কৈ মাছের বিরান – মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

কদমের মা বাজারেই ঘুরতে ঘুরতে সারাদিনে দুইকেজি চাল,এক কেজি আনাজ,সাথে পেঁয়াজ,কাঁচামরিচ জোগার করে ফেলে।হাত পাতার দীর্ঘদিনের অভ্যেস। দাতারা দিয়ে চলে অনায়াসে।কারন এত এত মালের আমদানি, এসব থেকে একটা বেগুন,তিনটা কাঁচা মরিচ, ,দুটো টাকি মাছ কিংবা এক চিমটি ডাল—–সমস্যা হয়না।ছওয়াবের আশা।
বাজারে ট্রান্সপোর্টের মাল খালাস করে আব্দুল। তার পেছনে লেগে থাকে রেনু,ছালে বেওয়া,অছিরন,হাংকির মা।এখানেও তাদের জন্য বরকতের ছড়াছড়ি। অজান্তে পড়ে থাকাআনাজ,মরিচ,পেঁয়াজ,বেগুন,আলু,সিম,পটল।
কুড়োবার সময় তুমুল প্রতিযোগিতা দিয়ে সকালটার শুরু।

কদমের মা ওদের সাথে কখনো পারে।কখনো পারেনা।শরীরটা ভাল থাকলে অল্প সময়েই রফা।ঘরে অচল স্বামী,তিন সন্তান রেখে মারা যাওয়া মেয়ের দিকের নাতি নিয়ে কদমের মা’র সংসার।এন্তাজের কলোনিতে ছোট্ট এলোমেলো বাসা।দুশোটাকা দিতে হয়।ভিক্ষাবৃত্তি,বিধবা ভাতার কার্ডটাই অবলম্বন।
মালিক ভাল লোক।
তাগাদা নেই।
পারলে দিবা।নাইলে না দিবা।
কদমের মা’র সব কুড়ানো শেষ।এবার মাছের বাজারে ঢোকে।নাকমুখে আঁচল চেপে হাতের বাটিটা কাঁপাতে কাঁপাতে কিছু সত্য মিথ্যা মিশিয়ে মাছ ভিক্ষা করে।
পায়ের কাছে একটা থাই কৈ সম্ভবত।
লোকজন সব অন্যমনস্ক। কদমের মা ওটা কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতেই কে যেন খপ করে ওর হাতটা ধরে ফেলে—-
এ্যাঁই বজ্জাত বেডি!মাছটা থ– কৈতাছি।
বাজান, মাটিতে পইড়া আছিল।
আরেকটু বিকৃত স্বরে লোকটা বললো,এ্যাঁহ্–মাটিতে পইড়া আছিল।তুমার বাপের ট্যাকায় মাছের ব্যবসা করতাছি!
মাছটা নিয়েই গেল।
পাশে দাঁড়ানো সমেদালী আরেকটু বিকৃত স্বরে উচ্চারণ করে,নাউজুবিল্লা। এত খারাপ মাইয়া মানুষ!সাহস কত, দেকছনি!
তাহের পাশে দাঁড়িয়ে মাছ কেনার কাজ শেষ করেছে।সে আরো এক কেজি থাই কৈ দিতে বললো।
মাছটা মেপে ছেলেটা বললো,নেন স্যার।ব্যাগ ধরেন।
আমার জন্য না।ওই যে ওনাকে দাও।
কদমের মা এমনিতেই দাবাড় খেয়ে রীতিমত কবুতরের বাচ্চার মতো তড়পাচ্ছিল।এবার সত্যি সত্যি ভয়ে আঁতকে ওঠে।পালাচ্ছিল।
তাহের ডাকে—নেন মা।কৈ মাছগুলো নিয়া যান।আর এইযে বাড়তি কিছু টাকা।তেল,মরিচ কিনে নিবেন।
কদমের মা হা করে তাকিয়ে থাকে।
পুরনো কিসমিসের মতো চুপসানো গাল বেয়ে ব্রহ্মপুত্রের জল গড়াচ্ছে।
বাজান আল্লায় তোমারে সোনা দানা,বাড়িএ,গাড়িএ দেউক।কোটি ট্যাহার মালিক বানাউক বাজান।
তাহের জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছে আগেই।
ক্ষুদ্র বাসার বোঁটকা পরিবেশের বাইরে কৈ মাছের বিরানের গন্ধ পেয়ে কদমের বাপের নাকে অন্য রকম আমেজে বাতাসের  খোঁচা দিয়ে যায়।

 

mdshohidullah

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top