খেলার জায়গা – শর্মিষ্ঠা গুহ রায়(মজুমদার)

 [post-views]

‘আমি কোথাও লুকানোর জায়গা পাইনা,এই এত্তটুকুন টুকুন ঘর’-মুখটা ব্যাজার করে করে বলে বছর আটেকের সুমি।সুমির মায়ের মাথাটা গরম হয়ে ওঠে রাগে,চিৎকার করে রান্নাঘর থেকে বলে ওঠে-‘কত্ত বড় ঘর লাগবে তোমার?

 

মাঠের মত বড়?ফ্ল্যাট এই রকম হয় বুঝেছ!’ সুমিও চিৎকার করে বলে-‘দিদার বাড়ির মত বাড়ি ভালো।ওখানে খেলার মত বাগান আছে।আমি ওখানে চলে যাব।’

সুমির মাও বলে-‘হ্যাঁ,তাই যাও,স্কুলটুল সব ছেড়ে ওখানে চলে যাও,সারাদিন খেলতে থাক।খুশীতো?’

     তারপর যা হয়,আর কী?ভ্যাঁ ভ্যাঁ কান্নাকাটি চলল কিছুক্ষণ।তারপর যথারীতি স্নানটান করে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে দুপুরের ঘুম।ঘুমালে এই মেয়ে অনেকক্ষণই ঘুমায়।মানে সহজে ঘুমোতে চায়না আর ঘুমালে উঠতে চায়না।

ঘুম থেকে ওঠানো মানে চিৎকার চেঁচামেচি,তারপর উঠে খুব মেজাজ গরম দেখানো,যেন মা কত অপরাধ করে ফেলেছে!তারপর দুধ হরলিকস্ খেয়ে পড়তে বসা,সেতো আর এক কুরুক্ষেত্র।

     এইতো মা মেয়ের রোজকার জীবনের রুটিন।জেদ,চেঁচামেচি,রাগারাগি,একা একা খেলা, পড়াশোনা –এইগুলো প্রায় সব ঘরের একই ঘটনা।সুমির মাও বোর হয়ে গেছে।ছোটবেলায় সেওতো খাতার মধ্যে ছবি আঁকত,একটা বাড়ি,বাড়ির সামনে পাখি,

একটা জলের কল(অবশ্যই সবসময় জল পাওয়া যায় তাতে অর্থাৎ জলের কোনো অসুবিধা নেই সেখানে),প্রচুর গাছ,কিছু টবে লাগানো,কিছু ন্যাচারাল মাটিতে ওঠা গাছ,দোলনা(যেটা ভীষণভাবে পারসোনাল,স্কুল বা পার্কের দোলনার মত সবাইকে ভাগ দিতে হয়না),

 

একটা স্লিপ যেখানে যখন খুশী চড়া যায়,একজন মহিলা যিনি সর্বদা মাটিতে পড়ে থাকা পাতা ঝাড়ু দিয়ে যাচ্ছেন(এই মহিলার ঝাড়ুটি ম্যাজিকাল,যেটা সব পাতা একেবারে সরিয়ে ফেলে পুরো জায়গা ঝকঝকে করে ফেলে),বাড়ির পেছনে বড়বড় তিনকোণা পাহাড় যার পিছনে সূর্যিমামা বড়বড় ডান্ডাওয়ালা কিরণ বের করে রয়েছে।

   এটা ছিল সুমির মায়ের স্বপ্নের বাড়ি।কিন্তু  কখনোই সেই অতবড় বাড়ি হয়নি সুমির মায়ের।অত পাখিটাখি,স্লিপ দোলনাটোলনাওয়ালা বাড়ি হয়নি।মধ্যবিত্ত পরিবারের বাড়ি যেমন হয় তেমনই একটুকরো বাগান নিয়ে ছোট্ট একটা বাড়ি করছিলেন সুমির দাদু,তাও সুমির মা বড় হয়ে যাওয়ার পরে।

     হাসি পেয়ে গেল সুমির মায়ের। তাওতো ভাল,সুমি খেলার জন্য দিদার বাড়ির ছোট্ট বাগানটা চেয়েছে।তার মত মাইল মাইল লম্বা জায়গায় বাড়ি চায়নি।তাহলে তো তার আরও বড় স্বপ্নভঙ্গ হত।

     মুচকি হেসে ঘুমিয়ে থাকা মিষ্টি সুমিকে আদর করে সুমির মা।মনে মনে বলে ওঠে-‘তাড়াতাড়ি দিদার বাড়ি নিয়ে যেতে হবে সুমিকে,নইলে সুমির শৈশবের স্মৃতিগুলো যে মিষ্টি মধুর হয়ে উঠবে না।’

বিছানা থেকে নেমে সুমির মা ব্যাগ গোছানো শুরু করে নতুন উদ্যমে। 

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top