎসব । অনেক কষ্টে একবার একটা কথাই জিজ্ঞাসা করেছিলো শুধু। তুমি আমার বন্ধু- না বঁধুয়া? কথা হেসেছিল শুধু।এরপর একদিন আচমকাই সেই কৃষ্ণনগর থেকে কথা চলে এল কলকাতায় উৎসব এর সাথে দেখা করতে। উৎসব ভাবল- ভালবেসে বোধ হয়। মা ভাবলেন,পিসি ভাবলেন, পিসতুতো বোনেরা ভাবল-ভালোবেসে বোধহয়।তারা সকলে মিলে দুজনের বিয়ে দিয়ে দিল।

বিয়েতে কেন রাজি হয়েছিল কথা, তা তার আজও অজানা। বাকিরাও ভাবে আজকাল, বিয়েটা হয়েছিল কিভাবে কে জানে! সে যাই হোক, কলকাতায় কথার মন টেকেনি এরপর।শাশুড়ির সাথে মতবিরোধ, কুমারী জীবনের স্বাধীনতার স্মৃতি-এসবই তাকে ক্রমশঃ উগ্র-বদমেজাজি এবং প্রায় মানসিক রোগী করে তুলছিল। উৎসব বুঝত সবই।আত্মীয় স্বজন, কর্মক্ষেত্র সকলের সাথে লড়াই করেই স্ত্রী এর পাশে থাকতে চাইত সে।শেষে অশান্তি চরম সীমায় পৌঁছলে, উৎসব বাধ্য হল মোটা মাইনের চাকরি, মা, দাদা সহ অন্যান্য স্বজনদের বিরাগভাজন হয়েই কথার পিছু পিছু কৃষ্ণনগর চলে আসতে।ভেবেছিল হয়ত, এতে দু কুলই রক্ষা পাবে, সবাই সুখি হবে।জানত যে ফিরে যাবার সমস্ত দরোজা সে নিজেই বন্ধ করে দিয়ে এসেছে। বছর দুই কেটে গেল এরপরে। উৎসব এখন একটা অত্যন্ত কম বেতনের চাকরি করে।

সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। অভাব অশান্তির জন্ম দেয়।অশান্তি শৈত্যের। কিন্তু কথা শৈত্য পছন্দ করে না। স্বামীর শৈথিল্যকে দাম্পত্য চুম্বনের উষ্ণতায় কাটিয়ে দেবার বদলে সে আবার ডুব দেয় ফেসবুকের অগাধ জলে।নতুন মৎস্য শিকারে। ইতিমধ্যে উৎসব এর সাহচর্‍্যে ও পরামর্শ মেনে লিখে , কথার কবিতার বেশ উন্নতি ঘটেছিল। সুন্দরী কবির জয় সর্বত্র। কাজেই জালে মাছ পড়তে সময় বেশী লাগল না। শেষে দৃশ্যটা এমন হল যে একই বিছানায় উৎসব বাম দিকে মুখ করে ঘুমের ভান করছে আর কথা কম্বলে মুখ ঢেকে চ্যাটিং এ ব্যস্ত সারারাত…।

এরপর একটা ঘটনা ঘটল। তিনদিনের অকাল বর্ষনে বন্যা এল কৃষ্ণনগরে। কথা, উৎসব কে ফেলে রেখেই কলকাতা পালিয়ে গেল কোনও এক পরিচিত ব্যক্তির আশ্রয়ে। দিন পনের কোনও খবর নেই। এমনকি ফোন করলেও রেগে যায়। জল কমতে ফিরে এল। সাথে জনৈক কবি-সম্পাদক শতদল । এই ব্যক্তি উৎসব এর ফ্রেন্ডলিস্টের এক কোনায় অনেক দিন থেকেই পড়ে ছিল।কিভাবে কথার জালে পড়ল কে জানে। শতদল এরপর থেকে ঘনঘনই যাতায়াত শুরু করল এদের বাড়ি। উৎসব বুঝতে পারছিল সবই কিন্তু মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হচ্ছিল কারন, তার যে আর কোথাও যাবার যায়গা নেই। এখন তার সমস্ত জগত জুড়ে শুধুই তার স্ত্রী।বইমেলা এল।

কবি কথা কলকাতা গেল উৎসব কে বাড়ির পাহারায় রেখে। সে এখন প্রায় সেলিব্রিটি। ফোন করে না। করলে রেগে যায়। ফেসবুক থেকে তো ব্লক করে রেখেছিল আগেই। এমন কি শতদল ও ব্লক করেছে তাকে। তবে জনৈক বন্ধুর থেকে উৎসব খবর পাচ্ছিল যে শতদল ও কথা কে কলকাতার বিভিন্ন অলিগলিতে একসাথে দেখা যাচ্ছে হামেশাই। একসময় এল সেই চরম মুহুর্ত। কথা মাঝরাতে ফোন করে স্বামীকে বল্ল, দ্যাখো, তুমি তো আর্থিক, শারীরিক বা অন্যান্য কোনও কাজেই আর লাগোনা আমার। সাথে ঘুরবার লোকও পেয়ে গেছি। কবিতা যেটুকু শিখেছি, তাতেই কাজ চলে যাবে আমার। তুমি তাই বাক্স- প্যাটরা গুছিয়ে নাও আজই।

মেলা শেষে বাড়ি ফিরেই তোমায় ডিভোর্স দেব আমি। বেশী ঝামেলা যদি কর, সর্বসমক্ষে এমন বদনাম করে দেব যে গলায় দেবার মত দড়িও জোটাতে পারবে না এর পর। না, দড়ি আর জোটাতে হয় নি উৎসব কে। তিনদিন পর যখন তার নিথর দেহটা বন্ধ বাড়ির থেকে বার করা হয়েছিল,তখন তার মৃত্যুর কারন নিয়ে খুব একটা জলঘোলা আর করেনি কেউই।ইঁদুরের বিষ হোক কি মেজর হার্ট এটাক,অসহায় পুরুষ কবির মৃত্যুর খবরের কোনও বিক্রয়যোগ্যতা নেই।  তবে সোশাল মিডিয়ায় কথার আছাড়ি পিছারি কান্নার ভিডিও প্রায় দশ হাজার লাইক পেয়েছিল। অনেকে অবশ্য অবাক হয়েছিল এটা জেনে যে কথার একটা স্বামীও ছিল।

দুই বছর পরের রাত। রাত্রির বিছানা। কৃষ্ণ নগরের বাড়ি। শতদল কিংকর্তব্য বিমুঢ়ের মত বিছানার বাম দিকে কাত হয়ে ঘুমের ভান করছে।কথা কম্বলের তলে মুখ লুকিয়ে মোবাইলে খুঁজছে কে কে জেগে আছে এখনও।  কেউ ঘুমায় নি।  আবার জেগেও নেই কেউ। শুধু সম্পর্কের মাধুর্‍্য গুলোই চোখ বুজে ঘুমের ভান করে পড়ে আছে বছরের পর বছর। সেলফির ফ্ল্যাশ আর ডিজিটাল ডিসকোর্স- এ দুটোই তার সহ্য হয় না যে। 

সমাপ্ত

Udayan Goswami

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top