গায়ে পড়া -শম্পা সাহা

[post-views]
 

 

চাটুজ্যে বাবু বড় গায়ে পড়া লোক। রাস্তাঘাটে দেখলেই হল অমনি, “কেমন আছেন, ভালো আছেন তো ?”থেকে শুরু করে হাবিজাবি গল্প ।

এদিকে যে অপর পক্ষের দেরী হয়ে যাচ্ছে সেদিকে হুঁশ নেই। মাঝে মাঝে আবার নিজের পয়সায় চা বিস্কুট খাওয়াতেও কসুর করেন না । কিন্তু তার এই খেজুরে আলাপ সবার সব সময় ভালো লাগে না, তাড়া থাকতে পারে, কারো অন্য কোন কাজ থাকতে পারে, সিম্পলি কথা বলতে ইচ্ছে নাই করতে পারে! কিন্তু আট থেকে আশি কারোরই তার হাত থেকে রেহাই নেই।

গল্প করতে না চাইলে একেবারে ঘাড়ের ওপর এসে হাত টেনে ধরে জুড়বেন তার ভালো-মন্দ সুখ-দুঃখের গল্প। আর বারবার বলবেন, “মনের বিনিময়, এটাই তো সবচেয়ে বড় ব্যাপার! কি ঠিক? কি ঠিক?”

আরে কে চায় আপনার সঙ্গে মনের বিনিময় করতে? আরো কি ঠিক? কি ঠিক? বলতে বলতে ডজন খানেক থুতুর কনা ছিটকে এসে লাগে শ্রোতার মুখে চোখে ।

আট থেকে আশি চাটুজ্জে বাবুর মনের বিনিময়ের হাত থেকে রেহাই নেই কারও। কখনো কখনো এমন ভাবে মুখ কানের কাছে এসে ফিসফিস করে কথা বলেন, যেন আকবরের লুকোনো গুপ্তধনের খোঁজ দিচ্ছেন । ওনার মুখের গরম ভাঁপ এসে একেবারে কর্ণকুহর পর্যন্ত ঢুকে পড়ে। কিন্তু সে কথা হয়তো নেহাতই মামুলি পাড়ার কাউকে নিয়ে বা সাধারণ রাজনীতি বিষয়ক। যা হরহামেশাই লোকে উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলতে থাকে রাস্তাঘাটে । কেন যে এমন সতর্কতা চাটুজ্যে বাবুর কে জানে?

মেয়েদেরও রেহাই নেই ওনার মনের বিনিময়ের হাত থেকে! ছেলে মেয়ে কোনো বাছবিচার উনি রাখেন না, দেখা হলেই, “কি কেমন আছো ?”,বলে শুরু করে দিলেন। হয়তো ঘন্টা খানেক আগেই ওনার অমৃত বাণী শুনিয়েছেন, আবার তাকেই ধরলেন ।

রোগা ফর্সা, এক মাথা সাদা চুল ,গোঁফ পেকে যাওয়ার পর ছেঁটে ফেলে একেবারে গোঁফ দাড়ি বিহীন চেহারা। গোল গোল গর্তে বসা কুৎকুতে চোখ, তোবড়াণো গাল, উঁচু দাঁত, তার দুটো আবার সব সময় বাইরে ।

ঘুরে ঘুরে বেড়ান পাড়ায়, আর লোক দেখে সেই চেনা ডাক। অনেকে ডাক শুনে মাথা নিচু করে, না শোনার ভান করে পালায়। কার হাতে এত সময় আছে ওনার সঙ্গে মনের বিনিময় করে? উনি না হয় রিটায়ার করেছেন তা বলে তো দুনিয়া শুদ্ধ লোক তো আর রিটায়ার করে বসেন নি।

বাড়িতে চাটুজ্জে বাবুর ছেলের বউ নাতি আর উনি। স্ত্রী মারা গেছেন প্রায় বছর সাতেক। প্রথম থেকেই উনি একটু বাক্যবাগীশ, হাসিখুশি, সদালাপী মানুষ । কিন্তু স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে এই গায়ে পড়া ব্যাপারটা আরো বেড়েছে।

সন্ধ্যেবেলা থেকেই বৌমা টিভিতে মগ্ন ,ছেলে মোবাইলে, নাতনি পড়াশুনায় । প্রায় রাত দশটা , চাটুজ্যে বাবু উঠে একটা প্লেটে তিনটে রুটি আর এক হাতা তরকারি নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে গেলেন। এ বাড়িতে সবাই ব্যস্ত, কারো ফুরসত নেই নিজেদের সঙ্গে কথা বলার ,তো বুড়ো বাবা ,দাদুর সঙ্গে কি কথা বলবে ?নাতনি ছোট থাকতো তাও কাছে আসত, এখন তাও আসে না । বড় হয়েছে না! আর ছেলে তো বড় হয়েছে কবেই!

খাবার সময় সুলতা পাশে বসে এটা-সেটা গল্প করতো। বেচারা ভালো রাঁধতে পারত না ,একটু এলোমেলো, অগোছালো।কিন্তু ওর সঙ্গে বসে আবোল তাবোল গল্পে রান্নার স্বাদ বাড়িয়ে দিত যেন। বৌমা রাঁধে খুব ভালো, কিন্তু একা ঘরে বসে সেই খাবার যেন গলা দিয়ে নামে না চাটুজ্জে বাবুর । এক ঢোঁক জল খান যাতে গলাটা ভেজে।

কি ব্যাপার?জলের স্বাদ নোনতা কেন? ওঃ! চোখটা আজকাল বড় বেইমানি করে, যখন তখন নোনতা জল ঝরাতে থাকে! আসলে বয়স হয়েছে তো!

 

 

আপনার মতামতের জন্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top