ক্ষণিকের পরিচয় — বিক্রম মণ্ডল

 [post-views]

আজ সাত আট বছর আগেকার কথা।কিংবা তারও বেশি হবে হয়তো। মনে আছে সেবার কাজের সুত্রে উত্তরাখণ্ড যাচ্ছিলাম। তবে তার আগে লখনৌ যেতে হবে । এর আগেও লখনৌ গিয়েছি একবার , তবে সেবার কাজের জন্য নয়, লখনৌ শহর ঘুরে দেখার সাধ ছিল ভীষন। বলতে গেলে সত্যজিৎ বাবুর “বাদশাহী আংটি”-ই আমাকে এই শহরে এনেছিল। না, কোনো বাদশাহী আমলের আংটি কিংবা কোনো খাজনার সন্ধানে নয়, আমার আসার উদ্দেশ্য ছিল অন্য। শহর ঘুরে ঘুরে মধ্যযুগীয় মুঘল আমলের স্থাপত্য ভাস্কর্য ও শিল্প কারুকার্যের সাথে পরিচিত হতেই এসেছিলাম।
 
       ট্রেন ছুটেছে তার আপন গতিতে – গন্তব্যের দিকে। পাশের লাইনটিও ছুটেছে যেন তার সমান প্রতিযোগী হয়ে।  মাঝে মাঝে উঁচু নীচু টিলা আর শাল, পলাশ, সেগুন গাছের বন। সবই ছুটেছে যেন স্রোতের বিপরীতে। ট্রেনের জানালা থেকে বাইরের চলমান জগৎটাকে উপভোগ করার সেরা মুহূর্ত কখনোই ভোলা যায় না। আর বিশেষ করে দূরের যাত্রাপথে জানালার ঠিক পাশের সিটে বসে বাইরেটা না দেখলে জীবনের অন্যতম সেরা তীর্থদর্শন অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এই জন্যই বোধহয় কোনো গল্পকার কিংবা ঔপন্যাসিক তাদের গল্পের বা উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রকে একবার হলেও ওই নির্দিষ্ট সিট-এ বসান ।
 
       হাজারিবাগ ঢুকতেই সন্ধ্যা ঘোর হয়ে এলো। আলোতে আলোতে সাজানো হাজারিবাগ রোড স্টেশন। বেশ কিছুটা সময় ট্রেন দাঁড়াবে এখানে। স্টেশনে ঘুরে-ফিরে এক ছোলা বিক্রেতা ছোলা বিক্রি করছেন তার ব্যবসায়িক ডাক ছেড়ে। সন্ধ্যাবেলা কিছু একটা না খেলে দাঁত বাবাজি আরাম পাবে কেনো ! অগত্যা ছোলা কিনে চিবাতে লাগলাম।শাল পাতার বাটিতে ছোলা মাখা আর বেশ কয়েকটি কাঁচালঙ্কা সিদ্ধ। আমরা যাকে ছোলা মাখা বলি, এখানে সেটাকেই বলা হয় ‘চানা’ । 
       
        এমন সময় এক হিন্দুস্থানী পরিবার উঠলেন ট্রেন কম্পার্টমেন্টে। মা মেয়ে আর পরিবারের কর্তা। এদিক ওদিক সিট নম্বর মিলিয়ে কিছুটা খোঁজাখুঁজির পর আমার সামনের সিটগুলি দেখে ‘মিল গেয়া’ বলে ওখানেই বসলেন। দুটি বড়ো ব্যাগ নিয়েই ওদের যত জামেলা। পরিবারের কর্তা বেশ মোটাগোটা গোছের।মাথায় চুলের চিহ্নমাত্র নেই অথচ ইয়া বড় একটা গোঁফ। মেয়েটি বসেছে আমার সামনে, জানালার পাশে। সুশ্রী চেহারা। বয়স আন্দাজ কুড়ি থেকে একুশ হবে। পরনে নীল রঙের কুর্তা, আর মাথার চুলগুলি খোঁপা করা। বেশ লাগছে তাকে। আলাপ করতে মন চাইছে কিন্তু সব সময় সবকিছু সম্ভব হয়েও হয় না। আর যাত্রাপথে সামনে এমন সুন্দরী একজন থাকলে যে কোনো যুবকই আলাপ সেরে নেবেন। মেয়েটির কাজল কালো চোখ যেনো হাজার অজানা রহস্যের ইঙ্গিত করছে।
 
       দূরের যাত্রাপথে বোবার মতো মুখবুজে যাওয়া ভীষন কষ্টকর আমার কাছে।কাছাকাছি থেকেও অচেনা অজানা মানুষের সাথে যদি বন্ধুত্বটা নাই করতে পারলাম তাহলে কথা বলার শক্তি হারানোই ভালো। সামনে বসে থাকা সেই হিন্দুস্থানী ভদ্রলোকের চোখে চোখ পড়তেই একটু মুচকি হেসে হিন্দিতেই বললাম, ” কতদূর যাবেন কাকু?” তার দিক থেকে প্রথমে কোনো জবাব এলো না। ভ্রু কপালে তুলে আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে কিছু সময় চুপ করে থেকে ভদ্রলোক বললেন, “বেনারস। আর তুমি কতদূর?”  যাক বাবা, অবশেষে তাহলে কিছু বললেন।
       — লখনৌ পর্যন্ত যাবো। কাজের সুত্রে। 
       — বাহ্। কি নাম তোমার?
       — আজ্ঞে অমিত। অমিত ব্যানার্জী।
       — বাঙালীবাবু! আমার নাম রামপাল গঙ্গবর।
       — নমস্কার।
       — তো কি কাজ করো হে?
       — কাজ বলতে তেমন কিছুই না।
       — এটা আবার কেমন কথা হে। খালি খালি তো আর কেউ ঘুরে বেড়ায় না!
       — বনবিভাগের কাজ। খুব ইচ্ছা ছিল ছেলেবেলা থেকে।
       — আবার বন ! আচ্ছা তোমরা আজকালকার ছেলে মেয়েরা বনজঙ্গল ছেড়ে সভ্য জগতের দিকে মন দিতে পারো না!
       — আসলে তথাকথিত সভ্যসমাজের চেঁচামেচি কোলাহলের বাইরেও যে একটা বিশাল জগৎ আছে, সেটা আপনি জঙ্গলের পরিবেশে না আসলে বুঝবেন না।
       “বাবাকে একথা অনেকবার বলেছি” শান্ত  আবেগ পরিপূর্ণ কণ্ঠে আমার সামনে বসে থাকা মেয়েটি বললো,” তবুও বাবা মানতেই চায় না।”
 
          ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন,” হে হে, ও আমার মেয়ে, পূজা। ছোটবেলা থেকে বনজঙ্গল দেখছে কিনা। তাই জঙ্গল-পাহাড়-নদীর মায়া ছেড়ে একদণ্ডও বারাণসী থাকতে চায় না। একপ্রকার জোর করেই নিয়ে যেতে হয়। ওর তোমার মতোই বনজঙ্গল ভালো লাগে।”
 
     এতো সময় পরে মেয়েটির নাম জানলাম। যেটা জানার ইচ্ছা ছিল অনেক আগে থেকেই। পূজাকে উদ্দেশ্য করে একটু হেসে বললাম, ” বাহ্ বেশ ভালো তো। মন তো আর বাঁধা মানে না, যে জগৎটাকে মন অ্যাকসেপ্ট করবে সেটাকেই আপন করে নেওয়াই ভালো।” কি জানি বাড়িয়ে বললাম নাকি! পূজা শুনলো, কিছু বললো না। তবে মাথা নেড়ে সায় দিল।
 
        — আচ্ছা কাকু এখানে কি বেড়াতে এসেছিলেন?
        — হ্যাঁ, তা একপ্রকার বেড়ানো বলতেই পারো। মেয়েকে নিতে এসেছিলাম হাজারিবাগ ওর মামার বাড়ি। হাজারিবাগ ঠিক নয় আরো অনেকটা দক্ষিণে বরকাগাঁও। এখানে থেকেই বড়ো হয়েছে।
        — আচ্ছা ! 
        — তবে সময় পেলে একবার এসো কিন্তু বারাণসী। শিবরাত্রির সময় বড়ো করে শোভাযাত্রা বের হয়। 
        — যাওয়ার ইচ্ছা আছে ভীষন। শুনেছি সন্ধ্যারতি বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবেই হয়।
        — হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ।
        — সন্ধারতি দেখার ভীষন আগ্রহ।
        — বারাণসী আসলে আমার বাড়িতে আসতে ভুলবে না একদম। এই নাও আমার ঠিকানা।
        ভদ্রলোক তার নাম ঠিকানা লেখা একটি কার্ড আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। হাত বাড়িয়ে নিয়ে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিলাম। 
 
      বারাণসী বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি বড়ো কাপড়ের দোকান আছে ভদ্রলোকের। বেশ নাম ডাকও আছে তার। অপরদিকে পূজা চরিত্রের সহজ সারল্য বোধ, প্রকৃতি প্রেম ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে  আমাকে। যদি ভগবান কোথায় থেকে থাকেন তবে তিনি নিশ্চই নিজ হাতে এমন এক প্রাণ সৃষ্টি করেছেন । এই যুগে ওর সমবয়সী কোনো শহুরে মেয়েই বন্ধুবান্ধবদের সাথে আনন্দ করা বাদ দিয়ে অকারণে  পাহাড় মালভূমি ঘেরা জায়গায় পড়ে থাকে না। অথচ এর জগৎটা আর পাঁচজনের থেকে ভিন্ন। এরও আনন্দ দুঃখ হাসি কান্না আছে। পূজার কাছে অবশ্য ক্ষণিকের আলাপে জেনেছি ঝর্নার জলে ভিজতে ওর ভীষন ভালো লাগে ইত্যাদি ইত্যাদি।খুব কমই কথা হয়েছে তার সাথে, তবে যেটা হয়েছে সেটা হলো একে অন্যের দিকে চোখাচোখি আর একটু করে হাসি। 
 
     বারানসী আসতে আর বেশি দেরি নেই। আর কিছু সময়ের মধ্যেই স্টেশনে ট্রেন থামবে । দূরে চলে যাবে পূজা, দূরে চলে যাবো আমি। সময় কেটে যাবে সময়ের নিয়মে।আর কখনোই দেখা হবে না হয়তো তাদের সাথে।
 
       ভোর হয়ে এলো।ট্রেনের গতি কমে আসছে। পুজাদের গোছগাছ করা দেখে বুঝলাম বারাণসী চলে এসেছি। মনটা একটু খারাপ লাগছিল না জানি কোন অজানা কারণে। বাকি পথ আবার নতুন কোনো মানুষের সাথে গল্প করে কাটিয়ে দেবো ঠিকই কিন্তু এই মুহূর্তটা আর ফিরে আসবে না। পূজার বাবা দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আগে বললেন, ” তুমি সাবধানে যেও অমিত। সময় পেলে একবার এসো কিন্তু, ঠিকানা তো দিয়েছি।”
       — হ্যাঁ কাকু, ভালো থাকবেন।
       পূজার বাবা মা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিছু সময় পূজা আমার দিকে তাকিয়েই বসে রইলো। হয়তো সেও কিছু বলতে চায়। বলতে চাই অনেক কথা কিন্তু কোনো এক অজানা বাঁধার প্রাচীর বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুইজনের মাঝামাঝি। হয়তো এতক্ষণে আমার মনের কোণে সূক্ষ্ম একটি জায়গায় করে নিয়েছিল এই মেয়েটি। একটুকরো হাসির রেখা দিল পূজার মুখে। আমিও একটু হেসে বললাম, “ভালো থেকো পূজা।” উঠে যেতে যেতে শুধু একবার বললো, “আসছি। সাবধানে যাবেন।” 
  ওরা সবাই নেমে গেলো । 
 
       ট্রেন আবার চলতে শুরু করল। ফিরে পেলো তার আপন গতি। বারাণসী পিছু ফেলে এগিয়ে চললাম। আমাকে পৌঁছতে হবে আমার গন্তব্যে।
 
                               –
বিক্রম মণ্ডল
বিক্রম মণ্ডল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top