চাঁদনী রাভা – সুব্রত সরকার

গল্প — চাঁদনী রাভা
সুব্রত সরকার

ডেথ ক্লেমের পেপারগুলো দেখছিলাম। আর্লি ক্লেম। অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ।
ফোনটা বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখলাম, আমার প্রিয় উত্তরবঙ্গের ফোন। ডুয়ার্সের বন্ধু শিবুনদা ফোন করেছেন,” অফিসে?”
” হ্যাঁ তো…”
“একটা ছোট্ট ভিডিও পাঠাচ্ছি, হোয়াটসঅ্যাপ টা খুলে দেখুন।” বেশ হাসি খুশি, উত্তেজনায় চঞ্চল মনে হল শিবুনদাকে।

নেট অফ করা ছিল। অন করে হোয়াটসঅ্যাপে শিবুনদার পাঠানো ভিডিওটা খুলতেই দেখলাম, নদীর জলে তিনটে হাতি জলখেলা করছে। একদম লাইভ ভিডিও। ছবি দেখে বুঝতে পারলাম এটা গরম বস্তির সেই চেনা গরম নদী। শিবুনদারা এখানেই স্বপনের চায়ের দোকানে আড্ডা জমায়। গরম বস্তিতে এটাই ওদের ঠেক। আলিপুরদুুয়ার, রাজাভাতখাওয়া থেকে আড্ডাবাজরা সব চলে আসে। আমি গেলেও এই আসাম- বারোবিশা হাইওয়ের ধারের স্বপনের দোকানে বসে গুলতানি করি। জয়ন্তী, বক্সাপাহাড়ের অজানা সব গল্প-কথা শুনি।

তিনটে হাতি গরম নদীর জলে অনেকটা নেমে গেছে। শূঁড় ডুবিয়ে ডুবিয়ে জল খাচ্ছে। সঙ্গে একটা বাচ্চা হাতিও আছে। অনেকদূরে ছবিতে কয়েকজনকে দেখতে পেলাম। তার মধ্যে বাবলুদা ও সুমিতকে চিনতে পারলাম। ওরা বেশ কাছ থেকে এই অ্যাডভেন্চারের মজা নিচ্ছে। ভিডিওটা দেখে আমারও বেশ ভালো লাগল। দেখা শেষ করে,” বাহ্ দারুণ ” লিখে একটা স্মাইলি ও থামস আপ পাঠিয়ে দিলাম।

অফিস থেকে বেরতে আজ একটু দেরীই হল। সুতপা দরকারী কিছু কেনার একটা ফর্দ ধরিয়ে দিয়েছিল। অফিসের নিচের বাজারে ঢুকে চটজলদি সেগুলো কিনে গাড়ি ছাড়লাম। গাড়ি চালানোর সময় আমি গান না শুনে পারি না। গান হচ্ছে, আমি গড়িয়াহাট থেকে বেরিয়ে গোলপার্ক হয়ে লেকের রাস্তা ধরে লেকগার্ডেন্সের রেল ব্রিজের ওপর চলে এসেছি। এই রাস্তাটায় বেশ ফুরফুরে আনন্দে ড্রাইভ করা যায়। ড্রাইভ করছি। ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। একটু সতর্ক হয়ে ফোনটা হাতে তুলে দেখি, বিজয় সিং ভুজেল ফোন করছেন। রাজাভাতখাওয়া-গারো বস্তির বিজয় দা। ওঁর কাঠ বাংলোর দোতলার বারান্দায় বসে দূরের ভুটান পাহাড় ও সিনচুলা রেঞ্জ দেখার আনন্দ ভোলা যায় না। আমি গাড়ির স্পিড কমিয়ে কলটা রিসিভ করে হেসে বললাম,” হ্যালো বিজয়দা, কেমন আছো?”
” স্যার, আপনি কেমন আছেন?”
“ভালো আছি। এই তো অফিস থেকে ফিরছি।”
“অনেকদিন তো আসছেন না! আসুন আবার।”
“যাব। যাব। এবার বর্ষায় তোমার কাছে গিয়ে দুুূদিন থাকব। বোরোলি মাছ খাওয়াতে হবে কিন্ত!”
” স্যার, একটু আগেই একটা খারাপ খবর হল।”
” কি হল?”
” স্যার, রাভা পাড়ার সেই চাঁদনী রাভার কথা আপনার মনে আছে?”
” আছে তো!”
” স্যার, ওর গান শুনে আপনি খুব খুশ হয়েছিলেন। চার্চে ওর বাইবেল পড়া আপনার পসন্দ হয়েছিল। ওর বাড়ির মাকুতে বানানো শাড়ি চাদর দেখে বহুত আচ্ছা লেগেছিল আপনার!”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। সে সব মনে আছে।”
” স্যার একটু আগে এই সন্ধ্যাবেলায় হাট থেকে ও একলা ফিরছিল। অন্ধকার রাস্তায় চক গোলাই মোড়ের ময়না গাছের আড়ালে দাঁড়ানো হাতির মুখে পড়ে যায়।”
” সেকি! তারপর…”
” ও পলাতে পারে নি। ছুট মেরেছিল লম্বা, লেকিন পারে নি…”
” তাই! কি হল তবে…. কাঁদছো কেন বিজয়দা!… বলো…”
” স্যার, ওকে আছড়ে খতম করে দিয়েছে!”

লর্ডসের মোড়ে লালবাতির সিগনালে আমি দাঁড়িয়ে আছি। উজ্বল আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। একটু দূরে সাউথ সিটি মল। তার পাশে আলো ঝলমল বিশাল বিশাল টাওয়ার। গারো বস্তির অন্ধকারে জোনাকির আলোও যেন জ্বলে না! এই সব প্রান্তজনেরা ওখানে জীবন হাতে করেই বাঁচে। মরে।…
চাঁদনীর কন্ঠে কি সুন্দর রাভা সংগীত শুনেছিলাম। চার্চে ওর বাইবেল পড়া ও অন্যদের বুঝিয়ে বলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই মেয়েটা নেই!…

সিগনাল সবুজ হল। আমি গাড়ি নিয়ে গল্ফ গ্রিনের অভিজাত রাস্তায় এখন। মন খারাপ বিষন্নতায় ডুবে আছি। আবার বেজে উঠল ফোন। শিবুনদার কল। ধরব কিনা ভাবছি। আজই দুপুরে শিবুনদার ভিডিওয় হাতিদের সেই সুন্দর জল খাওয়ার লাইভ ছবি দেখেছি, আর এই সন্ধ্যায় বিজয়দার কাছে চাঁদনীর চলে যাওয়ার খবরটা শুনে সব কেমন ঘোলাটে হয়ে গেল!…

চাঁদনী রাভার আছড়ে মরার ভিডিওটা নিশ্চয়ই কেউ তুলতে পারে নি!…

।। সমাপ্ত ।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top