খ্রিস্টধর্ম – সংকলক – সৌম্য ঘোষ

[post-views]

 

 [printfriendly]

 

খ্রিস্টধর্ম একটি অব্রাহামীয় একেশ্বরবাদী ধর্ম যা যীশুর জীবন ও শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়। এর অনুসারীগণ, যারা খ্রিস্টান বলে পরিচিত, বিশ্বাস করে যে যিশু হলেন খ্রিস্ট, যাঁর মশীহ হিসেবে আগমনের ব্যাপারে হিব্রু বাইবেল তথা পুরাতন নিয়মে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে এবং নূতন নিয়মে তা বিবৃত হয়েছে। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ধর্ম যার অনুসারী সংখ্যা ২০১৫ সালের একটি জরিপমতে ২.৩ বিলিয়ন।

খ্রিস্টধর্ম সাংস্কৃতিকভাবে এর পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য শাখাগুলোর মধ্যে এবং পরিত্রাণের প্রকৃতি ও প্রতিপাদন, যাজকাভিষেক, মণ্ডলীতত্ত্ব ও খ্রিস্টতত্ত্ব বিষয়ক মতাদর্শে বৈচিত্র্যময়। খ্রিস্টানদের সাধারণ ধর্মমত অনুসারে যীশু হলেন ঈশ্বরের পুত্র ।

যিনি পরিচর্যা, দুঃখভোগ এবং ক্রুশারোহণ করে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে মানবজাতির পরিত্রাণের জন্য পুনরুত্থিত হয়েছিলেন, যা বাইবেলে সুসমাচার বলে অবিহিত হয়েছে। মথি, মার্ক, লূক ও যোহন লিখিত চারটি সুসমাচারের পাশাপাশি এর পটভূমি হিসেবে ইহুদি পুরাতন নিয়ম হল যিশুর জীবন ও শিক্ষার বিবরণী।

খ্রিস্টীয় ১ম শতাব্দীর মধ্যভাগে লেভ্যান্টে (পূর্ব-ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল) খ্রিস্টধর্মের উত্থান ঘটে। জেরুসালেম থেকে সমগ্র নিকট প্রাচ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রসারলাভ করেছিল। আরাম, আসিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, ফিনিশিয়া, এশিয়া মাইনর, জর্ডন ও মিশর ছিল খ্রিস্টধর্মের প্রথম যুগের প্রধান কেন্দ্রসমূহ। খ্রিস্টীয় ৪র্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টধর্ম রাজধর্মের স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। ৩০১ সালে আর্মেনিয়ায়, ৩১৯ সালে জর্জিয়ায়,৩২৫ সালে আকসুমাইট সাম্রাজ্যেএবং ৩৮০ সালে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্ম রাজধর্মের স্বীকৃতি পায়।

 

৪৫১ সালে কাউন্সিল অফ ক্যালসেডনখ্রিস্টধর্মকে ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্সি ও ক্যালসিডোনীয় খ্রিস্টধর্ম – এই দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত করে দেয়। ১০৫৪ সালে মহাবিভাজনের সময় ক্যালসিডনীয় খ্রিস্টধর্মরোমান ক্যাথলিক চার্চ ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চেবিভক্ত হয়ে যায়। ষোড়শ শতাব্দীতে প্রোটেস্টান্ট সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি নতুন খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। পরে এই সম্প্রদায় থেকে অনেকগুলি পৃথক খ্রিস্টীয় সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়।

রোমান সাম্রাজ্যের যিহূদিয়া প্রদেশে একটি দ্বিতীয় মন্দির ইহুদি উপদল হিসেবে খ্রিস্টধর্ম যাত্রা শুরু করে। প্রারম্ভিক নিপীড়ন সত্ত্বেও যীশুর প্রেরিতগণ ও তাঁদের অনুসারীরা লেভান্ত, ইউরোপ, আনাতোলিয়া, মেসোপটেমিয়া, ট্রান্সজর্ডান, মিশর ও ইথিওপিয়ায় ছড়িয়ে পড়েন। এটি দ্রুত পরজাতীয় ঈশ্বরভীরুদের আকৃষ্ট করে যা একে ইহুদি রীতিনীতি থেকে ভিন্নপথে চালিত করে। ৭০ খ্রীষ্টাব্দে যিরূশালেমের পতনের পর দ্বিতীয় মন্দিরভিত্তিক ইহুদিধর্মের অবসান ঘটে এবং খ্রিস্টধর্ম ক্রমশ ইহুদিধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সম্রাট কনস্টান্টিন মিলান ফরমান (৩১৩) জারি করার মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্মকে বৈধতা প্রদান করেন।

 

পরবর্তীতে তিনি নিকিয়ার প্রথম পরিষদের (৩২৫) আহ্বান করেন যেখানে প্রারম্ভিক খ্রিস্টধর্মকে সংহত করা হয় যা রোমান সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় মণ্ডলীতে (৩৮০) পরিণত হয়। প্রধান বিচ্ছেদগুলোর পূর্বে খ্রিস্টধর্মের সংযুক্ত মণ্ডলীর ইতিহাসকে প্রায়শই “মহামণ্ডলী” বলে অবিহিত করা হয় (যদিও তৎকালে প্রচলিত মতের বিরোধী রহস্যবাদী খ্রিস্টান ও ইহুদি খ্রিস্টানদের অস্তিত্ব ছিল)। খ্রিস্টতত্ত্বকে কেন্দ্র করে এফেসুসের পরিষদের (৪৩১) পর পূর্ব মণ্ডলী এবং চ্যালসিডনের পরিষদের (৪৫১) প্রাচ্য অর্থডক্সি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

 

অন্যদিকে রোমের বিশপের কর্তৃত্বকে কেন্দ্র করে পূর্ব অর্থডক্স মণ্ডলী ও ক্যাথলিক মণ্ডলীরমধ্যে মহাবিচ্ছেদ (১০৫৪) ঘটে। ধর্মতাত্ত্বিক ও মণ্ডলীতাত্ত্বিক বিতর্ককে—প্রধানত আত্মপক্ষসমর্থন ও পোপীয় আধিপত্য—কেন্দ্র করে সংস্কার যুগে (১৬শ শতাব্দী) প্রোটেস্ট্যান্টবাদ পূর্ব ক্যাথলিক মণ্ডলীসমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অসংখ্য উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশে, বিশেষত ইউরোপে প্রাচীনযুগের শেষভাগ থেকে মধ্যযুগে, খ্রিস্টধর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবিষ্কারের যুগের (১৫শ–১৭শ শতাব্দী) পর মিশনারি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম আমেরিকা, ওশেনিয়া, সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা এবং বিশ্বের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।

 

মধ্যযুগে রোমান ক্যাথলিক ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম সমগ্র ইউরোপে প্রসারিত হয়েছিল। নবজাগরণের সময় থেকে শুরু করে ইউরোপের আবিষ্কার যুগে খ্রিস্টধর্ম সারা পৃথিবীতে প্রসারিত হয়। এর ফলে এই ধর্ম বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

 

খ্রিস্টধর্মের চারটি বৃহত্তম শাখা হল ক্যাথলিক মণ্ডলী (১.৩ বিলিয়ন/৫০.১%), প্রোটেস্ট্যান্টবাদ (৯২০ মিলিয়ন/৩৬.৭%), পূর্ব অর্থডক্স মণ্ডলী (২৩০ মিলিয়ন) ও প্রাচ্য অর্থডক্সি (৬২ মিলিয়ন/১১.৯%),যাদের মধ্যে ঐক্যের (বিশ্বব্যাপ্তিবাদ) বিভিন্ন প্রচেষ্টা জারি রয়েছে। পাশ্চাত্যে আনুগত্যের দিক দিয়ে পতন হওয়া সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্ম অঞ্চলটির প্রভাবশালী ধর্ম যেখানে প্রায় ৭০% জনগণ নিজেদের খ্রিস্টান হিসেবে চিহ্নিত করে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহাদেশ আফ্রিকা ও এশিয়ায় খ্রিস্টানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

বর্তমানে পৃথিবীতে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা দুই লক্ষ কোটি, যা বিশ্বের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি।।

 

সৌম্য ঘোষ
সৌম্য ঘোষ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top