ঘটনার প্রেক্ষাপট ১৯৯৯ সাল.. লোকাল ট্রেনের ভোকাল কাহিনী মো ইব্রাহীম খলিল

চাচার শশুর বাড়ি বিশেষ একটা কাজে ট্রেনে করে কুমিল্লা থেকে লাকসাম রওনা হলাম। চাচা আমাকে ট্রেনের ভি আই পি ভাড়া দিলেও লোকালে করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। উপরি যে টাকাটা থাকবে,সেটা দিয়ে হলে গিয়ে একটা বাংলা সিনেমা দেখবো বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম।

অনেক কষ্টে ঠেলা ঠেলি করে ভৈরব থেকে আসা একটা লোকাল ট্রেনে উঠলাম। অনেক কাই কুই করে কোনো মতে চিপা চাপা দিয়ে লোকাল যাত্রীদের চাপা খাইয়া ট্রেনের বগির মাঝ খানে ঠাই নিলাম।

আহা!নানা লোকের ঠাসাঠাসি আর ঘামাক্ত গন্ধে নাসিকা মহা ভোটকা গন্ধে জর্জরিত। তবুও সস্তার তিন অবস্থা মেনে নিয়েও সয্য করে যাচ্ছি।

এদিকে এক খাম্বার ন্যায় বিশাল ভুড়িওয়ালা লোক আমায় পায়ে পারা দিয়ে আকিজ বিড়ি টানছেন। বললাম,দাদা পা টা সরিয়ে নিন।আমি আপনার পায়ের আঘাতে পিষ্ট হচ্ছি।

লোকটি আকিজ বিড়ির ধোয়াটা আমার মুখ বরাবর ছেড়ে দিয়ে বলল,এইডা সরকারি ট্রেইন।আমি আমার পাও যেইহানে মুন চায়, হেইহানে রাখমু,তাতে আপনের গা জ্বলে ক্যা?
আমি কিছুটা ক্ষেপে গিয়ে বললাম৷ এইভাবে কথা বলেন কেনো?

লোকটি আরো তেলে বেগুনে জ্বলে বলতে লাগলো–লোকাল ট্রেইনে উঠলে পায়ে পারা লাগবোই। এতো বাবুগিরি সাঁজলে লোকাল ট্রেইনে না উইঠা ভিআইপি ট্রেনে উঠেন গিয়া।
আমি এরপর কিছু না বলে আরো একটু সামনে গিয়ে দাড়াই।
ট্রেন ভর্তি এতো মানুষ, জানলে সিনেমা দেখার কথা বাদ দিয়ে ভিআইপি ট্রেনেই উঠতাম। এক জনের মুখের সামনে আরেক জনের মুখ।

আমার মুখ বরাবর আরেক বৃদ্ধ মহিলা।
মহিলা পান খেতে খেতে বলতে লাগলো-বাজান,তুমি কি চেড়াগ মেম্বাররে চিনো?
আমি না বলতেই মহিলা বলতে লাগলো,ঐ গোলামের পুতের কাছে কিছু টেহা পামু, শুধু শুধু হয়রানী করে আমায়। লাকসাম থেইকা কুমিল্লায় আহন আর যাওন সব সময় কি সম্ভব?
আমি আর কোনো রা শব্দ না করে যে পকেটে টাকা আছে, সেখানে হাত দিয়ে ধরে রাখলাম, যদি চুরি হয়ে যায়,তাহলে তো ধরা খামু।
ট্রেন চলতে লাগলো—

নারী পুরুষে পুরো ট্রেন কোলাহলে ভরপুর। এরই ভিতর বিভিন্ন টুকরি নিয়ে অনেক দিন মজুররাও উঠেছে। এমনিতেই মানুষের ঠেলা সয্য করতে পারছিনা,তার উপর টুকরি টাকরীর গুতানি আরো জ্বালা দিতে লাগলো।

কিছু লোক তো ট্রেনের বগিতে দু চারজনের জায়গা দখল করে বসে বসে তাস খেলছে কিবা গল্প করতেছিলো।
আমার বা পাশে দেখি তিনজন ফকির কিসিমের মহিলা একজন আরেক জনের মাথার উকুন মারতাছে। এমন সময় কে যেনো একটা বিশাল শব্দে পাদ মারতেই আরেক লোক বলে উঠলো—এই আকামটা কে করলো?পেটে বদহজমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসা করান। এভাবে লোকাল ট্রেনে পাদ মাদ দিয়েন না।
একজন লোক এসে বলতে লাগলো,টিকেট দেখান?
আমি টিকেট দেখিয়ে মুখটা চাপ দিয়ে ধরলাম।

পাশের আরো তিন জনের কাছে টিকেট চাইতেই তারা ৩০টাকা দিয়ে বলল,এই লন ভাড়া?
চেকার আরো ১৫ টাকা চাইতেই এক মুরব্বী বলল- ও..মনু,হামাগো কাছে আর টেহা নাই,হামরা লাকসাম জংশনে ক্ষেতে কাজ করতে যাইতাছি।
চেকার কিছু খিস্তিখৈর গালি দিয়ে আরো সামনে গেলো। এমন অনেকেই যে যার মতো নয় ছয় টাকা দিয়ে চেকারকে বুঝ দিচ্ছে। চেকারও খাস বাংলায় গালাগালি করে টাকা গুলো নিয়ে সামনে এগোতে লাগলো।

মনে মনে ভাবতে লাগলাম,কেনো যে টিকেট কাটলাম, না কেটে এখানে নয় ছয় দিয়েই তো বুঝ দিতে পারতাম।
সামনের দিকে মনোযোগ দিতেই দেখলাম,চেকারের সাথে এক মাছের পোনা বিক্রিওয়ালার তুমুল জগড়া।
চার পাঁচ পাতিল ভরা জ্যান্ত মাছ। চেকার বলল,তোমার ভাড়া দিলা,মাছের ভাড়া কৈ?মাছ কি মাংনাই যাইবো?
নানান লোকের ঘাম আর ভাপসা গন্ধে প্রান ওষ্ঠাগত হবার মতো। অনেক কাই কুই করে আরো একটু সামনে এগুতেই টয়লেটের সামনে এসে দাড়ালাম।

দেখলাম, এক লোক বাহির থেকে সজোরে দরজা ধাক্কাইতাছে। ভিতর থেকে শব্দ আসছে–আরে ভাই এত্ত ধাক্কান কিল্লাই?আমার হাগা শেষ না হইলে তো আমি বের হইতে পারুম না।
এদিকে বাহিরে দাড়ানো লোকটিও বলতে লাগলো,আরে মিয়া..আমার মুত পইড়া যাইতাছে,আর ধইরা রাখতে পারতাছিনা। এভাবে চলতে থাকলো পাল্টা পাল্টি তর্ক বিতর্ক।

এরই ভিতর এক লম্বা জটাধারী দরবেশ কিসিমের লোক দরজায় এসে দরাজ গলায় ধাক্কা দিয়ে বলতে লাগলো–এই..বের হয় বলছি..আমি কল্লাসার মাজারের জটা বাবা বলতাছি।
ভিতর থেকে একই উত্তর,আপনি যেই হোন না কেনো,আমার হাগা শেষ না হওন পর্যন্ত লাইনে দাড়ান।
কি এক বিচ্ছিড়ি অবস্থা! লোকাল ট্রেনের এমন ভোকাল দৃশ্য গুলো আমাকে যেমন বিব্রত করছে,তেমন বিনোদনও কিন্তু পাচ্ছিলাম।

এরই ভিতর এক হকার এসে বলতে লাগলো,এই লোকাল ট্রেনে অনেকেরই দাউদ, একজিমা, আর খোশ পাচরা আছে। যদি এমন কেহ থেকে থাকেন,তাহলে আমার কাছ থেকে একটা পাগলা মলম মাত্র পাঁচ টাকায় কিনে নিয়ে লাগান, মূহর্তেই চুলকানি বন্ধ হইয়া যাইবো।
কয়েক মিনিট পর খেয়াল করলাম, তিন চারজন আগ্রহ ভরে মলম কিনতেছে।

আমি মলম বিক্রেতার কার্যকলাপ গুলো আগ্রহ ভরে দেখতেছিলাম। হঠাৎ চেকারেরে চিৎকার আর চেচামেচিতে সামনে ঠেলে এগিয়ে গেলাম। গিয়ে যা দেখলাম এবং বুঝলাম,তা হলো–এক বানরওয়ালার কাছে টিকেট চাইতেই চেকার অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছিলো। আর অমনি প্রভু ভক্ত সেই বানর চেকারের হাতে খাঁমছি মারে। এতেই চেকার ভয়ার্ত আর্ত চিৎকার মারে। আশে পাশে কয়েক জন লোক হু হু করে হাসছে। একজন তো বলেই ফেললো,ভালোই হইছে,শালা মানুষ নয়,আস্ত কসাই। গরীবের দুখ বোঝে না, তাই বান্দর কামড় মারছে। এই কথা শোনে আরো কিছু লোক হু হু করে হাসতে লাগলো।

আমি জানালার কাছে উ্ঁকি ঝুকি মেরে দেখতে লাগলাম সামনের দৃশ্যপট গুলো। এরই মাঝে আরেক বেদেনী হুঙ্কার ছেড়ে বলতে লাগলো–গছার ব্যারাম, ঘাড়ে ব্যাথা, কোমড় ধরা থাকলে সিঙ্গা নিতে পারেন। কারো সিঙ্গা লাগলে কন্,কম পয়সায় সিঙ্গা দিমু।
কে যেনো বলতে লাগলো,ঐ বেডী..আর জায়গা খুঁইজ্যা পাওনা?ট্রেনে সিঙ্গা দিবো কেডা?
এরই মাঝে আরেকটা শব্দ বোমায় আশে পাশে সবাই নাকে চাপড়ে ধরলো।

কে যেনো বলতে লাগলো,এই গু এর ত্যানা কেডা এইহানে ফেলাইছে?কামডা কে করছে?চুয়া গন্ধে পুরা ট্রেন মৌ মৌ করতাছে।
এরই মাঝে আরেক ফকির মহিলা বলতে লাগলো,ঐ সিঙ্গা লাগানো বেদেনীর কোলের বাচ্চাডা ।
চারদিকে গিজ গিজ, চৈ আর ভোটকা গন্ধে আমি পাগল হবার মতো অবস্থা ।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top